প্রয়াণ দিবসেও সংকটের দিশারী রবীন্দ্রনাথ
পাভেল আমান
আরো একটা বাইশে শ্রাবণ বাঙালি মানস যথাযোগ্য ভক্তি শ্রদ্ধা ও মর্যাদায় পার করে এলো । ২৫ শে বৈশাখের মতোই বাঙ্গালীরা কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা ভক্তি ও মর্যাদায় প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস স্মরণ করে। প্রতিটি বাঙালি মননে তিনি রয়ে গেছেন চরমভাবে আচ্ছন্ন হয়ে তার কালজয়ী সৃষ্টিশীলতার মধ্যে দিয়ে ।আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৬ তম প্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে তার জীবনাবসান ঘটে। দিবসটি রবী ভক্তদের কাছে একটি শূন্য দিন।বাইশে শ্রাবণ বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্র ভক্তদের কাছে মন খারাপের দিন। মহাকালের চেনাপথ ধরে প্রতিবছর বাইশে শ্রাবণ আসে।বাঙালির সংস্কৃতি সত্তার বাতিঘর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষা ঋতুকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এই ঋতু নিয়ে তার অসংখ্য কবিতা, গান, ছোট গল্প, প্রবন্ধ রয়েছে। সেই বর্ষাতেই তিনি চির বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। বিশ্ব দরবারে চিনিয়েছেন বাংলা ভাষাকে। ছিনিয়ে এনেছেন সাহিত্যের নোবেল। বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। বাংলা ভাষা সংস্কৃতি সাহিত্য বাঙালি চেতনা সর্বোপরি বাঙালিত্বকে রবীন্দ্রনাথ জাতিসত্তার ভূবনে এক অনন্য শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন কবি নন; তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক। সময়ের সীমানা অতিক্রম করেও তার সৃষ্টি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ এর প্রভাব বিস্তর এবং অতি বিস্তর। তিনি বাঙালিকে নতুন আলোয় ভাবতে শিখিয়েছেন, জীবন যুদ্ধে পথ দেখিয়েছেন, বিপর্যয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন, প্রেম-বিরহের গভীরতা বুঝিয়েছেন, বিশ্বপ্রকৃতি ও ঈশ্বরকে এক সূত্রে বাঁধতে শিখিয়েছেন, বৃহত্তর জগতে বাঙালিকে পরিচিতি দিয়েছেন, এবং... এরকম আরো অনেক কিছু করেছেন। তাই ২২শে শ্রাবণের মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালির এক লহমায় অজস্র ঐশ্বর্য হারিয়ে ফেলার এক নিবিড় স্তব্ধ যন্ত্রণা।রবীন্দ্র-জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তাঁর অতলান্ত অনুভব ক্ষমতা। জীবন সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ দুচোখ ভরে জীবনকে দেখে গিয়েছেন। অফুরান বিশ্ব, অফুরান ঈশ্বর, অফুরান প্রেম, অফুরান প্রকৃতি, অফুরান সময়... তাদের হাজারো বিচিত্র রূপ ! হাজারো বিচিত্র খেলা ! দেখেছেন, আর তাঁর মুগ্ধ অনুভবের নির্যাসটুকু উদারভাবে বিলিয়ে দিয়ে গেছেন গল্প উপন্যাস গানে কবিতায়। আমরা আপ্লুত হয়েছি, আমরা ঋদ্ধ হয়েছি, প্রাণিত হয়েছি।তাঁর চোখ দিয়ে আমরা জীবনকে দেখতে শিখেছি।২২শে শ্রাবণ, আসলে রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে আপামর বাঙালির নিজস্ব বোধ ও চেতনাকে আরো বহু বছর বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প গ্রহণের দিন। আজকে চারিদিকে যখন অস্থিরতা অসহিষ্ণুতা অবিশ্বাস বিদ্বেষ বিভাজন মানুষে মানুষে হিংসা সাম্প্রদায়িকতা ভয়াবহ বাতাবরণ ভেঙে পড়ছে আজন্মকাল বাপি গড়ে ওঠা সৌহার্দ্য সম্প্রীতি সংহতি ঠিক সেই মুহূর্তেই এই সংকটের দিশারী হিসাবে আমাদের আবারো বিবেক চেতনার জাগরণে মানবতার পথে চালিত করতে পারেন আমাদের সকলের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার রচনার মধ্যেই নিহিত আছে ব্যক্তি সত্তার উৎকর্ষ মনুষ্যত্বের উদ্দীপনা সর্বোপরি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বহুত্ব ঐক্যের আবদ্ধ আরো আরো বেঁধে বেঁধে থাকার শাশ্বত রসদ। শুধুমাত্র পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্র প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে তার সম্পর্কে বড় বড় গাল ভরা কথা বলে সোশ্যাল মিডিয়াতে তার রচনা পাঠের মধ্যে দিয়ে তাকে যথাযথ স্মরণ করা হয় না যতক্ষণ না আমরা তার লেখনীর আত্মস্থীকরণে নিজেদের যথার্থ বাঙালি হিসাবে ভাবতে শিখি। আজকে বাংলা ভাষা বাংলা সংস্কৃতি বাংলা সাহিত্য ও বাঙালিত্ব চেতনা থেকে বিকশিত ও পরিপূর্ণ করে তুলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিপুলা সৃষ্টির মধ্যে আমাদেরকে ভুব দিতে হবে। শেকড় কে ভুলে গেলে আমাদের ঐতিহ্য পরম্পরা অস্তিত্বহীন হয়ে উঠবে। পরিশেষে একটি কথা একজন বাঙালি হিসাবে বাঙালি সংস্কৃতি চেতনা সর্বোপরি বাঙালিত্বের উন্মেষ ঘটাতে ও সংকটের উত্তরণে্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ আমাদের চির সাথী পথপ্রদর্শক ও আলোর দিশারী। রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র পচিশে বৈশাখ কিংবা বাইশে শ্রাবণ নয় বাঙালি মননে চিন্তনে জাগরণে তিনি প্রতিটি মুহূর্তে তার কালজয়ী সৃষ্টিশীলতা ও পাহাড় প্রমাণ ব্যক্তিসত্ত্বায় বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন।
রচনা -পাভেল আমান- হরিহরপাড়া- মুর্শিদাবাদ

