ধারাবাহিক উপন্যাস ।। মাধব ও মালতি ।। সমীরণ সরকার

মাধব ও মালতি 

         সমীরণ সরকার 


(পূর্বকথা:--মানবেন্দ্র নারায়ণ পান্থশালার তত্ত্বাবধায়ক জগন্নাথ পাত্রের সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে গেছিল। দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে উৎকণ্ঠায় জর্জরিত হচ্ছিল পুনি। গাছের নিচে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল চেতক। হঠাৎ পান্থশালার দিক থেকে উত্তেজিত কথাবার্তার আওয়াজ শুনে পুনি চুপি চুপি এগিয়ে গেছিল পান্থশালার দিকে। সেখানে গিয়ে দেখতে পেল, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে জনৈক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি আর কপাল চাপড়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে একজন স্ত্রীলোক। তার মায়ের দেওয়া গয়না সব ডাকাতে নিয়ে গেছে বলে‌ স্ত্রীলোকটিয হাহুতাশ করছে। 
মানবেন্দ্র নারায়ণ কে লাঠি হাতে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন হিংস্রদর্শন ব্যক্তি।
পুনি সহজেই বুঝতে পারল, এরাই ডাকাত। এরাই স্ত্রী লোকটির গহনা অপহরণ করেছে। আর ওদের বাঁধা দিতে গিয়ে নিরস্ত্র কুমার মানবেন্দ্র বিপদে পড়েছে। মানবেন্দ্রের সাহায্য প্রয়োজন কিন্তু তার পক্ষে তো সাহায্য করা সম্ভব নয়। তাই সে চেতককে গাছতলা থেকে নিয়ে এসে এমন জায়গায় দাঁড় করালো যাতে চেতক তার প্রভুর বিপদ উপলব্ধি করতে পারে। 
পুনির কৌশল সফল হল। চেতক প্রায় ছুটে পৌঁছে গেল তার প্রভুর কাছে। মানবেন্দ্র নারায়ণ কাল বিলম্ব না করে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলো। চেতক এবার তার প্রভুকে পিঠে সুরক্ষিত রেখেই বিভিন্নভাবে আক্রমণ করতে শুরু করল ডাকাতদের। মানবেন্দ্র নারায়ণ তখন হাতে একটি অস্ত্র পাওয়ার জন্য চিৎকার করছিল। 
পুনি তাড়াতাড়ি গিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকা মধ্যবয়স্ক লোকটির বাঁধন খুলে দিল। তারপর তার নির্দেশ মতো ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটা বল্লম দেখিয়ে দিল পূর্ণিমা কে। 
ও সেটা নিয়ে ছুঁড়ে দিল মানবেন্দ্রের দিকে।
মানবেন্দ্র সেটা নিয়ে ডাকাতদের মোকাবিলা করতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে ডাকাতরা মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে লড়াইয়ে পরাজিত হচ্ছিল। বেগতিক বুঝে ডাকাতরা একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রাখা রণ পায়ে চেপে পালাতে শুরু করল। মানবেন্দ্র নারায়ণ ডাকাতদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,   ক্রন্দনরত  স্ত্রীলোকটির গহনা ফেরত দিতে। ওরা সে কথায় কর্ণপাত না করে পালানোর চেষ্টা করল।
মানবেন্দ্র নারায়ণ চেতকের পিঠে চেপে বল্লম হাতে ধাওয়া করলো ডাকাতদের। পূর্ণিমার কোন বারণ শুনল না সে।)

********************************************

মানবেন্দ্র নারায়ণ চোখের আড়াল হতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হল পূর্ণিমা। কুমার তো একা। চার চার জন হিংস্র ডাকাতের সঙ্গে একা কী করে লড়াই করবে সে? ডাকাতগুলো তো পালিয়ে যাচ্ছিল, ওদের তাড়া করার তো কোন দরকার ছিল না। 
তবে কী শুধুমাত্র ওই স্ত্রীলোকটির গহনা উদ্ধার করার জন্য কুমার ডাকাতদের পিছু নিল? সেটাই হবে। কুমার মানবেন্দ্র নারায়ণ খুব সাহসী এবং জেদী হলেও অন্যের দুঃখে খুব সহজে কাতর হয়ে যায়। বিশেষত সাহায্য প্রার্থী যদি স্ত্রীলোক হয় তাহলে তো কথাই নেই। তার জ্বলন্ত উদাহরণ তো সে নিজে। তা না হলে চৌধুরী বাড়ির সামান্য  রাঁধুনির মেয়ে হয়ে প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ এবং ধনী ব্যবসায়ী 
কনক নারায়ণ চৌধুরীর একমাত্র পুত্রের সঙ্গে সে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতো? আসলে সে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে আসায় এবং সেই ঘটনা মানবেন্দ্র নারায়ণ জানতে পারায় ব্যথিত হয়েছিল। তার মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় সে যখন তার মায়ের সঙ্গে চৌধুরী বাড়িতে আসতো, তখন বালক মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে সে খেলাধুলা করত। এই বিষয়টা য় প্রথমে তীব্র আপত্তি করেছিলেন বিধুমখী দেবী, কিন্তু মানবেন্দ্র নারায়ণের মা 
রত্নমালা দেবী তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি, পরোক্ষে বরঞ্চ তার ছেলের সব সময়ের খেলার সাথী হিসেবে পূর্ণিমা কে মেনেই নিয়েছিলেন। 
এরপর ১৩ বছর বয়সে রজোদর্শনের সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণিমার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন তার মা আশালতা দেবী ।কিন্তু মাত্র দু'বছর পরে ঠিক পনেরো বছরের মাথায় বিধবা হয়েছিল পূর্ণিমা। 
শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল। কিন্তু বিয়ের পরের দু বছরে তার শরীরে ও মনে অনেক পরিবর্তন এসেছিল। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছিল সে। তাছাড়া গত দু'বছরে স্বামী-সংসর্গ করায় তার দেহে বাঁধ ভাঙা যৌবন উপচে পড়ছিল।
ওদিকে পিতামহী বিধুমুখীর কথার দাম রাখতে গিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল  বিধুমুখীর বাল্য বয়সের সই চন্দ্রপ্রভার  পৌত্রী হৈমন্তীর সঙ্গে। 
কিন্তু হৈমন্তী এতটাই রোগা, পাতলা এবং অনভিজ্ঞ ছিল যে, স্ত্রীকে নিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ন একেবারেই সুখী ছিল না। ঠিক এই সময়েই তার নজরে এলো পঞ্চদশী পূর্ণিমা। ধীরে ধীরে দুজনের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে উঠলো। পূর্ণিমা বুঝেছিল যে, তার রূপ এবং বাঁধভাঙ্গা যৌবন আকৃষ্ট করেছে মানবেন্দ্র নারায়ণ কে।সে এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করল। বিভিন্নভাবে নিজের দুঃখ কষ্ট এবং অসহায়তা প্রকাশ করতে শুরু করলো মানবেন্দ্র নারায়ণের কাছে। মানবেন্দ্র পূর্ণিমাকে সাহায্য করতে গিয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল।
কাজেই এটা পূর্ণিমা খুব ভালো জানে যে, মেয়েদের দুঃখ কষ্ট বা কান্নাকাটি মানবেন্দ্র সহ্য করতে পারেনা।
তাই হয়তো ওই স্ত্রীলোকটিকে কান্নাকাটি করতে দেখে তার গহনা উদ্ধারের জন্য মানবেন্দ্র ডাকাতদের পিছু করল। কিন্তু গভীর জঙ্গলে অন্ধকারে সে কিভাবে ডাকাতদের মোকাবেলা করবে এটা ভেবে দুশ্চিন্তায় ভুগছিল পূর্ণিমা।
 যে মধ্যবয়সী লোকটির হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিয়েছিল পূর্ণিমা, সে এতক্ষণে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছিল। সে মানবেন্দ্র নারায়ন কে খুব ভালোভাবে চেনে কিন্তু পূর্ণিমা কে সে চেনে না। 
সে বুঝতে পারছিল না যে, কনকনারায়ণ চৌধুরীর ছেলে মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে এই যুবতীটির কী সম্পর্ক । আরেকটি বিষয় খুব অদ্ভুত লাগছিল তার, এত রাতে এরা এখানে এলো কেন? 
মানবেন্দ্র নারায়ণের ডাকাত দলকে তাড়া করার ব্যাপারে তার খুব একটা সায় ছিল না।তবু পুরো ব্যাপারটা মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়ায় সে বাধা দিতেও পারেনি। এবার সে কৌতুহল নিবারনের জন্য পূর্ণিমার উদ্দেশ্যে বলল, আপনি এখনো দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন, আসুন, ভিতরে এসে বসুন।
পূর্ণিমা কথা না বাড়িয়ে ভিতরে গেল এবং লোকটির নির্দেশ মতো একটা খাটিয়াতে বসলো। লোকটি এবার বলল, আমি মানবেন্দ্র নারায়ণ বাবুকে চিনি কিন্তু আপনি কে বুঝতে পারছি না। 
পূর্ণিমা বুঝতে পারছিল না যে, আর সত্যিকারের পরিচয়টা দেওয়া ঠিক হবে কিনা। ও তাকিয়ে দেখছিল যে, একটু আগে যে স্ত্রীলোকটি গহনার জন্য কান্নাকাটি করছিল, সেএখন তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কৌতুহলী  দৃষ্টিতে জরিপ করছে। পূর্ণিমা এই বিষয়টাতে গুরুত্ব না দিয়ে ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে বলল, আমি যদি খুব ভুল না করে থাকি তো আপনি বোধহয় এই পান্থশালার মালিক শ্রীযুক্ত বাবু জগন্নাথ পাত্র মহাশয়? 
এই পান্থশালাটির প্রকৃত মালিক বলরাম রায়। তিনি‌ সম্পর্কে জগন্নাথ বাবুর ভগ্নীপতি। জগন্নাথ পাত্র তবু তাকে মালিক বলায় বেশ খুশি হলো। 
সে একটু কৌশলে বলল, হ্যাঁ , আমি জগন্নাথ পাত্র! পান্থশালার মালিক আর কি, আমরা দুজনে এটার দেখাশোনা করি। 
---উনি বোধহয় আপনার স্ত্রী ,তাই না?
---হ্যাঁ । কিন্তু আপনার পরিচয় তো ঠিক পেলাম না। মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?
----উনি আমার স্বামী।
---ও ,আচ্ছা। তো এত রাতে আপনারা কোথায় যাচ্ছিলেন? 
----কাল সকালের দিকে আমার স্বামীর এক বন্ধুর বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে। আজ সন্ধ্যাতেই বেরিয়ে পড়বো ভেবেছিলাম কিন্তু আমার শরীর হঠাৎ একটু খারাপ হওয়ায় সন্ধ্যারাতে বেরোতে পারিনি। শেষে একটু সুস্থ বোধ করায় রাতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম ওখানে যাওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম, সারারাত ধরে গিয়ে ভোরে পৌঁছাব ওখানে। কিন্তু রাত্রি গভীর হয়ে যাওয়ায় আমার স্বামী বললেন যে, এখানে জয়পুরে তার একটি পরিচিত পান্থশালা আছে। সেখানে রাতটা কাটিয়ে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়বো আমরা। 
-----খুব ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু আপনার স্বামী যে কখন ফিরবেন, তা তো বুঝতে পারছি না। 
তাছাড়া ওই ডাকাতরা খুব দুর্ধর্ষ। ওভাবে ওদের পিছু নেওয়ার ঠিক হয়নি। 
-----আমি তো বারণ করেছিলাম, উনি শুনলেন না। সম্ভবত আপনার স্ত্রীর খোয়া যাওয়া গয়না উদ্ধারের জন্যই উনি ডাকাত দলের পিছু করলেন। কিন্তু এখন আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। 
----আমারও। 
জগন্নাথ পাত্রের কথা শেষ হতে না হতেই চেতক ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হল। ও পূর্ণিমার কাছে গিয়ে তার শাড়ির আঁচল মুখ দিয়ে টানতে লাগলো। পূর্ণিমা বুঝতে পারলো, চেতক কোথাও যেতে বলছে তাকে। কিন্তু কোথায়? 
তবে কি কুমার কোন বিপদে পড়েছে? না, তাড়াতাড়ি যেতেই হবে সেখানে।
পূর্ণিমা উঠে দাড়িয়ে বলল, জগন্নাথ বাবু, সম্ভবত কুমার কোন বিপদে পড়েছেন। আর তাই তাঁর প্রিয় ঘোড়া চেতক আমার শাড়ির আঁচল ধরে টেনে আমাকে ওখানে যাওয়ার জন্য ইশারা করছে‍। 
---কী করবেন এখন?
----আমি যাব ওখানে? 
-----ঘোড়ার চেপে? 
----না, চেতককে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে যাবো। সম্ভব হলে আমাকে একটা লন্ঠনের ব্যবস্থা করে দিন।
----দাঁড়ান, আপনি একা যাবেন না।
----তবে? 
-----আমিও লণ্ঠন নিয়ে আপনার সঙ্গে যাব। 
---বেশ, চলুন। 
জগন্নাথ বাবু ঘরের ভিতর থেকে একটা লন্ঠন নিয়ে এলো। কাচ দিয়ে ঘেরা একটা চতুষ্কোণ লন্ঠন। লণ্ঠনের উপর দিকে ধোঁয়া বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। হাতে ধরার জন্যে ও
একটা ব্যবস্থা করা আছে। 
পূর্ণিমা আছে চেতকের গায়ে হাত দিয়ে বলল, চল চেতক, কোথায় নিয়ে যাবে, চলো। 
চেতক এগিয়ে চলল। তার দুপাশে হেঁটে চলল
পূর্ণিমা আর লন্ঠন হাতে জগন্নাথ বাবু। 

(চলবে)

†*******************************
Regards
Dr. Samiran Sarkar
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727










Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.