দুর্গাপূজার উৎপত্তি এবং তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসার
দীপক পাল
হিন্দু বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয়া দুর্গাপুজা। শরৎকালে আশ্বিন কার্তিক মাসের শুক্লা তিথিতে মূলত দশ দিনব্যাপী এই উৎসব চলে যার মধ্যে নবরাত্রি ও শেষ পাঁচদিন পূজা। বসন্ত কালে যে দুর্গাপূজা হয় যাকে বাসন্তী পূজা বলে সে পূজার নিয়মও মোট দশ দিন নবরাত্রি ও বাসন্তী পূজা। বাংলায় এর একটি আধ্যাত্মিক পরম্পরা আছে। মায়ের উপাসনার মূল ভিত্তি কালিকা পুরাণ, দেবী ভাগবৎ এবং বৃহৎ নন্দীকেশ্বর পুরাণ। দূর্গা পূজার আচারের শাস্ত্রগত উল্লেখ মূলত বসন্তকালের চৈত্র মাসের শুক্লা তিথির বাসন্তী পুজাতে। শরৎকালের শ্রীরামচন্দ্র অকাল বোধনের না। এমনকি বাল্মীকির রামায়ণেও অকাল বোধনের কথা লেখা নেই। বাল্মীকির সংস্কৃত থেকে অনুদিত আটত্রিশটি ভাষার রামায়ণ এর মধ্যে শুধু কৃত্তিবাসের রচিত রামায়ণে অকালবোধনের কথা উল্লেখ আছে। কথিত আছে রাজা কংসনারায়ণরায় বাহাদুর প্রথম অকাল বোধন দুর্গাপূজা তাহেরপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ও অতি ধুম ধাম করে পূজা শুরু করেন। এই বিষয়ে ইতিহাসবিদদের কথায় রাজা গণেশ চন্দ্ররায় ভাদুরী সপ্তদুর্গায় প্রথম এই পূজা করেন। এই পূজা করার পিছনে একটা ইতিহাস আছে আর সেটা হচ্ছে তার ছেলে যদুনাথ সেই সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন অথবা গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এর ফলে হিন্দু বাঙালি সমাজের পন্ডিত ব্যক্তিগণ রাজার প্রতি ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি প্রমাদ গোনেন। সমস্ত পন্ডিতদের ডেকে একটা যজ্ঞ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তারা মত প্রকাশ করলেন যে এটা যজ্ঞের সময় না বরং তিনি দুর্গাপূজা করতে পারেন। গণেশ নারায়ণ দেবী দুর্গার ভক্ত ছিলেন। অতএব তিনি অত্যন্ত জাঁক-জমক সহকারে দুর্গা দেবীর আরাধনা ও পূজা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি কৃত্তিবাসকে এই দুর্গাপূজা রামায়ণে ঢোকাবার ব্যবস্থা করার আদেশ দিলেন। কৃত্তিবাস ছিলেন সভাকবি। তিনি পন্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর কাছে গিয়ে তার পরামর্শ চাইলেন। তার পরামর্শ মতো তিনি পড়লেন সংস্কৃতভাষায় লেখা এক রামায়ণ যার নাম ' 'অদ্ভুত রামায়ণ'। কিন্তু লেখকের নাম জানা যায় না। সেই রামায়ণে ' অকাল বোধনের ' কথা পাওয়া যায়। অতএব কৃত্তিবাসকৃত বাংলায় রামায়ণের সৃষ্টি হয়।
এদিকে বিদেশিরা রাময়ণে আকৃষ্ট হয়ে তাদের মতো করে লিখতে আকৃষ্ট হলো। পার্শিদের 'গ'এর উচ্চারণ অনেকটা আমাদের 'ক' এর মতো। তাই গণেশ নারায়ণ কালক্রমে কংস নারায়ণ হয়ে গেল, আর ইংরেজরা ভাদুরী পদবীর সাথে পরিচিত ছিল না কিন্তু রায় বাহাদুর জানত, তাই গণেশ নারায়ণ রায় ভাদুরী হয়ে গেল কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর। এটা গবেষকদের ধারনা। গণেশ নারায়ণ পালিয়ে যেতে ছেলে যদুনাথ ওরফে জালালুদ্দিন আর দুর্গাপূজা করার আগ্রহ দেখাননি। যদুনাথের স্ত্রী ছিলেন রাজশাহীর তাহেরপুরের অমরনাথ সান্যালের কন্যা। সেই কন্যার পুত্র অনুপ নারায়ণ ওখানকার পরিস্থিতি ভাল না লাগায় বিগ্রহ সমেত সব নিয়ে তাহেরপুরের রাজ পরিবারের ছায়ায় লুকিয়ে পরেন। রাজা বিগ্রহগুলো নিয়ে দুর্গাপূজা করে প্রচার করেন যে তারাই প্রথম দুর্গাপূজা করেন। রাজার পূজা বলে তা সহজেই তাহেরপুর তথা রাজশাহীতে যথেস্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরপরে বাঙালি সমাজে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে দুর্গাপূজা শারদীয়া রূপ নেয়। বিভিন্ন জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় তখন থেকেই তাদের ঠাকুরদালানে খুব ঘটা করে শাস্ত্রীয় প্রথায় শারদীয় দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান হতো। পারিবারিক পর্যায়েষোলশ দশ খ্রিস্টাব্দে বড়িষার সাবর্ণ রায়চৌধুরী দুর্গাপূজার কথা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে। কলকাতার জমিদার নব কৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজা, নদিয়ার ভবানন্দমজুমদারের দুর্গাপূজার কথা প্রায় ইতিহাস হয়ে গেছে।
নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তন্ত্রমতে খুব ঘটা করে বিভিন্ন পন্ডিতদের নির্দেশ মতো দেবী অন্নপূর্ণা পূজা করেন বাসন্তী পূজার অষ্টম তিথিতে অর্থাৎ বাসন্তী পূজার আগের দিন। যার ফলে রাজার পৃষ্ঠপোষিত দেবী অন্নপূর্ণা পূজা হয়ে যায় প্রধান, প্রাচীন বাসন্তী পূজা হয়ে পরে গুরুত্বহীন। তাই অকালবোধন দুর্গাপূজার দিকে মানুষের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। সতেরোশ নব্বই সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বার জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে প্রথম সর্বজনীন বারোয়ারী দুর্গা পূজার সূচনা করেন। উনিশশো দশ সালে কলকাতার বাগবাজারে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার উদ্যোগে পুরোপুরি জনসাধারণের জন্য এবং তাদের যোগদানের উদ্দেশ্যে বহু ব্যয় করে এই উৎসব বড়ো আকারে শুরু করার সূচনা করেন। বহু জনসাধারন বারোয়ারী এই দুর্গাপূজায় অংশ গ্রহণ করেন। বাগবাজারের দুর্গাপূজা জগৎবিখ্যাত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাঁদা তুলে সর্বত্র বারোয়ারি শারদীয়া দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পরেছে। এই পূজা বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব। এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব বটে। এটি ঐক্য, সংহতি ও ভালবাসার উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত ঝাড়খন্ড, বিহার, উড়িষ্যা, আসামের দুর্গাপূজা মহা ধুমধাম করে পালিত হয় ও সাংস্কৃতিক যজ্ঞ, বিভিন্ন সাধারণ ও সাংস্কৃতিক মেলার প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশে বিদেশে যেখানেই কিছু বাঙালি থাকে তারা সব জড়ো হয়ে একত্রে দুর্গাপূজা তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক উৎসব করে একটি সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি করে থাকে। ইউরোপ আমেরিকায় দুর্গাপূজা হয় একদিন কি দু দিন।সম্প্রতি UNESCO 2021 সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে Intangible Cultural Heritage মর্যাদা দান করে।
আগে একচালার পূজার প্রচলন ছিল। আদি পুরাণে দেবী দুর্গার মূল রূপ এবং তার সঙ্গে অঙ্গীভুত সিংহ ও মহিষাসুরের পূজার কথা বলা হয়েছে। সেখানে গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী বা লক্ষ্মী পৃথক ভাবে পূজার কোন উল্লেখ নেই। এই বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে দুর্গাপূজার মূল কাঠামোর সঙ্গে এই সহ-দেবতাদের সংযোজন পরবর্তীকালে ঘটেছে, যা একটা নতুন প্রথাগত প্রভাব এর ফলে দুর্গাপূজা কেবল মূল দেবীর আরাধনা মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সর্বাগ্রে মহাপূজায় রূপান্তরিত হয়, যার মধ্যে মহা স্নান, পূজা, হোম ও বলিদান অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট শাস্ত্রীয় ভিত্তি পাওয়া যায় কালীবিলাসতন্ত্রে। একচালা কাঠামো বাংলারএকান্নবর্তী যৌথ পরিবার কাঠামোকে নির্দেশ করে। প্রাচীন কালে দেবী দুর্গাকে মনে করা হতো দুর্গ রক্ষাকারী তাই তাকে বলা হতো দেবী দুর্গা। এক সময় দুর্গাকে বলা হতো মহিষমর্দিনী। তখনকার কৃষিজীবীদের কাছে দেবী ছিলেন মহিষমর্দিনী। কারন বন্য মহিষের দল চাষের ক্ষেতে ঢুকে ভয়ানক ফসল নষ্ট করতো। তখন ভারতের বিভিন্ন গুহা মন্দিরে স্থাপত্যের দুর্গা প্রতিমায় দুর্গাকে কেবল মহিষ বধ করতে দেখা যায়। এইসব ভাস্কর্যের মধ্যে কোন অসুরের চিহ্ন নেই। মহিষাসুরমর্দিনী এল সম্ভবত পাল ও সেন যুগ থেকে। দেবী দুর্গা মহিষমর্দিনী থেকে মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ পায়। পাল ও সেন রাজাদের আমল থেকেই দুর্গাকে সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পূজা করা হয়। মহিষাসুর ব্রহ্মার তপস্যা করেন ও তার বলে বলীয়ান হয়ে নিজে অজেয় রূপ ধারণ করে দেবরাজ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গ দখল করে দেবতাদের তাড়িয়ে দেন। দেবতারা ভগবান বিষ্ণুর কাছে গিয়ে তাদের দুর্দশার কথা ব্যক্ত করায় তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে পরেন। তারপর সমস্ত দেবতাদের একত্রিত করে মহিষাসুরবধ করার কথা প্রকাশ করেন। মহিষাসুরের স্পর্ধা দেখে সমস্ত দেবতারা রাগে অতি অগ্নিশর্মা হওয়ায় তাদের সমগ্র শক্তি একত্রিত হয়ে এক বিরাট শক্তি উৎপন্ন হয়ে সেখান থেকে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়। দেবতারা সবাই নানা প্রকার অস্ত্র শয্যায় দেবী দশভুজার দশ হাতে সাজিয়ে দিল। দেবী দুর্গা অসুর রাজ মহিষাসুরকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। কিন্তু অসুররাজকে বধ করার আগে একে একে নজন অসুরকে বধ করতে হয়। তার মধ্যে দুর্ধর্ষ শুম্ভ নিশুম্ভ, মধূকৈটভ ইত্যাদির পরে মহিষাসুরকে প্রচন্ড যুদ্ধ করে পরাস্ত ও বধ করেন। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গের সিংহাসন ফিরে পেলন। স্বর্গে শান্তি ফিরে এলো।
দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হলো দেবী দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত একটি হিন্দু উৎসব। এটি সারা বিশ্বে হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয়। শরৎকালে ও বসন্ত কালে চৌদ্দ বা পনের দিন ধরে এই উৎসব চলে। শরৎকালের পূজা বিশেষ করে হিন্দু বাঙালীর কাছে মহা উৎসব। মহালয়া থেকে বলতে গেলে প্রায় শুরু। সেই সময় অমাবস্যা থাকা কালীন অর্থাৎ পিতৃপক্ষ থাকতেই পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল সহযোগে জলদান উৎসব চলে। নদীর ধারে পুরুষের দল এই জলদান উৎসব করে থাকেন। বিশেষ করে কলকাতায় গঙ্গার ঘাটে ঘাটে প্রচুর লোক সমাগম হয়। ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশে, রাজস্থানের প্রভাস, উত্তরাখন্ডে লোকেদের প্রচন্ড ভিড় হয়। কেউ কেউ ঘরেই পুরোহিত দ্বারা পূর্ব পুরুষকে জল প্রদান করে। এরপর অমাবস্যা কালেই পিতৃপক্ষ থেকে মাতৃপক্ষ শুরু হয়। তখন নবরাত্রী শুরু হয়। ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন কলা বৌ স্নান করিয়ে গণেশের পাশে রাখে। তারপর ষষ্ঠী বিহিত পূজা হয়। অষ্টমীতে কুমারী পূজা ও অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় সন্ধিপূজা ও বলিদান। দশম দিনে হয় ভাসান। তার আগে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলা। আগে শুধু মহিলারাই খেলতেন। এখন অল্প হলেও পুরুষরাও এই সিঁদুর খেলায় যোগদান করেন স্ত্রীর সঙ্গে ছেলে মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে। তাতে সেটা একটা পারিবারিক উৎসবে পরিনত হয়। দশমীতেই বড় বড় ঠাকুর বিসর্জন হয় না। ছোট খাটো বারোয়ারী ঠাকুর এবং বাড়ির ঠাকুরেরই বিসর্জন হয়। এরপর সপ্তমীর সাতদিন পরে হয় লক্ষ্মী পূজা। এই পূজা শেষ হলেই দুর্গোৎসব মোটামুটি শেষ হয়।
-------------------------------------------------------
Dipak Kumar Paul, 9007139853,
DTC, Block-8, Flat-1B, Joka.


