গল্প ।। বৃত্তের ওপারে ।। আদীবা আবসারী

 

বৃত্তের ওপারে 

 আদীবা আবসারী




পিউ দরজা খুলে দেখল, মায়িশা দাঁড়িয়ে আছে। ঈদের বন্ধে কুয়েট থেকে ফেরার পর এই প্রথম মায়িশার সঙ্গে দেখা।

মায়িশা বলল, "তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আজকে সারাদিন তোর সঙ্গে ঘুরব।"

পিউ বিস্মিত হয়ে বলল, "সূর্য আজকে কোনদিকে উঠল রে? তুই বলছিস বেড়াতে যাওয়ার কথা?"

"ঢং করিস না। ও, ভালো কথা, নিচে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আন্টির খোঁজে এসেছে। তোদের নাকি হেল্পিং হ্যান্ড লাগবে। ওই যে তিতলী-কঙ্কা আছে না, ওদের কেয়ারটেকার।"

"তিতলী-কঙ্কা কে?"

"আমাদের সাথেই তো পড়ত। অন্য সেকশনে ছিল, তাই হয়তো ভুলে গিয়েছিস। যাই হোক, আর দেরি করিস না। রেডি হয়ে নিচে আয়, তাড়াতাড়ি।"

পিউ আর মায়িশা একটা রিকশায় উঠে বসল। পিউ বলল, "তারপর, তোর লেখালেখির খবর বল।"

"এই তো চলছে। পড়াশোনার ফাঁকে যতটুকু সময় পাই আরকি।"

"এখন যে গল্পটা লিখছিস, সেটার কাহিনি কিছুটা বল। বন্ধু হিসেবে তোর পাঠকদের আগে গল্প জানার privilege তো পেতেই পারি, নাকি?"

মায়িশা বলল, "গল্পটা একটা মেয়েকে নিয়ে। ২২–২৩ বছরের অতি রূপবতী তরুণী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রী। অথচ আর্টের প্রতি তার অগাধ প্রেম। বৃষ্টির দিনে কদম হাতে গুনগুন করে গায়, 'আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে।' আবার পূর্ণিমার সময় হাত বাড়িয়ে জ্যোৎস্নাফুল ছুঁতে চায়। ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট পুরোপুরি হয়ে গেলে তারপর আনব ট্র্যাজিক পার্ট। মেয়েটার হুট করে মা মারা যাবে। হাসিখুশি মেয়েটা কেমন যেন মনমরা হয়ে যাবে।"

পিউ মায়িশাকে থামিয়ে বলল, "তারপর ক্লাইম্যাক্স পার্টে লিখবি, মেয়েটার মাকে ওর বাবা খুন করেছে, তাই তো?"

মায়িশা বিস্মিত হয়ে বলল, "তুই কী করে জানলি?"

পিউ বলল, "তোর গল্পে কোনো রান্নার রেসিপির বিশদ বর্ণনা রেখেছিস, অথবা মেয়েটা কাউকে মনে মনে চিঠি লিখছে—এমন কিছু?"

মায়িশা বলল, "না, কেন বল তো?"

পিউ বলল, "না, তাহলে আরকি! কপিরাইট আরও ইজিলি হয়ে যেত।"

মায়িশা থমথমে গলায় বলল, "তার মানে আমি কারও লেখা কপি করেছি, বলছিস?"

পিউ বলল, "আমার বলা না বলায় কিছু আসে যায় না। তুই তোর মতো লিখিস, ভালোই তো হয়। এভাবে নকল করার কী দরকার, বল তো?"

মায়িশা বলল, "তুই অত্যন্ত রেগে যাওয়ার মতো একটা কথা বললি, কিন্তু আমি না রেগে উত্তরটা দিচ্ছি। আমি কারও লেখা নকল করিনি। আমি সবসময় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখি।"

পিউ চুপ করে রইল। যে বুঝতে চায় না, তাকে বোঝানো সম্ভব না।

কিছুক্ষণ পর প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলল, "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"

মায়িশা বলল, "তেমন কোনো প্ল্যান নেই। ভাবছি সারাটা দিন রিকশায় রিকশায় ঘুরব। অবশ্য তুই যদি চাস, জেলা শিল্পকলায় যেতে পারি। যাবি?"

পিউ বলল, "কেন, কোনো অনুষ্ঠান আছে?"

"হ্যাঁ, একটা সেমিনার হবে। মনোবিজ্ঞানের এক অধ্যাপক আসবেন। নামটা মনে করতে পারছি না।"

পিউ স্বস্তিবোধ করল। এটাই তাদের বন্ধুত্বের সুন্দরতম দিক। কেউ গ্রাজ ধরে রাখে না। মায়িশা আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে গল্প করছে।

পিউ গল্পে যোগ দিয়ে বলল, "কার কথা বলছিস? চিনতে পারছি না।"

মায়িশা বলল, "ওই যে, কিছু দিন আগে যে লোকটা একজন ভদ্র মহিলার কেস নিয়ে আলোচনায় এল।"

পিউ বলল, "বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কেস সলভ করে কবে থেকে?"

"আরে না না, ওই টাইপের কেস না। আমি যতদূর জানি, ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে ছোটবেলায় নির্জন মন্দিরে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তারপর আরেকদিন পুকুরে সাঁতারানোর সময় মনে হয়, কে যেন তার পা জড়িয়ে নিচের দিকে টানছে। শেষে গ্রামের লোকজন মিলে দেখে, একটা লাশ মেয়েটার পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা নাকি ওনার মধ্যে চলে এসেছে।"

পিউর বিস্ময়ভাব মায়িশা লক্ষ্য করে বলল, "তুই শুনিসনি এই ঘটনা? পুরো মিডিয়া তোলপাড় হয়ে গেল!"

পিউর বিস্মিত ভাবটা যেন আরও বেড়ে গেল। নিজেকে সামলে বলল, "আচ্ছা মায়িশা, তোর কী হয়েছে, বল তো?"

"আমার আবার কী হবে?"

"একটা উপন্যাসের হুবহু বর্ণনা দিয়ে বলছিস, এটা বাস্তবে ঘটেছে। এসবের মানে কী?"

মায়িশা বলল, "উপন্যাস মানে? এই তো কিছুদিন আগে নিউজে দেখলাম। তুই রিকশাওয়ালা মামাকে জিজ্ঞেস কর। উনিও সম্ভবত নিউজটা দেখেছে।"

রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে হলো না। সে নিজেই ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, "হ, আফা। হ্যায় বলে ভূত দ্যাহে। আমগো—"

রিকশাওয়ালা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখন মায়িশা থামিয়ে বলল, "দেখলি, মামাও জানে। কী ইঞ্জিনিয়ার আপা, কোনো খোঁজখবরই রাখেন না দেখছি। পড়াশোনার চাপে ভুলভাল বকছিস। কোনদিন বলবি, 'মায়িশা' নামে আমার তো কোনো বন্ধু নেই। সে তো একটা উপন্যাসের চরিত্র।"

মায়িশা শব্দ করে হাসছে।

পিউয়ের মুখভঙ্গি তবু স্বাভাবিক হলো না। সে হঠাৎ রিকশা থামিয়ে নেমে পড়ল।

মায়িশা বলল, "কোথায় যাচ্ছিস?"

"তুইও যাবি। নেমে আয়।"

পিউ উত্তরের অপেক্ষা না করে হাঁটতে শুরু করল।

ভাড়া মিটিয়ে মায়িশা তাকে অনুসরণ করল।

পিউ একটা বইয়ের দোকানে গেল। অনেকক্ষণ তাকে খুঁজতে দেখে দোকানদার বলল, "কোন বই খুঁজতেছেন? নাম বলেন। ১৬ বছর ধইরা দোকান চালাই। সব বইয়ের নাম লেখকসহ মুখস্থ।"

পিউ কিছুটা ইতস্তত করে বলল, "মিসির আলী আছে?"

মায়িশা বলল, "এই তো মনে পড়েছে। হ্যাঁ, ওই অধ্যাপক ভদ্রলোকের নাম মিসির আলি। কিন্তু উনার নামে কোনো বই আছে বলে তো জানতাম না। এতক্ষণ তার মানে আমার সঙ্গে মজা করছিলি? এই তো বলছিলি চিনতে পারছিস না। গল্প-উপন্যাস কত কী বললি!"

পিউ কিছুক্ষণ উদ্ভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইল মায়িশার দিকে।

মধ্যবয়স্ক বইয়ের দোকানদার বলল, "মিসির আলীর বইয়ের কথা তো আমিও শুনি নাই। লেখক কে, আপা?"

পিউ বিড়বিড় করে বলল, "আপনার দোকানে এই লেখকের কোনো বই নেই। আমি যা সন্দেহ করছি, তা সত্যি হলে থাকার কথাও না।"

তারপর মায়িশার দিকে তাকিয়ে বলল, "আচ্ছা মায়িশা, তোকে কিছু প্রশ্ন করব। ঠিক উত্তর দিবি। আজকে সকালে বাড়ির নিচে কে এসেছিল?"

"তিতলী-কঙ্কাদের বাড়ির কেয়ারটেকার।"

"ওনার নাম কী, তুই জানিস?"

মায়িশা বলল, "খুব সম্ভবত মতি মিয়া।"

পিউয়ের গলা উত্তেজনায় কাঁপছে। সে বলল, "আচ্ছা, এবার বল তো, তুই সত্যিই বুঝতে পারছিস না, কার লেখার ধাঁচে তুই তোর গল্পটা লিখেছিস?"

মায়িশা হতাশ গলায় বলল, "না।"

পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, "মায়িশা, আমার মনে হচ্ছে আমরা অন্য একটা ইউনিভার্সে ঢুকে পড়েছি, যেখানে ফিকশন আর রিয়েলিটিকে ওভারল্যাপ করেছে। এটা ছাড়া এসব ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।"

একটু থেমে আবার বলল, "এটা কোনো বাস্তব জগত না। কল্পনার জগত। আর যার কল্পনার জগতে আমরা ঢুকে পড়েছি, সেখানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ তার কাল্পনিক চরিত্রগুলো আমাদের ঘিরে আছে।"

কথা শেষ করে পিউ হঠাৎ লক্ষ্য করল, তার সামনে মায়িশা নেই। মেইন রোড থেকে অনেক শব্দ আসছে। কোনো গোলমাল বেঁধেছে। মায়িশা কি তাহলে ওদিকটায় গেছে?

পিউ রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। হলুদ পাঞ্জাবি পরা একটা লোক দু-হাত উঁচু করে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে চিৎকার করে বলছে, "ট্রাফিক বন্ধ, ট্রাফিক বন্ধ। চাক্কা ঘুরবে না।"

পিউর কেমন যেন অস্থির লাগছে। সে ফুটপাতে বসে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

পিউ চোখ খুলে দেখল, তার সামনে মায়িশা বসে আছে। মিটিমিটি হাসছে। ওই লোকটার কণ্ঠস্বর এখনো ভেসে আসছে। যেন তার কানের কাছে ফিসফিস করে কথাগুলো বলছে। পিউ শুনল, "ট্রাফিক বন্ধ, ট্রাফিক বন্ধ। চাক্কা ঘুরবে না... গল্পকথক চ্যানেলে আপনারা শুনছিলেন 'একজন হিমু ও কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা'।"

মায়িশা বলল, "যাক, ঘুম তাহলে ভাঙল মহারানীর। আধঘণ্টা ধরে তোর বাসায় এসে বসে আছি। আন্টি বলল, ভোরে উঠে আবার নাকি ঘুমাতে গিয়েছিস। আমিও ভাবলাম, দেখি কতক্ষণ ঘুমাতে পারিস। যাই হোক, এবার ফোনটা চার্জে দে তাড়াতাড়ি। প্লেলিস্টে যা যা আছে, মনে হয় সবই বেজেছে।"

পিউকে দেখে মনে হচ্ছে, মায়িশার কোনো কথাই সে বুঝতে পারছে না। সে বলল, "মিসির আলী কে?"

মায়িশা বলল, "হঠাৎ এই কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?"

"না, এমনি। তুই আছিস তো আজকে? চল কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি। তোর সঙ্গে কতদিন কোথাও যাওয়া হয় না।"

মায়িশা বলল, "নারে। অনেকটা সময় ছিলাম। তোর ওঠার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। রাগ করিস না, দোস্ত।"

পিউর ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল। সব ঠিকঠাকই আছে, তাহলে।

মায়িশা বলল, "আচ্ছা, যাই রে। আন্টি একটু বাইরে গেছে। দরজাটা লাগিয়ে দে। ও, ভালো কথা, একটা লোক এসেছিল আন্টির খোঁজে। আন্টিকে বলিস তো।"

পিউ খানিক অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কে?"

মায়িশা বলল, "মতি মিয়া।"

( হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে)

==================== 
নাম: আদীবা আবসারী 
ঠিকানা: নতুন আইলপাড়া, পাঠানটুলী, নারায়ণগঞ্জ ।
মোবাইল: ০১৫৩১৭৫৬৬৯২

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.