ছবিঋণ- ইন্টারনেট
দাদুর মন্ত্রশক্তি
সরজিৎ মণ্ডল
আমার দাদু ছিল ওঝা । কাউকে সাপে কাটলে দাদু মন্ত্র দিয়ে তার শরীর থেকে বিষ ঝেড়ে দিতে পারত । আমি নিজের চোখে তার সে মন্ত্রশক্তি দেখেছি ।
সাপে কাটা কেউ দাদুর কাছে আসত চিকিৎসার জন্য আর দাদু বিড়বিড় করে কী সব মন্ত্র বলত । সে সব মন্ত্র তো আমি একবার শিখতেও চেয়েছিলাম । কিন্তু পারিনি । কেন জান ?
-কেন ? বিছানায়, আমার ছোট্ট মেয়ে শুচির উৎসুক প্রশ্ন ।
কারণ, সেসব মন্ত্র মোটেই স্পষ্ট উচ্চারণের হোত না । আর তাই আমি বুঝতে পারতাম না । আর লিখতেও পারতাম না । অন্ততঃ লিখতে পারলে পরে মুখস্থ করে নিতাম । কিন্তু, সে উচ্চারণকে বাংলা ভাষায় ধরার অক্ষর ছিল না । আসলে দাদু তো লেখাপড়া শেখেনি ? শুনে শুনে সে তার গুরুর কাছ থেকে মন্ত্র শিখেছিল । যেমনটি শিখেছিল ঠিক তেমন উচ্চারণই করত ।
পরে আমি ভাবলাম, না, টেপরেকর্ডারটা নিয়ে আসি । দাদুর মন্ত্রকে টেপে তুলে রাখি । কিন্তু দাদু কী বলল জান ?
-কী ?
বলল, এটা মা মনসার দান । তোমাদের ওই “কলে” তুলে রাখলে কাজ করবে নি । মানে, সাপে কাটা রুগী ভালো হবে নি । আর তোমার ক্ষেতিও হতেও পারে । আমি তোমার ওই কলের সামনে মন্ত্র বলব নি ।
-তাহলে-?
-তাহলে আর কী ? আমার সে মন্ত্র শেখা হল না । অথচ, শিখতে পারলে আমি তার মতো একজন গুণীন হতে পারতাম ।
-গুণীন মানে-
-যারা এভাবে মন্ত্র বলে ক্ষমতা দেখাতে পারে তাদের গুণীন বলে ।
দাদুর মন্ত্রশক্তি যে কী অদ্ভুত ছিল, তা বলি শোন ।
একবার দাদু সকালবেলায় উঠে দেখল, তার কালো গরুটার মন খারাপ, শরীরটা ভালো নয় । কেমন যেন গা ফুলে গেছে । দাদু ভাবল, ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসি । ডাক্তার ডাকতে ছুটল । তার কিছুক্ষণ পর আমি ছুটলাম ডাক্তার ঘরে ।
-কেন, তোমার আবার কী হোল ?
-কিছু না । আমি দাদুকে ডেকে আনতে গেছিলাম ।
-কেন ?
-আমি ঠাকুমাকে যখন এসে বলেছিলাম, আমাদের গোয়াল ঘর থেকে একটা সাপ বাইরে বেরিয়ে পালাল, তখন ঠাকুমা বলেছিল, তাহলে তোর দাদুকে ডেকে নিয়ে আয় । সাপেই কামড়েছে গরুটাকে ।
আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম, দাদু এত সাপে কাটা বুঝতে পারে, কেমনে তা তার বোধগম্য হল না সেদিন । আমার মনে হয়েছিল, হয়ত দাদু সেদিনটার জন্য আধুনিক হয়ে গিয়ে ডাক্তার ডাকতে ছুটেছিল ।
সে যাইহোক, দাদু যখন আমাদের সেই কালো গাইটার সামনে এল, তখন আমরা দেখলাম, গরুটার মুখ অনেক সাবান ফেনার মতো বুদবুদ সাদা ফেনায় ভরে গেছে । আর শুয়ে পড়ে কাতরাচ্ছে । মানে-, মরে যায় আর কী ?
দাদু কী সব মন্ত্র বলা শুরু করে দিল । আর দেখলাম, তাতে গরুটা ভালো হতে হতে আধঘণ্টার মধ্যে একেবারে ভালো হয়ে গেল !
-সত্যি !
-হ্যাঁ, সত্যি । মন্ত্র যে এত শক্তি দিতে পারে তা এখনকার দিনে তোমাকে ছাড়া আর কাকেই বা বোঝাই বল তো ?
-আমি বুঝেছি । বাপি, তোমার সে দাদু এখন কোথায় ?
-সে তো কবেই মারা গেছে । মৃত্যুকালে দাদুর কত বয়স হয়েছিল জান ?
- কেমন করে জানব ? তুমি বল । তবেই তো জানব ?
আমি ভাবলাম, বাব্বা, এইটুকু মেয়েও দেখছি, কেমন পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে ?
বললাম, নব্বুই বছর ।
-মানে-
-মানে-, তোমার দাদুর চেয়েও কুড়ি বছরের বড় ।
জানি, শুচি এবার কুড়ি বছর কত নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে । তাই তাড়াতাড়ি তা এড়িয়ে বললাম, জান সে বয়সেও দাদু গরু চরাতে যেত খাল-বিল-মাঠে আর গরুর পিছনে ছুটত ।
-তাই !
-হ্যাঁ, দাদুর নাম ছিল কিশোর । সত্যি সেই বুড়ো বয়সেও সে কিশোরের মতোই সতেজ ও সবল থাকত । কতবার আমি দেখেছি, তার লাল গাইটা ছুটছে বাড়িতে ফিরে আসবে না বলে আর দাদুও তার পিছু ছুটছে তাকে ফেরানোর জন্য । অথচ, কী-ই বা এমন খেত ? খুবই গরিব ছিল। তা তার গরু চরানো হতে সহজেই বুঝতে পারছ ।
তবে, দাদু আমাকে বলত, তাদের সেই ছোটবেলায়, তারা নাকি ভাত জল দিয়ে কক্ষনো সেদ্ধ করত না, করত সবসময় অনেক দুধ দিয়ে । তাদের নাকি অনেক গাইগরু ছিল ।
শুচি এখন আর বেশি প্রশ্ন করছে না দেখে বুঝলাম, ওর ঘুম আসছে নিশ্চয় । আসবেই-বা না কেন ? রাত দশটা তো হল ? কিন্তু দাদুর মন্ত্রশক্তি নিয়ে আমার কিছু বলতে খুবই ইচ্ছে করছে । সুতরাং, আর সময় নষ্ট না করেই বললাম, দাদুর মন্ত্র কেমন করে বিষ নামাত, তা নিয়ে একটু বলে ফেলি, কেমন?
-বল, আমার খুব ঘুম আসছে এবার । -শুচি বালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়ল । আমি বলে চললাম –
ইলেকট্রিকের মতো বিষ প্রবাহিত হতে পারে । যেমন এই তারের ভেতর ইলেকট্রিক কারেন্ট গিয়ে আলো জ্বালাচ্ছে, তেমনই বিষও হয়তো বয়তে পারে । যদি মানুষকে সাপে কাটত, তাহলে দাদু তার পিঠে একটা কাঁসার থালা দিলেই তা আটকে যেত । তারপর, দাদু মন্ত্র বলতে বলতে একসময় সে থালা মাটিতে আপনা-আপনি পড়ে যেত । তখন বোঝা যেত, সাপে কাটা রুগী লোকটার গায়ে আর বিষ নেই । আর সেও একেবারে সেরে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো দাদুকে প্রণাম করে বিদায় নিত ।
মুশকিল হোত, যদি কোন গরুকে সাপে কাটত । কারণ, গরুর তো আর সেরকম চ্যাপ্টা পিঠ নেই । তাই কাঁসার থালা ধরানো মুশকিল হোত । তাই, দাদু তার সমাধান অন্যভাবে করত । যেমন, যে গরুটিকে সাপে কেটেছে, তার গায়ে হাত দিয়ে কোন লোক বসত আর সেই লোকের পিঠে দাদু থালা রাখত । যতক্ষণ, গরুর গায়ে বিষ থাকত, ততক্ষণ সে থালা পড়ত না । তারপর মন্ত্র বলতে বলতে আধ ঘণ্টার মধ্যে যেই গরুর গায়ের বিষ নেমে যেত বা উবে যেত সেই তখুনি সে থালা পড়ে যেত । সেই জন্যই তো বলছিলাম, বিষ-শক্তি কারেন্টের মতো প্রবাহিত হতে পারে মনে হয় । তা নাহলে মন্ত্র চলাকালীন সেই লোকটি যেই গরুর গা থেকে হাত সরিয়ে নিত অমনি থালা মাটিতে পড়ে যেত । তারপর আবার হাত লাগালে আবার থালা ধরে যেত যতক্ষণ না পুরো বিষ উবে গিয়ে সে গরু ভালো হোত ।
-বাহ্ ! অদ্ভুত তো ?
-আচ্ছা, তুমি তাহলে ঘুমাও নি ? আমি ভাবছিলাম, কিছু বলছ না মানে ঘুমিয়ে পড়েছ হয়তো ।
-না, ঘুম পাচ্ছে ঠিকই তবে তুমি যা বলছ তা এত বেশি তাক লাগানো যে আমাকে জেগে থাকতে বাধ্য করাচ্ছে ।
-হ্যাঁ, চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না । মন্ত্রশক্তি যে কী অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকার রাখে, তা আমাদের লেখক শ্রী প্রমথনাথ বি.সি. তার “মন্ত্রশক্তি অদ্ভুত” গল্পে বেশ ভালোভাবেই বলে গেছেন ।
- কী, সেই গল্প ?
- বড় হলে তা পড়ে নিও । এখন ঘুমোও তো ? অনেক রাত হল ।
-হ্যাঁ, এখন আমি ঘুমিয়ে পড়ি । খুব ঘুম এসে গেছে ।
তারপর, শুচি সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল দেখলাম ।
বাচ্চারা কত সহজেই না ঘুমের দেশে চলে যায় ? যদি আমি বাচ্চা হয়েই থেকে যেতে পারতাম তো খুব ভালো হোত ।
---------------------------------------------------------------------------------------------------
From,
Sarajit Mondal,
Rajwada Springfield, Elachi, Narendrapur, Kolkata-700103.

