ছোটগল্প ।। মায়াটান ।। শংকর ব্রহ্ম

Uploaded Image

 
মায়াটান
 

শংকর ব্রহ্ম



  প্রথমে বুঝতে পারিনি যে, সে একটি বাঘিনী ছিল। তার কোনও গড়গড় আওয়াজ আমি শুনিনি।

                         

     বাড়ির ভিতরে ঢোকার দরজাটি ছিল খোলা। দেখলাম সে এসে সেখান দিয়ে ঢুকল। ঢুকেই এদিকে সেদিকে দু'একবার তাকাল। তারপর কিছু একটা ভাবল। এরপর আমার ঘরে ভিতর এসে, অন্ধকারে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। তার গা থেকে লতা-পাতা ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল। বন্য প্রাণীর গন্ধ যা আমাকে ভীষণ সম্মোহিত করে দিয়েছিল। শুয়ে পড়ে সে গভীর শ্বাস নিচ্ছিল। একটু পরেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। আধো আলোতে দেখে, আমি চিনলাম এটা একটি বাঘিনী।

                   প্রথমে তার গা ভেজা ছিল, ত্বক থেকে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়েছিল আমার চারপাশে, যা শীতলতার সৃষ্টি করেছিল। এখানে আসার জন্য তাকে অবশ্যই নদীটা সাঁতার কেটে পার হয়ে আসতে হয়েছে, কারণ নদীটার ওপারে গভীর বন-জঙ্গল আছে।


                   গ্রীষ্মকাল বলে গরমের তাজা ভাবটা আছে। শরৎকালের মতো শীতল বাতাস সমভূমি ছুঁয়ে এখানে ঘুরতে এসেছিল বড় নদীটা থেকে, তার জলজ গন্ধটা আমাকে মোহিত করেছিল।

                  রাতে ভাল ঘুমিয়েছি আমি। বাঘিনীও ছিল চুপচাপ। বোধহয় তারও ভাল ঘুম হয়েছে। 

                   সকালের দিকে, উষ্ণতা ফিরে এসেছিল তার শরীরে। যখন তার ঘুম ভাঙল, সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে, প্রথমে বাড়ির সামনের আম বাগানে গিয়ে দাঁড়াল। বড় নদীটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।

                   তাকে মাংস খেতে দিয়ে, আমি কাছে আসার জন্য ইশারা করলাম। আশা করেছিলাম, সে কাছে এসে  আমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবে। কিন্ত সে ছিল নীরব। তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিল, তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, আমাকে তার বলার কিছুই নেই। অবশেষে তার সাথে আলাপ করার আশা ছেড়ে দিয়ে, আমার কাজ নিয়ে আমি ব্যস্থ হয়ে পড়লাম। সে নীরবে সেখানেই বসে রইল। 

                        আমি প্রায়ই তার সাথে আমার ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম এবং মনে মনে ভাবতাম যে, সে আমার সব কথা বুঝতে পারছে।


                        সেই রাতেও আবার বাঘিনীটি এসে আমার পাশে ঘুমিয়েছিল। তার পরের দিন, সে বাড়ির পাশের আম বাগানে কাটিয়েছি সারাদিন, সূর্যের বিপরীতে, ছায়ায় বসে। আমি মাঝে মাঝে, নদী ছাড়িয়ে দূরের বনের দিকে তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি। আরও দেখেছি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সে, জলের স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকত।


                          সেদিন আমি তাকে বলেছিলাম, 

কিছুদিনের জন্য আমাকে বাড়ি ছেড়ে বাইরে যেতে হবে, ফিরতে বেশ কয়েক দিন দেরি হতে পারে, তোমাকে ভেবে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না থাকার দিনগুলিতে, তুমি বাড়ির ভিতরে, নাকি বাইরে থাকতে চাও? আমি দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাইলাম। উত্তর না দিয়ে বাঘিনীটি শুয়ে পড়ল দরজার সামনে। আমি বুঝলাম যে ঘর বন্ধ করার আর কোনও প্রয়োজন নেই, আমি ঘর খোলা রেখে চলে গিয়েছিলাম।


                     সাতদিন পরে, ফিরে এসে দেখি, বাঘিনীটি দরজার বাইরে খোলা চোখে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে রইল। তারপর সে উদাস ভাবে দরজা থেকে উঠে, সরে গিয়ে, চলে গেল আম বাগানের দিকে।


                      বাড়িটি যেমন ছিল তেমনই আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, তাকে বললাম। সে তার কোন প্রতি-উত্তর না দিয়ে নদীর ওপারে গভীর বনের দিকে তাকিয়ে রইল।


                       এর কিছুদিন পর আমি যখন নদীতে মাছ ধরতে যেতাম, তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত। নদীর পাড়ে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম, সে তা মনোযোগ দিয়ে দেখত। কিন্তু ছুঁতো না। বাড়ি নিয়ে এসে, ওকে খেতে দিলে, মাছ খেত।


                       যখন আমি শ্যালো নৌকা করে নদী পেরিয়ে বনের মধ্যে (সেখানে সে ছিল) কাঠ কাটতে যেতাম সে আমার সঙ্গে যেত। চুপচাপ বসে থাকত। ফিরে এসে প্রতি রাতে সে আমার পাশে শুয়ে ঘুমাত। 


                      তারপর একদিন সে ভোরের দিকে, নিঃশব্দে আমার বাড়ি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

                      যাবার আগে সে আমাকে একবার স্পর্শ করেছিল। আমাকে জাগাতে চেষ্টা করেছিল। তারপর সে গভীর দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। আমি বুঝিনি যে সে চলে যাবে। এরপর সে ধীরে ধীরে দরজা দিয়ে বেরিয়ে, বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে চলে গেল। আমি সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম, সাঁতার কেটে সে নদীটা পেরিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে। তখনও টিপটিপ করে অঝরে বৃষ্টি পড়ছিল।

                     ভেবেছিলাম একটু পরেই সে ফিরে আসবে আবার। আমি তাই আর বিছানা ছেড়ে উঠিনি। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য, সে আর ফিরে আসেনি।

                    আমি তখন  ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য সে, আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জানতে পারলে, বুঝতে পারলে, হয়তো তাকে বাধা দিতাম। চলে যেতে দিতাম না।

                     আমি এখনও আশা করি যে, সে একদিন আবার ফিরে আসবে আমার কাছে।


                       আজকাল আমি আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না। কিংবা যাই না বনে কোনও কাঠ কাটতে। আমার যেন, এখন আর কোনও কাজ ভাল লাগে না। মন নেই কাজে। মন পড়ে আছে তার কাছে। কোনও কাজ করতে আর ভালও লাগে না।


                        আমি আজকাল নদীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বসে থাকি, আর ভাবি তার কথা। সে প্রথম যেদিন এসেছিল আমার ঘরে, মনে পড়ে যায় সেসব কথা। 

যাবার সময়, যেন সে আমার কাছ থেকে সমস্ত আনন্দ কেড়ে নিয়ে চলে গেছে।


                       আজকাল ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমি,, একবার হলেও তার কথা ভাবি। ভাবি, একদিন হয়তো  ফিরে এসে সে, নিঃশব্দে আমার পাশে শুয়ে পড়বে। ঘুমের মধ্যে, আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে দেখব সে আমার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। 

                   আজকাল একা একাই আমি শুয়ে থাকি। ঘুম আর আসে না রাতে, তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়। একদিন ভোরের দিকে তন্দ্রার মতো এসেছিল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি, কখন যেন সে নিঃশব্দে আমার ঘরে এসেছে। আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে, তার জিব দিয়ে আমার ঠোঁট চাটছে। আমি তাতে রক্তে চরম উত্তেজনাপূর্ণ শিহরন অনুভব করি। শিহরিত রোমাঞ্চে, বাঘিনীর গলা জড়িয়ে ধরতে গিয়ে, আমার তন্দ্রা কেটে যায়। চোখ মেলে দেখি, কোথায় বাঘিনী? আমি কি তবে স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ? মন-মরা ভাব নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে, আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। মনেহয় যেন একটা কিছু সাতার কেটে আমার দিকে আসছে। না, এটা ছিল আমার ভ্রান্তি। ভ্রান্তি নিয়ে সারাদিন নদীর পাড়ে বসে থাকি। ইচ্ছে পূরণ হয় না। তারপর চরাচর জুড়ে সন্ধ্যা নেমে এলে, হতাশ হয়ে আমি ঘরে ফিরে আসি। 

আবার আমি পরের দিন যাই নদীর পাড়ে। আবার পরের দিন … 

                          যাওয়াটা আমার কাছে এখন একটা নেশার মতো হয়ে গেছে। আজও আমি, সেই নেশাতেই মগ্ন হয়ে বেঁচে আছি।


----------------------------------------------------------------------------
SANKAR BRAHMA.
8/1, ASHUTOSH PALLY,
P.O. - GARIA,
Kolkata - 700 084.
----------------------------------------------------------------------------
Uploaded Image
 

শংকর ব্রহ্ম



Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.