ধারাবাহিক উপন্যাস ।। মাধব ও মালতি (পরিচ্ছেদ - ১৬) ।। সমীরণ সরকার


prem

 

মাধব ও মালতি  

সমীরণ সরকার 


(পূর্বকথা:-- গভীর রাতে  চেতকের পিঠে চেপে মানবেন্দ্র নারায়ন ও পুনি কমলাপুর গ্রাম ছেড়ে‌ পূর্ণিমার রামু মামার বাড়ি সোমড়া গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। যাত্রা শুরু করার আগে মানবেন্দ্র নারায়ণ বলেছিল যে, সে রাতটা তারা
জয়পুরে তার পরিচিত এক পান্থ নিবাসে রাত্রি বাস করে পরদিন সকালে রওনা হবে সোমড়া গ্রামের উদ্দেশ্য। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ওরা দুজনে রওনা হল জয়পুরের উদ্দেশ্যে। বাঁকুড়া থেকে জয়পুর যাওয়ার রাস্তা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ।
জঙ্গলের রাস্তায় রাতচরা পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ আর  বুনো জীবজন্তুর
ডাকে শিহরিত হচ্ছিল পুনি। রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে একটু ভিতরে একটা পরিষ্কার জায়গায় ঘোড়া দাঁড় করালো মানবেন্দ্র। পুনি দেখতে পেল একটা মস্ত বড় গাছের প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাটির দোতলা ঘর। ঘরের ভেতর থেকে হালকা আলোর আভা বেরিয়ে আসছে।)
********************************************"

সোমড়া গ্রামের অভিনব মন্দির স্থাপত্য সম্পর্কে আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯শে আশ্বিন, ১৯৬৭ তারিখে প্রকাশিত বিবরণী এরকম ছিল:--
"সোমড়া ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে হুগলি জেলার একটা গাঁ। বর্তমানে পূর্ব রেলপথের হাওড়া -ধুলিয়ান শাখার একটা রেলস্টেশন। 
স্টেশনে নেমে আপনি সোজা চলে যাবেন পাকা রাস্তা ধরে একেবারে গাঁয়ের ভেতর; খানিক দূর যাবার পর হঠাৎ রুদ্ধ হবে আপনার গতি। চোখে পড়বে একটা বিরাট প্রাসাদতুল্য পাকা বাড়ির 
ধ্বংসাবশেষ। যদি ঢুকতে চান ভাঙ্গা বাড়ীর ভেতরে চোখে পড়বে মর্মর ফলকের একটা লেখা: এখানে বাস করতেন রায় রায়ান রাজা রামচন্দ্র ,দেওয়ান বাংলা- বিহার।
ইংরেজিতে লেখা এই স্মৃতিফলক। এই শ্বেত পাথরের লেখাটি ও ইঁটের তৈরি বাড়ির ভাঙ্গা পাঁজরগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা - বিহারের দেওয়ান রাজা রামচন্দ্র রায় মহাশয়ের
গৌরবময় অতীতের কথা। সাক্ষী হিসেবে বর্তমান রয়েছে ভগ্ন চন্ডী মন্ডপ ও ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত ইঁটগুলো।
গাঁয়ের ভিতরে কাঁটা ও বন জঙ্গলে ঢাকা ভাঙাচোরা অনেকগুলো ইঁটের তৈরি মন্দির রয়েছে। তন্মধ্যে যেটা ভালো ও অভিনব বলে বোধ হয় তা হচ্ছে ষোলোচালা বিশিষ্ট জগদ্ধাত্রী দেবীর ও অষ্টকোণাকৃতি আটচালার মন্দিরটি।
পঞ্চরত্ন ও নবরত্নের মন্দির গুলির বৈশিষ্ট্য 
 উপাক্ষণীয় নয়। তথাপি ষোলচালা ও আটচালার মন্দিরদ্বয় বাংলার স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে একটা বিশেষ স্থানের দাবি রাখে। 
পশ্চিমবাংলার আটচালা, বারচালা ও ষোলচালার মন্দির চারচালার মতন সচরাচর 
বেশি চোখে পড়ে না। আবার যা পাওয়া যায় তাও জরাজীর্ণ  অবস্থায় ।মন্দিরটি বঙ্গের আদি
শ্রীশ্রীমহাবিদ্যা নামে খ্যাত শ্রীশ্রীজগদ্ধাত্রী দেবীর মন্দির, দেওয়ান রায় রামশংকর কর্তৃক
১১৭২ বঙ্গাব্দে স্থাপিত। মন্দিরের গর্ভগৃহ চতুষ্কোণ আয়তক্ষেত্র বিশিষ্ট। গর্ভগৃহের চাল 
ক্রমহ্রাসমান আকৃতিতে ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠে গেছে। কিন্তু এর অন্যতম আকর্ষণীয় হলো মন্দিরের পিরামিডাকৃতি ছাদ। দক্ষিণ ভারতের পহ্লব মন্দির -স্থাপত্যের সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে। 
দূর থেকে দেখতে অনেকটা উল্টানো নৌকার তলার মতো। যদিও এটির মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় দ্রাবিড় মন্দির স্থাপত্য রীতির ছাপ পড়েছে তবুও উড়িষ্যার পীঢ়া ভদ্র দেউলের প্রভাব কে অস্বীকার করতে পারেনি বাঙালি শিল্পী। উড়িষ্যার ভদ্র দেউলের গণ্ডীর উপরিভাগকে এক কথায় মস্তক বলা হয়। মিনারগুলির মস্তকের উপরে উড়িষ্যার দেউল স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষণীয়। মন্দিরটা একটা চতুষ্কোণ ঘরের মতন দেখতে। দেওয়ালে না আছে কোন উৎকীর্ণ ভাস্কর্য, না আছে কোন কারুকার্য, আছে শুধু চূন বালির সাদা পলেস্তারা। 
এখানকার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য মন্দির হলো সব জঙ্গলে ঢাকা আটচালার মন্দিরটি। এরূপ ভালো অষ্টকোণাকৃতি   আটচালার মন্দির সাধারণতঃ দেখা যায় না। অনুরূপ একটা জীর্ণ আটচালা 
মন্দির হুগলির ইলছোবা- মন্ডলাই গাঁয়ে আছে।
মন্দিরের বাইরে থেকে সমগ্র মন্দির সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা যায় না। মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি।..…............. পঞ্চরত্ন ও নবরত্নের মন্দির গুলো অধিকাংশ অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নির্মিত হয়েছিল তা বোঝা যায় নবরত্ন মন্দিরের খোদিত তারিখ (১৬৭৭ শকাব্দ অর্থাৎ 
ইংরেজি ১৭৫৫ সালে) ও গঠন রীতি দেখে।.....…..।"

                     (ষোলো)

মানবেন্দ্র নারায়ণ দোতলা মাটির ঘরটির থেকে একটু দূরে  চেতককে দাঁড় করিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝাঁপিয়ে নামল। তারপর পুনির দিকে হাত বাড়িয়ে খুব সন্তর্পনে ওকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে মাটিতে দাঁড় করিয়ে দিল।
পুনি বলল, এত রাতে মনে হয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তোমার কে যেন পরিচিত আছে বলছিলে না কুমার?
-----হ্যাঁ, জগন্নাথ পাত্র। ও দেখাশোনা করে এই সরাইখানা টি। এই পথ দিয়ে যারা যায় , তাদের অনেকে এখানে দিনের বেলায়  খাওয়া-দাওয়া করে, বিশ্রাম নেয়, তারপর নিজের গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সন্ধ্যার পর সাধারণত এখানে কেউ আসে না। তবুও যদি কোন কারনে ই কেউ সন্ধ্যার পর এখানে এসে পড়ে, তারা এখানে রাত্রি বাস করে সকালে চলে যায়। 
আমি দেখি, জগন্নাথ বাবু আছেন কিনা। 
--হ্যাঁ, দেখো কুমার ।
মানবেন্দ্র নারায়ন সরাই খানার দিকে এগিয়ে গেল। 

(চলবে)

Regards
Dr. Samiran Sarkar
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727




Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.