মুখোশকাকু আর মিমি
অঞ্জনা মজুমদার
বাবা মা আর দাদাভাই এর সঙ্গে মিমি আনন্দে পুজোর বাজার করতে বেরিয়েছে। বিশেষ করে বাটার দোকান থেকে পুজোর জুতো কেনায় মিমির সবচেয়ে বেশি আগ্রহ।
বাটার দোকানের বিক্রেতাকে মিমি বাটাকাকু বলে ডাকে। তাতে তিনি খুশিই হন। বড্ড মজা হয় বাটাকাকুর দোকানে গেলে। কলাবাগান এলাকার এই দোকানে পুজোর সময় প্রবল ভিড় হয়। সব বাচ্চাদের একলেয়ার্স চকোলেট আর একটা করে বেলুন দেওয়া হয়। চকোলেট এর চেয়ে বেলুনের দিকে মিমির বেশি আগ্রহ। দাদাভাই মনে করে সে বড় হয়ে গেছে, তার বেলুন সে মিমিকেই দেবে নিশ্চয়ই। আবার কোনও কোনও বেলুনের সঙ্গে একটা মজার বাঁশি থাকে। ফুঁ দিয়ে বেলুন ফোলানোর চেষ্টা করতে গেলেই কোনও কোনও বাঁশি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে, কোনও কোনও বাঁশি হো হো করে হেসে ওঠে, কোনও কোনও বাঁশি আবার মোরগের মতো কোঁকর কোঁ করে ডাকে। এত্ত সব মজার জন্য বাটাকাকুর দোকানে যেতে মিমির খুব আগ্রহ।
বাটার দোকান একটা ছোট্ট গলির মধ্যে। গলির মুখ থেকে বেলুন দিয়ে সাজানো। রাতের বেলা আবার টুনি বাল্বের আলোয় দোকান ঝলমল করে। গলির মুখে এসেই মিমি মায়ের হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে দোকানে ঢুকে পড়ল।
বাটাকাকু তখন একটা ছোট্ট ছেলেকে জুতো পরিয়ে হাত ধরে হাঁটতে সাহায্য করছেন।
মিমি তাই দেখে দোকানের পেছন দিকে চলে গেল। সেখানে আজ এক মুখোশ পরা কাকু হাত পা নাড়িয়ে মজার খেলা দেখাচ্ছেন।
মিমি সামনে এসে দাঁড়াতেই মুখোশ কাকু নাচতে নাচতে মিমিকে একটা বেলুন হাতে দিলেন। সেই বেলুন ফোলাতে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্নার আওয়াজ বেরোতে লাগল।
সেই মুখোশ কাকুর হাত ধরে মিমি কখন পেছনের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল খেয়াল নেই। অন্ধকার গলির মুখে এসেই মিমির খেয়াল হল দাদাভাই, বাবা মা সঙ্গে নেই। কার হাত ধরে যাচ্ছে সে? কোথায় যাচ্ছে?
বাটাকাকু কই? তুমি কে? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? মিমি চেঁচিয়ে উঠতেই সেই মুখোশ কাকু, চুপ চেঁচামেচি নয়! বলে ধমক দিয়ে উঠল।
মিমি ছোট হলেও এটা বুঝতে পারল যে চেঁচামেচি করে লাভ নেই, এ কাকুটা ভালো নয়।ধরে নিয়ে যাচ্ছে মানে কি ছেলেধরা? আর কি মা বাবা দাদাভাইকে দেখতে পাবে না? ভেবেই মিমির খুব রাগ হয়ে গেল। রেগে গেলে মিমির মাথায় আগুন জ্বলে। দাদুভাই বলেন তপ্ত কড়াই। মিমি মুখোশ কাকুর হাতে জোরে কামড় দিল। সেও ব্যথায় বাবাগো বলে হাত ছাড়িয়ে নিল। আর মিমি পিছনে ফিরে দৌড়। চিৎকার করছে, মা বাবা বাটাকাকু বাঁচাও।
এদিকে মিমির বাটাকাকু মিমিকে খুঁজে না পেয়ে দেখেন পেছনের দরজা খোলা। সেটা দেখে তিনি দরজার বাইরে বেরিয়ে মিমিকে ছুটতে দেখে দৌড়ে এলেন। মিমি দৌড়ে বাটাকাকুকে জড়িয়ে ধরলো। মুখোশ পরা লোকটা পালাতে চেষ্টা করেও পারল না। বাবা আর দাদাভাই এর হাতে বন্দি হয়ে গেল।
মা ভয়ে কথা বলতে পারছেন না। মিমিকে মায়ের কাছে দিয়ে বাটাকাকু বললেন, চিন্তা করবেন না বৌদি, মিমি একদম ঠিক আছে। মুখোশ পরা লোকটা কেঁদে ফেলেছে।
আমার অনেক টাকার দরকার বাবার অপারেশন হবে। একজন বলল, বাচ্চা মেয়েকে ভুলিয়ে আমার কাছে এনে দিলে দশহাজার টাকা দেবে। আমি পারলাম না।
এবার মিনি আসরে নামল। মুখোশ কাকু, তুমি কি বোকা বলতো? তোমার বাবার অসুখ, আমার বাবাকে নিয়ে যাবে তো? বাবা ডাক্তার, আমি তো বড় হলে ডাক্তার হবো। আমি কি এখন তোমার বাবার অসুখ সারাতে পারবো?
এবার লোকটি মিমির সামনে হাতজোড় করে কেঁদে ফেলল। আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে মা। আর কখনো এমন হবে না।
বাবা বললেন, আমার বাড়িতে এসো সব কাগজ পত্র নিয়ে। তোমার বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেবার চেষ্টা করবো।
মুখোশ কাকুর বাবা সরকারি হসপিটালে চিকিৎসা করে ভালো আছে। আর পল্টু? সে মিমির মুখোশ কাকু এখন মিমির বাবার চেম্বারে কাজ করে। মিমির সঙ্গে তার খুব ভাব। বাড়িতে মা ভালো কিছু রান্না করলে মুখোশ কাকুকে দিতেই হয়।
পল্টু বলে মিমি আমাকে ভালো হতে শিখিয়েছে।
====================
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লি বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনি
কলকাতা ৭০০০৮১

