করাল গ্রাস” ও “নগ্ন নির্জন হাত”--- একটি সংলাপধর্মী প্রবন্ধ ।। রণেশ রায়


 

“করাল গ্রাস” ও “নগ্ন নির্জন হাত”---

একটি সংলাপধর্মী প্রবন্ধ

রণেশ রায় 


জীবনানন্দ দাশের "নগ্ন নির্জন হাত" কবিতায় সময়, ক্ষয়, স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। সেখানে কবি যেন এমন এক নারীর মুখোমুখি, যিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন—তিনি ইতিহাস, সভ্যতা, প্রেম এবং মানুষের অস্তিত্বের রূপক। তাঁর নগ্নতা দেহের নয়, সময়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়া জীবনের নগ্নতা। তিনি তাঁর কবিতার শুরুতেই লেখেন :

“আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হ’য়ে উঠছে:
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।”

আমাদের "করাল গ্রাস" সেই কবিতারই এক নীরব উত্তর।

জীবনানন্দ প্রশ্ন করেন— "কোথায় গেল সেই সৌন্দর্য?"

আমরা বলি— "সে সময়ের করাল গ্রাসে হারিয়েছে।"

তাঁর কবিতায় হারিয়ে যাওয়া নারী স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে। আমাদের কবিতায় সেই নারীও হারিয়ে যায়, কিন্তু তার অন্তর্ধান চূড়ান্ত নয়। আমরা বিশ্বাস করি, সময় যেমন ধ্বংস করে, তেমনি নতুন জন্মেরও আয়োজন করে।

জীবনানন্দের কবিতার অন্ধকার নিঃসঙ্গ। তাই তিনি লেখেন :

“কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস—
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।”


আমাদের কবিতায় অন্ধকারের বুক চিরে নতুন প্রভাতের আগমন ঘটে। তাই আমাদের কবিতার শেষ উচ্চারণ—
“সময়ের বুক চিরে তার আগমন আবার।”

এই "আবার" শব্দটিই দুই কবিতার প্রধান সংলাপ। জীবনানন্দ যেখানে ক্ষয়ের গভীরতাকে অনুভব করেন, আমরা সেখানে পুনর্জন্মের সম্ভাবনা দেখি।

আমাদের কবিতায় ব্যাবিলনের স্বর্গোদ্যান, মিশরের পিরামিড, পারস্যের গালিচা—এসব কেবল ইতিহাসের নিদর্শন নয়; এগুলো মানুষের সৃষ্টির মহিমা, যা সময়ের আঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। সেই কারণেই শেষ পর্যন্ত আমরা উচ্চারণ করি—

“নবজীবনের উৎসরণে
জাগে নতুন প্রাণ।”

এইখানেই "করাল গ্রাস" জীবনানন্দের কবিতার অনুকরণ নয়; বরং তার সঙ্গে একটি সৃজনশীল সংলাপ। কবি জীবনানন্দ সময়ের নিষ্ঠুরতাকে দেখেছেন, আমরা সেই নিষ্ঠুরতার ভেতর থেকেই ভবিষ্যতের বীজ খুঁজি ।

দুটি কবিতার মধ্যে তাই বিরোধ নয়, বরং উত্তরাধিকার আছে। একটির ভাষা ক্ষয়ের, অন্যটির ভাষা পুনর্জন্মের। একটির শেষ নৈঃশব্দ্যে, অন্যটির শেষ নতুন জীবনের জনরাজে—যেখানে মানুষ, স্মৃতি ও নবজাগরণ মিলেমিশে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়।



সংযোজন 

জীবনানন্দ দাশের "নগ্ন নির্জন হাত" অবলম্বনে

করাল গ্রাস
রণেশ রায় 

জীবনাকাশে আঁধার ঘনায়—
সে এক করাল গ্রাস।
হেমন্ত শেষে হিমশীতল শীত,
যেন জ্যৈষ্ঠের দুপুরের সহদরা।

সে সেই অদেখা সুন্দরী আমার,
রহস্যময়ী, অচেনা নারী—
যে আমাকে ভালোবেসেছিল---
হারিয়ে গেছে সে আজ।

সেই নগ্ন দেহ, নীল আকাশ,
আদিম সেই স্থাপত্য—
ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ-মিনার;
হয়তো ব্যাবিলনের স্বর্গোদ্যান,
মিশরের পিরামিড, পারস্যের গালিচা—

সপ্তম আশ্চর্যের মতোই
ভঙ্গুর এ জীবন,
সেই নারীর নগ্ন শরীর,
যাকে আমি ভুলিনি।

কোন সে করাল গ্রাস?
সময়ের নিষ্ঠুর আঘাত---
আঘাত হানে সবারই;
সেই নারী আমার—
সেও হারায়
সময়ের করাল গ্রাসে।

তবু জানি, সে জাগে নতুনের মাঝে---
সময়ের বুক চিরে
তার আগমন আবার।

নবজীবনের উৎসরণে
জাগে নতুন প্রাণ;
দীপ্ত প্রাণের স্পন্দন
শুনি আজ,
আগামীর নতুন প্রভাত—
নতুন জীবনের জনরাজ।


নগ্ন নির্জন হাত
জীবনানন্দ দাশ 

আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হ’য়ে উঠছে:
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।

যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হ’য়ে উঠছে।

মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা
সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।

ভারতসমুদ্রের তীরে
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে
আজ নেই, কোনো এক নগরী ছিলো একদিন,
কোনো এক প্রাসাদ ছিলো;
মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ:
পারস্য গালিচা, কাশ্মীরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা,
আর তুমি নারী—
এই সব ছিলো সেই জগতে একদিন।

অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিলো,
মেহগনির ছায়াঘন পল্লব ছিলো অনেক;
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কতো শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুঁজি না।

ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী,
অপরূপ খিলান ও গম্বুজের বেদনাময় রেখা,
লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ,
অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধূসর পাণ্ডুলিপি,
রামধনু রঙের কাচের জানালা,
ময়ূরের পেখমের মতে রঙিন পর্দায়-পর্দায়
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস—
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।

পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!
তোমার নগ্ন নির্জন হাত;

তোমার নগ্ন নির্জন হাত।

=============== 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.