তথাগত একটা জটিল সমস্যায় ফেঁসে গেছে। দুটো ট্রেন। এদিক থেকে ঝাঁ ঝাঁ করে ছুটে যাচ্ছে সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। পাশের লাইনে ওদিক থেকে মালগাড়ি। ইয়া লম্বা। চলছে ঢিকির ঢিকির। জানালার বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। ক্রিং ক্রিং। তবে সেটা সমস্যা নয়। প্রবলেমটা হচ্ছে দুটো ট্রেনের লেংথ আলাদা, স্পিড আলাদা। এক্সপ্রেস চলছে দেড়শো কিলোমিটার স্পীডে। বন্দে ভারত টারত হবে। ওতে বেশ টিফিন ফিপিন দেয়। জানালাগুলোও বেশ বড়ো বড়ো। গতবছর ওরা যখন...সে যাই হোক। আপাতত সমস্যা হচ্ছে ট্রেন দুটো ক্রস করতে কত সময় লাগবে ফ্রম ইঞ্জিন তো লেজের ডগা সেটা হিসেব করে দেখতে হবে। প্রবলেম নাম্বার তিন, ফোর্থ চ্যাপ্টার। ক্রিং ক্রিং।
রবিবারের বিকেল। এখন কি এসব বিদঘুটে ব্যাপার নিয়ে ঘরে বসে থাকার সময়? অন্যদিন এইসময় ও বাইরেই থাকে। এই হাউসিং কলোনীটায় খেলার মাঠ নেই। একটা ছোট পার্ক আছে, তাতে শুধু বাচ্চাদের দোলনা আর বুড়োদের বেঞ্চি। ওরা দু-চার জন রাস্তাতেই খেলে গলি ক্রিকেট বা ফুটবল। আর কেও না থাক, ঋদ্ধি থাকেই। খেলতে না বেরোলে ব্যালকনির নিচে থেকে ডাকাডাকি করে। তবে আজ ডাকবে না। ডাকলেও তথাগত যাবে না। ক্রিং ক্রিং। এ তো আচ্ছা মুশকিল!
জানালার পাশে যথাসম্ভব পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিচে উঁকি দিলো তথাগত। যা ভেবেছিলো তাই। আজ কেও খেলছে না। কে খেলবে? ঋদ্ধি একাই সাইকেল চালাচ্ছে। ব্যালকনির নিচে দাঁড়িয়ে বেল বাজাচ্ছে ক্রিং ক্রিং। আজ আর ওকে খেলতে ডাকতে হচ্ছে না। ডাকলেই কে যাচ্ছে। ভাঙা দাঁতের খালি মাড়িতে জিভ বোলাতে বোলাতে জানালা থেকে সরে এলো তথাগত। এও এক সমস্যা। জিভ কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না। বারবার চলে যাচ্ছে দাঁতের খালি স্লটে। সদ্য ভাঙা দাঁত। কাল যা হয়েছে, আজ আর খেলতে যাওয়া যাবে না। কি করা যায়? বিকেলে কেও অঙ্ক করে?
বাবাকে ডিসটার্ব করা যেতে পারে। রবিবার বিকেলে বাবা কুমিরের মত ঘুমোয়। মা তো রোজই।
"বাবা!"
"উঁ?"
"ও বাবা!"
"কি?"
"ঘুরতে যাবে?"
"না।"
"চলো না।"
"কোথায়?"
"জু যাবে?"
"উঁ? জু? বিকেলে তো বন্ধ।"
"মল এ চলো।"
"ওই ভিডিও গেম আর্কেড? নেভার।"
"তাহলে এমনি ঘুরবে চলো। রাস্তায় রাস্তায়।"
"শুধু শুধু তেল পোড়াবো? ফসিল ফুয়েল? তুই খেলগে যা না।"
"কেও খেলছে না।"
"হুম।"
"ও বাবা!"
"ধুত্তোর! তোমরা দুটোই বেরোও তো। ঘুমোতে দাও।" - মায়ের ঘুম চটকে গেছে। "সাইকেলটাকে একটু ধুপ ধুনো দাও না গিয়ে। পড়ে পড়ে ধুলো খাচ্ছে।"
ঘুম ঘুম চোখে বাবা পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে। গালে বালিশের দাগ। পাশে তথাগত। সামনে সাইকেল। তার কি অবস্থা! ঝুল আর ধুলো। মাসে দশে একবার হাত পড়ে। বাবার তো বাড়ি ফিরতে ফিরতেই রাত। আর রবিবার ঘুম। তথাগতর শেখাই হয়ে ওঠে নি এখনো। ঝাড়া মোছা, চাকায় হাওয়া, সব সেরে সাইকেল রাস্তায় নামলো। ক্রিং ক্রিং।
ঋদ্ধির সাইকেল হুশ করে পেরিয়ে গেলো। আড়চোখে একবার মেপে নিলো তথাগত। বাবার পরিচিত বক্তৃতাটা ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবার সাইকেল বেরোলেই হয়।
"মনে রাখবি ব্যালেন্সটাই আসল কথা। সেন্টার অফ গ্রাভিটিটাকে দু চাকার মাঝে রাখতে হবে। এদিক ওদিক হলেই টলে যাবে। তখন পা দিয়ে সাপোর্ট। স্পিডটা বড়ো কথা নয়। স্লো এন্ড স্টেডি। নাও স্টার্ট।" বাবা কেরিয়ার চেপে ধরে তৈরী। তথাগত সিটে উঠে বসতে গিয়ে বাঁদিকে কাত হয়ে বাবার বুকের ওপর।
"উঁহু! উঁহু! সোজা হও।"
বললেই কি সোজা হওয়া যায় নাকি? সাইকেলটা কী টেরিফিক ভারী লাগছে। বাবাকেই সাপোর্ট দিতে হলো। এক হাতে হ্যান্ডেল, এক হাতে কেরিয়ার।
"পা ওঠা।"
"পারছি না। পড়ে যাবো।"
"পড়বি না। ধরে আছি।"
প্যাডেলে চাপ দিতেই হ্যান্ডেল ল্যাগব্যাগ করে উঠলো। "স্লো! স্লো!" বাবা দৌড়োচ্ছে পাশে পাশে। হ্যান্ডেল ছাড়লেই ব্যালান্স বিগড়ে যাচ্ছে। কি মুশকিল। ঋদ্ধি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। হাসছে নাকি? দুম করে দুহাতে ব্রেক চেপে সিট থেকে জোড়া পায়ে লাফ। "কি হলো?" বাবা হাঁফাচ্ছে।
"পড়ে যাচ্ছি।"
"পড়ে যাওয়ার কি আছে?" বাবা বিরক্ত। টায়ার্ডও। "সিম্পল মেকানিক্স। ডানদিকে হেললে ডানদিকে হ্যান্ডেল ঘুরবে, বাঁদিকে হেললে বাঁদিকে। বডি ওয়েট দিয়ে এডজাস্ট করো। সেন্টার অফ গ্রাভিটি..."
"তুমি ছেড়ে দাও আঙ্কেল, ওভাবে হবে না।"
এই রে! ঋদ্ধি। কখন এসে দাঁড়িয়েছে বাবার বক্তৃতার মাঝখানে। নিজেকে সাইক্লিং -এর এক্সপার্ট ভাবে বোধহয়। সবাই চালায় রাস্তায়, ও চালায় পার্কিং লটে গাড়ির ভিড় পাশ কাটিয়ে, ড্রেন কভারের ওপর দিয়ে, পার্কের সিঁড়ির ধাপে। আজকাল স্টান্ট দেখানোরও চেষ্টা করছে। ফোন দেখে দেখে শিখছে নাকি। কাল ঝামেলাটাও তো ওখান থেকেই শুরু।
সন্ধে। ক্রিকেট বল হারিয়ে গিয়েছিল। খেলা বন্ধ। ওরা দু তিনজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পার্কের সিঁড়িতে। গুলতানি। হঠাৎ ঘাড়ের ওপর ঋদ্ধির সাইকেল। সবাইকে চমকে দিয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাপে লাফাতে লাফাতে ল্যাগব্যাগে সাইকেলটা ওদের ঠিক সামনে এসে একটা বিপজ্জনক বাঁক নিয়ে ক্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর অন্ধকারে টিউবলাইটের মতো দাঁত বার করে হাসি। দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায় তথাগতর।
"মজা বেরিয়ে যাবে তোর একদিন।"
"আরে কিছু হবে না। হুইলি করবো দেখবি? দাঁড়া।"
"ওই! সামলে। তোর বডি মাস স্ট্রিমলাইন কর, সিজি নড়ে গেলেই ধড়াম। আর যে অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টামটা ক্রিয়েট হচ্ছে তাতে..."
"হুঁহ। তোর ফিজিক্স দরকার নেই ভাই। তোকে বসিয়েও হুইলি করতে পারি আমি। দেখবি? বোস না, বোস? ভয় পাচ্ছিস?"
"পাগল নাকি! তুই যেটা করছিস সেটা বাহাদুরি না, পিওর লাক। ইটস অল মেকানিক্স ভাই। জাইরোস্কোপিক ইফেক্টটাই তো..."
"ছাড় তো। সাইকেল ধরতেই পারে না আবার বড়ো বড়ো কথা। তুই চালিয়ে দেখা।"
এরপরই দুম করে দু কান গরম হয়ে যায় তথাগতর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতদুটো ঝাঁপিয়ে পড়ে ঋদ্ধির ওপর। সাইকেলটা বিপদ বুঝে এক ঝটকায় সরে পড়ার চেষ্টা করতেই তথাগত হুমড়ি খেয়ে পড়ে রাস্তার ওপর, যদিও তথাগতর হাত ধরাশায়ী করে ফেলে সাইকেল সমেত ঋদ্ধিকেও। তারপর কিছুক্ষন দুজনেই ভুলে গিয়েছিলো তারা কী করছে।
"আমি দেখছি আঙ্কেল। তুমি ছেড়ে দাও।"
বাবা অবাক। "তুই আবার কী দেখবি?"
"সাইকেল চালাতে একটাই জিনিস লাগে আঙ্কেল। ওটা হলেই শিখে যায় সবাই।" ঋদ্ধি এগিয়ে এলো তথাগতর সামনে। "নে। শুরু কর। আমি ধরছি।"
"তুই পারবি?" তথাগতর গলায় অবিশ্বাস।
"তুই শুরু তো কর।"
"ফেলে দিসনা ভাই।"
বাবা দাঁড়িয়ে দেখছেন, সাইকেল ল্যাগব্যাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, ডানদিক, বাঁদিক, সোজা। কেরিয়ার ধরে ছুটছে ঋদ্ধি, বাঁদিক, ডানদিক, সোজা। চেঁচাচ্ছে, "ভাই সামনে তাকা, সামনে।" স্পিড বাড়ছে। দুজনেরই।
ধড়াম!
প্রথমে ঋদ্ধি। তারপর সাইকেল। তার ওপর তথাগত। বাবা দৌড়ে আসছেন। সাইকেল সরিয়ে ফেলে দিয়ে তথাগত টেনে তুলছে ঋদ্ধিকে। জামাপ্যান্টের ধুলো ঝেড়ে দিচ্ছে। ধুলোমাখা হাঁটু আর কনুই থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দেখা দিতে শুরু করছে। আর এতো সবকিছুর মাঝখানে ঋদ্ধি হাসি হাসি মুখে বলছে, "ব্যাস। এটাই বাকি ছিল। এবার সাইকেল শিখে গেলি তুই। আছাড় খেলেই সাইকেল শিখে যায় সবাই।"
"তোর ঠোঁট থেকে... রক্ত..."
"ও কিছু না। মিটমাট হয়ে গেল।" ঋদ্ধির মুখে সেই টিউবলাইটের হাসি। শুধু একটা দাঁত মিসিং। তথাগতর মতোই।
Nilesh Kr Layek
9234613360
38C professional flat
Kadma farm area
Jamshedpur
831005
ছবিঋণ- Gemini AI দিয়ে বানানো।
