গল্প ।। লাস্ট লেন ।। অনিন্দ্য পাল

 

লাস্ট লেন 

অনিন্দ্য পাল 


এক
 
খড়্গপুরের কাছে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর তখন বিকেলের কনে-দেখা আলো ফিকে হয়ে আসছে। রাস্তার দু’পাশের ফাঁকা মাঠ থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারছে চোখেমুখে। অমিত বাইকের গতি একটু কমাল। তার মিটারে স্পিড এখন পঞ্চান্ন। পিলিয়নে কেউ নেই, পেছনের সিটে শক্ত করে বাঁধা শুধু একটা ওয়াটারপ্রুফ স্যাডেল ব্যাগ আর একটা টেন্ট।
চাঁদিপুর থেকে ফেরার পথে খড়্গপুর ঢোকার মুখে জ্যামটা দেখে অমিত বাইক থামাল। সামনেই ট্রাফিকের সিগন্যাল ব্যাটন হাতে দু-একজন পুলিশ কর্মী অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকটা ট্রাক আর চারচাকার ভিড়। পিচ রাস্তা ঘেঁষে ছড়ানো কাচের টুকরো, একজোড়া ছেঁড়া রাইডিং গ্লাভস, আর একটা চূর্ণবিচূর্ণ কালো হেলমেট। পিচের ওপর ছোপ ছোপ কালচে দাগ—রক্ত নাকি ইঞ্জিনের পোড়া মবিল, দূর থেকে বোঝা যায় না।
অমিত বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করল। হেলমেটের বাইজারটা ওপরে তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক চা-ওয়লাকে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, কী হয়েছে?"
চা-ওয়ালা একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি থেকে বাষ্পওঠা চা ঢালতে ঢালতে বিষণ্ণ মুখে বলল, "এক রাইডার মেয়ে গো দাদা। ওই তো, সিক্স লেনের ডান দিকের ওভারটেকিং লেনে একটা ট্রলার ডাম্পার শ্লথ গতিতে যাচ্ছিল। মেয়েটা ওভারটেক করতে গিয়ে দেখে সামনে একটা ব্রিজের মুখে হঠাৎ পিচ শেষ হয়ে ১ ফুট উঁচু কংক্রিটের ঢালাই। স্পিড সামলাতে পারেনি। ব্যালেন্স হারিয়ে ডাম্পারের পেছনে... ব্যস! স্পট ডেড। নাম যেন কী বলল পুলিশ—রঞ্জনা দেবনাথ।"
অমিতের বুকের ভিতরটা ছাঁৎ করে উঠল। রঞ্জনা! রাইডার রঞ্জনা দেবনাথ?
অমিতও অল্পস্বল্প রাইডিং করে, চালক হিসেবে বেশ অভিজ্ঞ। সোশাল মিডিয়ার দৌলতে রঞ্জনাকে সে চিনত। মেয়েটা বেশ কিছুদিন ধরেই লং রাইড করছিল—লখনউ, লাদাখ, উত্তর-পূর্ব ভারত। অথচ আজকে নিজের ঘরের কাছে, এই চেনা হাইওয়েতেই সব শেষ হয়ে গেল?
অমিত রাস্তার পাশে নিজের রয়্যাল এনফিল্ডটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করাল। গ্লাভস দুটো খুলে বাইকের ওপর রাখল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। মানসিক ক্লান্তি আর শোক একসঙ্গে চেপে ধরল তাকে। রাস্তার ধারের চা-দোকানের একটা কাঠের বেঞ্চিতে এসে সে বসল। চা-ওয়ালা একটা কাগজের কাপে চা বাড়িয়ে দিল।
হাইওয়ের ওপর দিয়ে তখন ধেয়ে চলেছে ভারী ট্রাক, প্রাইভেট কার আর একের পর এক হাই-সিসি বাইক। ট্রাফিকের বিকট গর্জন আর ধোঁয়ার মধ্যে অমিতের মনে হলো—এই বিশাল হাইওয়েটা যেন একটা চলমান কসাইখানা। যেখানে নিয়মের কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধু তাড়াহুড়ো আর খামখেয়ালিপনা। 

 
 দুই
 চায়ে চুমুক দিতে দিতে অমিতের চোখ গেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চার-পাঁচজন তরুণ-তরুণীর দিকে। তাদের সবার গায়ে দামি রাইডিং জ্যাকেট, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা প্যাডেড বুট, চোখে ডার্ক সানগ্লাস। তাদের বাইকগুলোর দাম সাধারণ মানুষের কয়েক বছরের উপার্জনের সমান। বাইকের হ্যান্ডেলবারে বসানো দামী অ্যাকশন ক্যামেরা।
তাদের মধ্যে একজন, বয়স বড়জোর বাইশ-তেইশ, চ্যাঁচামেচি করে বলছিল, "দূর ভাই! মেয়েদের এমনিতেই হাইওয়েতে অত জোরে বাইক চালানো উচিত নয়। হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি থাকে না। ৮০-১০০ স্পিডে গেলে ওই এক ফুট উঁচু ঢালাইয়ে বাইক জাম্প করবেই। রাইডিং স্কিল না থাকলে এসব ঢং করতে আসা কেন?"
অমিত চুপ করে শুনছিল। ছেলেটির জ্যাকেটে লেখা 'প্রো রাইডার'।
ছেলেটির পাশ থেকে অন্য এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, যিনি নিজের অল্টো গাড়িটি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে জল খাচ্ছিলেন, তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলেন, "কী বললেন ভাই? রাইডিং স্কিল? আপনি সিক্স লেনের রাস্তাটা দেখেছেন? সিক্স লেনের একদম ডানদিকের লেনটা কিসের জন্য বলুন তো? ওভারটেকিংয়ের জন্য তো? অথচ দেখুন, ওই লেনে ১০০ টন ওভারলোড নিয়ে একটা ঢিমেতাল ট্রাক ৪০ স্পিডে চলছে! বাম দিকের লেনগুলো খালি, আর ডানদিকের ফাস্ট লেনে শ্লথগতির গাড়ি। ট্রাফিক পুলিশ কী করছে? তারা গাছের ছায়ায় বসে ফাইন কাটতে আর তোলা তুলতে ব্যস্ত! রাস্তা ঠিক করার কথা কে বলবে?"
কথাকাটাকাটি বাড়ে। চায়ের দোকানের সামনে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে যায়।
অমিত বসে বসে প্রত্যক্ষ করছিল ভারতীয় হাইওয়ের চিরাচরিত রূপ। এ যেন এক অদ্ভুত নাটকমঞ্চ, যেখানে প্রত্যেকেই ভুক্তভোগী, আবার প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অপরাধী।
ভদ্রলোক আবার বলতে লাগলেন, "শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন? মিজোরাম আর নাগাল্যান্ড বাদ দিয়ে পুরো ভারতের সব রাজ্যের হাইওয়ের একই হাল। কোনো শৃঙ্খলা নেই। কোথাও স্পিড লিমিট ৮০ লেখা, আর তার ঠিক দুই হাত দূরেই লোহার ব্যারিকেড বসিয়ে রেখেছে! ৮০ থেকে হঠাৎ জিরো স্পিডে আনা কোনো বাইক বা গাড়ির পক্ষে সম্ভব? দুর্ঘটনা তো হবেই!"
তরুণ রাইডারটি অহংকারের সঙ্গে হেসে বলল, "আরে কাকা, আপনাদের মতো কম সিসির গাড়ি চালানো লোকজনের এটাই সমস্যা। আমরা হাজার সিসির বাইক চালাই, আমাদের রিফ্লেক্স আলাদা। আমাদের জন্য ওইসব ব্যারিকেড কোনো ব্যাপার না।"
ভদ্রলোক বিরক্তির সাথে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, "হুঁ, বাপের টাকায় ফুটানি মারা উড়ন্ত যুবক-যুবতী সব! জ্যাকেট আর ক্যামেরা পরলেই রাইডার হওয়া যায় না। রাস্তাটা তোদের রেসিং ট্র্যাক নয়। ঘুরতে যাওয়া মানে মনোরম পরিবেশ ফিল করতে করতে সুস্থভাবে পৌঁছানো। তোদের এই উড়ানো মার্কা বাইকিংকে রাইডিং বলে না, ছাপরিপনা বলে!" 

 
তিন
অমিত এবার উঠে দাঁড়াল। গোলমালটা বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়। সে ধীর পায়ে এসে বলল, "দাদা, থামুন। একজন রাইডার মারা গেছেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। এই শোকের মুহূর্তে আমরা একে অপরকে দোষারোপ করে কী পাব?"
তরুণ ছেলেটি অমিতের দিকে তাকিয়ে একটা অবহেলার হাসি হাসল। কম সিসির বাইক আর সাধারণ পোশাক দেখে হয়তো অমিতকে তার খুব একটা 'প্রো' মনে হয়নি।
অমিত ছেলেটির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "ভাই, তুমি নিজেকে প্রো রাইডার ভাবছ, খুব ভালো কথা। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—হাইওয়েতে যখন তুমি নামছ, বাইকের সামনের চাকাটা তোমার 'জীবন', আর পেছনের চাকাটা 'মৃত্যু'। এই দুইয়ের মাঝে ব্যালেন্সের খেলা খেলে আমরা বেঁচে থাকি। অ্যাক্সিডেন্ট কিন্তু বারবার হয় না, জাস্ট একবারই হয়। আর তাতেই সব শেষ।"
ছেলেটি একটু ইতস্তত করল, কিন্তু মুখ ফোটার আগেই অমিত আবার বলতে লাগল, "তোমরা যারা ভাবো যে ১০-১৫ ঘণ্টা একটানা বাইক চালিয়ে বিশাল বীরত্ব দেখাচ্ছ, তারা কি কখনো ভেবেছ শরীর কতটা শারীরিক ধকল সহ্য করছে? তোমরা কি প্রতিদিন কোনো ওয়ার্কআউট করো যাতে ১২ ঘণ্টা রাইডের পর মাথা আর শরীর ঠিকমতো রেসপন্স করে? টেকনিক্যালি তোমরা কতটা সক্ষম? কোনো ট্রমা কেয়ারের অভিজ্ঞতা আছে তোমাদের সঙ্গে? জরুরি মুহূর্তে একটা ফ্র্যাকচার সামলানোর প্র্যাকটিস করেছ কখনো?"
কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল তরুণদের দলের মধ্যে। তাদের মধ্যে থেকে একটি মেয়ে—হয়তো তাদেরই বন্ধু—চুপিচুপি বলল, "ঠিকই তো বলছেন উনি..."
অমিত ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "এখানে শুধু রোড ম্যানেজমেন্ট বা ট্রাফিক পুলিশকে দোষ দিলে ভুল হবে। ভুল আমাদেরও। আমরা রাস্তায় নামলেই এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো দেখাই। যেন পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছাতে না পারলে জীবনটাই বৃথা। কেন? কিসের এত তাড়া? ওভারলোডেড ট্রাকগুলো বাম দিক দিয়ে না গিয়ে মাঝের লেন দিয়ে যাচ্ছে বলে বাইককে এদিক-ওদিক লেন চেঞ্জ করতে হচ্ছে। আর ঠিক সেই সময় পেছন থেকে ১০০ স্পিডে একটা চারচাকা এসে হর্ন বাজিয়ে হুট করে ডানদিকের লেনে ঢুকছে। একটা কনফিউশন তৈরি হচ্ছে, আর সামলাতে না পেরে মানুষ মারা যাচ্ছে।" 

 
 চার 
ভিড়ের মধ্যে থেকে আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তি বলে উঠলেন, "ঠিক বলেছেন ভাই। আজকাল রাস্তায় নামলেই দেখি ভেড়ার পালের মতো একসাথে ৪০-৫০ জন বাইক নিয়ে লাইন দিয়ে চলেছে। সো-কল্ড লোকদেখানো 'প্যাশন' ফলো করতে! ইউ-টিউবে ভ্লগ বানিয়ে লাইক আর ভিউ পাওয়ার জন্য এরা নিজের আর অন্যের জীবন বিপন্ন করছে।"
অমিত একটু ভেবে বলল, "কাকাবাবু, সোশ্যাল মিডিয়া আর ভ্লগিং অবশ্যই একটা বড় কারণ। কিন্তু তাই বলে সব নতুন রাইডারকে 'ছাপরি' বা অনভিজ্ঞ বলে দাগিয়ে দেওয়াও ভুল। অ্যাক্সিডেন্ট যে কারো হতে পারে। এই যে রঞ্জনা চলে গেল... ও তো কোনো অনভিজ্ঞ মেয়ে ছিল না। ও নিয়ম মেনেই চালাত। কিন্তু ভারতের হাইওয়েতে চলতে গেলে শুধু বইয়ের নিয়ম মানলে চলে না। কারণ তুমি আমেরিকায় গাড়ি চালাচ্ছ না, ভারতে চালাচ্ছ।"
"মানে?" প্রবীণ ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন।
"মানে খুব সাধারণ," অমিত ব্যাখ্যা করল, "এখানে নিয়মের সঙ্গে অতিরিক্ত যেটা লাগে, সেটা হলো চরম মনসংযোগ, ধৈর্য আর বাস্তব অভিজ্ঞতা। সামনের গাড়িটার চলন দেখে আপনাকে বুঝতে হবে ওই গাড়ির ড্রাইভারের মানসিকতা কী। সে কি হুট করে ইন্ডিকেটর না দিয়ে ডানে ঘুরবে? নাকি রাস্তায় হঠাৎ কোনো গরু বা ছাগল চলে আসলে সে সজোরে ব্রেক চাপবে? এই প্রেডিকশন পাওয়ারটা হাইওয়েতে বেঁচে থাকার আসল চাবিকাঠি।"
অমিত যোগ করল, "অনেকে বলে স্লো মুভিং গাড়িগুলো রাস্তার বাম দিক দিয়ে চলুক। একদম ঠিক। কিন্তু বাইকের যেহেতু কম জায়গা লাগে, বাইককেও সচেতন থাকতে হবে। ট্রাফিক আইন কড়া না হলে, আর মানুষ নিজে সভ্য না হলে কোনো সমাধান নেই। আমরা পাহাড়ে গেলে দেখি ড্রাইভাররা কত নিয়ম মেনে গাড়ি চালায়, কত সভ্য। অথচ সমতলে নেমে এলেই যেন সব দানব হয়ে যায়!"
ট্রাফিক কনস্টেবলটি, যে এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, এসে বলল, "আপনারা পুলিশকে দোষ দিচ্ছেন, কিন্তু আমরা কতদিক সামলাব বলুন? রাস্তা মেরামত করার দায়িত্ব তো পূর্ত দপ্তরের। উল্টোডাঙা ভিআইপি ব্রিজের কথা ধরুন, বা এই হাইওয়ের কথা ধরুন—রাস্তায় অজস্র গর্ত। মাঝপথে হঠাৎ কংক্রিটের ঢালাই একফুট উঁচু হয়ে আছে। একটা গাড়ি বা বাইক ১০০ স্পিডে এসে ওই গর্তে পড়লে পুলিশ কী করবে?"
কনস্টেবলটির কথায় সত্যতা ছিল। পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অপরিসীম—টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গাফিলতির অভিযোগ মিথ্যে নয়। কিন্তু একই সঙ্গে পরিকাঠামোর অভাব আর প্রশাসনিক উদাসীনতাও সত্য। 

 
পাঁচ
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হাইওয়ের এল-ই-ডি লাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠল। আলোর তলায় ভেসে উঠছে পিচ রাস্তার ধুলো আর কালো ধোঁয়া।
অমিত বাইকের কাছে ফেরত এল। সে তার হেলমেটটা হাতে নিল। তার মনে হচ্ছিল, রঞ্জনার এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সমাজের একটা নগ্ন ছবি তুলে ধরেছে। একদলে আছে প্রশাসনিক গাফিলতি, খারাপ রাস্তা আর তোলাবাজির ট্রাফিক ব্যবস্থা। অন্যদলে আছে নিয়ম না মানা, ওভারস্পিডিং, মনসংযোগের অভাব আর ইউ-টিউবে ভাইরাল হওয়ার সস্তা আদিখ্যেতা। আর এই দুইয়ের মাঝে পড়ে বলি হচ্ছে কিছু তাজা প্রাণ।
পাশের তরুণ রাইডারদের দলটি এখন বেশ শান্ত। তাদের অহংকার অনেকটাই ধুয়েমুছে গেছে অমিতের যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে। তরুণটি অমিতের কাছে এসে নিচু গলায় বলল, "দাদা... আমরা শিলিগুড়ি যাচ্ছি। আপনার কথাগুলো শুনে সত্যি মনে হলো, আমরা হয়তো একটু বেশিই ঝুঁকি নিচ্ছিলাম। রঞ্জনাদির মতো এত ভালো রাইডারের যদি এই অবস্থা হতে পারে..."
অমিত তরুণটির কাঁধে হাত রাখল। "ভাই, শোনো। বাড়ি ফেরো। দ্রুত পৌঁছানোর থেকে সুরক্ষিত পৌঁছানো অনেক বেশি জরুরি। ঘুরে বেড়ানো মানে রেসিং নয়, পরিবেশকে উপভোগ করা। যখন পেছনে কেউ বসে থাকে, বা নিজের জীবনের কথা ভাববে, তখন স্পিড মিটার অটোমেটিক্যালি নেমে আসা উচিত। একটু দেরি হলে জীবন থেমে যায় না, কিন্তু জীবনটা চলে গেলে সেটা কেউ ফিরিয়ে আনতে পারবে না।"
ছেলেটি মাথা নাড়ল। তারা আস্তে আস্তে তাদের বাইকের স্টার্ট দিল, কিন্তু এবার আর সেই তীব্র কর্কশ আওয়াজ বা রেসিংয়ের প্রবৃত্তি ছিল না। তারা ধীর গতিতে রাস্তার বাম দিক ধরে এগিয়ে গেল। 

৬. ছয়
অমিত তার রয়্যাল এনফিল্ডের ইঞ্জিন চালনা করল। একটা পরিচিত গম্ভীর আওয়াজে হাইওয়ের বাতাস কেঁপে উঠল। সে হেলমেটটা পরে বাইজার নামিয়ে দিল।
চাঁদিপুর থেকে ফেরার এই রাস্তাটা যেন আজকে তাকে একটা বিশাল শিক্ষা দিয়ে গেল। মৃত্যু সবসময়ই বেদনাদায়ক। রঞ্জনার বিদেহী আত্মাকে স্মরণ করে অমিত মনে মনে বলল—'ওঁ শান্তি'।
অমিত লেনে ঢুকল। সে স্পষ্ট জানে, ভারতের এই জাতীয় সড়কগুলোতে কোনো লেন ডিসিপ্লিন নেই, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট সিগন্যালিং সিস্টেম। গ্রিন থেকে এক লহমায় দুম করে রেড হয়ে যাওয়া সিগন্যাল, হঠাৎ ভুল দিক থেকে চলে আসা কোনো ইঞ্জিন ভ্যান বা টোটো, কিংবা লেনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ওভারলোডেড ট্রাক—সবকিছুর মুখোমুখি তাকে হতেই হবে।
কিন্তু লড়াইটা তো থামবে না। ঠিক দু-সপ্তাহ আগে বাসন্তী হাইওয়েতে সেদিন ৬০ স্পিডে আসছিল অমিত। ফাঁকা রাস্তা, কিন্তু নারায়ণপুর মোড় ঘুরতেই উল্টোদিক থেকে সামনে চলে এল একটা ইট-বোঝাই মোটরভ্যান। 
    সাবধানে রাখতে হবে। সচেতন হতে হবে নিজেকেই, একথা অমিত জানে। সেদিনও বাইকের গতি ২০-৩০ এর মধ্যে নামাতে না নামাতেই মোটরভ্যানটা পুরো গায়ের উপর এসে পড়ল। 
      অমিত ওভারটেকিংয়ের ফাস্ট লেন ছেড়ে মিডিল আর লেফট লেনের মাঝামাঝি নিজের জায়গা করে নিল। পেছনের ভিউ মিররে সে দেখতে পেল খড়্গপুরের সেই দুর্ঘটনাস্থলটি আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। 
      আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। অমিত একা, নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রেখে, শান্ত মাথায় রাতের হাইওয়ে ধরে এগোতে লাগল। তাকে এখন বাসন্তী হাইওয়ের নারায়ণপুর মোড়ে পৌঁছাতে হবে। সেদিনের অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে ওটাই তার নতুন ঠিকানা। বাকি শরীরটা পুলিশ নিয়ে রুবিয়ার কাছে দিলেও তার মাথাটা ঠিক পিছনেই তীব্র গতিতে আসা লরির চাকায় বাসন্তী হাইওয়ের পিচ-রাস্তায় মিশে গেছিল। 
=======================\

অনিন্দ্য পাল 
প্রজত্নে -- বিশ্বনাথ পাল
গ্রাম -- জাফরপুর  
পোঃ-- চম্পাহাটিি 
পিন - ৭৪৩৩৩০ 
থানা -- সোনারপুর 
জেলা -- দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা  
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত  

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.