ছবিঋণ- ইন্টারনেট
মাথাভাঙ্গা মন্দিরে
বিদ্যুৎ মিশ্র
আকাশের গায়ে মেঘ ঘন হয়ে এসেছে, এদিকে ভূষণবাবু দ্রুত পা চালালেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।একটা ঘন জঙ্গল পেরিয়ে তবে তার বাড়ি। প্রতিদিনই ফিরতে দেরি হয়ে যায়। আজ একটু বেশি দেরি হয়ে গেল। হঠাৎ করে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগতেই তার চলার গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল।
লক্ষ্য করলেন আশেপাশে কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই ।তাই কাকভেজা হয়ে তিনি জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করলেন পাতার ফাঁকে যেটুকু বৃষ্টি ফোঁটা গায়ে লাগে তাতে অবশ্যই খুব একটা সমস্যা হবে না। কিন্তু যেভাবে আঁধার করে এসেছে ,রাস্তার পথটুকু ভালো করে দেখা যায় না। কিছুদূর এগিয়ে তিনি দেখতে পেলেন পথের পাশে সেই মাথাভাঙ্গা মন্দির’টা । আদিকাল থেকে সেটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেকের মুখেই শুনেছেন জায়গাটা নাকি অশুভ । একটা সময় ওখানে নিয়ম করে পুজো অর্চনা হতো।একদিন সেখানে পুরোহিতকে মেরে ফেলে মন্দিরের সব গয়না নিয়ে পালায় একদল দুষ্কৃতী। তখন থেকে গ্রামের মানুষ এই জায়গাটাকে এড়িয়ে চলে ।সন্ধ্যার পর আর কেউ এই পথে পা মাড়ায় না।
আজ হঠাৎ করেই এত সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার পর ভুষণবাবু এই পথটাতে আসতে বাধ্য হলেন তাই মাথাভাঙ্গা মন্দিরটা দেখে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠলো। একটু গভীরে যাওয়ার পর খুব জোরে একটা শব্দ করে বাজ পড়ার শব্দ শুনে তিনি চমকে উঠলেন , মন্দিরের দিকে ফিরে দেখলেন সেটার ভেতরে একটা প্রদীপ জ্বলছে ।তিনি বেশ অবাক হলেন, এই পরিত্যক্ত মন্দিরে, রাতের বেলা বৃষ্টির মাঝে এখানে কে প্রদীপ জ্বালাতে এসেছে। তিনি আর সাহস করে এগোলেন না সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
দেখলেন মন্দিরের ভেতর থেকে ২৪-২৫ বছরের একটি বউ বেরিয়ে আসছে ,মাথায় রাঙ্গা সিন্দুর, মুখে উদ্ভাসিত আলো । ঠিক যেন কোন লক্ষ্মী প্রতিমা, তার মনে ভক্তির সঞ্চার হল, তিনি মনে করলেন নিশ্চয় কোন দেবী অথবা অপ্সরা। তিনি কাছে গিয়ে প্রণাম করে শ্রদ্ধাভরে জিজ্ঞেস করলেন ,তুমি কে মা ? আর এই আঁধারবেলা বৃষ্টির মাথায় নিয়ে এখানে কি করছো? বউটি কিছু বলল না তার দিকে একটি মিষ্টি হাসি হেসে আবার বনের উল্টো পথে চলে গেল । ভূষণবাবু সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না? মনের কৌতূহল চাপা পড়ে রইল । তিনি দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন । বাড়িতে ফিরে তার গিন্নিকে সব ঘটনা বিস্তারিত জানালেন । তার গিন্নি বলল, তুমি মায়ের দর্শন পেয়েছো? কাউকে এ কথা জানিও না।
সেদিন রাতে ভূষণ বাবুর ভীষণ জ্বর এলো, জ্বর আর মাথা ব্যথা। গ্রামের মধ্যে কোন ভালো ডাক্তার নেই ।সেই শহরে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য ,তাই গ্রামের ছেলেরা তাকে শহর নিয়ে যাবার উপক্রম করল। কিন্তু সব বিফলে গেল সে রাতেই ভূষণবাবু তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ভূষণ বাবুর স্ত্রী রাতের ঘটনাটা গ্রামের মানুষদের জানালেন। গ্রামের মানুষ বললেন ওটা কোন দেবীর স্বরূপ ছিল না ,নিশ্চয়ই কোন ডাকিনী, তাই ওই ভাঙ্গা মন্দিরের কাছে কেউ যায় না। ধীরে ধীরে এই কথাটা পুরো গ্রামে চাউর হয়ে গেল। এই ঘটনা আরো কয়েকদিন পার হয়ে গেল ।
হঠাৎ করে একটি আট দশ বছরের মেয়ে বল খেলছিল , বলটা একটা ঝোঁপের আড়ালে চলে গেলে সে বলটি আনতে যায় তারপর মেয়েটির চিৎকার শুনে গ্রামের মানুষ সেখানে উপস্থিত হয় এবং মেয়েটির ক্ষতবিক্ষত দেহ তারা উদ্ধার করে। ওইটুকু ফুটফুটে মেয়ের এরকম মর্মান্তিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারল না। কিন্তু ব্যাপার এই যে সামনের জঙ্গলে কোন হিংস্র পশু থাকতো না। হ্যাঁ, কদাচিৎ কখনো শেয়ালের ডাক শোনা যায়। কিন্তু গ্রামের সংলগ্ন মাঠে এসে কোন শেয়াল একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে জখম করতে পারে না, তাই গ্রামের মানুষ কিছু সদুত্তর না পেয়ে এটাও ডাকিনী করেছে, এটাই রটিয়ে দেয়। গ্রামে একটার পর একটা দূর্ঘটনা ঘটতে থাকে ।একবার স্কুলের মাস্টার মশাই তার ছাত্রদের নিয়ে মাঠের মধ্যে খেলার আয়োজন করেছেন। ছেলেদের খেলা যখন জমে উঠেছে হঠাৎ করে জঙ্গলের ভেতর থেকে শাঁখের শব্দ শোনা গেল, তারপরে শঙ্খ ঘন্টা বেজে উঠল ।যেন ভাঙ্গা মন্দিরে পুজো হচ্ছে, ছেলেরা বেশ আশ্চর্য হল। তারা বাড়ি ফিরে নিজেদের বাড়িতে জানালো।গ্রামের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো মন্দিরে নিশ্চয়ই কোনো অপশক্তির আরাধনা করে ডাকিনীকে জাগানো হয়েছে, যার জন্য ভুষণ বাবু বা ওই ফুটফুটে মেয়েটির এরকম মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে কিন্তু এর থেকে রক্ষা পাবার উপায় জানে না কেউ।
প্রতিমাসেই গ্রামের কেউ না কেউ জঙ্গলের ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যেতে শুরু করলো। একদিন গ্রামের মোড়ল সবাইকে ডেকে বলল, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকলে কোনো সমাধান হবে না। বরং চলো সবাই নিবারণ পণ্ডিতের কাছে যাওয়া যাক। একমাত্র সেই এর কোনো সমাধান করতে পারেন। সবাই সম্মতি জানালো। এ ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না। গ্রামের মোড়ল আর দুইজন গ্রামবাসী তার পরের দিন সকালবেলা নিবারণ পণ্ডিতের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
নিবারণ পণ্ডিত সেইসময় দাওয়ায় বসে হুকোতে টান দিচ্ছিল। মোড়ল তার কাছে এসে হাত জোড় করে বলল, পণ্ডিত মশাই একমাত্র আপনিই পারেন আমাদের এই সমস্যা থেকে উদ্ধার করতে। নিবারণ পণ্ডিত পুরো ঘটনাটা সবিস্তারে শোনার পর যেতে সম্মতি প্রকাশ করলো। তারা সেদিন বিকেলে রওনা দিল। গ্রামে পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়ে গেছে, আকাশের গায়ে ফুট ফুটে চাঁদ, তারা ভরা রাত, ফুরফুরে বাতাস ।বেশ মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। নিবারণ পন্ডিত বললেন গ্রামের মধ্যে কোন অপশক্তি অথবা অশুভ কিছুর প্রভাব নেই, রইলে অবশ্যই আমি অনুভব করতাম। তার মানে যা কিছু রহস্য আছে ওই ভাঙ্গা মন্দিরে। আজকের রাতটুকুটা বিশ্রাম নিয়ে কালকে আমি মন্দিরে যাবো। মড়লের বাড়িতে নিবারণ পন্ডিতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাত্রে নিবারণ পণ্ডিত কিছুই খাইনি, শুধু এক গ্লাস দুধ আর কলা মেখে একটু চিড়ে খেয়েছিল। ঘরের সোনালী আলো গ্রামের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই নিবারণ পণ্ডিত বেরিয়ে পড়লেন ভাঙ্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।
জঙ্গলে ঘেরা ধ্বংস স্তূপের মত দেখা যাচ্ছে ভাঙ্গা মন্দিরটি। এখানে কোন অপশক্তি বা অশুভ কিছু থাকতে পারে বলে মনে হয় না। ঝরা পাতা আর ধুলোর স্তূপে ভরে রয়েছে চারিদিক। তিনি শান্ত পড়লে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। মন্দিরে কোন বিগ্রহ নেই। তবে পুজোর স্থানটি এখনো রয়ে গেছে। মন্দিরের গায়ে কতগুলো চামচিকে ফরফর করে উড়ে পালালো। বেশ একটা গুমোট ভাব মন্দিরের ভিতরে ঘিরে রয়েছে। নিবারণ পন্ডিত তার ঝোলা থেকে একটা বোতল বার করলেন বোতলের ভেতরে জল ছিল সেটা মন্দিরের আশেপাশে ছড়িয়ে দিয়ে চারিদিকটা ভালো করে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। না সন্দেহ করার মত সত্যিই কিছু নেই। তাহলে ভূষণ বাবু কাকে দেখেছিলেন? অথবা ঐ বাচ্চা মেয়েটিকে নৃশংস ভাবে কে খুন করেছিল? অনেক কিছুই রহস্য জড়িয়ে রয়েছে এই জঙ্গলের মধ্যে অথচ দিনের আলোতে তার লেস মাত্র নেই। তিনি আরো কিছুক্ষণ মন্দিরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে দুপুর নাগাদ গ্রামে ফিরে এলেন। স্থির করলেন রাতে মন্দিরে এসে আরো একবার ভালো করে ব্যাপারটা লক্ষ্য করবেন। যদি কিছু বোঝা যায়। গ্রামে একটু তাড়াতাড়ি রাত নামে নিবারণ পন্ডিত রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে উপস্থিত হলেন।দিনের আলোয় একবার এখানে এসেছেন তাই রাস্তা ঠাহর করতে অসুবিধে হলো না। ঝি ঝি পোকা ডাক কানে তালা লাগানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। জানেন না তার জন্য কি রহস্য অপেক্ষা করে আছে। বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় গাত্রবন্ধন করে নিয়েছিলেন ফলে অশুভ শক্তির প্রভাব তার উপরে কুপ্রভাব ফেলতে পারবে না। তিনি সেই ভাঙ্গা মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন। রাতের নিস্তব্ধ অরন্যের মাঝে আকাশে নির্মল চাঁদের আলো সবকিছুই যেন কবির কল্পনা ছাড়া আর কিছুই কল্পনা করতে পারে না কেউ এই মনমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে বিশ্বাস করতে চাইবে না এখানে এরকম কিছু একটা অশুভ শক্তির প্রভাব রয়েছে।যদিও নিবারণ পন্ডিত নিজেও সন্দিহান ।এখনো সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাপারটি বুঝে উঠতে পারেননি।
মন্দিরে কাছে একটা পরিষ্কার মতো জায়গা দেখে আসন পেতে বসে রইলেন। জঙ্গলের ভেতর বন্য প্রাণীর ভয় তো থাকেই তাই তিনি সতর্কভাবে জেগে রইলেন।যে কোন মুহুর্তে আশ্চর্য কিছু ঘটে যেতে পারে।তিনি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। এখানে আকাশ ঠিকমতো দেখা যায় না। চাঁদের উপস্থিতি না বোঝা গেলেও অনুভব করলেন বেশ রাত হয়েছে। তাহলে কি আজকে রাতে আর কিছুই দেখা যাবে না। তিনি নিজের কাছে ধুনি জ্বেলে বসেছিলেন।সেই আগুন প্রায় নিবু নিবু, এমন সময় সরসর করে একটা শব্দ হলো। তিনি চকিতে ফিরে তাকালেন। সাদা কাপড় পরিহিত একটি নারীর মূর্তি তার পাশে বসে রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট অনুভব করলেন সেই মূর্তিটি কোন পার্থিব শরীর নয়।নিবারণ পন্ডিত তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন,
- আপনি কে মা?
- সেই নারী মূর্তি অস্পষ্ট কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বললেন
- - আমি এই মন্দিরের একমাত্র পূজারিণীর মেয়ে সুকন্যা।
- - আপনিই সন্ধ্যায় এখানে পুজো করতে আসেন?
- - হ্যাঁ
- - কিন্তু গ্রামে এইসব নৃশংস ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই ভিত। এর থেকে মুক্তির উপায়?
- কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সেই নারী মূর্তি বলল,
- - একজন কাপালিক এখানে ডামরি সাধনা করতে এসেছিল, কিন্তু তার সাধনায় ত্রুটি থাকার ফলে ডামরির হতেই তার প্রাণ যায়।এখন তার অতৃপ্ত আত্মা এসব করে বেড়াচ্ছে। অসীম শক্তিশালী সে।
- নিবারণ পন্ডিত জিজ্ঞেস করলেন,
- - এর থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই মা ?
- সেই নারী মূর্তি অস্পষ্ট কন্ঠে বললেন,
- - সে আছে বৈকি। সেই আত্মার মুক্তির ব্যবস্থা করো। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তার শরীর ভাঙ্গা মন্দিরের পিছনে শিমুল গাছের নিচে পড়ে রয়েছে। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন দিলেই তার মুক্তি ঘটবে।
- নিবারণ পন্ডিত আরোও কিছু জিজ্ঞেস করতেন কিন্তু হঠাৎ কোথাও মোরগ ডেকে উঠলো আর তার সাথেই সেই সাদা নারী মূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেলো। নিবারণ পন্ডিত ভাঙ্গা মন্দিরের পিছনে শিমুল গাছের নিচে খোঁজ করতে লাগলেন।কতদিন আগের মৃত কাপালিকের মৃতদেহ অবশেষ খোঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো। কিছু অস্থী টুকরো ছড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। তিনি সেটাকে দাহ করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন।তারপর যখন গ্রামে ফিরে এলেন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। তাকে দেখেই গ্রামের মানুষ ভিড় করে ছুটে এলো। নিবারণ পন্ডিত এর মুখে সব বৃত্তান্ত শুনে গ্রামবাসী তার পায়ে লুটিয়ে পড়লো। যাই হোক গ্রামের এরকম অভিশাপ থেকে তিনিই মুক্তি দিয়েছেন।
============================
কাশীপুর, পুরুলিয়া

