ছবিঋণ- ইন্টারনেট
চিলকা লেকে টর্নেডো আর অচেনা নৌকা
অঞ্জনা মজুমদার
মিনু বিনু রম্ভায় এসেছে গরমের ছুটিতে। সঙ্গে অবশ্যই রোবু আছে মিনু বিনুর সর্বক্ষণের সঙ্গী। রোবট রোবুকে মিনু বিনুর মামা বৈজ্ঞানিক সায়ন মিত্র তৈরি করেছেন। দেখে রোবুকে মিনু বিনুর ভাই বলেই মনে হয়।
রম্ভা পান্থনিবাসের ঠিক পিছনে চিলকা লেকে খুব সুন্দর একটা ফেরীঘাট আছে। এখান থেকে নৌকা করে চিলকা লেকে ঘোরা যায়। মিনু বিনুর ইচ্ছে নৌকা করে ঘোরা। মা বললেন, দুপুর গড়িয়ে এসেছে, এখন আর নৌকায় উঠতে হবে না। কাল সকালের দিকে গেলেই হবে। এখনও তো দুদিন এখানে থাকবো। মিনু বিনুর মুখ আঁধার নেমে এল। মিনু আদুরে গলায় বলল, যাই না বাবা। সন্ধ্যা হতে তো এখনও দেরি আছে। আজ একটু যাই? কাল মায়ের সঙ্গে আবার যাবো। নৌকার মাঝি বলল, চিন্তা কোরো না মা ঠাকরুন, আমি একটু ঘুরিয়েই দাদাবাবু দিদিমনিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনবো। রোবু বলল, মা আমি আছি সঙ্গে? চিন্তা কোরো না।
মা বাবার দিকে তাকালেন। বাবা মাথা নাড়লন, আচ্ছা যাও। তবে মাঝি ভাই, সাবধানে ঘুরিয়ে আনো।
মিনু বিনু দৌড়ে জেটিতে গেল। মাঝি তাদের তিনজনকে যত্ন করে নৌকায় উঠতে সাহায্য করলেন। নৌকা ছেড়ে দিল। মিনু বিনু মা বাবাকে হাত নেড়ে টা টা করে হ্রদের জলে আর জলের চারপাশ অবাক হয়ে দেখতে লাগল।
খানিক বাদেই তীর দূরে চলে গেল। হ্রদের মাঝে একটা বাড়ি, আর চিমনি। মাঝি বলল, এটা ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড। ইংরেজ আমলে সাহেবরা এখানে খাওয়া দাওয়া করতে আসত।
মিনু বলল, মাঝি আঙ্কেল, এখানে নেমে একটু ভেতরটা দেখে আসি? মাঝি রাজি হলেন না। না দিদিমনি, ওখানে কেউ থাকে না। তাছাড়া সাপ খোপের আড্ডা। এখন বিকালে ওখানে নামা ঠিক হবেক নাই। নৌকা ওই দ্বীপ থেকে দূরে চলে গেল। হতাশ মিনু তাকিয়ে রইল , মনে হলো একজন টুপি পরা সাহেব আর সাদা গাউন পরা মেমসাহেব ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ডের ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীন দিয়ে দেখছে ওদেরই দিকে।
মিনু উত্তেজিত, দাদাভাই ওখানে সাহেব মেমসাহেব দাঁড়িয়ে আছে।
বিনু কিছু দেখতে পেল না। রোবুও কিছু দেখেনি। বিনু বলল, বোন তুই হ্যালুসিনেট করছিস। বড্ডই বেশি কল্পনা করা শুরু করেছিস।
নৌকা এবার একটা পাথুরে দ্বীপের সামনে। দ্বীপে একটা বড়সড় ডাইনোসোরের মূর্তি রয়েছে। মাঝি বললেন, এটা বার্ড আইল্যান্ড। এখানে তিন চারটি ময়ূর দেখা গেল। বিনু ছবি তুলল। কয়েকটি পানকৌড়ি, অল্প কিছু পরিযায়ী পাখি জলের ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মাঝি বললেন, এরা বাচ্চা পাখি। এদের বাবা মায়েরা শীতের শেষে উড়ে গেছে। পরের বছর এরাও শীত শেষে উড়ে যাবে। ছবি তুলতে এখানে মাঝি নামতে দিতে রাজি হলেন। ওরা হৈ হৈ করে নেমে ডাইনোসর এর মূর্তি আর পেছনে ময়ূরের সাথে ছবি তুলল। মাঝি তাড়া দিলেন। এবার ফিরতে হবে।
পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের পাশে একটুকরো পাখির মতো কালো মেঘ দেখে মাঝি ভয় পেলেন। দাদাবাবু দিদিমনি লাইফ জ্যাকেট পরে ভালো করে ধরে বসো। আমরা ফিরবো এবার।
বিনু বলল, মাঝি আঙ্কেল তুমি কি ভয় পেয়েছো?
রোবু বলল, বিনুদাদা সূর্যের পাশে ওই যে পাখির মতো দেখতে পাচ্ছো ওটাই ভয়ঙ্কর ঝড়ের সংকেত হতে পারে।
বিনু অবাক হল। চারিদিক শান্ত। মাঝি আঙ্কেল মিছিমিছি ভয় পাচ্ছে। কিন্তু রোবুও ভয় পাচ্ছে সেটাই বিনুর চিন্তা। রোবু মিছিমিছি ভয় পায় না।
মাঝি নৌকার স্পিড বাড়িয়ে দিল। ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড পার হতেই হঠাৎই নৌকার সামনে একটা থামের মতো জলস্তম্ভ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। মাঝি জয় জগন্নাথ বলে নৌকার স্পিড বাড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু নৌকা একটুও নড়ল না। বাতাস নেই একটুও। পৃথিবী কি থমকে দাঁড়িয়েছে?
এবার বিনুরও কেমন যেন ভয় লাগছে। মিনু একমাত্র ভয় না পেয়ে মজা পেয়েছে। দাদাভাই দেখো জলের থাম কেমন আকাশে মিশে গেছে। যাবার সময় এটা দেখিনি তো?
মাঝি নৌকার স্টিয়ারিং ছেড়ে হাত জোড় করে চোখ বুজিয়ে জয় জগন্নাথ জয় জগন্নাথ ডেকেই চলেছে।
নৌকা এদিকে জলের থামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জলের থাম যেন নৌকাকে গিলে ফেলতে চাইছে।
রোবু আর দেরি করেনি। মাঝিকে ঠেলে নৌকার স্টিয়ারিং ধরেছে।
তক্ষুনি ঝড় উঠলো প্রবল বেগে।
রোবু চেঁচিয়ে বলল, বিনুদাদা, মিনুদিদি ভালো করে শক্ত করে ধরে বসো।
ঝড়ের ধাক্কায় জল ফুলে ফেঁপে উঠছে। আর সেই জলস্তম্ভ মূহুর্তের মধ্যে ভেঙে গেল। সেই ভাঙা ভাগ্যক্রমে নৌকা যেদিকে তার উল্টো দিকে হলো। আর নৌকা ঢেউয়ের ধাক্কায় আকাশে উড়ে গেল যেন।
ভয়ে আতঙ্কে বিনু মিনুর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। ভাই বোন দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে আছে। মাঝি জয় জগন্নাথ ডেকেই চলেছে। রোবু কিন্তু স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরে আছে।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। এদিকে আকাশের আঁধার দিগন্ত ছেয়ে গেছে। কোনোদিকে কিনারা দেখা যাচ্ছে না। পথ হারিয়ে গেল নাকি?
হঠাৎ একটু দূরে একটা ছোট্ট নৌকার আলো। নৌকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে, যেন পথ দেখাতে চাইছে।
এতক্ষণে মাঝির ভয়ার্ত গলা শোনা গেল, ওই নৌকার পেছনে পেছনে গেলে আমরা বেঁচে যাবো।
রোবু সেই নৌকার পেছনে পেছনে মিনুদের নৌকা নিয়ে যেতে যেতে কিছু দূরে আলো দেখা গেল। হ্রদের ধারে প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে। অন্য নৌকার মাঝিরা, পান্থনিবাস এর লোকজন সবাই জড়ো হয়েছে। মা বাবা বৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন।
রোবু নৌকা জেটিতে ভিড়িয়ে দিল। মিনু বিনুকে মাঝি হাত ধরে নিয়ে মায়ের কাছে। মা দুজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। রোবু কই? মা বাবা দু-জনে একসাথে বলে উঠলেন।
রোবু পেছনে ছিল। মাঝি তাকে জড়িয়ে ধরে বললে, এই ছেলের জন্য আজ আমাদের প্রাণ রক্ষা হয়েছে মা। যে বিপদ আসিছিল, জগন্নাথ এই ছেলের মধ্যে দিয়েই আমাদের বাঁচিয়েছেন।
পান্থনিবাস এর ঘরে পৌঁছে, ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে চা পকোড়া খেতে খেতে মিনু বলল, মা জানো তো জলের মধ্যে একটা থাম তৈরি হয়েছিল। থামটা যখন ভাঙলো তখন নৌকা আকাশে উঠে গিয়েছিল। মাঝি আঙ্কেল ভয়ে জয় জগন্নাথ ডেকেই চলেছে। রোবু নৌকা চালিয়ে আমাদের নিয়ে এসেছে।
বাবা বললেন, ওটাকেই টর্নেডো বলে। বিশেষ বিশেষ ঝড়ের সময় জলের মধ্যে টর্নেডো তৈরি হয়। ওই টর্নেডো আমরাও দেখেছি। তাই তো ভয় পেয়েছিলাম।
বিনু বলল, ঝড়ের শেষে আমরা জলের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। একটা ছোট্ট পাল তোলা নৌকা আমাদের পথ দেখিয়েছে। তীরের কাছে এসে আর সেই নৌকাটা দেখতে পেলাম না।
রোবুও মাথা নাড়লো, সত্যি তীরের কাছে এসে আর দেখতে পাইনি।
পান্থনিবাসের ম্যানেজার বললেন, আমি দেখিনি কোনওদিন কিন্তু শুনেছি ভালো মানুষেরা বিপদে পড়লে ঐ নৌকা তাদের সাহায্য করে। শুনেছি সাহেব মেমসাহেব ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দেখা দেন। আজ এই ঝড়ের পূর্বাভাস আমাদের আবহাওয়া অফিস দিয়েছে কিনা জানতাম না। জানলে মাঝিরা নৌকা ছাড়ত না।
মিনু বলল, মা আমি সাহেব মেমসাহেব দেখেছি। দাদাভাই আর রোবু কেউ দেখেনি।
মা বললেন, যাই হোক সবাই ভালোয় ভালোয় ডাঙায় ফিরেছে তাই অনেক। তবে আমাদের রোবু সঙ্গে ছিল তাই রক্ষা।
মা রোবুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আর বাবা রোবুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন।
বিনু বলল, মামুকে রোবুর সাহসের কথা ফোনে বলতে হবে।
মিনু বলল, থ্যাঙ্ক ইউ রোবু।
রোবু বলল, অলওয়েজ ওয়েলকাম মিনুদিদি।
----------------------------------------------------
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লী বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনী
কলকাতা ৭০০০৮১

