নীল সাগরের তীরে, নীলাচল পর্বতের কোলে, এক অনন্ত রহস্যের সূচনা। সেই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু শ্রীজগন্নাথ—যিনি কেবল এক দেবতা নন, তিনি সকল মানুষের আপনজন। তাঁর আখ্যান যুগে যুগে ভক্তির আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।প্রাচীন কালে মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শুনতে পেলেন এক অলৌকিক দেবমূর্তির কথা, যার নাম নীলমাধব। শোনা যায়, অরণ্যের গভীরে শবররাজ বিশ্ববাসু গোপনে সেই দেবতার পূজা করতেন। রাজা নীলমাধবের দর্শনের জন্য তাঁর পুরোহিত বিদ্যাপতিকে পাঠালেন।বিদ্যাপতি বহু কষ্টে শবররাজের আশ্রয় পেলেন। বিশ্ববাসু প্রথমে দেবতার অবস্থান জানাতে রাজি হলেন না। পরে নানা অনুরোধে তিনি বিদ্যাপতির চোখ বেঁধে নীলমাধবের কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু বিদ্যাপতি বুদ্ধি করে পথে সরিষার দানা ছড়িয়ে দিলেন। কয়েক দিন পর সেই দানা থেকে গাছ গজিয়ে পথের চিহ্ন ফুটে উঠল।রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিশাল বাহিনী নিয়ে সেই স্থানে পৌঁছালেন। কিন্তু ততক্ষণে নীলমাধব অন্তর্ধান করেছেন। রাজা গভীর শোকে নিমগ্ন হলেন। তখন আকাশবাণী শোনা গেল—সমুদ্র থেকে এক দিব্য দারু (পবিত্র কাঠ) ভেসে আসবে। সেই দারু দিয়ে আমার নতুন রূপ নির্মিত হবে।কিছুদিন পর সত্যিই সমুদ্রতীরে এক অলৌকিক কাঠের গুঁড়ি ভেসে এল। বহু মানুষ চেষ্টা করেও সেটি নড়াতে পারল না। শেষে রাজা, বিশ্ববাসু এবং বিদ্যাপতি একসঙ্গে ভক্তিভরে প্রার্থনা করলে দারুটি সহজেই স্থানান্তরিত হলো।এরপর এক বৃদ্ধ শিল্পী রাজদরবারে এসে বললেন, আমি এই মূর্তি নির্মাণ করব। তবে একুশ দিন পর্যন্ত কেউ দরজা খুলবে না। রাজা শর্ত মেনে নিলেন। বহু দিন কোনো শব্দ না পেয়ে রানি উৎকণ্ঠিত হয়ে দরজা খুলে ফেললেন। দেখা গেল বৃদ্ধ শিল্পী অদৃশ্য, আর তিনটি মূর্তি—জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা—অসম্পূর্ণ অবস্থায় বিরাজমান। তাঁদের হাত-পা পূর্ণরূপে গঠিত নয়, কিন্তু মুখমণ্ডলে অপার করুণা ও আনন্দের দীপ্তি।রাজা দুঃখিত হলে আবার দৈববাণী শোনা গেল—এই রূপেই আমি যুগে যুগে পূজিত হতে চাই। আমার কাছে রূপের পূর্ণতা নয়, ভক্তির পূর্ণতাই প্রধান।সেই থেকে নীলাচলে প্রতিষ্ঠিত হল শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার পূজা। প্রতিবছর রথযাত্রার দিনে তিন দেবতা বিশাল রথে আরোহণ করে নগর পরিক্রমা করেন। রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ রথের দড়ি টানেন। এই উৎসব মানবসমাজে সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও ভক্তির এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।শ্রীজগন্নাথের আখ্যান আমাদের শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর কোনো সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি বনবাসী শবরের কাছেও যেমন আপন, তেমনি রাজপ্রাসাদের অধিপতির কাছেও। তাঁর অসম্পূর্ণ মূর্তি যেন মানুষের অসম্পূর্ণ জীবনকেই আশ্রয় দেয়, আর তাঁর অবারিত হাসি জানিয়ে দেয়—সত্যিকারের ভক্তির কাছে সব ভেদরেখা বিলীন হয়ে যায়।এইভাবেই যুগে যুগে শ্রীজগন্নাথের মহিমা, করুণা ও সর্বজনীন প্রেমের আখ্যান মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
—---------------
মনিকা চট্টোপাধ্যায় মোবাইল
সালকিয়া, হাওড়া - ৬