ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস ।। মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে (পর্ব -৪)।। সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 

 

 মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে 

সপ্তদ্বীপা অধিকারী    

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ 


"মৎস্যরাজার বিশাল প্রাসাদ
সাগর তলে বাস
এত্তো গভীর সেথায় যেতে
লাগবে বারো মাস!
ইচ্ছে হলে মানব সমাজ
করতে পারে নাশ!
কিন্তু তারা প্রেমিক, তাদের
বিবেক টানে রাশ!
নীল তিমিরা মানুষকে যে
করতে পারে দাস!
মৎস্যরাজার বিশাল প্রাসাদ
সাগর তলে বাস!"

সাগরের অতল গভীর নীচে আছে  রাজপ্রাসাদ। সেখানে বিশাল স্ফটিকের প্রাসাদের সিংহাসনে বসে আছেন মৎস্যকন্যার বাবা মহারাজ পান্নালাল।  দুশ্চিন্তায় তিনি অধীর হয়ে ছটফট করছেন। চারিদিকে পাত্র-মিত্ররাও ছটফট করছে। মৎস্যরাজ বলছেন--" মৎস্য যুবকদের পাঠিয়েছি খোঁজার জন্য। উত্তরের গভীর সমুদ্রের নীল তিমিকে সন্দেহ করেছিলাম। ব্যাটা ভীষণ পাজি।" 

কথা তাঁর শেষ হয়েছে কি হয়নি রাজদ্বারে মৎস্যরানিমা চুনিবালাকে দেখা গেল। বিষন্ন আর ম্রিয়মান। সুন্দর চেহারার সমস্ত পারিপাট্য আজ অতীত। একমাত্র মেয়ের শোকে তিনি পাগলিনি প্রায়। তাঁদের রাজপ্রাসাদ গভীর সমুদ্রের ভিতরে। জলের নীচের মাটির উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই প্রাসাদের ভিতরেও জল,  জল আর জল। তাঁরা সেই জলের মধ্যেই লেজ নেড়ে নেড়ে মাছেদের মতোই সাঁতার কেটে কেটে চলছেন।

 স্ফটিকের তৈরি রাজপ্রাসাদের বাইরেও জল, জল আর জল। তবে এই দুই জলের মধ্যে পার্থক্য আছে। সমুদ্রের জলে নানারকম ছোটো বড়ো মাছেদের আনাগোনা। এছাড়াও বিভিন্ন লতাগুল্ম তো আছেই। আরও অনেক নোংরা নোংরা জিনিষপত্রও পড়ে রয়েছে। মানুষরা তাদের ব্যবহার করা প্লাস্টিকের বোতল, ব্যাগ, প্যাকেজিং সামগ্রী,  মাইক্রোপ্লাস্টিকের  বিভিন্ন মোড়ক সমস্ত রাস্তা-ঘাটে ফেলে দেয়। বিভিন্ন কলকারখানা থেকে আসে বিষাক্ত রাসায়নিক 
বর্জ্য, পারদ, ভারী ধাতু ইত্যাদিও।
এছাড়া সমুদ্রগামী বড়ো বড়ো জাহাজ বা তার ট্যাংকার থেকে তেল নি:সরণের ফলেও সমুদ্রের জল দূষিত হয়।

কৃষিকাজের সময় মানুষ তাদের জমিতে যে কীটনাশক ব্যবহার করে তা বৃষ্টির জলে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রে মিশে সমুদ্রের জলকে দূষিত করে তোলে।
শহরের নর্দমার অপরিষ্কার জলও সমুদ্রে গিয়ে মেশে।  বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড থাকে। মানুষদের কারণে বায়ুতে এই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন সমুদ্র এই অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নেয়। যার ফলে সমুদ্রের জল আম্লিক হয়ে পড়ে। এই জল সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।

এছাড়া মৎস্য-শিকারীরা মাছ ধরার পির ছেঁড়া জাল সমুদ্রে ফেলে দেয়। এই জাল  বছরের পর বছর সমুদ্রে ভাসতে থাকে। মাছেদের এতে মারাত্মক ক্ষতি হয়।
মাছ ধরার সময় মৎস্যশিকারীরা যে নৌযান বা ট্রলারে করে সাগরে যায়, তা মবিল বা ইঞ্জিন তেলে চলে এবং এই তেল সাগরের জলে মিশে গিয়ে জলকে দূষিত করে তোলে। অনেক সময় এরা অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিকও ব্যবহার করে জলকে বিষ করে তোলে। মানুষের মতো জঘন্য, নৃশংস প্রাণী আর দুটো নেই এই দুনিয়ায়!

চাষ করার সময়ে মানুষ যে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে, সেসবও বৃষ্টির জলে সব এসে সাগরে মিশে সাগরের জলকে দূষিত করে তোলে।
  
 এছাড়া বিভিন্ন ছোটো, বড়ো মাছ নানারকম কারণে মারা গেলে তা থেকেও জল দূষিত হয়।
"দুপেয়ে জীব মানুষেরাই
নষ্ট করে জল
জলের বোতল, রাসায়নিক
কিংবা ফেলে মল!
তারা নাকি বিদ্বান বড়ো
এই নাকি তার ফল!
আসল কথা মানুষেরাই
সবার থেকে খল।" মৎস্যরাজ পান্নালাল তাই সমুদ্রের দূষিত জলরাশির থেকে তাঁর প্রাসাদ গড়েছেন শুদ্ধ জলরাশির ভিতর। তাঁর রাজপ্রাসাদের জল স্বচ্ছ নীল এবং পরিশুদ্ধ। তিনি পরিকল্পনা করেছেন মানুষেরা যদি সমুদ্রের জলকে দূষিত না করে তাহলে পুরো সমুদ্রের জলই তিনি এমনই পরিশুদ্ধ করতে পারেন। কিন্তু তা সম্ভব নয় বলেই আপাতত তাঁর রাজপ্রাসাদ শুদ্ধ জলেই তৈরি। সেই শুদ্ধ জলের  ভিতর মুক্তার দানা ভর্তি। সেই মুক্তার রঙ শুধু সাদাই নয়। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, আকাশি, কমলা, সোনালি, রুপালি এইসমস্ত রংই আছে! জলের ভিতর  মুহুর্মুহু তাদের রঙ পরিবর্তিত হয় এবং বিচ্ছুরিত হয়। এই সৌন্দর্যের মধুর অনুভূতি সমুদ্রের অন্য কোনো প্রাণীরা পায় না! মৎস্যরাজ ভীষণ বুদ্ধিমান। মানুষের থেকে তাঁদের বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে। তাঁরা যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করেন না। এই কারণেই তাঁদের এতো উন্নতি। মানুষ এতো কিছু করেও শুদ্ধ অক্সিজেনের পৃথিবী তারা কোনোদিনই সৃষ্টি করতে পারবে না। এই ব্যাপারে তাদের গাছেদের সাহায্য নিতেই হবে। অথচ মৎস্যরাজ পান্নালাল তা করে ফেলেছেন। তিনি বলেন:
"জন্ম-মৃত্যু সবই সত্য
লড়াই কেন তবে?
নিজেরাই সবার প্রাণের
আপন হতে হবে।
মারলে তোমায় আমার কী লাভ?
কেউ রবে না ভবে?
বাসলে ভালো সবার প্রাণে
তবেই বেঁচে রবে!"

এই যাঁর মানসিকতা সেই মৎস্যরাজ তাঁর একমাত্র কন্যাকে যে চোখে হারাবেন তা তো বলাই বাহুল্য!
মেয়েটা ভীষণ চঞ্চল। যখন তখন এদিক ওদিক সাঁতার দিয়ে চলে যেতো। মহারাজ পান্নালাল অনেকবার বলেছেন:
"এত্তোদূরে যাসনে মাগো
নোংরা জলে ভরা
একটু হেসে মেয়ে বলে
'তাতে কী আর করা?
দিলাম কথা বাবা তোমায়
আসব ফিরে ত্বরা।'
মৎস্যরাজা ভয় পেয়ে কন
'যদি পড়িস ধরা?
এত্তো দূরে যাসনে মাগো
মাছের খাদক ভরা!"
হ্যাঁ, সমুদ্রে তো মাৎস্যন্যায় চলে। তার মেয়েটা সুন্দর। স্বাস্থ্যবতী। 
তিনি তাই ভয় পেয়ে মেয়েকে দূরে যেতে নিষেধ করতেন। মেয়ে কথা শুনত তো না-ই। তার আবার গোঁসা হতো। আর গোঁসা হলেই সে কিচ্ছু খেতো না। মুখ গোমড়া করে ঘুরে বেড়াত।

 মৎস্যরাজ মেয়ের হাসিহীন মুখ সহ্য করতে পারতেন না। তিনিই আবার মেয়েকে আদর করতেন। বলতেন --"ঠিক আছে। যা একটু ঘুরে আয়। কিন্তু দেরি করবি না।"
মেয়ে অনুমতি পেয়েই প্রাসাদের ফটক খুলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত সমুদ্রের অথৈ জলে।  আবার নিজে নিজেই ফিরে আসত। কিন্তু এবার 
তাঁদের আদরের মেয়েটা সেই যে গেল, আজ চারদিন হয়ে গেছে সে আর ফিরে এলো না।

মৎস্যরাজ পান্নালাল বলেন:
"কোথায় গেছিস সোনার মেয়ে
ফিরে আয় ফিরে আয়!
তোকে ছাড়া দিন কাটে না
বাপ তোর অসহায়!
আশায় আশায় পথ চেয়ে রই
পাঁজর ভাঙে হায়।
কোথায় গেছিস সোনার মেয়ে
বুকে আয় ফিরে আয়।" মৎস্যকন্যার শোকে পাগলপ্রায় রাজমহিষী চুনিবালা মহারাজের দরবারে হত্যে দিয়ে পড়লেন।
"মহারাজ, আমি আমার মেয়েকে চাই। আর কিচ্ছু চাই নে। মেয়েকে ফিরিয়ে দিন। নইলে আমি আমরণ উপবাসে দেহত্যাগ করব!"
মৎস্যরাজ পান্নালাল বলেন:
"আর কেঁদো না মহারানি
আর করো না রোষ!
কন্যা নিজেই হারিয়েছে
দেবে কারে দোষ!
বারে বারে বুঝিয়েছি
একটু ঘরে বোস!
ওমনি মেয়ের মান হয়েছে
ওমনি অসন্তোষ!" 
--------------------------
চলবে-------------  

 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad