ছবিঋণ- ইন্টারনেট
সুরের টানে..
- শ্যামাপ্রসাদ সরকার
কদিন পরে বেশ রোদ্দুর বেরিয়েছে বলে চারপাশে বেশ একটা চনমনে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত সপ্তাহের আদ্ধেকদিন আকাশে ঘন কুয়াশা আর মেঘলা করে থাকার দৌলতে ঝপ্ করে কখন যে দিনের আলো ফুরিয়ে আসছিল সেটা ভাল করে ঠিক বোঝাই যাচ্ছিল না। কাজেই আমাদের রবিবাসরীয় আড্ডাটা যে ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠেনি সেটা আর বলে কাজ নেই।
বেলায় এগারোটা নাগাদ এক এক করে আমরা সবাই এসে পৌঁছতেই সমস্বরে প্রফেসর সোমের খোঁজ পড়ল। ভদ্রলোক সেই কবে আর্কিওলজ্যিকাল সার্ভের চাকরী থেকে অবসর নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু পেশাগত জীবনের নানারকম বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কিছু নমুনা আমাদের আড্ডায় পেশ করে এমন অভ্যেস তৈরী করে দিয়েছেন যে ওনার গল্প ছাড়া রোববারের আড্ডাটা বড্ড জোলো মনে হয়।
...
যদিও আমরা কেউ সেইভাবে ইতিহাসের ছাত্র নই ঠিকই, তাও ওনার মুখে সেইসব অচেনা, অজানা সব পুরনো কালের ঘটনার মায়ারঙ্গে যে আজও সকলে মেতে উঠি। এসব কাহিনির সাথে বাড়তি পাওনা হল ওইসব অকূস্থলে ওনার একান্ত কিছু এক বা একাধিক অতিপ্রাকৃত আবহের অনুভূতি। কাজেই ওঁর কাছে গল্প শোনার মজাটাই আলাদা !
তাছাড়া ভদ্রলোক আর পাঁচজন রিটায়ার্ড বৃদ্ধদের মত বাতের ব্যথা, হাঁটুর অসুখ, হাঁপানি কিংবা সুগারলেভেলের কচকচানি না করে আমাদের মতন সব তিরিশ-পঁয়তিরিশের সঙ্গীদের কাছেই স্বচ্ছন্দ থাকেন বলে উনিও তাই খোলামনে বিচিত্র সব গল্পগুজব করে থাকেন।
.......
একটু পড়েই প্রফেসর সোম যথারীতি এসে পড়তেই আমরা সাদরে ওনাকে অভিনন্দন জানালাম। স্মিত হেসে প্রফেসর তাঁর কাঁধের ব্যাগ থেকে জলভরা সন্দেশের একটা বাক্স বাড়িয়ে ধরতেই আমাদের মধ্যে শোরগোল পড়ে গেল।
আমরাও সাথে সাথে ওনার জন্য চিনি ছাড়া লিকার চা আর গরম চপের এর অর্ডার দিয়ে আসতেই দেখতে পেলাম সবাই উশখুশ করতে শুরু করে দিয়েছে। প্রফেসর সেটা বুঝতে পেরে নিজেই বলে উঠলেন, " আর অধৈর্য্য হয়ে কাজ নেই বাপু!গপ্পো বলা শুরু করছি। তবে আজ যেটা বলতে চলেছি সেটা আমার কিশোরবেলায় ঘটা একটা অভিজ্ঞতার কথা। তখন কি আর জানতাম! যে ইতিহাসের গলিঘুঁজিতে আমাকে পরবর্তীকালে নিজেকেই ঘুরে বেড়াতে হবে!"
মহিম চাকলাদার লিটল্ ম্যাগাজিনের কবি ও সম্পাদক হয়েছে ক'বছর হল। সে বলে উঠল, 'বেশ তাই হোক না কেন ! আমাদের জন্য আপনার মুখনিঃসৃত গল্পের স্রোত যে সর্বদাই একইভাবে আকর্ষণীয় ! '
একটু পরে জলযোগ শেষ হতেই প্রফেসার তাঁর চুরুটটা ধরিয়ে গল্প বলা শুরু করলেন।
" এ গল্পের শুরু স্বাধীনতার পরের দশকে। সেটা সম্ভবতঃ ষাটের গোড়ার দিকে। সবে আই এ পরীক্ষা পাশ করে কলকাতায় পড়তে এসেছি। আমাদের আদি বাসস্থান ছিল বর্ধমানের দক্ষিণ রায়নার কাছে। কাছাকাছির মধ্যে তখন দামোদর নদের সে এক অন্য রূপ! আটাত্তরের আগের দামোদরকে ডি ভি সি পরবর্তী দামোদরের সাথে মেলালে ভুল হবে। সে নদ ছিল একাধারে ঐশ্বর্যপ্রদায়ী আবার বন্যার সময় স্বয়ং যমের তূল্য ! সে যুগে কত গ্রামকে যে বন্যায় জাস্ট তলিয়ে যেতে শুনেছি তা আর কি বলব !
যাইহোক, রিপন কলেজে বি এ পড়তে এসে বাসস্থানের অভাব দেখা দিলে আমাদের গ্রামের পড়তি জমিদার নবকান্ত মহাশয় একটা তৎক্ষণাৎ সমাধান বাতলে দিলেন। ওনার দুই ছেলে তখন কলকাতায় পেশাগতসূত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।এই ছেলেরা তাদের শৈশবে আমার পিতৃদেবের কাছে ইংরেজী আর সংস্কৃত পড়েছে বলে আমাদের পরিবারেরসাথে নবকান্ত বাবুদের একটা সহজ সৌজন্যের সম্পর্ক অনেকদিন পর্যন্ত বজায় ছিল।
উনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে কলকাতায় ওঁদের যে তিন তলা বাড়ি ছিল শেয়ালদা'র কাছে সেখানেই একটা ঘর আমার থাকা-খাওয়ার জন্য বরাদ্দ করে দিলেন।
এমনকি তার ওপর দিনের বেলা কলেজ করে এসে আমার নিজের পড়াশোনার সাথে সপ্তাহে তিন দিন ও বাড়ির নাতি দুটির দৈনন্দিনের পড়াশোনাটিও দেখিয়ে দেবার বরাত পেলাম। ভাবতে পার? সে যুগে পঞ্চাশ টাকা যে এত সহজে আমার পকেটে ঢুকতে পারে সেটায় জেনে আমি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে উঠলাম!"
বুঝতে পারছি এ গল্পের গতি শুরুতে হয়তো একটু ঢিমেসতালে চললেও তা ঠিক এক সময় সেটা কাঙ্খিত গতিতে ছুটতে চলেছে। বিজন সুযোগ বুঝে আর এক রাউন্ড চা আনতে গেলে প্রফেসর আবার বলতে শুরু করলেন।
" শিয়ালদহের কাছে সাবেক কলকাতার অন্যতম এক পুরনো রাস্তা হল ক্রিক রো। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ঘটনা। একটা সময় এর পাশ দিয়ে একটা খাল বা 'ক্রিক' প্রবাহিত হত বলে জানা যায়। এখন অবশ্য সেটি মুছে গেছে। আর্চডিকন হাইড সাহেব তাঁর 'প্যারোকিয়াল অ্যানালস' এবং 'পেরিশ অব বেঙ্গল' বই দুটিতে এখানকার সেযুগের বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কাজেই ফ্যান্সী লেন অবধি এই রাস্তার সংযোগের কথাও সে লেখায় রয়েছে। আমাদের গ্রামের সেই জমিদার নবকান্ত চৌধুরী মহাশয়ের প্রপিতামহ রাজেন্দ্রমোহন চৌধুরী এখানে একদা যে তিনটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি তৈরী করেছিলেন বর্তমান বাড়িটি হল তারই শেষতম অংশবিশেষ।
উনিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে প্রায় শেষার্ধ অবধি এ বাড়িতে নিয়মিত খেউড়, তর্জা ও বাঈজী নাচের আসর বসলেও বিগত একশো বছরে সে সব লাম্পট্যের পাট উঠে গিয়ে এটা একটা নিছক বসতবাড়িতে পর্যবসিত হয়ে গেছে।
একটা জমিদার পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন শেডের গৃহকর্তাদের পালাবদলের ফলাফল জড়িয়ে এইসব হাভেলীগুলো ঠিক যতটা স্মৃতিমধুর, ঠিক ততটাই অসংখ্য গুপ্তহত্যা, পারিবারিক কলঙ্ক আর সদ্য গজিয়ে ওঠা শহুরেয়ানার এক নির্লজ্জ নিদর্শন হয়ে কিছুকাল আগেও এই শহর কলকাতার বুকে জেগে থাকত।
........
এখানে পড়তে এসে থাকতে শুরু করার সুবাদে শুনতে পেলাম যে রাজা রাজেন্দ্রমোহনের এক ভাই হরেন্দ্রমোহন ছিলেন নাকি সেকালের কালোয়াতি গানের এক বড় সমঝদার। বাপের অমতে খোদ বেনারস না আগ্রায় তিনি ওস্তাদের কাছে পাখোয়াজ,এস্রাজ আর বাঁশী বাজানো শিখে এবাড়িতে উনি ওসবের পত্তন করেছিলেন।
অবশ্য লোকমুখে তখনও তাঁকে ঘিরে বয়ে চলা অজস্র গালগল্পের সাথে যেকটা প্রমাণ তখনও বিদ্যমান ছিল, তা হল ওই ভদ্রলোকের একটা মাঝারিমাপের পোট্রেট, ওনার বাজানো দুটো ভগ্নপ্রায় ও তার ছেঁড়া সারেঙ্গী ও একটি বটতলায় ছাপানো সুলভ রাগসঙ্গীত সংহিতার একটি পোকায় খাওয়া ভল্যুম যার প্রকাশক ছিলেন যোগমায়া সুরলহরী বিদ্যাবিনোদ। তবে এই 'যোগমায়া ' নামধারী বস্তুটি যে আসলে কোন সংগীত প্রতিষ্ঠান না কোন ওস্তাদ বা পন্ডিতের নাম তা অবশ্য আজ আর জানার কোনও উপায় নেই।
........
উনিশশ তেষট্টী সালের দোলপূর্ণিমা কেটে যাওয়ার ঠিক পাঁচ দিন পরের ঘটনাটা আজ বলব। এরকমই এক বাসন্তিক সপ্তাহকাল ধরে আগামী মাসে আসন্ন ফাইন্যাল পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়াশোনা করতে করতে একঘেয়ে লাগায় ছাতে উঠে সবে একটা সিগারেট ধরিয়ে রাত্রিকালীন নিসর্গকে সবে উপভোগ করতে শুরু করেছি হঠাৎ কানে এল এক মৃদু সারেঙ্গীর শব্দ।
মনে হল, যেন বহুদূর থেকে আসা একঝলক সুরের অলৌকিক চলাচলটি ঘটছে তেতলায় যে ঘরে আমি থাকতাম সেই দিক থেকে।
অথচ অত রাতে এইরকম পাগলামীর যে কোন সম্ভাবনাই নেই। পাগলামী বললাম বটে তবে সুরের চলাচল যতটা শুনে কান দুটো সবে পাকতে আরম্ভ করেছে তাতে বুঝলাম যে সুরটি যিনি বাজাচ্ছেন তা সম্ভবতঃ মালকোষ রাগাশ্রিত ও তা যথেষ্ট উঁচুদরের।
তখন রাত প্রায় আড়াইটে পেরিয়েছে। সাহেবদের লেখায় ততদিনে পড়েছি যে রাত তিনটে পেরোলেই এ্যান্টি ক্রাইস্ট টাইম শুরু হয় ও তখন নাকি যত অপদেবতাদের কান্ডকারখানার সূত্রপাত হয় যা ভোর হওয়া অবধি বলবৎ থাকে।
....
কাজেই আমিও প্রমাদ গুণলাম। ততোদিনে ইতিহাসের গলিঘুঁজির মধ্যে সবেমাত্র আনাগোনা শুরু করেছি বলে এসবে একটা বাড়তি উৎসাহের সূত্রপাত ঘটেছি ...হে..হে!
এই সাবেক কলকাতার আস্তানাটিকে প্রথমদিন দেখে আমার মনে হয়েছিল যে এটারও একটা অসংখ্য অজানা ইতিহাসের আঁতুড়ঘর হওয়ার সম্ভাবনা বড় প্রবল।
যাইহোক, বাজনার আওয়াজটা লক্ষ্য করে এগোতে এগোতে দেখলাম আমার ঘরের পাশে যে ঘরটা সারাবছর বন্ধ থাকে সুরের উৎস সেটাই। ভাবলাম, এখানে আবার দরজা খোলা রেখে কে এখন সুরসঙ্গতে ব্যস্ত?
....
চমকটা ভাঙল দশ মিনিট পরে আবছা আলোয় দেখলাম দামী শাল জড়ানো একজন ঈষৎ পৃথুল একজন মাঝবয়সী লোক মাথা নীচু করে সারেঙ্গী বাজাচ্ছে। তার ফোলা ফোলা দুটো চোখ টসটস করছে জলে। যেন নিদারুণ বেদনায় একজন সুরসাধক বাজিয়ে চলেছেন হৃদয় নিংড়ানো বিষাদগাথার একেকটা সুরের লহর।
লোকটিকে চেনা বলে মনে হল । একটু এগিয়ে দরজার কাছটিতে দাঁড়াতেই লোকটি ধরা গলায় একবার বলে উঠল, " হল না ভায়া! একবারের জন্যেও সুর আর তাল লাগসই হচ্চে নাহ্। ওস্তাদজী আর মুক দেকবেন নাকো। আট বচ্ছর ধরে মালবকৌশিক শিকিয়েচেন আমায়। রাগটা যে কিচুতেই রপ্ত হচ্চে না। "
আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই দেখলাম হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে লোকটি এবার পরণের কাপড়ের খুঁট খুলে ফাঁসের মত বানিয়ে গলায় পরতে যেতেই আমি এবারে তীর বেগে ছুটে লোকটির কাছে গিয়ে হাতটা ধরতে দেখলাম ঘরে কোত্থাও কেউ নেই।
খালি ওপরের কড়িকাঠ থেকে জিভ বার করে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছেন একজন মাঝবয়সী সুরসাধক যার পোট্রেট আর সারেঙ্গী এ বাড়ির দেওয়ালে আগে থেকেই ঝুলতে দেখেছি।
তিনি আর কেউ নন স্বয়ং হরেন্দ্রমোহন চৌধুরী!
........
পরের দিন কায়দা করে সেরেস্তা ঘরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে ছেচল্লিশ বছর বয়সে মাথার অসুখ ধরার পরে অবিবাহিতও সুরসাধক হরেন্দ্রমোহনকে তেতলার একটা ঘরে বন্ধ করে রাখা হত। সেখানেই তিনি আপনমনে যতদিন জীবিত ছিলেন আপনমনে এস্রাজ বা সারেঙ্গী বাজাতেন।
মাইনে করা একজন চাকর এসে দুবেলার খাবার টাবার এসে দিয়ে যেত। বাড়ির আর কারুর সঙ্গে তাঁর সেভাবে কোন সম্পর্ক ছিল না। শোনা যায় একদিন খাবার দিতে এসে চাকরটি দেখে যে হরেন্দ্রমোহন গলায় কাপড়ের ফাঁস জড়িয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সেইদিন থেকে ওই ঘরটা আর ব্যবহার না করে বন্ধ করে রাখা হয় প্রায় পঁচাত্তর বছর ধরে।
তবে বাসন্তিক রাতের মায়াবী আলোয় আমি যে অপার্থিব ও অবিশ্বাস্য দৃশ্যটির সাক্ষী রইলাম তার কোন যথার্থ ব্যাখ্যা আজ এই বয়সে এসেও খুঁজে পাইনি। "
.....
প্রফেসরের গল্পটি শেষ হতে আমরাও সেই বিস্মৃতপ্রায় এবং নাম না জানা জমিদার তনয় তথা সুরসাধকের মনখারাপ করে দেওয়া কাহিনিটিকে আমাদের আড্ডার অন্যতম ফসল হিসেবে স্মৃতিপটে রেখে দিলাম।

