গল্প ।। মনের আয়নায় সানাই সুর ।। দীপক পাল


ছবিঋণ- ইন্টারনেট  

মনের আয়নায় সানাই সুর 


 দীপক পাল 


 দুর্গাপূজার প্রায় প্রতিটা প্যান্ডেল থেকে সানাইয়ের সুরে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আজ সপ্তমীর এক রৌদ্রকরোজ্বল মনোরম সকালে প্রদ্যোৎ আর সায়ন্তী অলস পায়ে হেঁটে যেতে যেতে ঘনিষ্ঠ হয়ে নিজেদের মধ্যে মৃদু মৃদু কথা বলছে। এই আপাত স্নিগ্ধ পরিবেশের মধ্যে ওরা নিজেরা একেবারে একাত্ম হয়ে গিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। প্রদ্যোৎ ও সায়ন্তি দুজনেই আর জি কর মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট। প্রদ্যোৎ থাকে তালতলায় আর সায়ন্তী থাকে পাইকপাড়ায়। সকাল দশটা নাগাদ ওরা গ্রে স্ট্রিটের মোরে খান্না সিনেমার কাছে পরস্পরে দেখা করেছে। তারপর প্রথমে নলিনি সরকার স্ট্রিটের ঠাকুর দেখা থেকে শুরু করে তার পাশের আরো দুটো ঠাকুর দেখে ভিতরের রাস্তা দিয়ে শিকদার বাগানের ঠাকুর দেখে হাতিবাগান সার্বজনীন দেখে সোজা কাশী বোস লেন। ওখান থেকে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে দেখতে পৌঁছে গেল আহিরিটোলা সার্বজনীন দুর্গোৎসব। এর প্যন্ডেলও যেমন চমৎকার তেমনি প্যান্ডেলের ভেতরে এমন সুন্দর ভাবে সাজিয়েছে যে সময় নিয়ে না দেখলেই নয়। প্রতিমাও দেখার মতো বটে। মোবাইলে ওরা অনেক ফটো তুললো। প্যান্ডেলের ভেতর থেকে সবে রাস্তায় নেমেছে ওমনি হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামলো। ওরা আর রাস্তার লোকেরা সব হুড়মুরিয়ে ছুটলো সামনের গাড়ীবারান্দার দিকে। শেডের তলায় গিয়ে হাঁফ ছেড়ে রুমাল দিয়ে বৃষ্টির জল গা থেকে মুছতে লাগলো। মধ্য ও উত্তর কলকাতায় রাস্তার ধারে ফুটপাথের ওপর ছোট বড় অনেক গাড়ীবারান্দার মতো প্রচুর শেড আছে। ফুটপাথ যদি চওড়া হয় ও শেডটিও যদি লম্বা হয় তাহলে একসাথে অনেক লোক ধরে। এই শেডটিও বেশ বড়সড়। প্রদ্যোৎ বিরক্ত হয়ে বলে,
- ' জানিস সায়ন্তী, বাঙালির দুর্গাপুজার মতো এতবড়ো একটা উৎসবের মাঝে এই বৃষ্টিটাই হচ্ছে আসল অসুর। দেখ নিমেষের মধ্যে এমন সুন্দর পরিবেশটার কেমন বারোটা বাজিয়ে দিল।'
- ' একদম ঠিক বলেছিস প্রদ্যোৎ। কিন্তু আমরা সময় নষ্ট হতে দেব না। ঐ দেখ দোসাওয়ালার কাছে কেমন ভীর। চল আমরাও দোসা খাওয়ার লাইন দিইগে।'
- ' হ্যাঁ হ্যাঁ চল দোসা আমার অতি প্রিয় খাবার।'
            ওদের হাতে যখন দোসা এলো তখন হঠাৎ কেমন বৃষ্টিটা ধরে গেল। লোকেরা সব রাস্তায় নামতে থাকলো। কিন্তু ওদের হাতে যে দোসা তাই রাস্তায় নামার কোন উপায় নেই। সায়ন্তী বলে উঠলো,
- ' দেখেছিস বৃষ্টিটা কিরকম শয়তানি করছে।'
- ' তুই যায়ি বল দোসাটা কেমন চমৎকার বানিয়েছে। মজা করে খেয়ে যা তুই, দেখছিস না আকাশে এখনও কিছুটা মেঘ আছে যেকোন সময় হুড়মুড় করে আবার নামতে পারে। তাহলে আবার শেড খুঁজতে হবে দাঁড়াবার জন্য।'
         প্রদ্যোতের কথা শেষ হতেই হাল্কা রোদ মেঘ চিরে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়লো গোটা চৌহদ্দির মধ্যে। এরপর দুজনের মধ্যে চোখাচখি হতেই দুজনে একসাথে হেসে উঠলো। খাওয়া শেষ করে ওরা চিৎপুর রোডে এসে পড়লো। তারপর কুমারটুলি পার্ক আর কুমারটুলির ঠাকুর ওরা হাত ধরাধরি করে দেখলো আর খুব ভালো লাগায় ফটো তুলে রাখলো কয়েকটা। কুমারটুলি পার্কের ঠাকুরের প্যান্ডেলের বাইরে ও ভিতরের প্রতিমা সমেতের কাজ ছিল অভুতপুর্ব। পার্কের উল্টো দিকে শোভাবাজার রাজবাড়ীর ঠাকুরও দেখতে ওরা ছাড়েনি।

            আহেরিটোলা থেকে চিৎপুর রোডে পরার পর লোকের ভিড়ের মধ্যে ওরা পরস্পরের হাত ধরাধরি করে হাঁটে একেবারে শোভাবাজার রাজবাড়ী পর্য্যন্ত। তখন ওদের মনের মধ্যে যেন এক ভালবাসার ছায়া দুলছিল। আবার কুমারটুলির ঠাকুর দেখতে দেখতে কখন যে আবার ওদের দুহাত এক হলো সে হাত ছাড়াছাড়ি হলো একেবারে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের বাসস্ট্যান্ডে এসে। বাসে বিশেষ ভীর ছিল না। রাস্তায় লোকের চলাফেরা সেরকম কিছু নয়। চতুর্দিকে কেমন ঢিলাঢালা ভাব। এক কন্ডাক্টারের চীৎকার ছাড়া। বাগবাজার বাসস্ট্যান্ডে ওরা ছাড়া বাস প্রায় খালি হয়ে গিয়ে আবার ভরে গেল।
            বাগবাজারে ঢুকতেই সেই উৎসবের পরিবেশটা যেন আবার ওরা ফিরে পেল। চওড়া রাস্তার দুপাশে কত ছোট ছোট দোকান বসেছে কতরকমের। এখানে ভীর বেশী হলেও প্রশস্ত রাস্তার দরুন চলাফেরায় খুব একটা অসুবিধা হয় না। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল বেশ দুরে হওয়ায় ওরা হাত ধরাধরি করে চলতে লাগলো। রাস্তার দুপাশের সব দোকানগুলো দেখতে দেখতে হাঁটতে বেশ ভাল লাগছে। সানাইয়ের সুরের যাদুতে দুটি মন যেন এক হতে চায়। চুপচাপ সেই সুর শুনতে শুনতে ওরা পার্কের ভিতরে লাইন দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাগবাজারের প্রতিমা হয় সাবেক ঢঙের এক চাতালের। কিন্তু ঐতিহ্যে ও গরিমায় সবার মন আকর্ষণ করে। বহু লোকের তাই মনে হয় এখানে একবার না এলে পুজো দেখা সম্পূর্ণ হলো না। পার্কের ভিতরের গা জুড়ে কত স্টল। প্যান্ডেলের এক দিকের বাইরে এক ঝাঁক সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার ভীর। তারা কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চয়। ওদিকে যাওয়া সম্ভব নয়। ওরা সোজা ঢুকে প্রতিমা দর্শন করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে এলো। সামনে কত স্টল খাবারের দোকান। কিন্তু আগুন জ্বালাবার নিয়ম নেই। ওরা পছন্দসই কিছু খাওয়ার চিন্তা করলো। ঠিক সেই সময় সায়ন্তির মায়ের ফোন এলো বাড়ী থেকে। প্রদ্যোৎকে বললো, 'এই আমার মায়ের ফোন।'
সর্বত্র ভীরের মধ্যে একটু আড়াল খুঁজে নিয়ে কানে মোবাইল ধরলো।
- ' হ্যালো, কিছু বলবে? আমি এখন বাগবাজার পুজো প্যান্ডেলে।'
- ' তোর বাবার শরীর খুব খারাপ লাগছে, খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এখন তুই যেখানেই থাক তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে আয়। আমার ভয় করছে।'
- ' চিন্তা করো না আমি এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, যদি পাই একজন ডাক্তার নিয়ে ঘরে ঢুকবো।'  প্রদ্যৎ জিগ্গেস করলো,
- ' সায়ন্তী, এনি প্রবলেম?' সায়ন্তী সবটা ওকে গুছিয়ে বলতে ও বলে
- ' চল আমিও তোর সঙ্গে যাব। তোর পক্ষে একা অসম্ভব হতে পারে।'
- ' সেকি তোর বাড়ীতে চিন্তা করবে না?'
- ' আমি ফোন করে বাড়ীতে জানিয়ে দিচ্ছি।'
- ' ঠিক আছে চল আমার সাথে তবে। তুই গেলে ভালই হবে আমার।'
            নিমেষে ওরা পাঁচ মাথার মোরে এসে গেল। ট্র্যাফিকে অনেক বাস দাঁড়িয়ে আছে। ওরা একদম প্রথম বাসটাতেই উঠে পড়লো। বসার জায়গা পায়নি। স্বপ্নের জগৎ ছেড়ে একদম বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়লো সায়ন্তি। দুরুদুরু বক্ষে মা দুর্গাকে ডাকছে একমনে। আরজিকর ছাড়িয়ে বাস পাইকপাড়ায় বড়ো পোষ্ট অফিস স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে ওরা বাস থেকে নামলো। নেমে কয়েকটা বাড়ী পেরোবার পর সায়ন্তী একটা বাড়ীর গেট খুলে ভেতরে ঢুকে প্রদ্যোৎকেও ভিতরে আসতে বললো। তারপর এগিয়ে গিয়ে কলিং বেল বাজালো।
ওপর থেকে নিচে নামার বন্ধ দরজার ওপরে একটা ছোট্ট সাইনবোর্ড তাতে লেখা

Dr. Nishit Ray, MBBS(CAL), MD(CHANDIGAR)
ওপরের বারান্দা থেকে একজন মহিলার কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ' কে?'
- 'ডাক্তার কাকা আছেন?' সায়ন্তী জিগ্গেস করলো। মহিলা সরে গেল। একটু পরেই পুরুষ কন্ঠ ভেসে এলো 'কে? ও তুমি কি ব্যাপার?'
-' ডাক্তারকাকা, আপনাকে কল করতে এসেছি, বাবার খুব শ্বাসকষ্ট।'
-' একটু অপেক্ষা কর আমি রেডি হয়ে আসছি।'
-' চল। বাবার কি হয়েছে? যেতে যেতে শুনি।'
-' ডাক্তার কাকা, আমি বাগবাজারের ঠাকুর দেখে সবে বেরিয়েছি ঠিক তখন আমার মায়ের ফোন এলো তাড়াতাড়ি বাড়ী আসতে বাবার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি তাই ঠিক করলাম একেবারে ডাক্তার নিয়ে ঘরে ঢুকবো। এই মূহুর্তে ঠিক বাবা কেমন আছে আমি জানিনা।'
ডাক্তারবাবু আড়চোখে একবার প্রদ্যোৎকে দেখে নিয়ে বললেন,
-' তুমি খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে, চল দেখি আগে নির্মলবাবুকে।'
            সবাইকে নিয়ে সায়ন্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে বাবার ঘরে ঢুকলো। দেখল বাবা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। বুকটা অল্প ওঠানামা করছে। চোখ বন্ধ। ডাক্তারবাবু আগে প্রেসারটা দেখলেন, পালসটা দেখলেন, চোখটা দেখলেন, পেটটা টিপে টিপে দেখে বললেন,
-' ভয়ের কিছু নেই, আমি প্রেসক্রিপসন লিখে দিচ্ছি, এই ওষুধগুলো এখুনি স্টার্ট করে দিতে হবে। আর কিছু ভেরিফিকেসন লিখে দিলাম সেটা এখুনি করার দরকার নেই তবে করতে হবে। আচ্ছা উঠি।'
সায়ন্তী মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ডাক্তারের ভিজিটটা দিল।
সায়ন্তী বললো,' মা আমরা বাবার ওষুধটা আনতে যাচ্ছি এখন।'
-' হ্যাঁ যা কিন্তু প্রদ্যেৎকে অতি অবশ্যই নিয়ে আসবি। বাবা প্রোদ্যেৎ তুমি কিন্তু আজ আমাদের এখানে খাবে। না করবেনা কেমন?'
-' ঠিক আছে কাকিমা।' সায়ন্তীকে বললো, 'ভারী মুস্কিল হলো।'
-' কেন মা তো ঠিকই করেছে। আমার যখন ক্ষিদে পেয়েছে তোরো নিশ্চই সে রকম ক্ষিদেই পেয়েছে। তুইকি সন্ধেবেলা গিয়ে খাবি? তুই যে আমার বিপদে আমার সাথে এসেছিস এতে মা খুব খুশী হয়েছে। তুই কি ভেবেছিস মা তোকে না খাইয়ে ছেড়ে দেবে?'
           ওষুধ নিয়ে এসে আগে বাবাকে দুটো ওষুধ খাইয়ে দিলো। তারপর মাকে জিগ্গেস করলো বাবা কিছু খেয়েছে কিনা। শুনলো ভাত চটকে জ্যান্ত মাছ দিয়ে খাইয়ে দিয়েছে। সকালে নাকি বাবা বাজার করে এসে হাত পা ধুয়ে এসেই খাটে শুয়ে পড়ে বলে শরীরটা খারাপ লাগছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
-' বেশ, এবার আমাদের এখুনি খেতে দাও বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে।'
-'সেতো পাবেই সেই কখন খেয়ে বেরিয়েছিস। স্নান না করে...।'
-' পরে করবো। ওকে কতদুর যেতে হবে বলতো। চিন্তা করে না?'
-' আয় তবে বসে পর।' খুব যত্ন করে ভাত বেড়ে দিল মা ওদের।
-' আমরা দুজনে আরজিকরে একসাথে পড়ি সেকেন্ড ইয়ারে। ও থাকে তালতলায়। আমাদের প্ল্যান আছে এম.ডি করার।'
            খাওয়া দাওয়ার পর সায়ন্তী প্রদ্যোৎকে বাসে উঠিয়ে দেবার জন্য ওর সাথে বেরলো। বেশী কথা হলো না দুজনের মধ্যে। খালি আলোচনা হলো সকালটা গেছে স্বপ্নের ঘোরে এখন কাটছে বাস্তবের মাটিতে। প্রদ্যোৎ বাসে উঠে চলে গেল টা টা করে। সায়ন্তী বাড়ী ফিরছে। মন ভারাক্রান্ত খুব। সানাই বাজছে বেলগাছিয়া পার্কের দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে। সেই সুর ভেসে আসছে তার কানে। ওর কাছে সেই সুর এখন যেন বড় করুণ লাগে। ও বুঝতে পারেনা এর কারণ। বাবার অসুস্থতা নাকি মা কি খেয়েছে সেই চিন্তায় নাকি প্রদ্যোৎ চলে যাওয়ার জন্য। অথবা সকালে ওদের রঙিন স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার জন্য। সায়ন্তী ঠিক জানে না।

                      ------------------------------------

Address :-  Dipak Kumar Paul (9007139853),
                    DTC, Block-8, Flat-1B,
                    D.H.Road, Kol-700104.

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.