গল্প ।। উপলব্ধি ।। সুকান্ত ঘোষ


 Uploaded Image

উপলব্ধি

সুকান্ত ঘোষ 

 
দেবযানীর বুকের থেকে যেন একটা ভারী পাথর নেমে গেল।ডাক্তার ব্যানার্জির চেম্বার থেকে বের হয়ে এসেই কন্যা মিলিকে জড়িয়ে ধরে থাকলেন তিনি।দুই চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো অনবরত।মিলিও শক্ত করে ধরলো মায়ের হাত দুটো।পাশে দেবাঞ্জন পাথরের মূর্তির মত স্থির।অথচ,তাঁর চোখেমুখে ও আনন্দের রেশ।
    ডাক্তার ব্যানার্জি ও আজ বেশ অবাক হয়েছিলেন ওদের কে দেখে।দীর্ঘ তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন রোগের নাম শুনলে অসুস্থ মানুষের পরিজন রা  গম্ভীর হন । তাঁদের চোখে মুখে ফুটে ওঠে চিন্তার রেখা।এক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটলো না।বরং অন্যরকম প্রতিক্রিয়া দেখলেন তিনি। আসলে ,মিলি ওরফে মিতুল ঘোষাল এর কেস টাই ছিল অন্যরকম  ।ডাক্তার হিসাবে তিনিও প্রথমটা হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন।
মিলির বয়স পনের বছর। মাস ছয়েক আগে থেকে তার একটা অদ্ভুত উপসর্গ দেখা দিয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায় সে।মিনিট পনের কুড়ি সেই অবস্থায় থাকে। মুখে চোখে জল দেওয়া, হাওয়া,হাতে পায়ের চেটোয় মালিশ করা - কোনো কিছুই কাজে দেয় না সেই সময়।
মিলির বাবা দেবাঞ্জন ঘোষাল অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী।মফস্বল শহরে তাঁর একটি গাড়ীর শো রুম আছে তাঁর।আছে প্রমোটারি ব্যবসাও। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাঁর। ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছেন তাকে।তাঁর ইচ্ছা মেয়ে ডাক্তার হবে।
স্বভাবতই, একমাত্র মেয়ের চিকিৎসা করাতে দেরী করেন নি তিনি। বাড়ির কাছেই খ্যাতনামা এক চিকিৎসকের কাছে মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বেশ কয়েকবার মিলিকে দেখে তিনি এপিলেপসি বলে সন্দেহ করেন।সেইমত স্ক্যান , এম আর আই, ই ই জি,রক্ত পরীক্ষা কোনো কিছু বাকী রাখেন নি তিনি।কিন্তু,সব কিছুই নরমাল দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত স্রেফ কিছু এন্টাসিড আর হজমের ওষুধ লিখে ছেড়ে দেন। 
উপসর্গ কমেনি।বরং,তার ফ্রিকুয়েন্সি আরো বেড়ে যাওয়ায় এক নিউরোলজিস্ট এর কাছে  নিয়ে যান তাঁরা মিলিকে।এই ডাক্তারবাবু নিশ্চিত করে বলেন যে রোগটা এপিলেপসিই।তিনি মত প্রকাশ করেন যে মাইল্ড কেস অনেক সময় ই ই জি তে ধরা পরেনা ।তিনি এপিলেপসির কিছু ওষুধও দেন। তাতে হিতে বিপরীত হওয়ায় দিশেহারা হয়ে ঘোষাল পরিবার  আজ ছুটে এসেছিলেন ডাক্তার ব্যানার্জির কাছে।
প্রাথমিক ভাবে ডাক্তার ব্যানার্জি ও একটু হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন। সমস্ত রিপোর্ট নর্মাল।যে দুজন ডাক্তারবাবু মিলিকে আগে দেখেছেন তাঁরাও যথেষ্ট নামি এবং কোয়ালিফায়েড।দ্বিতীয় জনের তো কলকাতা শহরেও বেশ নাম ডাক।
কিন্তু ,ডাক্তার ব্যানার্জির একটি বিশেষ গুণ হল তিনি সমস্ত কিছুকে অন্য রকম ভাবে ভাবেন। যেখানে অন্য ডাক্তার বাবুদের ভাবনা শেষ হয় তাঁর ভাবনা শুরু হয় সেখান থেকেই ।আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যেদিন তিনি এম বি বি এস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন সেদিন তাঁর মাস্টারমশাই ডাক্তার অরুণাভ সেন তাঁকে বলেছিলেন, "বুঝলে নারায়ন,প্রথম হলেই ভালো ডাক্তার হওয়া যায় না।
ভালো ডাক্তার হতে গেলে থাকতে হবে অন্তর্দৃষ্টি আর  অন্য রকম করে ভাববার ক্ষমতা।এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সাফল্যের চাবিকাঠি।"
  মিলির কেস টা একেবারে গোড়া থেকে শুনলেন তিনি।তার মা দেবযানী দেবীর কাছ থেকে।বাবা দেবাঞ্জন বাবুর কাছ থেকে ।সব শেষে মিলির কাছ থেকে। আলাদা আলাদা করে। তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস, সামাজিক পদমর্যাদা, মেয়ের বুদ্ধিমত্তা, তার বন্ধুমহল,পরিবারের সকলের সঙ্গে তার সম্পর্ক,তাদের পছন্দ অপছন্দ,তাদের প্রত্যাশা সব কিছু ।আর তার পরেই তাঁর কাছে সমস্ত জিনিসটা স্পষ্ট হয়ে গেল ।
   মিলির অসুখটা Dissociative Disorder  ছাড়া অন্য কিছু নয়।
মাঝে মাঝে এমন হয় ।বন্ধু মহলে একলা হয়ে যাওয়া,পারিবারিক একাকীত্ব, মা বাবার প্রত্যাশা  -----        এত চাপ মস্তিষ্ক একসাথে নিতে পারে না।সেই সব ক্ষেত্রে এই অসুখ হয়। এই অবস্থায় কেউ জ্ঞান হারায়,কেউ কিছু সময়ের জন্য চোখে কিছু দেখতে পায় না।আবার কেউ সাময়িক ভাবে হাঁটবার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
তিনি মিলির বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন তাঁরা যে বৌদ্ধিক উৎকর্ষ মিলির থেকে আশা করেন জন্মসূত্রেই তা মিলির নেই।তাছাড়া,সকল কেই যে ডাক্তার হতে হবে তার তো কোনো মানে নেই।  ডাক্তার  না হয়েই রবীন্দ্র নাথ, শেক্সপিয়ার ,লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কিংবা অবন ঠাকুর তো বিখ্যাত হয়েছেন।মিলি আঁকতে পছন্দ করে ,কবিতা লিখতে চায় ।তার বাবা মা চান না সে এসব করে সময় নষ্ট করুক ।কিন্তু,সে তো এসব করতে ভালোবাসে।
বাবা তাঁর ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত।মা ব্যস্ত সংসার আর পুজো অর্চনা নিয়ে।তার একমাত্র বন্ধু ছিল ক্লাসের দিব্যা মুখার্জি।কিন্তু,গত বছর সে  ট্রান্সফার নিয়ে অন্য স্কুলে চলে গেছে।এই একাকীত্ব এই প্রত্যাশার চাপ তাকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরে একাকার করে দিয়েছে।
তিনি আরো নিশ্চিত হলেন এইকথা জেনে যে  তার অজ্ঞান হয়ে যাবার সব কয়টি ঘটনা ঘটেছে তখন যখন বাড়ির সবাই আশেপাশে উপস্থিত ছিল। সকলের পরিচর্যায় সে সুস্থ হয়ে উঠত ঠিকই কিন্তু,এই সময়ের কথা তার কিছু মনে থাকতো না। অবাক করার মত হলেও সাধারণত এই রকম ই হয়।যেকোন মানুষ এই ঘটনা শুনলে মনে করবে যে সে ইচ্ছা করে এইসব ঘটাচ্ছে অ্যাটেনশন ড্র করার জন্য।নাহলে তো সে একা যখন বাড়িতে থাকতো তখনও এই অজ্ঞান হয়ে যাবার ঘটনা ঘটতে পারত।কিন্তু, ডাক্তার ব্যানার্জি জানেন যে মানুষের মস্তিষ্ক সম্পর্কে যা কিছু আবিস্কার হয়েছে রহস্য রয়ে গেছে তারও বেশী।
এই অসুখ টিও তেমন। 
গ্রামের লোক জন হলে ভূত প্রেত ,তন্ত্র মন্ত্র, মারণ উচাটন করতো।হয়তো মিলির বাবা মাও চিকিৎসায় কোনো ফল না পেয়ে বাধ্য হয়  ভবিষ্যতে কোনো তান্ত্রিকের ই শরণাপন্ন হতেন।
ডাক্তার ব্যানার্জি বোঝালেন ,এটি নিতান্তই একটি অসুখ।আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে,এই অসুখের চিকিৎসা আছে।সাইকোথেরাপি,স্ট্রেস ম্যানেজ মেন্ট এর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।সঙ্গে অল্প কিছু ওষুধ।কিন্তু,সব থেকে  বড় ভূমিকা অভিভাবকের।ছেলে মেয়েকে একটু স্বাধীন ভাবে বাঁচতে দিতে হবে গুরুত্ব দিতে হবে তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা কে। ডাক্তার ব্যানার্জির ভালো লাগলো যে দেবাঞ্জন ঘোষাল এবং দেবযানী ঘোষাল সেটা বুঝেছেন।
বাইরে যখন দেবযানী দেবী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন চেম্বারের ভিতরে ডাক্তার ব্যানার্জি সিসি টিভি মনিটরে চোখ রেখে দেখছেন এক কিশোরী আর তার অনুতপ্ত পিতা মাতাকে।চোখে জল এলো তাঁর।একটু হেসে মনিটর অফ করে দিলেন তিনি।এই উপলব্ধির ক্ষণ টুকু শুধু মাত্র ওদের তিনজনের একান্ত হয়েই থাক।
=================================
 
SUKANTA GHOSH
CHANDIPUR 
PIRPUR 
HOWRAH 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.