ছবিঋণ- ইন্টারনেট
প্রতিশোধ
সমীর কুমার দত্ত
ঋতু বিধবা হয়ে ফিরে এলো বাপের ঘরে ঠিক বিয়ের বছরখানেক পরে। স্বামী প্রসেনজিৎ আগে থেকেই লাং ক্যানসারে আক্রান্ত। ছেলের বাড়ি সে কথা বেমালুম গোপন করে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝেই ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেবা করার তো দাসী চাই।তাই হয়তো ছেলের বিয়ে দিয়ে দিলেন।একটা মেয়েকে যে অকালে বিধবা হয়ে তার সুখ শান্তি জলাঞ্জলি দিতে হবে, সে কথা একবারও না ভেবে।ফলত,যা হবার তাই হলো। পরের ভালোকরি আর না করি, মন্দ করবো না —এই চিন্তা মানুষ করতেই ভুলে গেছে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য।
বিয়ের ঠিক কিছুদিন পরেই ঋতুর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে তার স্বামী কর্কট রোগাক্রান্ত। স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে স্বামী সবই স্বীকার করে এবং বলে সে বিবাহ করতে চায় নি। শুধু মায়ের জন্য এ বিয়েতে রাজী হয়েছে। মায়ের বয়স হয়েছে তার ওপর শরীরও ভালো যায় না। আর বোন সুচেতাও বেরিয়ে যায় টিউশন পড়াতে। চাকরির চেষ্টা করছে,তারজন্য বাইরে বের হতে হয়। এইসব সাত পাঁচ ভেবেই বিয়েতে সায় দিতে হলো। জানি এটা অন্যায়। কিন্তু কি করবো। ঋতু নীরব থেকে শুধু শ্রোতার মতো শুনে গেলো। কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও বলতে পারেনি। ও এমনিতেই একটু মুখচোরা, তার ওপর তখন বলে কোনো লাভ নেই। যা হবার তা হয়ে গেছে।এখন সংসারে মানিয়ে নেয়া ছাড়া গতি নেই। ঋতু অবশ্য তার বাপের বাড়িতে কিছু জানায় নি। ভালো মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির নিন্দেমন্দ করতে পারে না।
জামাইয়ের মৃত্যুর পর ঋতুর বাবা বিমলবাবু মেয়ের বিধবা শাশুড়ি রেবাদেবীকে বলেছিলেন, " বেয়ান, আপনার এভাবে রোগ গোপন করে বিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। আমাদের অনেক ভালো করে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। আপনার এই শোকের সময় এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। কি করবো, এই অল্প বয়সে মেয়েটার কপাল তো পুড়লো! শত দুঃখেও রেবাদেবীকে মাথা নিচু করে সব শুনতে হলো।
প্রসেনজিৎ ইষ্টার্ন রেলওয়েতে চাকরি করতো সি.এ.বি.সি. ডিপার্টমেন্টের সুপারিণটেন্ডেট পদে। মাঝেমাঝেই শরীর খারাপ হোত আর অফিস কামাই হতো। শেষের দিকে ক্যাজুয়্যাল লীভ প্রায় শেষ। খুব একটা অসাবধানে থাকতো না। ওষুধপত্র ঠিকমতোই চলতো। প্রায় অনেকটাই ভালো হয়ে আসছিলো কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে এটা ভাবা যায় নি। তবে এই রোগ বিলম্বিত লয়ে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে।কারো দুদিন আগে,কারো দুদিন পরে।
সে যাক্।এখন সংসারটা চলবে কিভাবে। ওই তো একার ওপর সংসার। দ্বিতীয় উপায়ী তো কেউ নেই। কারণ সংসারে উপার্জনক্ষম, অবিবাহিত এক ননদ ছাড়া আর কেউ নেই। ননদ সুচেতা শিক্ষিতা, টিউশন পড়ায় আর চাকরির দরখাস্ত করে যায়। অনেক দেখাশোনা করা হয়েছে। হয় পাত্রী পছন্দ হয় তো পাত্র পছন্দ হয় না।এই করে করেই মেয়েটার বিয়েই হলো না। বাবা মারা যাবার আগে ওর বিবাহের টাকা ফিক্সড্ করে রেখে গেছেন। কিন্তু সেই টাকার ওপরেও হাত পড়েছে চিকিৎসার জন্য।
মৃতের চাকরির অধিকারী একমাত্র তার স্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হলো — এই সংসারকে চালাবার জন্য ঋতু কি তার জীবনকে জলাজ্ঞলি দেবে? কখনই না।
সামনে তার যে জীবন পড়ে আছে,তা উপভোগ করার অধিকার ওর রয়েছে।
ঋতুর বাবা বিমলবাবু ঋতুর শাশুড়িকে সাফসাফ জানিয়ে দিলেন — "এই শোক কাটিয়ে উঠলে আমি আবার মেয়ের বিয়ে দেবো। সুতরাং জামাইয়ের চাকরি আমার মেয়ে করবে না।কারণ চাকরি করে এই অল্প বয়সে বৈধব্য বয়ে নিয়ে আপনাদের সংসার টানার মধ্যে দিয়ে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ কী? ওর এই অকাল বৈধব্য ওর কতো বিপদ থেকে আনতে পারে। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই বলছি, চাকরিটা আপনার মেয়ে সুচেতাকে দেওয়াই ভালো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোক কাটিয়ে উঠলে আমি আবার ওকে পাত্রস্থ করবো।"
শাশুড়িও স্বীকার করলেন, " বৌমার এই বেশ আর চোখে দেখা যায় না।বৌমা চাইলেও এই বয়সে বৈধব্য বহন করে আমার সংসার টানবে তা হতে পারে না। আমি যেমন সন্তান হারা হয়ে শোকস্তব্ধ তেমনি বৌমারও স্বামীহারা হয়ে সংসার জীবনের প্রথম ধাক্কাটা সামলে উঠতে দেরি হবে।তারপর আপনি ওর বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলি যদি ভরসা দেন।
বিমলবাবু বললেন, " আপনি নির্ভয়ে বলুন।"
শাশুড়ি রেবাদেবী বললেন, " একবার মেয়ের বিয়ে দিয়ে আপনার উপর তো চাপ পড়েইছে,তাই সমস্ত যৌতুক যা আপনি দিয়েছেন তা ফিরিয়ে নিতে হবে। কারণ আমিও তো একজন মা। আমার হলেও তো চাপ পড়তো। আপনি আর 'না' করবেন না। কারণ আমি আর বিয়ের কোন স্মৃতি ঘরে রাখবো না।"
এইভাবে ঋতু ফিরে এলো পিতৃগৃহে। কিছুদিন বাইরে বের হতে পারেনি।পাড়া প্রতিবেশীরা এই শোকস্তব্ধ পরিবারকে বিশেষ করে ঋতুকে সান্ত্বনা দিতে এলো।
তারপর অবস্থা কিছুটা থিতিয়ে গেলে ঋতু প্রয়োজনে বাইরে যাতায়াত শুরু করলো।একদিন পথে ঋতুকে আসতে দেখে পাছে ঋতুর মুখোমুখি হতে হয় প্রীতম যেন কিছু ভুল হয়ে গেছে বোঝাতে বাড়ির দিকে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। ঋতু প্রীতমের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলো যে, প্রীতম তাকে এড়িয়ে যেতে চায়। ও বোধ হয় খুব দু:খ পেয়েছে। মুখোমুখি হতে পারলে হয়তো প্রীতমের কাছে সে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারতো।
প্রীতম ঋতুর পাড়ার ছেলে। সরাসরি কখা ছিল না কিন্তু পরস্পর পরস্পরকে চিনতো। উভয়েই ম্লান হাসি বিনিময় করতো।আর এতেই প্রীতম ঋতুকে ভালোবেসে ফেলেছে।
কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারতো না। একদিন একটি চিঠি মারফত প্রীতম ঋতুকে প্রেম নিবেদন করে। পাড়ার কেউ হয়তো তা দেখতে পেয়ে ঋতুর দাদাকে জানিয়ে দেয়। ঋতুর দাদা প্রীতমকে যৎপরনাস্তি
অপমান করতে ছাড়েনি।প্রীতম সেকথা ভোলেনি। সেইথেকে প্রীতম ঋতুর মুখোমুখি হওয়ার
চেষ্টাও করেনি।
সেইজন্য ঋতুর বাবা তাড়াতাড়ি ঋতুকে পাত্রস্থ করতে বাধ্য হন। কারণ, প্রীতম ছেলে হয়তো ভালো —শিক্ষিত,নম্র,ভদ্র কিন্তু বেকার, ওদের অবস্থাও ততটা ভালো নয়। তদুপরি ঋতুরা ব্রাহ্মণ — 'বন্দ্যোপাধ্যায়' আর প্রীতমরা গন্ধবণিক—'সাহা'।
প্রীতমের প্রতি ভালোবাসা হয়তো ছিল, কিন্তু ভালোবাসার আহ্বান গ্রহণের পূর্বেই সবকিছু বানচাল হয়ে গেল। সেইজন্য ঋতুর প্রীতমের মুখোমুখি হতে লজ্জা পেতো। যদি সে ক্ষমা চেয়ে নিতো তবে হয়তো তার জীবনে এই বিপর্যয় নেমে আসতো না। কিন্তু সে সুযোগ সে পেলো না। প্রীতমের মতো সুন্দর মনের ছেলের মনে দেওয়া দু:খ হয়তো প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে শোধ নিলো!
---------------------------------
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra

