গল্প ।। মহালয়ার তর্পণ ।। অঞ্জনা মজুমদার


 

মহালয়ার তর্পণ  

অঞ্জনা মজুমদার   


আজ সকালে পবনের ঘুম ভেঙেছে রেডিওতে সেই প্রতি বছরের মতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর মহালয়ার পাঠ, আশ্বিনের শারদপ্রাতে...  
তারপর সেই মন কেমন করা গান, বাজলো তোমার আলোর বেণু।
পবনকে আজ ডাকতে হয়নি। প্রতি বছর এই দিনে বাবা গঙ্গা স্নানে যান আর পবন বাবার জামা কাপড়ের ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ে। গঙ্গার জলে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে সবাই মন্ত্র পড়ে তর্পণ করেন পূর্ব পুরুষকে জল দেন আর পবন গঙ্গার অপর পারে সূর্য ওঠার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। লাল সূর্যটা কেমন টুপ করে জলের মধ্যে থেকে উঠেই কমলা তারপর হলুদ হয়ে যায় আর চারদিক আলোর বন্যায় ভেসে যায়। 
আজও বাবা খানিকটা জলে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়া শুরু করেছেন। এদিকে গঙ্গা তীরের ঝুপড়ির বাচ্চা ছেলে মেয়ে গুলো একটা ছেঁড়া ফুটবল নিয়ে নিজেরা হৈ হৈ করে খেলছে। পবন সেদিকে চেয়ে। ছেলের দল বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই মারামারিতে প্রত্যেক বার একটা ঝাঁকড়া চুলের বাচ্চা ছেলে, খালি গা প্রতিবার বলটা কেড়ে নিয়ে মাথার ওপর দুহাতে তুলে নেচে নিচ্ছে, আর অন্যরা তখন মাথা চুলকে হার মেনে নিচ্ছে। 
কিন্তু এবার একটু অন্য রকম খেলা হলো। বাচ্চারা খেলতে খেলতে একেবারে গঙ্গার ধারে চলে এসেছিল কেউ খেয়াল করেনি। বলটা একটু উঁচুতে উঠেছিল। সেই বাচ্চাটি লাফ দিয়ে বলটা ধরলো ঠিকই কিন্তু মাটিতে নামার বদলে সে সোজা বল শুদ্ধু জলে গিয়ে পড়লো। অন্য বাচ্চারা নাড়ুউউ  বলে চেঁচিয়ে উঠল।
কি জানি কি হলো পবনের, সে হাতের ব্যাগটা ফেলে দৌড়ে গঙ্গার পাড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে। 
জোয়ারের সময় এসে গেছে। জল ফুলে ফেঁপে উঠছে। সেই জলে নাড়ু হাবুডুবু খাচ্ছে। পবন সাঁতরে কাছাকাছি যেতে চাইছে। জলের প্রবল স্রোতে সময় লাগছে নাড়ুর কাছে যেতে। 
ইতিমধ্যে আরও চার পাঁচজন দক্ষ সাঁতারু জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পবন নাড়ুর কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হাঁপিয়ে উঠল। নাড়ুর ঝাঁকড়া চুল মুঠো করে ধরতেই অন্য দুজন এসে পড়েছে। নাড়ুকে আর পবনকে নিয়ে পাড়ে এসে পৌঁছাতেই নাড়ুর মা আর পবনের বাবা দৌড়ে এলেন। 
নাড়ু কিন্তু এতো কিছুর মধ্যেও সেই ফুটবল আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
পেটে চাপ দিতেই নাক মুখ দিয়ে জল বেরিয়ে নাড়ু চোখ মেলল।
নাড়ুর মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। ফুটবল পেলে আর কিছুই মনে থাকে না। মার কথাও মনে থাকে না? 
নাড়ুর মুখে এত কিছুর মধ্যেও মিটিমিটি হাসি। তাই দেখে পবন নিশ্চিন্ত মনে পেছন ফিরতেই বাবা আর অনেক মানুষের ভিড়।
বাবা বললেন, জানি তুই ভালো সাঁতার জানিস। তবে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা আর গঙ্গায় সাঁতার কাটা কি এক? 
পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন। পবনের হাত দুহাতে ঝাঁকিয়ে বললেন, সত্যিই তুমি সাহসী ছেলে। এমনই থেকো সারাজীবন। 
সেই বাচ্চা ছেলেদের দল এদিকে পবনকে ঘিরে ধরেছে। নাড়ুও কখন যেন পবনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পবনের হাত টেনে হেসে বলল, তুমি আমাদের সঙ্গে খেলবে দাদা? 
অফিসার বললেন, আজ আর খেলা নয়, আজ  সবাই মিলে জিলিপি আর কচুরি খাবো চলো সবাই। 
পবনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, আজ তুমিও আমাদের সঙ্গে জিলিপি খাবে।
বাচ্চারা নাচতে নাচতে দৌড়ল, আজ আবার পুলিশ কাকু জিলিপি খাওয়াবে। কি মজা, কি মজা! 
গঙ্গা তীরের পুরোহিত মশাইরা হেসে বললেন, এই পুলিশ বাবু মাঝে মাঝেই বাচ্চাদের জিলিপি খাওয়ান। 
একজন পুলিশ কনস্টেবল চোখের জল মুছে বললেন, এই মহালয়ার দিনেই স্যর তার ছেলেকে হারিয়েছেন। তাই এইদিন স্যর বাচ্চাদের মধ্যেই থাকতে চান।
পবন বাবার দিকে তাকাতে বাবা ইশারা করলেন যাবার জন্য। নিজেও পিছনে পিছনে চললেন। আজ নাড়ুকে বাঁচিয়ে পবন বাবার মহালয়ার তর্পণ সার্থক করেছে। 

========================== 
অঞ্জনা মজুমদার 
এলোমেলো বাড়ি 
চাঁদপুর পল্লী বাগান 
পোঃ  রাজবাড়ি কলোনী 
কলকাতা   ৭০০০৮১


 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad