ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস ।। মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে (পর্ব -৩)।। সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 

 মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে 

  সপ্তদ্বীপা অধিকারী   

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

"ভালোবাসার পরীক্ষাতে 
জো করেছে পাশ!
মনে তাহার টৈ-টম্বুর 
ভালোবাসার বাস!
অনাথ আঁতুর যেজন তাদের
বাসতে ভালো আশ
মনের মধ্যে তাইতো তাহার
খুশির এ উচ্ছ্বাস!"

জোএর আনন্দ আর ধরে না। সে তো দিদার সাথে সাথে ঘুরছে। মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান শোনাচ্ছে। কখনো দিদার মাথায় বসছে। কখনো কাঁধে।
বলছে--"দিদা, তুমি তাহলে আমাদের ভালোবাসার পরীক্ষা নিচ্ছিলে?"
বুড়ি বললেন--"হ্যাঁ। গভীর সমুদ্রে তো যে কাউকে পাঠাতে পারি না।  যে যাবে তার জীবন সংশয়। ওখানে অনেক হিংস্র প্রাণী থাকে। আর তাছাড়া জলের ভিতর থেকে অক্সিজেন নেওয়াও তোদের পক্ষে সম্ভব নয়।"
চিন্তিত মুখে জোনাক মা বলল--"তবে উপায় কীহবে গো মা?"
বুড়ি বললেন--"উপায় হবে রাতের বেলায়। দিনের আলোয় এসব কাজ করা যাবে না!"
বললেন তিনি  :
"উপায় হবে রাতের বেলা
যখন গভীর নিশা!
কেমন করে সেথায় যাবে
বাতলে দেবো দিশা!
ভালোবাসা অনেক দামি
সেটাই আসল ভিসা!
সেইটা আছে জেনেছি তাই
বাতলে দেবো দিশা!"

জো বলল:
"যা করার তা জলদি করো
মানুষ লোভী কতো!
অত্যাচারে কন্যেকে সে
করতে পারে হত!
এক মুহূর্তের রক্তপাতে
ভীষণ করে ক্ষত!
বন্ধু আমার  জ্ঞান হারিয়ে
গাছের তলায় রত!"
বুড়ি বললেন--"তোকে দেখে আমার সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। আমি বলছি তো। অন্ধকার হলেই অতল জলের গভীরে প্রবেশের পথ তোকে বলে দেবো।"

জোনাক মা বলল--"কিন্তু আমার মেয়েকে নয় মা, আমাকেই যেতে দাও। ও বাচ্চা মানুষ! বুদ্ধি কম। আমি যাই মা!"
জোনাক বাবা বলে--"কখনোই না। তুমি জোকে নিয়ে ঘরে ফিরে যাও। আমি পাতালে প্রবেশ করছি। তোমাদের একটা নিশ্চিন্তের জীবন দেওয়া আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে!"
"মা মনে চায় সে যাক তবে
জোএর ভালো হোক
মনের ভিতর হিংসা খালি
মানুষ বাজে লোক।
বাবার মনের গহিন পুরে
আছে বড়ো ক্ষোভ
মানুষ যে আজ হিংস্র সেরা
ধ্বংস তাদের হোক।"
জো বলল--"কোনোদিন তা হতে পারে না! আমি এখন যথেষ্ট বড়ো হয়েছি। মা-বাবার প্রতি এখন আমার দায়িত্ব পালন করার সময়। তাছাড়াও মৎস্যকন্যা তো আমার বন্ধু। আমার বন্ধুকে আমি বাঁচাবো। আমি কথা দিয়েছি বন্ধুকে।"
"জো কেঁদে কয়; থামো থামো
এখন আমার পালা!
মা ও বাবা শুনতে কি পাও
হয়েছো কি কালা?
বললে মায়ে অস্ফুটে সে
কী জ্বালা কী জ্বালা!
বাবার চোখের ভাষা বলে
পালা মেয়ে পালা!"
বুড়ি বললেন--"তোরা ঝগড়া করিস নে। জো তুইই যাবি অতল জলের গহিন দেশে।"

জো খুশি হয়ে গেল। তারপর তারা সারাদিন অপেক্ষা করতে লাগল রাতের জন্য। 
জো একবার বলল--"মৎসকন্যার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে দিদা! ওকে কিচ্ছু খেতে দিচ্ছে না! গায়ের আঁশ তুলে নিচ্ছে টেনে টেনে! উফফফফ, সে কি রক্ত বার হচ্ছে গো দিদা তুমি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না!"
বুড়ি বললেন--"সেইজন্যই তো আজই রাত্রে রওনা হতে হবে তোকে!"
জো বলল--"আচ্ছা দিদা, মানুষেরা এত্ত হিংস্র কেন গো? এত্তো লোভী কেন গো? মৎসকন্যার চাষ করবে বলে কী কষ্টটাই না দিচ্ছে আমার বন্ধুটিকে!"
বুড়ি চমকে উঠলেন।
বললেন--"কী বললি? ওরা মৎস্যকন্যার চাষ করবে? তুই কেমন করে জানলি?"
জোনাক মা বলল--"ওরা আলোচনা করছিল। সেইজন্যই তো আঁশ তুলেছে, রক্ত নিয়েছে।"
বুড়ির সমস্ত চোখ-মুখ আবার পাল্টে যেতে লাগল। টকটকে চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। হাতের নখগুলো বেড়ে উঠল।  মাথার চুলগুলো নড়ে উঠল বিষাক্ত সাপের মতো! মুখ দিয়ে বুড়ির আগুন বেরতে লাগল। বুড়ির এই পরিবর্তন দেখে জো আবার আগের মতো ভয় পেয়ে গেল! খানিকক্ষণ বুড়ির মুখের দিকে চেয়ে সে ভয়ে কাঁপতে লাগল ঠকঠক করে। আর তারপরই হঠাৎ কেঁদে ফেলল। জোএর অশ্রু ঝরতেই বুড়ি আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে লাগলেন। 
তারপর তিনি  জোকে বললেন--"সোনা মেয়ে, এত্তো ভয় পাও কেন?"
বললেন:
"ভয় পেয়ো না সোনার মেয়ে
ভয়কে করো জয়।
তবেই তোমার জিত হবে গো
জানিও নিশ্চয়!
মনে প্রেমের আগুন জ্বালো
কোপের করো ক্ষয়!
হিংসা-দ্বেষে খুন করিলে
জীবন প্রেমময়!"
জো বলল--"ওরা আমার বন্ধুকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। আমার বন্ধুকে কিচ্ছু খেতেও দিচ্ছে না!  আমার বন্ধুকে বাঁচাতে তুমিই সাহায্য করতে পারো!"
বুড়ি বললেন--"তা পারি। তোকে বললাম তো যে, অন্ধকার হলে তোকে জলের অতল রাজ্যে যাবার রাস্তা বাতলে দেবো। অপেক্ষা কর।"
বলে বুড়ি বললেন--"তার জন্য তার মা আর বাবার যে কেমন করে দিন কাটছে তা ভেবেই তো আমার কষ্ট হচ্ছে! মৎস্যরাজার আর মৎস্যমহারানির নয়নের মণি এই মৎস্যরাজকন্যে! মানুষেরা ভালো করেনি একদম। ওরা ওদের কৃতকর্মের ফল ঠিকই পাবে!
"গভীর অতল। থাকে সেথায়
মৎস্য তাজা তাজা।
মৎস্যকন্যার প্রাসাদে হায়
থাকেন মহারাজা!
মেয়েকে না দেখে রে দিন
হচ্ছে ভাজা ভাজা!
ধরতে পারলে মানুষকে সে
কঠিন দেবে সাজা!" 
=====================
চলবে-------  

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.