ছদ্মবেশী
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
নতুন ঠিকানায় হেড অফিস স্থানান্তর হওয়ায় কয়েকদিন ধকলের পর আপাতত নিলয়ের দিন তিনেকের ছুটি পাওনা হল। অতঃপর তার ভাবনা শুরু হল কোথায় যাই! কোথায় যাই ! ভাবতে ভাবতে নিলয়ের মনে হল যে এবারে কলকাতা থেকে একটু ঘুরে আসাই যায়।
অনেক ভাবনা চিন্তার পর শেষমেশ কলকাতা যাওয়াটাই স্থির হল , হাজার হোক কলকাতা নিলয়ের পিতৃভূমি ও শৈশব যৌবনের উপবনও বটে।
প্রবাসীজীবনের বাসিন্দারা মানবেন যে শিকড়ের টান সময়ের নিরিখে কতটা মর্মভেদী হতে পারে!
....
নিলয়দের পিতৃকূলের সবাই এখন ওপারে। এমনকি ১৪/৪ ভোলা মিত্তির লেনের বাড়িটাও তো আজ আর নেই। সেইভাবে দেখলে গত সাতাশ বছর আগে নিলয়ই ছিল এবাড়ির একমাত্র জীবিত সন্তান।
অবশ্য আজ ছত্রিশ বছর পর একটু ঠান্ডা মাথায় মিত্তির বাড়ির বারো আনা শরিকের তালিকা দেখলে বোঝা যাবে যে তাদের অনেকের মাথায় ছিট থাকার দরুণ তারা সব বেজায় খামখেয়ালী। অর্থাৎ সংসারী হিসেবের নিয়মকানুন না মেনে সবাই একটা সময় অবধি জীবন কাটিয়ে স্রেফ দুনিয়া থেকে যেন উবে গেছে।
......
নিলয়ের জ্যেঠামশাই আর ছোটকাকা দুজনেই ছিলেন ব্যাচেলার। একজনের সঙ্গী ছিল ক্ল্যাসিকাল গান আর অন্যজনের ঘুরে ঘুরে ম্যাজিক দেখানো আর থিয়েটার করার নেশা ।
সংসার চালানোর পক্ষে এই দুজন নেহাৎ বেমানান হওয়াতে ঠাকুর্দা নিলয়ের বাবাকেই কষ্টেসৃষ্টে পোস্টাপিসে একটা চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন বলে নিলয়দের পরিবারটি পরবর্তী কালে হয়ত আর ভেসে যায়নি।
.....
বঙ্গভূমির পড়তি এক জমিদার বংশের এসব হল আজব ধারাপতনের কাহিনিমালা । নিলয়ের প্রপিতামহরা ছিলেন গোবিন্দপুরের সাড়ে তিন আনার শরিক। তারই নানা ধরণের শরিকী মামলায় জেরবার হতে হতে শেষমেশ ঠাকুরদার ভাগে রয়ে গেছিল স্রেফ বসতবাড়িটুকুই।
যদিও আট বছর আগে কলকাতার পাট চিরতরে চুকিয়ে দিল্লী চলে যাওয়ার ফলে শুরুতেই বললাম যে সেই ঠিকানাটিও আজ আর নেই।
....
নিলয় একটা বেসরকারী কোম্পানির লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টে বিভিন্ন কিসিমের কাজের সূত্রে বছর দশেক হল দিল্লী প্রবাসী।
কলেজ শেষে তার কর্পোরেট আইন নিয়ে পড়াশোনাটা যে নেহাৎ অপচয় হয়নি সেটা ওর মাসের বেতন ঢুকলে ঠিক টের পাওয়া যায়। যদিও স্বাধীন আইন ব্যবসায় বার্ষিক আয়ের অংকটা বন্ধুমহলে এর চেয়ে দু-এক শতাংশ বাড়তি হলেও এখানে চাকরির নিরাপত্তাটা আপাতত ওর কাছে মূল্যবান। এইসব মিলিয়ে নিলয় বিয়ের ঝামেলা রাখেনি। একা মানুষ সে , কাজেই একদম ঝাড়া হাত -পা।
....
আটচল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছতে সে বুঝেছে যে নিজেকে এবার একটু বাড়তি সময় দেওয়াটা জরুরি। আর সেটা প্রাইভেট আইনজীবিদের প্রফেশনে আদৌ সম্ভব নয় বলেই নিলয় এই চাকরিটার মায়া এখন আর নতুন করে ছাড়তে পারে না।
অফিস থেকে আটটা নাগাদ ঘরে ফিরে একটু হাল্কা সময় কাটিয়ে সাড়ে ন'টা বাজলে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলে নিলয় অবশেষে লেখালিখির জগতে ডুব দেয়।
ওর দৈনন্দিন রান্নাটা আসে একটি মাঝারিমাপের হোম ডেলিভারির দৌলতে, কাজেই স্বহস্তে একটু আধটু চা -টোস্ট বা জমিয়ে মুড়ি চানাচুর ছাড়া নিজের ভাঁড়ারে কিছু রাখার প্রয়োজনও সে রাখে না। অবশ্য ভাল মকাইবাড়ির লিকার চা পান ওর একটা অবশেসন।
.....
কাজেই বাকি সময়টা এহেন নিলয়ের কাটে বই পত্র পড়ে অথবা নিজের তাগিদে একটু আধটু লেখালিখি করে। এই লেখালিখির অভ্যেসটা ওর জন্মগত।
ইস্কুলে থাকতে তো বটেই এমনকি কলেজে পড়তেও সেই যে লিটল্ ম্যাগাজিনের পোকা সেই যে ওর মজ্জায় এসে বসল সেটাই গত তিরিশ বছরে ওর একটা প্যারালাল ইউনিভার্সে পদচারণার মত চালিয়ে নিয়ে এসেছে ।
তবে ঠিকঠাকভাবে শুরুটা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। সেবারে একটা মাঝারি ধরণের প্রকাশনা সংস্থা থেকে বারোটা গল্পের একটি সংকলন প্রকাশ হওয়া মাত্রই হটকেকের মত তা কলকাতা বইমেলায় সাড়া ফেলে দিয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের এই নতুন মুখটিকে সাক্ষাতে না চিনলেও বৌদ্ধিক সমাজ সেদিন ওর প্রতিভাকে স্বাগত জানাতে দেরী করে নি।
অবশ্য কিছূ সংখ্যক দূর্জনে ভেবেছিল যে এটা বোধহয় কোনও বিশেষ পরিচিত লেখকের একটা ছদ্মনামের ছলনাপ্রয়াসমাত্র।
....
সেসব কথা অবশ্য নিলয় লোকমুখে শুনে সেদিন মিটিমিটি হেসেছিল। বরং ওয়ান বুক অথর হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনাটিকে উড়িয়ে সেবার পুজোয় প্রকাশ পেয়েছিল তার প্রথম প্রেমের উপন্যাস, ' অর্গল ও অবরোধ ' যেটা হুট করে পেয়ে যায় নবাগত লেখকের প্রতি ' যুব সাহিত্য আকাদেমী' প্রদত্ত কথা সাহিত্য পুরস্কার।
অবশ্য তারপরে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। বছরে দুটো বা তিনটে বই এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ পেয়েছে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এবং সেটা সম্ভব হয়েছে নিলয়ের ঝঞ্ঝাটবিহীন ওই প্রবাসজীবন থেকেই।
এরফলে তৈরী হয়েছে একটাই অসুবিধা। বিদ্বজ্জন বা লেখক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে হুট করে কোনও সভা বা সমিতিতে নিলয়ের আর যাওয়া হয় না। এমনকি টুকটাক কাগজে বা আজকালকার সমাজ মাধ্যমে একটু আধটু নিলয়ের ছবি দেখা গেলেও খুব তন্নিষ্ঠ পাঠক পাঠিকা ছাড়া তার মুখশ্রীটি কলকাতার মানুষ নিয়মিত দেখতে অভ্যস্ত নয়।
....
এর ওপর কয়েকবছর আগে নিলয় ছিল বেশ শ্মশ্রুগুম্ফ শোভিত এক মধ্যবয়সী পুরুষ আর এখন সে যাকে বলে ক্লিন শেভড্ আর তার সাথে সম্প্রতি চোখে উঠেছে চালশের বাইফোকাল পরকলা। মুখে ও মুকুরের এই পালাবদলে লেখকটিও যে কতটা বদলেছে সেটা একমাত্র ভাবীকালই বলতে সক্ষম।
এমতাবস্থায় খ্যাতির বিড়ম্বনা বলতে যেটা বোঝায় সেটা দিল্লীর কীর্তিমার্গ থেকে এমনকি খোদ কলকাতাতেও বিশেষ অনুভূত হয়না বলে সে বরং স্বস্তি পায়।
নিলয় মনে করে একজন লেখকের পরিচয় তার সৃজনপটুতায়। তার সামনের চেহারা বা ব্যক্তিগত জীবনযাপনের বিবৃতিতে নয়। আজীবন সে চেয়ে এসেছে পাঠক পাঠিকাদের নিরন্তর মনযোগ যা তার একান্ত কাম্য। আর জনপ্রিয়তা যদি কিছু হয় সেটা আসতে পারে তার লেখা থেকেই! কারণ বাইরের চেহারাটা একজন ফিল্মস্টারের ক্ষেত্রে যতটা জরুরী কথাসাহিত্যিকের ক্ষেত্রে বোধহয় এখনও ততটা জরুরী নয়।
........
এই ক'মাস 'বিষাদসিন্ধুর তীরে' শীর্ষক একটি উপন্যাস লিখতে নিলয় প্রাণমন পরিশ্রম করে ফেলে বেশ ক্লান্ত বোধ করেছে। ওদের অফিসের আইনসংক্রান্ত কাজের ফাঁকে এটা লিখতে বসে এই প্রথম নিলয় বুঝতে পেরেছে যে তার এই পরিশ্রম তাকে এতদিনের শৌখিনতার খোলস কাটিয়ে এতদিনে একটা পাকা সাহিত্যকীর্তি হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
এমনকি কলকাতার নামী প্রকাশনা সংস্থার কিংবদন্তীতূল্য প্রবীণ সম্পাদক ধ্রুবময় ঘোষ তাঁকে অভিবাবকসুলভ প্রশ্রয়ে এবারের লেখাটা পুজোসংখ্যায় ছাপতে চাপ দেন নি। বরং চেয়েছেন যে তিনজন নবীন কলমচির উপন্যাস আসন্ন বইমেলার ' তিন-সত্যি ' উপন্যাস সিরিজের অন্যতম অংশ হিসেবে এটাকে প্রকাশ করতে।
এরজন্য টাকার অংকটা যেমন ধারাবাহিক লেখার চেয়ে যেমন কিছুটা বেশী দিয়েছেন তেমনই লেখার সময়সীমা বাড়ানোর আব্দারটিতে সহজ এ্যাপ্রোচেই রাজী হয়েছেন।
শেষমেশ ছাপতে দেওয়ার আগে এই চব্বিশ পর্বের উপন্যাসটি পড়ে যে বিদগ্ধ মতামত তিনি নিলয়কে দিয়েছেন সেটা বোধহয় নিলয়ের অর্থপ্রাপ্তির চেয়েও বেশ কিছুটা বেশী।
ধ্রুবময় আশাবাদী যে উপন্যাসটির ধমনীতে পূর্বপঠিত সুবিখ্যাত ' জাগরী ' উপন্যাসের একটা সার্থক উত্তরধারা সতত প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নিলয় যে এবারে অচিরেই বর্ণময় লেখককূলের পাদুকায় পা গলাতে চলেছে বলে তিনি আশাবাদী।
....
কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা এবারে শুরু হচ্ছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। নিলয় চারদিনের ছূটি ম্যানেজ করেছে পঁচিশ থেকে ঊনত্রিশ জানুয়ারি অবধি। অগত্যা আসা যাওয়ার ব্যবস্থাটা প্লেনেই করতে হবে সময় বাঁচানোর জন্য।
তবে সে ঠিক করেছে লোকালয়ের ভীড়কে এড়াতে এসে উঠবে এয়ারপোর্ট সংলগ্ন একটি মাঝারি হোটেলে তাও নিজের খরচে। ওর সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসটির প্রকাশকের পক্ষ থেকে কোনও রকম স্পনসর্ড হোটেল বা অযথা বিলাসিতা সে এইবারের ট্যুরে এড়িয়ে চলবে বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
.....
এদিকে খবর এসেছে যে ধ্রুবময়দা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য, ফিরবেন ফেব্রুয়ারির ৭ই। তাঁর শারীরিক অবস্থা হয়ত তেমন চিন্তার নয় তবুও একটা থমথমে পরিবেশ জারি থাকবে গোটা মেলার আবহে। বইপ্রেমী অসংখ্য মানুষ ধ্রুবময় ঘোষকে বাদ দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রতি সুবিচার করতে অক্ষম। কাজেই এবারের বইমেলার সফরে নিলয় তার স্বল্পখ্যাত লেখকজীবনের প্রিয় অভিবাবকটির সান্নিধ্যটি একান্তভাবে মিস করবে।
তাই সে মনে মনে ঠিক করেছে যে এই নতুন প্রকাশিত উপন্যাসটি সেইভাবে জনপ্রিয়তার শিখরে না ওঠা অবধি সে এক প্রগাঢ় নির্লিপ্তিতে এবারের বইমেলায় ঘুরবে।
....
এটা সত্যি যে নিলয়ের চিন্তাভাবনা যে একটু অন্যরকমের সেটার জন্য তার জিনটিই সম্ভবত দায়ী। তার বংশের অর্ধেক সদস্য মনোরোগী বা খামখেয়ালী।
কাজেই তার এই একাকী জীবনের মধ্যে একটু সেসবের বিচ্ছূরণ ঘটলে অন্তত দোষ দেওয়া যায় না। কাজেই স্বেচ্ছায় বাহ্যিক মেকওভারের নাটকীয়তার বদলে সে শেষমেশ বেছে নিয়েছে একদা কলেজ পড়ুয়া সূলভ সেই ফেলে আসা ছন্নছাড়া ভাবটিকে।নেহাৎ তার মধ্যপ্রদেশ সহ চেহারায় তেমন আঁচড় পড়েনি বলে ব্যাপারটাতে চমক দেওয়াটা তার পক্ষে কিছুটা সহজ হয়েছে।
যদিও সে জানে যে মেলার জনসমুদ্রের মেজাজটাই তাকে ঠিক ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তাই নিলয় মনেপ্রাণে চাইছে যে সেদিনের মত বিখ্যাত লেখকদের অনুসরণ করতে করতে সই শিকার আর অল্প বাজেট নিয়ে মেলায় আসা ঊনিশ - কুড়ির সেই নিলয়কেই সারা মেলায় বরং খুঁজে বেড়াবে উদযাপনের মেহফিলে।
স্মৃতিপটে থেকে যাওয়া নতুন বইএর গন্ধের সাথে ময়দানের ধূলোমাখা ফেরারী বিকেলগুলোকে কি এখনকার মেলায় আবার আদৌ ফেরৎ আনা যাবে?
.....
আধঘন্টা থেকেও যখন নবপ্রকাশ প্রকাশনীর স্টলে যে নিলয়কে কেউ চিনতে পারল না সেটা দেখে সে একটু আশ্বস্ত হল। এমনকি ওদের হাউসে তার লেখা ' ভাঙা কাচের স্বর্গ' বইটির জন্য ক্রেতাদের উৎসাহ এখনও বেশ চোখের পড়ার মত। দু তিনটে কপি তো তার সামনেই চটপট বিক্রি হতে দেখল নিলয়।
সদ্য লেখকবেলার প্রাথমিক পর্যায়ের যে তিনটি বই তাকে সারস্বত মহলে একদা পরিচিতি দিয়েছিল এটা তারই একটা। তবে এটা সত্যি অবাক কান্ড এই যে তাকে সশরীরে দেখেও কেউ চিনতে পারলনা। এরপর আরও তিনটে স্টলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
তবে দু একজনের আড়চোখের আন্দাজে তার ধরা পড়ে যাওয়াটা নিশ্চিত হতেই সে ততক্ষণে অন্য স্টলে পা চালিয়ে হাজির হয়েছে।
আহা! এই নির্লিপ্তিটাই তো নিলয় চাইছিল এবারের মুক্তপ্রাণ বিচরণে।
.....
শেষের দিকে একবার বুড়ি ছুঁয়ে 'অভিলাষ প্রকাশনী'র হিট লেখক বন্ধুবর নভনীল দত্তকে দেখতে পেয়ে অন্যদিকে এক দৌড়ে পালাল নিলয়।
অতঃপর তারপর পরবর্তী গন্তব্য ' নতুন পাতা'র স্টলে পা রাখতেই তার ফেলে আসা সেই কিশোরবেলাটিকে যেন ছুঁয়ে ফেলা গেল।
এই অনুভূতির দাম অবশ্য আজকের নিলয়ের কাছে অমূল্য। এখান থেকেই তো পেপার ব্যাক কমিকস্ সিরিজ 'সওদাগর' বেরত আটের দশকের শেষের দিকে। এমনকি এই প্রকাশনীর একটা পাল্প ফিকশন একটা জমজমাট এ্যাডভেঞ্চার সিরিজ 'ক্যাপ্টেন পার্পল' ও খুব সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। মনে আছে 'আগন্তুক' ছদ্মনামে একজন লিখতেন সেই সিরিজগুলো। যদিও নিলয়ের স্মৃতিতে সেই 'আগন্তুক'এর মুখশ্রীটি আবছা হলেও একদম অস্পষ্ট হয়ে যায়নি।
.....
লোকমুখে নিলয় শুনেছিল যে একই লেখক অপর একটি ছদ্মনাম 'অর্বাচীন' ব্যবহার করে লাইফস্টাইল বিষয়ক বেশ কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছিলেষ তৎকালীন এক পত্রিকায়। হয়ত সেখানে তাঁর ছবিটি কখনও দেখে থাকলেও লেখকের প্রতি তার টান অদম্য ছিল এইকয়েক বছর আগেও। এমনকি নিলয়ের আজকের পরিচিতি বা এই বারের ছদ্মবিচরণে কি সেই 'আগন্তুকে'র কোনও ভূমিকা নেই?
যদিও একথা বলতে দ্বিধা নেই যে সেইসব 'দিনগুলি - রাতগুলি'র উন্মাদনা আজকের ইউ-টিউব বা ওটিটি সিরিজমোদী দর্শকদের কাছে আশা করাটা বেশ কঠিন।
.....
তবে সবচেয়ে বিস্ময়টা অপেক্ষা করছিল মেলা থেকে বেরিয়ে আসার সময়। মেলার ৯গেট থেকে এগোতেই একটি চা -বাদামের স্টলে চা খেতে যাওয়াটাই তাকে যে একটা লাইফটাইম ফিলিংস এনে দেবে আজ সেটাকে একটা দৈবযোগ ছাড়া আর কিছু বলা উচিৎ নয়।
চিনি ছাড়া লিকার চা খাওয়ার আগে চীনেবাদামের ঠোঙাটা হাতে নিয়ে পয়সা দেওয়ার সময় সে একটু থামল। অজস্র বলিরেখায় ভরা ন্যুব্জ বৃদ্ধবয়সী বাদাম বিক্রেতাটির চোখদুটো বেশ জ্বলজ্বলে তার কেমন যেন চেনাচেনা ঠেকল তার কাছে।
বাদামভাজা কিনতে কিনতে লোকটির সাথে সামান্য আলাপচারিতা করাটার লোড ছাড়াটা কঠিন। কাজেই নিলয় লেগে পড়ল স্বভাবের ঔৎসুক্য নিয়েই। বিক্রেতাটি যেন ঠিক সাধারণ বাদামওলা নয়।
বোঝা যাচ্ছে অভাবগ্রস্ততা লোকটির অবস্থা পেড়ে ফেললে ওই চোখদূটির প্রখরতা কাড়তে পারেনি তার ব্যক্তিত্বের আচমকা বৈপরীত্যটির মত।
.....
তবে তার বিস্ময়ের পালা এখানেই শেষ নয়।বিক্রেতাটি তার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে অস্ফূট স্বরে একবার বলে উঠল তার কাছে খুচরো পয়সার হাতটান। দয়া করে নিলয় যেন বড় নোট না দেন। নিলয় টের পেল বৃদ্ধের গলার স্বরের দানাটা বেশ ঈর্ষণীয়।
হাত বাড়িয়ে খুচরো টাকা বের করতে গিয়ে কাঁধের ঝোলাটি থেকে কখন এক যে কপি 'ক্যাপ্টেন পার্পল' বেরিয়ে মাটিতে পড়েছিল তা খেয়াল হয়নি।
নীচু হয়ে লোকটি কাঁপা কাঁপা হাতে বইটি তুলে নিলয়কে ফেরৎ দেওয়ার সময় সে দেখতে পেল যে বইটির হঠাৎ ছোঁয়া পেয়ে অশ্রুসজল চোখে নিজেকে সামলে নিচ্ছে ওই বাদামওলা।
....
নাহ্ ! নিলয়ের এবার আর চিনতে ভুল হয়নি। এতক্ষণ মনটা খচখচ করলেও সে টের পেয়েছে ওই জ্বলজ্বলে চোখের বিস্মৃতপ্রায় 'আগন্তুক' লেখক 'মনোময় সান্যাল'কে। ব্যক্তিগত জীবনে জুয়া, অর্থাভাব আর বয়স এই তিনটে আঘাতেই তিনি জেরবার হয়ে লেখা ছেড়ে শেষে বাদাম বিক্রি করতে এসেছেন কলকাতা বইমেলার সামনে।
কথায় কথায় সে জানতে পারল যে নানা রকম আইনী ঝামেলায় তিনি বর্তমানে বাস্তুচ্যূত ও জীবিকাহীন। হয়ত তাঁর প্রকাশকের কাছে তিনি আজ পলাতক, মৃত বা নিখোঁজ। তাই নিছক পেটের দায়ে কখনও খবরের কাগজ বা বাদামভাজা বেচার ভূমিকায় আজ তাঁকে নামতে হয়েছে দীন ছদ্মবেশে।
অথচ নিজেই দেখলেন যে তাঁর লেখা বই মেলায় স্টল আলো করে বিক্রী হচ্ছে এতদিন পরেও।
নিলয় নিজের হৃৎপিন্ডের শব্দ শুনতে শুনতে টের পাচ্ছিল রে 'ক্যাপ্টেন পার্পল' সিরিজের নায়ক আজ নাটকীয় ভাবে বাদামবিক্রেতার ভূমিকায় সামনে এসে না দাঁড়িয়ে থাকলে বোধহয় সবটা অকথিত থেকে যেত একটি সত্যিকারের গল্পের প্লট হিসেবেই।
....
শনিবারের ফ্লাইট ক্যানসেল করে নিলয় রাতের ট্রেনে দিল্লী ফিরবে বলে ঠিক করেছে। তবে সে এবারে সে একা ফিরছে না।
অভিভাবকের যে উষ্ণতাটি থেকে দিল্লীর শীতে সে এতদিন বঞ্চিত ছিল তাই যেন অবশেষে পূরণ হতে চলেছে সত্তর-আশির দশকের সেই জনপ্রিয় অগ্রজ সাহিত্যিক মনোময় সান্যালের হাত ধরে। স্মৃতি- বিস্মৃতির সমস্ত প্রলেপ সরিয়েই নিলয় তার একজন প্রিয় ছদ্মবেশী 'আগন্তুকে'র সাথে আবার নতুন গল্পের সন্ধানে যাত্রা শুরু করতে চলেছে ।
=====================
Best Regards ,

