ছবিঋণ- ইন্টারনেট
বর্ষা মঙ্গল
উৎপল সরকার
সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচে ঝরে পড়া টুপটাপ শব্দ তুলে ছোট ছোট জলবিন্দুগুলো যেন একের পর এক গল্প লিখে চলেছিল।স্মিতা চুপচাপ বসে ছিল নিজের ছোট্ট ঘরে। সামনে খোলা ডায়েরি, অথচ একটি শব্দও লিখতে পারছিল না।
হঠাৎ মোবাইলে একটি মেসেজ এল।
—“আজও কি বৃষ্টিকে এত ভালোবাসো?”
নম্বরটি অচেনা নয়। পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ—অর্ক।
কলেজ জীবনের বন্ধু, তারপর প্রেম। কিন্তু কিছু ভুল বোঝাবুঝি আর দূরত্ব তাদের আলাদা করে দিয়েছিল। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি, তবু সম্পর্কটা শেষ হতে হতেও অর্ধ সমাপ্ত রয়ে গিয়েছিল।
স্মিতা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল,
—“ভালোবাসি। তবে আগের মতো আর ভিজি না।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর এল।
— “আমি এখনও ভিজি। কারণ বৃষ্টি ভেজা কিছু স্মৃতি এখনও শুকোতে দিতে চাই না।”
সেদিনের পর থেকে কথাবার্তা শুরু হলো আবার। প্রথমে প্রথমে দ্বিধা ছিল, পরে ধীরে ধীরে জমে উঠল হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প। অর্ক জানাল, চাকরির জন্য দূরে চলে গেলেও কখনও স্মিতাকে ভুলতে পারেনি। স্মিতা স্বীকার করল, নতুন করে কাউকে জীবনে আনতে পারেনি।
একদিন অর্ক বলল,
—“আগামী শনিবার দেখা করবে?”
স্মিতা অনেক ভেবেচিন্তে রাজি হলো।
সেদিন শনিবার সেদিনও বৃষ্টি ছিল। শহরের এক ছোট্ট ক্যাফেতে তাদের দেখা হলো। পাঁচ বছরে দুজনেরই চেহারায় বদল এসেছে, কিন্তু চোখের ভেতরের পরিচিত ভালোবাসার আলোটা একই রয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতে সময় কেটে গেল। পুরোনো অভিমানগুলো যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেল ধীরে ধীরে।
হঠাৎ অর্ক ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।
—“এটা তোমার জন্য লিখেছিলাম। কিন্তু কখনও পাঠাতে পারিনি।”
চিঠিটা খুলে স্মিতা দেখল,শেষ লাইনে লেখা—
"যদি কোনোদিন ফিরে আসতে ইচ্ছে করে, আমি অপেক্ষা করব।"
চোখের কোণে আচমকা একবুক দলাপাকানো বেদনাময় উথলে ওঠা জল জমে উঠল তার।
— “এত বছর অপেক্ষা করলে?”
অর্ক মৃদু হেসে বলল,
—“সবাই তো জীবনে একবারই সত্যিকারের ভালোবাসে।”
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছে। স্মিতা জানালার ওপারে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল।অর্ক আলতো ছোঁয়ায় স্মিতার হাতটা ধরল।
সেই মুহূর্তে মনে হলো, হারিয়ে যাওয়া পাঁচ বছর যেন এক নিমেষে মুছে গেছে।
এক বছর পর, ঠিক এমনই এক বর্ষার দিনে, তাদের বিয়ে হলো। সেদিনও বৃষ্টি ছিল।বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল দুজন।
স্মিতা হেসে বলল,
— “জানো, বৃষ্টি না হলে হয়তো আমাদের গল্পটা আর শুরুই হতো না।”
অর্ক উত্তর দিল,
— “হয়তো। কিন্তু শেষটা এমন সুন্দর হবে, সেটা আমিও ভাবিনি।”
আকাশ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টিধারার মধ্যে দাঁড়িয়ে স্মিতার মনে হলো, জীবনের সব অপেক্ষা, সব অভিমান আজ ধুয়ে মুছে গেছে। দূরে কোথাও যেন ভেসে আসছিল রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা পঙ্ক্তি—
“আজ বারি ঝরে ঝরঝর ভরা বাদরে,
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা কোথাও না ধরে॥”
আর সেই আকুল বর্ষণের মাঝেই অর্কের হাত ধরে স্মিতা বুঝতে পারল, কিছু ভালোবাসা আর প্রেমের গল্প শেষ হয় না—বরং বৃষ্টিভেজা কোনো বিকেলে নতুন করে শুরু হয়।
উৎপল সরকার, নিউ টাউন আলিপুরদুয়ার।

