ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস ।। মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে (পর্ব -১)।। সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 

 

 
 ছবিঋণ - ইন্টারনেট 

মৎস্যকন্যা ও জোনাক মেয়ে

সপ্তদ্বীপা অধিকারী 


প্রথম পরিচ্ছেদ 
 

"মন বসে না ঘরেতে তার
দুষ্টু জোনাক মেয়ে
বন-বাদাড়ে ঘোরে দ্যাখে
এদিক-ওদিক চেয়ে!
গাছের মাথায় উঠে পড়ে
গুনগুনে গান গেয়ে!
বকলে পরে আঁধার মুখে
থাকে শুধু চেয়ে!"

সে অনেককাল আগের কথা। তখন জোনাকির পাখায় আলো জ্বলত না। তারা তখন বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো।
 একটি মা জোনাকির আর একটি বাবা জোনাকির একটা ছোট্ট মেয়ে হয়েছিল। মা জোনাকি আর বাবা জোনাকি মেয়েকে বড্ড ভালোবেসে তার নাম রেখেছিল জো। জো ভীষণ চঞ্চল। সবসময় পাখা মেলে এদিক-ওদিক টো টো করে বেড়াত।
সারাটাদিন কেটে যেত মহারানি বাড়ি ফিরত না। বাবা -মা খুব চিন্তা করত। জোএর জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করত। সন্ধে উতরে গেলে তিনি ফুরফুর করে উড়তে উড়তে ফিরতেন! আবার কী খুশি হয়ে তিনি তখন গানও গাইতেন। বাবা যদি বকত ওমনি সে বলে উঠত: 
 
"জানো না মা নদীর ধারে
মিঠে হাওয়া বয়!
ওরাই আমায় জোরটি করে
রেখেছে নিশ্চয়।"
কখনো বলতো :
"তালগাছের ওই মগডালেতে
একটা ভূতের ছা!
বললে আমায় নাচ দেখাবে
আঁধার হলে গাঁ!
দুজন মিলে নেচে গেয়ে
বললে--' এবার যা!
আঁধার হলো অনেকখানি!'
বন্ধু ভূতের ছা!" 
 
জোএর মা বকত। বাবা বকত। কিন্তু মেয়েকে কিছুতেই বাগে আনা যায় না!
মেয়ে হাসতে হাসতে বলত:
" ভালোবাসি গাছগাছালি
ঘুরি নিরন্তর!
তাইতে মাগো ফিরতে দেরি
হয় যে আপন ঘর!"

এদিকে হয়েছে কি একদিন রাত্রে জো ফিরলই না। চিন্তায় চিন্তায় মা আর বাবার সারাটা রাত জেগে কাটল। 
"এমন আঁধার রাতে তাহার
নির্ঘুমে রাত কাটে।
মেয়ে তো তার এলো না হায়
সূর্য গেল পাটে!
কোথায় মেয়ে কোথায় মেয়ে
হাটে-মাঠে-বাটে!
ঘুম আসে না মা ও বাবার
নির্ঘুমে রাত কাটে!"
জোএর বাবা বেরিয়ে পড়ল। সারাটা জঙ্গল ঘুরে ঘুরে বেড়াল। ডেকে ডেকে ক্লান্ত হলো মা। কিন্তু মেয়ের কোনো পাত্তাই নেই!
"গাছের মাথাও খাঁ খাঁ করে
জো বসে নেই ঘাসে!
কোথায় গেলে মেয়ে পাবে
ভাবে দীর্ঘশ্বাসে!
মেয়ের কথা ভেবে ভেবে
মায়ের নয়ন ভাসে!
বাবার হৃদয় কেঁপে ওঠে
ভয়ে আর সন্ত্রাসে!"
দু:স্বপ্নের রাতও এক সময় শেষ হলো! পরদিন সকালে জো এসে হাজির। মা অনেক বকল। বাবাও।
তখন জো বলল:
"দুপেয়ে জীব মানুষগুলো
বড্ড বাজে লোক!
সুন্দরী এক মাছকে বেঁধে
বলছে-" মরণ হোক!"
মাছটি কাঁদে হুহু করে
হচ্ছে দেখে শোক!
মানুষগুলি বড্ড বাজে
নেইকো লাজের চোখ!"
মা-বাবা তার কথার তেমন একটা গুরুত্ব দিল না! ভাবল মনে মনে মেয়ে এমন আজেবাজে কথা তো সবসময়েই বলে। কিন্তু এবারে জোর যেন সত্যিই কিছু হয়েছে। সে খেতে পারছে না। খালি কাঁদছে। মা-বাবা তখন বললে:
" আর কেঁদো না লক্ষ্মী মেয়ে
কান্না থামাও সোনা
তোমার অশ্রু বাড়ায় জ্বালা
সইতে পারিবো না।
জোয়ের মনে দারুণ অসুখ
দারুণ সে যন্ত্রণা!
চোখ থেকে তার ঝরেই চলে
অশ্রু নোনা নোনা।"

তারপর জোনাক মা আর জোনাক বাবা জোকে কোলে তুলে নিল। অশ্রু মুছে দিল। তারপর জোয়ের মুখে চুমু খেয়ে বলল--"বলো মা, তুমি কী চাও!"
জো বলল--"বদ আর দুষ্টু মানুষগুলোর হাত থেকে আমার বন্ধুকে বাঁচাও।"

জোনাক মা আর জোনাক বাবা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তারা ছোট্ট ছোট্ট দুটো প্রাণী! তারা ও-ই হিংস্র দুপেয়ে জীব মানুষদের সাথে কেমন করে যুদ্ধ করবে? এওকি সম্ভব?
কিন্তু জোএর কানে কোনো কথাই প্রবেশ করছে না। 
অনন্যোপায় জোনাক বাবা আর জোনাক মা তখন চলল জোকে নিয়ে অকুস্থলে।
জঙ্গলের অন্য প্রান্তে বিশাল সাগর।  সাগরের প্রান্তে গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ভিতর  অনেকগুলো বড়ো বড়ো গাছ জড়াজড়ি করে রয়েছে। সেইখানেই একটা গাছের গোড়ায় দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা রয়েছে একটি অপূর্ব সুন্দর মেয়ে। তার পিঠ ভর্তি কুচকুচে কালো চুল। গভীর কালো দুটো চোখ।। মিষ্টি মুখখানা যন্ত্রণায় কাহিল। সুন্দরী মেয়ের কোমর থেকে পা পর্যন্ত মাছের মতো। জোনাক মা বলল: 
 
"এতো দেখি মৎস্যকন্যা
আরে আরে একি?
এমন করে কে বেধেছে?
যন্ত্রণা পায় দেখি!" 
 
জো তখন বলল--"কাল সন্ধেবেলায় ও-ই সাগরের জলে এই মৎস্যকন্যা খেলা করছিল। তখন একদল মানুষ জাল ফেলে একে বন্দি করেছে। তারপর টানতে টানতে এখানে এনে বেঁধে রেখেছে, মা!"
জোনাক মায়ের বুকটা যেন টনটন করে উঠল কথা শুনে।
সে ওমনি বলল:
"কার সে বুকের ধন গো মেয়ে
কোন্ সে বাবার প্রাণ!
তোমায় ছাড়া দিন যে তাদের
চোখের জলের বান!
মানুষ বড়ই হিংসা পোষে
মুখে প্রেমের ভান!
এদের হাতে পড়লে মেয়ে
নাইকো পরিত্রাণ!" 
 
বলতে বলতেই ওখানে একদল মানুষ এলো। মৎস্যকন্যাকে ওরা নানারকমভাবে যন্ত্রণা দিতে লাগল। তার শরীর থেকে  আঁশ ছাড়িয়ে নিল কয়েকটা! গলগল করে রক্ত বার হতে লাগল। এরপর সেই কাচা চামড়ায় ইঞ্জেকশান দিল। এমনকি মৎস্যকন্যার মুখ খুলে দাঁতও তুলে নিল নিষ্ঠুর মানুষেরা!

 মৎস্যকন্যার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে বাধা দেবার চেষ্টা করেছে। তাতে মানুষগুলো রেগে গিয়ে মৎস্যকন্যার কুচকুচে চুলের গোছা মুঠোয় ধরে জোরে জোরে টানতে লাগল। মৎস্যকন্যা হাহাকার করে কেঁদে ফেলল। তাই দেখে একজন মানুষ চিৎকার করে বলল--"এই ওর মুখটা বেধে ফেল। ভাল্লাগছে না চিৎকার!"
জোনাক মা বলল--"ওরা এই মৎসকন্যাকে নিয়ে কী করতে চাইছে?"

ঠিক তক্ষুনি একজন মানুষ বললে--"জলের প্রায় সমস্ত জীবই আমরা খাই। শুধু জলের কেন? পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীদেরই আমরা খেয়ে থাকি! হা হা হা!"
অন্য একজন মানুষ বললে--"যাই বলো, এই জলের প্রাণীদের স্বাদ কিন্তু সবচেয়ে ভালো।"
অন্য একজন বলল--"আমি তো সেই কথাই বলছি। এই মৎস্যকন্যাও দারুণ স্বাদু হবে। এটাকেও কেটে খেয়ে ফেলি পিঁয়াজ-রসুন দিয়ে কষিয়ে রান্না করে!"
একজন বলল--"দারুণ চর্বি কিন্তু এর গায়ে! হেব্বি লাগবে খেতে!"
প্রথমজন বলল--"চুপ কর সব বোকার দল! একটা মৎস্যকন্যা খেয়ে লাভ কী? আমারা আগে প্রচুর পাখি শিকার করে খেতাম। পাখি খাবার জন্য তাদের পরিমাণ এখন এতোটাই কমে গেছে যে, এখন আর পাখি শিকার করতে পারি না। তোরা তোদের দাদুদের জিজ্ঞাসা করে দেখিস, আমরা আগে হরিণের মাংসও খেতাম। সত্যি বলতে আমরা এই মানুষেরাই রাক্ষস!"
বলে নিজের রসিকতায় লোকটা নিজেই হা হা হা করে খুব খানিকটা হাসল।
তারপর বলল--"এই মৎস্যকন্যাকে আমরা পুষব। যেমন হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পুষি,ঠিক তেমন করে। এর অনেক বাচ্চা হবে। তখন একে ঘচাং করে কেটে খেয়ে ফেলব! যেভাবে হাঁস-মুরগি খাই, সেইভাবে!"
এইবার জোনাক মা বলল--"কী সাঙ্ঘাতিক হিংস্র মানুষরে এরা! ছিহ!"
জো ততক্ষনে আবার কাঁদতে আরম্ভ করেছে।
"মানুষেরা বড্ড বাজে
হিংসা ভরা মনে।
সকল পশুই খাদ্য তাদের
আকাশ-জল বা বনে!" 
 
চলবে-----   
 
-----------------------------------------
 
Uploaded Image
 
সপ্তদ্বীপা অধিকারী  
গ্রাম: মানিকতলা, 
ডাকঘর: দোগাছিয়া, 
উত্তর চব্বিশ পরগনা, 
সূচক:৭৪৩৭০২,
পশ্চিমবঙ্গ, 
ভারত, 
 
 
 
 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.