থ্রিলার গল্প ।। দরিয়ার বাতিঘর ।। মামুন সরকার



 

দরিয়ার বাতিঘর

মামুন সরকার

 

 সমুদ্রের ধারে ছোট্ট জনপদ।  দিনের বেলায় জায়গাটা শান্ত। জেলেদের নৌকা, সাদা বক, আর দূরের নীল ঢেউ দেখে মনে হয় যেন ছবির কোনো গ্রাম। কিন্তু রাত নামলে পুরো জায়গাটা বদলে যায়। বিশেষ করে ঝড়ের রাতে।
কারণ সমুদ্রের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে এক পুরোনো বাতিঘর।

বহু বছর আগে সেখানে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ঝড়ের রাতে বাতিঘরের আলো নিভে যাওয়ায় একটি জাহাজ পাথরে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। তারপর থেকেই বাতিঘর বন্ধ। তবু গ্রামের লোকেরা বলে, ঝড় উঠলে আজও সেখানে আলো জ্বলে।

আর ভেতর থেকে শোনা যায় ভারী বুটের শব্দ।
পনেরো বছরের তাহমিদ এসব গল্প শুনে মজা পেত।
তার বন্ধু রাফি আর, সঙ্গে ছিল মেয়ে বন্ধু মেহরীন। ওরা অজানাকে জানতে সবসময় কৌতূহলী আর সাহসী।
সেদিন বিকেলে তারা তিনজন সমুদ্রের ধারে ছবি তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল। দূরে বিদ্যুৎ চমকালো। মেহরীন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ঝড় আসছে।

সমুদ্র তখন ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ঢেউগুলো যেন অন্ধকার পাহাড়ের মতো ফুলে উঠছে। হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস শুরু হলো। রাফি চিৎকার করে বলল, ওই বাতিঘরে চল। নইলে ভিজে শেষ হয়ে যাব।

তিনজন দৌড়ে বাতিঘরের দিকে গেল। বাতিঘরের বিশাল লোহার দরজাটা আধখোলা ছিল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তাদের গায়ে ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে বাতাস লাগল। ভেতরটা অন্ধকার। দেয়ালে শ্যাওলা। বাতাসে পুরোনো লবণ আর মরিচা ধরা লোহার গন্ধ। বাইরে তখন ঝড় পুরোপুরি শুরু হয়েছে।

বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল।
তাহমিদ টর্চ জ্বালাল। সামনের গোল সিঁড়িটা ওপরে উঠে গেছে। যেন অন্ধকারের পেটের ভেতর ঢুকে গেছে। ঠিক তখনই, ঠক--ঠক--ঠক--

উপরে থেকে ভারী বুটের শব্দ ভেসে এলো। তিনজন একসঙ্গে জমে গেল। রাফির গলা শুকিয়ে গেল।
কে--কে ওখানে?
কোনো উত্তর নেই। শুধু ঝড়ের হাহাকার আর বাতাসের সোঁ--সোঁ -- শব্দ।

তারপর আবার ঠক--ঠক--ঠক--

মেহরীন ফিসফিস করে বলল, এখানে কেউ আছে।

তাহমিদ ধীরে বলল, চলো ওপরে দেখি।

রাফি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল, তোরা পাগল?
কিন্তু ততক্ষণে তাহমিদ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। সিঁড়িগুলো ভিজে আর পিচ্ছিল। বাতাসে কাঁপছে পুরো বাতিঘর। উপরে উঠতে উঠতে তারা দেখতে পেল দেয়ালে পুরোনো কিছু ছবি ঝুলছে। সমুদ্রের ছবি। জাহাজের ছবি। আর এক জায়গায় একটা বিবর্ণ ছবি। একজন বৃদ্ধ বাতিঘর প্রহরী।
তার চোখদুটো অদ্ভুত গম্ভীর। ছবির নিচে লেখা,
ক্যাপ্টেন ইলিয়াস রহমান, শেষ প্রহরী।

ঠিক তখনই ওপরে কোথাও দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।“ধাম!”

তিনজন চমকে উঠল। তাহমিদ টর্চ তুলে সামনে ধরল। বাতিঘরের চূড়ার ঘর। দরজাটা একটু ফাঁক।
ভেতর থেকে ক্ষীণ আলো বের হচ্ছে। মেহরীন কাঁপা গলায় বলল, ওই আলোটা--

তাহমিদ ধীরে দরজাটা ঠেলে খুলল। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই তারা হতবাক। বাতিঘরের বিশাল আলোটা জ্বলছে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দুজন অপরিচিত লোক। টেবিলের ওপর মানচিত্র। রেডিও সেট। দূরবীন। একজন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল, কে তোরা?

তাহমিদ প্রথমে ভেবেছিল এরা হয়তো কোনো সাধারণ মানুষ। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। এরা মানুষ না। তাদের মুখ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির যেন জীবন্ত নয়, বরং কোনো পুরোনো স্মৃতির ছায়া। তাদের শরীরের ভেতর দিয়ে বাতিঘরের আলো মৃদু ভেসে যাচ্ছে।

হঠাৎ আরেকজন লোক রেডিওর মতো যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, জাহাজটা কাছে চলে এসেছে,  আলো নিভতে দেওয়া যাবে না।

তার গলার স্বরটা যেন দূর সমুদ্রের তলদেশ থেকে ভেসে আসছে। তাহমিদের বুক ধকধক করতে লাগল। মেহরীন ধীরে বলল, ওরা, আমাদের দেখছে না তো?

ঠিক তখনই বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল দূরে কয়েকটা ক্ষীণ আলো ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে। কিন্তু আলোগুলো অদ্ভুত। একই জায়গায় ঘুরছে। যেন এগোচ্ছে না, শুধু আটকে আছে। রাফি ফিসফিস করে বলল, ওগুলো কি ডুবে যাওয়া জাহাজ?
হঠাৎ সেই দুজন একসঙ্গে তাদের দিকে তাকাল।
এইবার স্পষ্ট। চোখ দুটো ফাঁকা কিন্তু গভীর। একজন ধীরে বলল, নতুন কেউ এসেছে মনে হচ্ছে।

আরেকজন বলল, ওদেরও পথ দেখাতে হবে।

তাদের কণ্ঠে কোনো রাগ নেই। কিন্তু অদ্ভুত এক শীতলতা। তাহমিদ চিৎকার করল, দৌড়াও--

সে দ্রুত একটা লণ্ঠন ছুড়ে মারল। ঝনাৎ শব্দে
ঘরের আলো কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য ছায়াগুলো বিকৃত হয়ে গেল। চারদিকে অন্ধকার।
মেহরীন চিৎকার করল, দৌড়াও--

তিনজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। পেছনে এবার আর মানুষের দৌড়ানোর শব্দ নেই। বরং শোনা যাচ্ছে—ঠক-- ঠক-- ঠক--

ধীর, ভারী বুটের শব্দ। যেন কেউ সময় মেপে হাঁটছে।
বাতিঘর কাঁপছে। বাইরে বজ্রপাত। জানালার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে। হঠাৎ—মড়াৎ শব্দে পুরোনো একটা ধাপ ভেঙে গেল। রাফি পিছলে নিচে পড়ে যেতে লাগল। মেহরীন তার হাত ধরে ফেলল শেষ মুহূর্তে। নিচে তাকাতেই রাফি দেখল, অন্ধকার নয়, বরং ঘূর্ণায়মান সাদা কুয়াশা। যেন নিচে মাটি নেই। শুধু শূন্যতা।
তাহমিদ আর মেহরীন মিলে তাকে টেনে তুলল। ঠিক তখনই বাতিঘরের বিশাল আলোটা নিজে নিজে ঘুরে সমুদ্রের দিকে পড়ল। ঘরজুড়ে সাদা আলো ছড়িয়ে গেল। সবাই থেমে গেল। কারণ আলোটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছায়ামূর্তি।
বৃদ্ধ একজন মানুষ। লম্বা কোট। মাথায় পুরোনো ক্যাপ। তার চোখ যেন সমুদ্রের মতো গভীর। মেহরীন ফিসফিস করে বলল, ওই ছবির লোকটা। 

লোকটা ধীরে বাতিঘরের আলোয় হাত রাখল।
তারপর সমুদ্রের দিকে তাকাল। দূরের আলোগুলো একে একে নিভে যেতে লাগল। যেন ডুবে যাওয়া জাহাজগুলো অবশেষে শান্তি পাচ্ছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুটো ছায়ামানুষ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। একজনের কণ্ঠ ভেসে এলো,
এবার আমরা যেতে পারি--

পরের মুহূর্তে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো। আলো নিভে গেল। আবার আলো ফিরতেই ঘর ফাঁকা। কেউ নেই।

পরদিন কোস্টগার্ড এল। তারা কিছুই খুঁজে পেল না।না কোনো লোক, না কোনো যন্ত্র। সবাই বলল, হয়তো ঝড়ের রাতে চোখ ভুল দেখেছে।

কিন্তু বাড়ি ফেরার আগে মেহরীন আবার সেই পুরোনো ছবিটার সামনে দাঁড়াল। ছবির কাঁচে তখনো বৃষ্টির ফোঁটা। সে হঠাৎ থমকে গেল। কারণ ছবির নিচে নতুন করে ভেজা লবণপানির দাগ।
আর ছবির বৃদ্ধ প্রহরীর মুখে, এইবার স্পষ্ট—একটা শান্ত, তৃপ্তির হাসি।

কারণ ছবির নিচে নতুন করে ভেজা লবণপানির দাগ। আর ছবির বৃদ্ধ প্রহরীর মুখে, এইবার স্পষ্ট—
একটা শান্ত, তৃপ্তির হাসি।

মেহরীনের বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি উঠল।
সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে এল, তাহলে--উনি সত্যিই ছিলেন?

তার গলায় ভয় আর বিস্ময় একসঙ্গে মিশে গেছে।
রাফি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার চোখ ছবির ওপর স্থির। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
মানে,  আমরা যেটা দেখেছি, সেটা--সত্যি?

তাহমিদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে অদ্ভুত এক অনুভূতি—ভয়, সম্মান, আর অজানা কিছুর প্রতি নীরব শ্রদ্ধা। সে ধীরে বলল, হয়তো উনি এখনো পাহারা দিচ্ছেন। শুধু আমাদের মতো সবাই দেখতে পায় না।

হঠাৎ বাইরে সমুদ্রের দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল। তিনজন একসঙ্গে ফিরে তাকাল। বাতিঘরের মাথার আলোটা তখন নিভে গেছে। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

তারপরই সব আবার স্বাভাবিক। মেহরীন নিচু গলায় বলল, চল্ এখান থেকে যাই। আর থাকা ঠিক হবে না।

কিন্তু তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল, তখনও তাদের মনে হচ্ছিল, কেউ একজন নীরবে তাকিয়ে আছে।
রাগ নিয়ে নয়, বরং এক ধরনের নিশ্চিন্ত পাহারার দৃষ্টি নিয়ে।

****
প্রয়োজনে
হলি হোমস সাগর সৈকত 
অভিযান#১৫ ফ্ল্যাট নং এ /৭
টঙ্গী কলেজ গেট, গাজীপুর। 
বাংলাদেশ। 
মোবাইল +What's app
01718060277

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.