সঙ্গী যখন সোস্যাল মিডিয়া
গৌতম সমাজদার
বর্তমানে facebook একটি অতি জনপ্রিয় মাধ্যম, বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোন দেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করা যায়। সে দেশটাকে জানা যায়। সে দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরী করা যায়। যেকোন দেশের দূরবর্তী স্থানের মানুষের সাথেও সেটা সম্ভব। এর আগে চিঠি আদান প্রদানই ছিল একমাত্র মাধ্যম, যাতে অনেক দেরী হত। আজ মুঠোফোনে পৃথিবী আপনার আঙুলে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই শক্তিশালী মাধ্যমকে কিভাবে ব্যবহার করব আমরা?
আজ চাকুরীসূত্রে অনেকেই পৃথিবীর নানা দেশে থাকে। দেশে অসুস্থ বয়স্ক পিতামাতারা থাকেন। এই সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের দেখাদেখি হয়, কথার আদান প্রদান ঘটে। ফলতঃ এর মাধ্যমে মানবকল্যাণ সূচিত হয়। আজ আমরা এর ভাল আর খারাপ দিক সম্পর্কে জানব।
সোস্যাল মিডিয়াগুলো---ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, পিন্টারেস্ট,লিঙ্কডইন,ইউটিউব। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩ বিলিয়নের বেশি মানুষ যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে, সেটা জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ। এই সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। এটাকে মানুষের ক্ষমতায়নের হাতিয়ারও বলা চলে। এই মিডিয়ার হাত ধরে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণকর কাজও হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় অবদান মানুষ নিজের কথা বলার জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে। নিজের বোধ,বুদ্ধি,অনুভূতি,উপলব্ধি অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে পারছে। এক সামাজিক বিপ্লব এনেছে বলা যায়।
মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি ব্যক্তি মানুষের চাওয়া পাওয়া, বেঁচে থাকা, জীবন সংগ্রামের চালচিত্র ফুটে উঠছে। বিশ্বের নানা জনজাতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য দর্শন, রাজনীতি, সমাজনীতি, জ্ঞান বিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞান সমুদ্রের মণিমুক্ত আদান প্রদান করে নিচ্ছে। সাংস্কৃতিক ভাব বিনিময়ের অন্যতম বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাছাড়া সমাজের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কুসংস্কার, নানা ব্যভিচার, গোঁড়ামির মূলে কুঠারাঘাত করছে সোস্যাল মিডিয়া। রাজনীতিবিদদের ভাল বা খারাপ কাজের মূল্যায়ন করে। জনগণ, সরকার ও বিখ্যাত মানুষের এটা যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম আজ। বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও দেশের নিরাপত্তা ইস্যুতে যোগাযোগ রক্ষা করে। তর্ক, বিতর্ক ও সঠিক সমাধানের চেষ্টা করে। ব্যবসা, কর্মসংস্থান , ধর্মীয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির সুবিধা মানুষ গ্রহণ করছে। বিভিন্ন পরিসেবা ঘরে বসেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের সচেতনমূলক ছবি তৈরী করে শেয়ার করা, বিজ্ঞাপন, এর চেয়ে ভাল মাধ্যম কোথায়? এই মাধ্যমের মধ্য দিয়ে নিজের দক্ষতা পৃথিবীর মানুষের নজরে আনা সম্ভব।
সোস্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের রাশ থাকে না বলে মানুষের মাঝে হতাশা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়, এমন অনেক প্রমাণ আছে বিভিন্ন গবেষণাতে। এই মিডিয়ার ব্যবহার যে শুধুমাত্র মানসিক বিকার সৃষ্টি করছে তাই নয়, শারীরিক অসুস্থতাও তৈরী করতে পারে। বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের নিদ্রাহীনতা রোগ বৃদ্ধি একটা ভয়াবহ বার্তাই দিচ্ছে বলে জানা যায়। স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ, ডেস্কটপ স্ক্রিনের বেগুনী রশ্মি চোখের ব্যাপকভাবে ক্ষতিসাধন করে, সেটা সর্বজন স্বীকৃত। আরেকটি গবেষণায় জানা যায় যে সোস্যাল মিডিয়ায় যারা যত বেশি পরিমাণে সক্রিয় তারা বাস্তব জীবনে তত বেশি নিষ্ক্রিয়। সোস্যাল মিডিয়ায় অনেক ভুল তথ্য দেওয়া থাকে যা মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে। তাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।এটা ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন ধরনেরা মিথ্যা ভুল ধারণা, গুজব, উস্কানিমূলক পোস্ট ও ছবি গণ্ডগোলের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক গণ্ডগোল, বিদেশী এজেন্ডা, অর্থ প্রতারণা হতে পারে। নকল product বিক্রি,মিথ্যা ব্যবসা,অবৈধ কার্যকলাপ বিভ্রান্ত করতে পারে, যা দেশের বা পৃথিবীর ক্ষতি করতে পারে।
অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে টিন এজাররা অর্থাৎ যাদের বয়সসীমা তের থেকে ঊনিশ বয়সের মাঝে। জেনে বা না জেনে এর সাথে এমনভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে,তাতে তাদের জীবন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রচুর সময় কাটানোর ফলে তাদের পড়াশোনা ও মনের একাগ্রতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের সাথে, পরিবারের, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা কমে যাচ্ছে, মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে যা নিয়ে মা-বাবারা দুশ্চিন্তায় থাকেন, অশান্ত হয়। এই মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ও যুবক-যুবতীদের প্রলুব্ধ করার জন্য বর্তমানে ছবি, বার্তা ও ভিডিও ফিল্মের মাধ্যমে নোংরা প্রচার করা হচ্ছে। অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে প্রভাবিত করে বোকা বানাচ্ছে মানুষকে, বিজ্ঞাপন, যা সত্য নয় তা গ্রহণ করার ফলে। গ্ল্যামার বাড়ানোর জন্য সেগুলোর অনুকরণে বিপদ ঘটছে। গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেক গোপন আলোচনা ইন্টারনেটের সাহায্যে দুষ্কৃতীরা বিপদে ফেলতে পারে, বেশি ব্যবহারের ফলে রাত জেগে থাকায় ঘুম পর্যাপ্ত না হওয়া, ক্ষিধে কমে যাওয়া, কাজে অনীহা, ক্লান্তি এনে দিচ্ছে। ফলে জীবনে অসুস্থতা নেমে আসছে। অবসর সময়ে বই পড়া, গান শোনা, নাটক, সিনেমা দেখা থেকে বিরত থেকে হুমড়ি খাচ্ছে সোস্যাল মিডিয়ায়। সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমশঃ প্রাণহীন, নীরস, অসাড় হয়ে যাচ্ছে। একাকীত্বকে থামাতে গিয়ে চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মিডিয়ায় বিভিন্ন চমক ও পাগলাটে কাণ্ডকারখানা অনুসরণ করা, ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যু ডেকে আনছে।
কি কি পথ অবলম্বন করলে এই মোবাইল নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা বলার চেষ্টা করব---
১. প্রথমে প্রতিদিন কতটা সময় ব্যয় করেন সেটা বার করুন, তারপর ধীরে ধীরে কমাতে লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
২. দিনের নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখুন, গাড়ি চালানো, মিটিং এ, জিমে, dinner, lunch এ, বন্ধুদের সাথে, বাচ্চাদের সাথে খেলার সময়।
৩. মোবাইল, ট্যাব বিছানায় আনবেন না, change করার জন্য অন্য ঘরে রাখতে হবে।
৪. সামাজিক মিডিয়া, বিজ্ঞপ্তিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করুন।
৫. কম দরকারি সোস্যাল মিডিয়া অ্যাপসগুলো সরানোর চেষ্টা করুন।
৬. আপনার ফোকাস পরিবর্তন করুন। খুব কষ্ট হলে বন্ধুকে ফোন করুন, পরিবারের সাথে ছবি শেয়ার করুন।
৭. যদি সোস্যাল মিডিয়াকে বাস্তব জীবনের অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করেন তাহলে বেরিয়ে আসার জন্য কফি খাওয়াতে বন্ধুকে ডাকুন, হাঁটুন বা জিমে যান।
৮. সোস্যাল মিডিয়ায় অন্যদের সাথে কথোপকথন অনুসরণ করে। এটা অর্থপূর্ণ অনুভূতি আনে না বরং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৯. Off line বন্ধুদের সাথে বেশি সময় কাটান, সপ্তাহে একদিন আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখুন, মিলিত হন।
১০. ক্লাবে যোগ দিন,শখ, সৃজনশীল প্রচেষ্টা, ফিটনেস কার্যকলাপ খুঁজুন যা আপনি উপভোগ করুন।
১১. আত্মীয় স্বজন, সহকর্মীকে দুপুরে খেতে আমন্ত্রণ জানান।
১২. অপরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করুন।
১৩. মননশীলতার চর্চা বাড়ান।
১৪. বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যোগ দিয়ে মানুষের সাথে সময় কাটান।
আপনি যদি আপনার সন্তানের মিডিয়া ব্যবহারে চিন্তা করেন তাহলে ডিভাইস কেড়ে নিলে সমস্যা বাড়তেও পারে। পরিবর্তে বন্ধু সংখ্যা বাড়াতে বলুন, তাদের সাথে মিশতে দিন, আর সন্তানকে দায়িত্বশীল উপায়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মগুলোতে ব্যবহার কমাতে সাহায্য করুন। সন্তানের deta ব্যবহার সীমাবদ্ধ করুন। অন্তর্নিহিত সমস্যা সম্পর্কে বেশি করে বলুন, সন্তানকে শেখান সোস্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনের সঠিক প্রতিফলন নয়।
------------------

