ধারাবাহিক উপন্যাস।। মাধব ও মালতি ।। সমীরণ সরকার


 

মাধব ও মালতি 

                              -----সমীরণ সরকার 


           

(পূর্ব কথা:--জয়পুরের পান্থশালার তত্ত্বাবধায়ক জগন্নাথ পাত্রের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে একদল ডাকাতের মুখোমুখি হয়েছিল  মানবেন্দ্র নারায়ণ। ডাকাতেরা জগন্নাথ পাত্রের স্ত্রীর গয়না অপহরণ করে পালিয়ে যাচ্ছিল। মানবেন্দ্র নারায়ণ ওদের বাধা দিচ্ছিল। কিছুক্ষন লড়াইয়ের পর ডাকাতেরা  পিছু হটছিল। তখন বেগতিক বুঝে ডাকাতদের একজন গাছের আড়ালে লুকিয়ে রাখা রণ পা বের করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।  হাতে ‌ বল্লম নিয়ে চেতকের পিঠে চেপে ডাকাত দলের পিছু ধাওয়া করলো মানবেন্দ্র নারায়ণ।
মানবেন্দ্র নারায়ণের ফিরতে দেরি হচ্ছিল দেখে
 দুশ্চিন্তায় পড়েছিল পুনি। ইতোমধ্যে জগন্নাথ পাত্রের জিজ্ঞাসার উত্তরে পুনি জানিয়েছিল যে,
মানবেন্দ্র নারায়ন তার স্বামী। স্বামীর বন্ধুর বাড়িতে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তারা যাচ্ছিল। পথে রাত নামায় এই পান্থশালায় আশ্রয় নেওয়ার জন্য তারা এসেছিল। 
জগন্নাথ পাত্র মানবেন্দ্র নারায়ণ কে চিনতেন।
তিনিও মানবেন্দ্র দীর্ঘক্ষণ না ফেরায় উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। এমন সময় ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হয়েছিল চেতক। পূর্ণিমার কাছে এসে তার শাড়ির আঁচল  মুখ দিয়ে টানছিল। 
তাতেই পূর্ণিমা অনুমান করেছিল যে,  মানবেন্দ্র নারায়ণ হয়তো কোন বিপদে পড়েছে‌, সেখানে যাওয়ার জন্যেই সম্ভবত তাকে ইশারা করছে চেতক । সেই কথা জগন্নাথ বাবু কে জানাতেই তিনিও একটা লন্ঠন হাতে পূর্ণিমার সঙ্গী হলেন।)

#########################

গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল চেতক। জগন্নাথ বাবু লন্ঠন  হাতে  চেতকের পাশে পাশে ধীরে এগোচ্ছিলেন, যাতে লণ্ঠনের আলোতে পথ দেখতে পুনির অসুবিধা না হয়। তবুও ঘন অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছিল পুনি। সারা জঙ্গল জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল হাজার হাজার খদ্যোত। ভেসে আসছিল ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাকের আওয়াজ। হঠাৎ হঠাৎ রাতজাগা পাখিদের  কর্কশ ডাকে চমকে উঠছিল পুনি। 
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার একটা বড় গাছের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে গেল চেতক। লণ্ঠনের স্বল্প আলোতে পূর্ণিমা দেখতে পেল , গাছটার নিচে  পড়ে আছে মানবেন্দ্র নারায়ণ। পূর্ণিমা ছুটে গেল সেদিকে। জগন্নাথ বাবু‌ লন্ঠন হাতে দৌড়ে এলেন। তিনি লন্ঠনটা মাটিতে নামিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণের নাকের  কাছে হাত নিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর বললেন, না,‌  চিন্তার কোন কারণ নেই, হয়তো কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। 
হঠাৎ পূর্ণিমা একটু উত্তেজিত কন্ঠে বলল, আলোটা আমার হাতে একটু দিন না জগন্নাথ দাদা ।
---কেন , কী হয়েছে?
লন্ঠনটা সামান্য দূরে  মাটিতে নামানো ছিল। পূর্ণিমার কথা শুনে জগন্নাথ বাবু তাড়াতাড়ি 
ওটা নিয়ে পূর্ণিমার হাতে দিলেন।পূর্ণিমা তাড়াতাড়ি ওটা  মানবেন্দ্রের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ওই দেখুন, কুমারের কপাল ফেটে টাটকা রক্ত পড়ছে এখনো। হয়তো শয়তান ডাকাতদের কেউ ওকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। উনি কোনভাবে পালিয়ে এসে এখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন।
জগন্নাথ বাবু মানবেন্দ্রের কপালের আঘাত ভালোভাবে পরীক্ষা করার পরে বললেন,  এখনো তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আমার মনে 
হচ্ছে, ডাকাতদের লাঠির আঘাতে এটা হয়নি। ফিরে আসার সময়, হয়তো অন্ধকারে ঠিকমত খেয়াল করতে না পারার জন্য,কোন বড় গাছের  ঝুলে থাকা ডালের সঙ্গে জোরে আঘাত লেগে উনি আহত হয়ে ছিটকে পড়ে গেছেন ঘোড়ার  পিঠ থেকে।সে যাই হোক না কেন, ওঁকে তাড়াতাড়ি পান্থশালায়  নিয়ে  গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। 
---হ্যাঁ , ঠিকই বলেছেন দাদা। কিন্তু কিভাবে নিয়ে যাব? আমি আর আপনি কী পারব কুমার কে নিয়ে যেতে?
----আপনার প্রয়োজন নেই, আমি একাই পারবো। আপনি  আমাকে একটু সাহায্য করলে আমি ওঁকে আমার কাঁধে তুলে নিতে পারব। আপনি আলো হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেই হবে।
---আপনি পারবেন দাদা? 
--- পারতেই হবে। উনি তো আমার স্ত্রীর গহনা উদ্ধার করার জন্যই ডাকাত দলের পিছু নিয়েছিলেন, সেই কারণেই তো ওঁর এই অবস্থা হয়েছে।
কথা শেষ করে জগন্নাথ বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণের মাথার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে 
বললেন, আপনি ওর পায়ের দিকটা ধরুন, আমি মাথাটা ধরছি। ওঁকে আরো একটু কাত করে দিলে আমার ঘাড়ে তুলতে সুবিধা হবে।
----একটু দাঁড়ান দাদা। 
---কেন? 
------কুমারের কপাল থেকে এখনো রক্ত পড়ছে। আমি আগে ওটা একটু বেঁধে দিই। আপনি আলোটা একটু তুলে ধরুন তো দাদা।
কথা শেষ করেই পূর্ণিমা চট করে ওর শাড়ির একটা প্রান্ত ছিঁড়ে ফেললো। জগন্নাথ বাবু আলোটা তুলে ধরলেন। পূর্ণিমা নিজের শাড়ির আঁচলের একটা প্রান্ত দিয়ে সযত্নে মানবেন্দ্রের 
কপাল, চোখের কোণ ও কপোল সযত্নে মুছে রক্ত পরিষ্কার করে দিল। তারপর শাড়ির ছেঁড়া 
অংশটি দিয়ে‌ মানবেন্দ্রের কপালের ক্ষতস্থান‌ খুব যত্ন সহকারে ঢেকে  বেঁধে দিল। 
কাজ শেষ করে পূর্ণিমা বললো, দাদা , এবারে কুমার কে কাঁধে নিতে পারেন।
----আপনি ওঁর পায়ের দিকে যান, আমি ওঁর মাথাটা ধরছি। দুজনে মিলে একটু চেষ্টা করে যদি ওঁকে কিছুটা কাত করতে পারি, তাহলে আমার পক্ষে কাঁধে তুলতে সুবিধা হবে। 
---আচ্ছা দাদা, আমি চেষ্টা করছি। 
জগন্নাথ বাবু মানবেন্দ্রের মাথাটা একহাতে সাবধানে ধরে অন্য হাতটা মানবেন্দ্রের কাঁধের নিচে অতি সন্তর্পনে ঢুকিয়ে দিলেন।
পূর্ণিমা‌ মানবেন্দ্রের পায়ের দিকটা ধরে একটু উঁচু করলো। হঠাৎ ওর চোখে পড়লো , মানবেন্দ্রের পায়ের নিচে চাপা পড়ে আছে একটা লাল রঙের ছোট্ট থলি। পূর্ণিমা চিৎকার করে বলল, দাদা, একটু দাঁড়ান। 
---কেন কী হল?
----কুমারের পায়ের নিচে একটা ছোট্ট লাল রঙের থলি চাপা ছিল। এতক্ষণ দেখতে পাইনি, এখন পা তুলে ধরতেই নজরে এল।
---লাল রংয়ের থলি ?
----হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছে ওটাই বৌদির খোয়া যাওয়া গয়নার থলি। 
---সেকি!
--আমি ওটা বের করার চেষ্টা করছি। 
কথা শেষ করে ,পূর্ণিমা মানবেন্দ্রের পা একহাতে ধরা অবস্থায় নিজের শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে রেখে, অন্য হাত দিয়ে অনেক কসরত করে লাল রঙের থলিটা টেনে বের করল। থলিটা বেশ ভারী। থলিটা না খুলে বাইরে থেকে ওটার গায়ে হাত বুলিয়ে পূর্ণিমা অনুভব করল যে, ভিতরে শক্ত কিছু আছে। সে থলিটা একটু উঁচু করে তুলে ধরে একটু জোরে বলল, দেখুন তো দাদা, এটা বৌদির গয়নার থলি কিনা ?
জগন্নাথ বাবু দূর থেকে থলিটা একটু সময় নিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করে বলল, হ্যাঁ, এটাই আমার স্ত্রীর গয়নার থলি। থলিটা আপনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা দেখে মনে হচ্ছে, ওটা ফাঁকা নয়। 
----না,একেবারেই না। ফাঁকা নয়,যথেষ্ট ভারী এটা। আমার কুমার এটা ডাকাতদের কাছ থেকে উদ্ধার করে এনেছে।
---হুম। আপাতত ওটা আপনার কাছেই থাকুক। রাত হয়ে যাচ্ছে, পান্থশালায় ফিরতে হবে। এবারে আমাকে একটু সাহায্য করুন, আমি মানবেন্দ্র নারায়ণকে কাঁধে তোলার চেষ্টা করি। 
---হুম।
কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর জগন্নাথ বাবু মানবেন্দ্রকে কাঁধে তুলে নিলেন। 
লন্ঠন হাতে সামনে এগিয়ে চলল পূর্ণিমা।  তার পিছনে  ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করলেন জগন্নাথ বাবু। জগন্নাথ বাবুর পাশে  প্রায় মানবেন্দ্র নারায়ণের শরীর ঘেঁষে ধীরে ধীরে হাঁটছিল চেতক। 
মানবেন্দ্র নারায়ণ যথেষ্ট লম্বা এবং বলিষ্ঠ দেহী। জগন্নাথ বাবুর খুব কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে। তবুও উনি খুব সন্তর্পনে গাছের ফাঁক দিয়ে এমনভাবে হাঁটছিলেন যাতে কোন রকমেই গাছের ডালের সঙ্গে  মানবেন্দ্রের  শরীরে আঘাত না লাগে। 
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর ওরা 
পান্থশালায় পৌঁছালো।

(চলবে) 

*******"*********************************

From:-Dr. Samiran Sarkar
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.