গল্প ।। সব মহাজন মহাজন নন ।। মিঠুন মুখার্জী

 

 সব মহাজন মহাজন নন 

মিঠুন মুখার্জী 


অনেক বছর আগের একটা গল্প বলি শোন। এ গল্প একজন গরিব স্কুল মাস্টারের সর্বস্বান্ত হওয়ার কাহিনী। হাতের পাঁচ বাড়িটা ও কাটা তিনেক জমি ছাড়া তার আর তেমন কিছুই ছিল না। এখনকার মোটা টাকা বেতন পাওয়া নীতিভ্রষ্ট স্কুল মাস্টারের মতো তিনি ছিলেন না। তার উপর স্কুল মাস্টারের চাকরি করার জন্য এখনকার ছেলেমেয়েদের লক্ষ লক্ষ টাকা দেওয়ার লাইন পড়ে গেছে। তিনি তখনকার সময়ে খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল চার জন। তিন মেয়ে ও  সে। স্ত্রী অল্প বয়সে মারা গিয়েছেন।তারপর নিজের হাতেই তিন মেয়েকে তিনিই মানুষ করেছেন। স্কুলে পড়িয়ে তিনি যে টাকা বেতন পেতেন তাতে খাওয়া টুকু ছাড়া আর কিছুই তেমন হত না। বড় মেয়ে ঋতুর বয়স চব্বিশ, মেজ মেয়ে হৈমন্তীর বয়স ছিল কুড়ি আর ছোট মেয়ে রাধী ষোলো বছরের। তাদের প্রত্যেকের চার বছরের বয়সের পার্থক্য ছিল। বড় মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন। সমাজের মানুষের চিমটি কাটা তিনি পছন্দ করতেন না। কেউ তাকে শুনিয়ে বলতেন --- " মাস্টার মশাই আপনার ঋতুর কি বিয়ে দেবেন না? বিয়ের বয়স যে পেরিয়ে যাচ্ছে। পেছনে যে আরো দুটো লাইনে আছে। ঋতুর না দিলে ও দুটোর পথ পরিষ্কার হবে কি করে।" আবার গায়ে পড়ে কেউ বলতেন--- "আপনার মেয়ে কি আপনার মতো মাস্টারি করবে মাস্টারমশাই? এ গ্ৰামে ওর মতো বয়সের অবিবাহিত মেয়ে একটাও নেই। আমি কি ওর সম্বন্ধটা দেখে দেব? প্রেমটেম নেই তো? না আজকালকার মেয়ে তো বিশ্বাস করা যায় না।" তাদের কথা শুনে মাস্টারমশাই চুপচাপ থাকতেন। কখনো মুখ ফুটে বলতেন --- " না না বৌদি, ওদের বিয়ের চিন্তা আমাদের আছে। মাথার উপর যে বাবার তিনটি মেয়ে তার টেনশন থাকবে না! দেবো এক এক করে তিনজনকেই সুপাত্রস্ত করব। মেয়ে হয়ে যখন জন্মগ্ৰহণ করেছে তখন বিয়ে তো দিতেই হবে, ঘরে সারাজীবন আটকে রাখলে চলবে!!"
   মাস খানেক পর এক রেশন ডিলারের ছেলের সঙ্গে স্কুল মাস্টারের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়। ছেলেটির গায়ের রং কালো। তবে কালোর মধ্যে মুখের কাটিংটা ভালো। বাড়ির অবস্থা বুঝতে পেরে ছেলের বাবা মন্দিরে চার হাত এক করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু  মাস্টার মশাই রাজি হন নি। তিনি বলেন --- "বড় মেয়ের বিয়ে ওভাবে আমরা দেব না। আত্মীয়স্বজন আশা করেন, তাদের একেবারে নিরাশ করে এভাবে মন্দিরে বিয়ে দেওয়া যাবে না।" এরপর বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। মাস্টারের সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই ছিল না। তিনি মহাজনের কাছ থেকে হাজার পাঁচেক টাকা সুদে নেবেন বলে ঠিক করেন। মহাজনের কাছে গিয়ে সমস্ত বিষয়টি তিনি খুলে বলেন। মহাজনকে তিনি বলেন, যত তাড়াতাড়ি পারবেন তার সুদ-আসল শোধ করে দেবেন। মহাজন তখন তাকে বলেন---" টাকা দিতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু তার বদলে আপনার বাড়ি ও জমির দলিল আমার কাছে বন্ধক রাখতে হবে। শুধু মুখের কথার তো আজকাল বিশ্বাস নেই। পরিচিত মানুষের সঙ্গেই ঝামেলাটা বেশি বাঁধে।" গরীব স্কুল মাস্টার একেবারে নিরুপায় হয়ে জমির দলিল ও বাড়িটি মহাজন অমিয় ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বন্ধক রাখেন এবং পাঁচ হাজার টাকা নেন। টাকা দেওয়ার সময় দুমাস বেঁধে দেন তিনি। 
   বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে কেবল মাস্টার মশাই। একটা ছেলের আশা করতে করতে তিনটে মেয়ে হয় তার। সন্তান তাই ফেলে দিতে পারেন নি। তবে মেজ ও ছোট মেয়ে বাবার সঙ্গে থেকে অনেক কাজ করে দেয়। বিয়ের বাজার থেকে শুরু করে, বড় মেয়ের বিয়ের কাপড়, বরের ধুতি-পাঞ্জাবি, সামান্য সোনার অলংকার কেনা, পাড়ার লোক ও আত্মীয় স্বজনদের নিমন্ত্রণ বাবার সঙ্গে থেকে তারাই করে। মাস্টার মশাইয়ের ভগ্নিপতি ঋতুর প্যান্ডেলটা দিয়েছিলেন। বিয়ের দিন বরপক্ষ মেয়ের আশীর্বাদ সেরে নিলেও ছেলের আশীর্বাদ হয়েছিল এক সপ্তাহ আগে। সেখানেও বেশ কিছু টাকা খরচ হয়েছিল তার। দেখতে দেখতে গরিবনা মতে ঋতুর বিয়ে হয়ে যায়। খুব আনন্দ করে হৈমন্তী ও রাধী। বৌভাতের দিন প্রায় পঞ্চাশজন কন্যাযাত্রী ঋতুর শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। একটা গোলাপী রঙের শাড়ি পড়েছিল ঋতু। খুবই মানিয়েছিল তাকে। খুবই আনন্দের সঙ্গে কেটেছিল সেই রাতটা। চোখের জলে মাস্টার মশাই বিদায় দিয়েছিলেন বড় মেয়ে ঋতুকে। মায়ের নাড়ি ছেঁড়া ধন বড় করে সারাজীবনের জন্য একদিন অন্যের হাতে তুলে দিতে হয়। সমাজের এ এক নিষ্ঠুর নিয়ম। পিতা -মাতার থেকে তার উপর অন্যের অধিকার বেশি হয়ে যায়। মেয়েদের জীবনের দুঃখ এই সমাজ আজও বোঝে না।
দেখতে দেখতে দুমাস চলে যায়। মাস্টার মশাই মহাজনের টাকা পরিশোধ করতে পারেন না। কি করে তার কাছে তিনি মুখ দেখাবেন বুঝে উঠতে পারেন না। একদিন সকালে মহাজনের কাছে গিয়ে তিনি বলেন ---" দাদা আপনার টাকাটা আমি এখনো জোগাড় করতে পারিনি। আপনি আমায় আর কয়েকটা দিন সময় দিন। আমি আপনার টাকা দিয়ে দেব, মারব না।" মহাজন তাকে কোনো কথা না বলে চুপ করে থাকেন। মাস্টার মশাই মনে করেন তিনি সম্মতি জানিয়েছেন। তাই আর একমুহুর্ত বিলম্ব না করে বাড়িতে ফিরে যান। সংসারের চাপে ও কাজের ব্যস্ততায় তিনি টাকা শোধের কথা ভুলে যান। যখন মনে পড়ে তখন পরিশোধ করার মতো টাকা থাকে না। এদিকে তিনি ভুলে যান মহাজনের কাছে তার জমির দলিল ও বাড়িটা বন্ধক রাখা আছে। মহাজনও তার কাছে টাকা চায় না। মাস্টার মশাই মনে করেন মহাজন হয়তো তার পরিস্থিতি জেনে শুনেই তার কাছে টাকা চান না।
এভাবে দুবছর পেরিয়ে যায়। হঠাৎ একদিন সকাল বেলা মহাজন চারজন লেঠেল নিয়ে মাস্টার মশাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত হন। মাস্টার মশাই তখন বাড়ি ছিলেন না। হাটে গিয়েছিলেন বাজার করতে। মহাজনের গলা পেয়ে হৈমন্তী ও রাধী বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। তাদের দেখে মহাজন বলেন -- "আজ থেকে এ বাড়ি ও জমি আমার। এক সপ্তাহের মধ্যে এই বাড়ি খালি করে দিবি তোরা। তোর বাবা হাট থেকে  ফিরলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি। মেয়ের বিয়ের জন্য দুমাসের সুদে টাকা নিয়ে আজ দুবছর হয়ে গেল টাকা দেওয়ার একেবারে নাম করছে না। আমার কাছে বাড়ি ও জমির দলিল বন্ধকী তাও ওনার কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার টাকা সুদসহ না পেলে তোদের আমি ভিটে ছাড়া করব বলে রাখলাম।" মহাজনের আচরনে ভয় পেয়ে হৈমন্তী ও রাধী কান্নাকাটি করে। 
ঘন্টা দুয়েক পর মাস্টার মশাই হাট থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন তার মেজ ও ছোট মেয়ে মুখ গোমরা করে খাটের উপর বসে আছে। তিনি তাদের বলেন --- " কি হয়েছে তোদের, মুখগুলো অন্ধকার করে রেখেছিস কেন? তোদের কি কেউ কিছু বলেছে?" দুই মেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ কেঁদে ফেলে এবং ঘন্টা দুয়েক আগে ঘটা সমস্ত ঘটনাটি বাবাকে বলে। মাস্টার মশাই সব শুনে খুবই রেগে যান। তৎক্ষণাৎ তিনি মহাজনের বাড়ি যাওয়ার উদ্যোগ নেন। মেজ মেয়ে হৈমন্তী বাবাকে বলে--- " বাবা জ্যৈষ্ঠের এই দাবদাহে তুমি হাট থেকে ফিরেছ। এখন উত্তেজিত হয়ে তোমাকে ওই চামার মহাজনের বাড়িতে যেতে হবে না। তোমাকে অপমান করবে ও। আগামীকাল ঠান্ডা মাথায় আমরা তিনজন গ্ৰামপ্রধানকে সঙ্গে নিয়ে মহাজনের বাড়িতে যাব। এই দুবছরে পাঁচ হাজার টাকার সুদ - আসল কত হয়েছে জেনে তারপর একটা ব্যবস্থা করা যাবে।" মেয়ের কথা শুনে তিনি তখনি মহাজনের বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত হন। 
পরদিন সকালে মেজ মেয়েকে নিয়ে মাস্টার মশাই মহাজনের বাড়িতে যান। গ্ৰামপ্রধান অসুস্থ থাকায় যেতে পারেন না। তখন মহাজন খাটিয়ায় বসে হুঁকা খাচ্ছিলেন। তার দুপাশে দুজন লাঠিয়াল লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মাস্টার মশাইকে দেখে মহাজন বলেন ---- " আসুন মাস্টার মশাই। বসুন।" একজন লাঠিয়াল চেয়ার এগিয়ে দেয়। "এতোদিন বাদে আমার কথা মনে পড়ল আপনার। দুমাসের নাম করে টাকাগুলো আমার কাছ থেকে নিলেন, আজও দেওয়ার নাম করছেন না। আজ দুবছর হয়েগেল। সুদ-আসলে কতটাকা হয়েছে তা আপনি একবারও খোঁজ নিয়েছেন? আপনার সম্পত্তি হারানোর ভয় নেই?" মহাজনের কথা চুপচাপ শোনার পর মাস্টার মশাই বলেন--- " আমি অনেকবারই আপনার টাকা সুদসহ মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু সংসারের চাপে আপনার কাছে আসতে পারিনি। আপনার লেন দেন আমার সঙ্গে তাহলে আমার বাড়িতে গিয়ে মেয়েদের অপমানজনক কথা বলেছেন কেন? আর কতটাকা আপনার হয়েছে যে আপনি ওদের ঘর খালি করে দেওয়ার কথা বলেছেন। আমি তো আপনার কাছ থেকে এমন ব্যবহার আশা করি নি।" মাস্টার মশাই কথা শেষ না করতেই মহাজন বলেন --- " আমিও তো আপনার কথা এতো ঠুনকো তা জানতাম না। আগে যদি জানতাম তাহলে আপনাকে একটা টাকাও দিতাম না। এই দুবছরে আপনার সুদ-আসল মিলে হয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকা।" মহাজনের কথা শুনে মাস্টারমশাই একেবারে আকাশ থেকে পড়েন। তিনি কিছুক্ষণ হা করে মহাজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মেয়ে হৈমন্তী বাবার গায়ে হাত দিয়ে নাড়িয়ে বলে--- " কি হয়েছে বাবা? তুমি একেবারে চুপ হয়ে গেলে কেন?" সুদ-আসলের টাকা শুনে মাস্টারমশাই যেন কিছুক্ষণের জন্য সম্বিত হারিয়েছিলেন। তিনি মহাজনকে বলেন --- " কি বলছেন আপনি!! পাঁচ হাজার টাকার দুবছরের সুদ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা!! ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। আপনি কি আমায় বাংলাদেশের ধূর পেয়েছেন? না আমি অশিক্ষিত চাষাভূষ মানুষ!! আপনি আমায় হিসাব শিখাচ্ছেন?" মহাজন একটুও বিলম্ব না করে বলেন ---" আপনি দুমাসের সুদে টাকা নিয়েছিলেন। সেই টাকা সুদের সুদ তার সুদ ও প্রতিমাসে দ্বিগুন সুদ বাড়তে বাড়তে আজ মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা হয়েছে। আপনি হয় এক মাসের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করুণ নতুবা বাড়ি-জমি আমার নামে করে দিয়ে ওই বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসাবে থাকুন। মাসে দুশো টাকা ভাড়া দিলেই হবে।" মহাজনের কথা শুনে মাস্টারমশাই বুঝে যান তিনি মহাজনের ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। এই জাল কেটে বের হওয়া কঠিন। মহাজনের এমন উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি অবগত ছিলেন না। ফলে তিনি কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অবশেষে মনে সাহস সঞ্চার করে তিনি বলেন --- " আমি কিছুতেই আমার বাড়ি জমি আপনার নামে লিখব না। আপনি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এমন ঘোরতর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমি আদালতে যাব। দেশে আইন বলতে তো একটা কিছু আছে। এমনভাবে লোক ঠেকাবেন না। এতে গরিবের অভিশাপ লাগবে আপনার বংশে। এইভাবে টাকা সম্পত্তি কারো হজম হয় না।" মাস্টার মশাইয়ের কথা শুনে মহাজন বলেন --- " আপনি যেখানে ইচ্ছে যান। আপনি টাকা নিয়ে সঠিক সময়ে দেন নি। দুবছর পর টাকার জন্য ডেকে আনতে হচ্ছে। আবার আইনের ভয় দেখাচ্ছেন। ওইসব আইন আমার জানা আছে।" মাস্টার মেজ মেয়ে হৈমন্তীকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। মনে মনে ভাবেন--- "কোন কুক্ষণে যে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিতে গেছিলাম তা বুঝতে পারছি না। আগে জানলে অন্যভাবে পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করতাম।"
এরপর আরো একমাস কেটে যায়। এতো টাকা তিনি জোগাড় করতে পারেন না। মাথার ছাদ হারানোর ভয়ে তিনি খুবই ভেঙে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন মহাজনের সাথে আইনি পথে বেশীদিন সে লড়তে পাড়বে না। তার ক্ষমতা ও অর্থের কাছে তিনি চুনোপুঁটি। শেষমেষ নিরুপায় হয়ে মহাজনের সিদ্ধান্তকেই তিনি মেনে নেন। বাড়ি এবং জায়গা মহাজনের নামে লিখে দিয়ে মাসিক একশো টাকা ভাড়ার চুক্তিতে সেই বাড়িতে থাকেন তিনি। 
এদিকে বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বিষয়টা লোকের মুখে জানতে পেরে বড় মেয়ে ঋতুর প্রতি মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। শাশুড়ি বলেন--- " কোথা থেকে ভিখারী মাস্টারের মেয়ে আনলে কে জানে, থাকার মধ্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই একটুখানি বাড়ি ও জমি ছিল সেটাও মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে দিতে না পারায় মহাজন নিয়ে নিল। আমার বাবুর শ্বশুরবাড়ির ভাগ্য ভালো নয়। দিতে পারিস না তো টাকা ধার নিস কেন বাপু।" শাশুড়ির কথাশুনে ঋতুর দুচোখে জল দেখা যায়। সে মনে মনে ভাবে, এ জগতে গরিব হয়ে জন্মানো মহাপাপ। গরিবের কোনো মূল্য নেই ধনীদের কাছে। বৌমার বাবার বিপদের দিনে কোথায় নিজেরা গিয়ে দাঁড়াবে কিংবা ছেলেকে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলবেন তা নয় নিজেদের সুখের কথা চিন্তা করতেই ব্যস্ত তারা। আজ মানুষ চরম অমানবিক। নিজের ছাড়া অন্যের কথা চিন্তাও করে না।
মাস্টারমশাই স্কুলে গেলেও ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে তার ভালো লাগে না। বারংবার তার মাথায় ঘোরে কিভাবে সে ঘর-বাড়ি মহাজনের কাছ থেকে কিনতে পারবেন। হৈমন্তী ও রাধী বড় হয়ে উঠছে। ওদের তিনি কি ভাবে বিয়ে দেবেন। বড় জামাই ও বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনও খুব একটা সুবিধার নন। এইভাবে একটা বছর কেটে যায়‌। মাস্টার মশাইয়ের এরই মধ্যে একবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়। কপাল জোরে বেঁচে যান তিনি। মেয়েদের সেবা শুশ্রুষায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। 
কথায় আছে কাছা খুলতে সময় লাগে কিন্তু কপাল খুলতে সময় লাগে না। একদিন একটা টাকা দিয়ে মাস্টার মশাই ভাগ্য পরীক্ষা করান। একটা লটারির টিকিট কাটেন। পরদিন তিনি খবর পান সেই টিকিটে তার প্রথম পুরস্কার একলক্ষ টাকা বেঁধেছে। তিনি আনন্দে একেবারে আত্মহারা হয়ে যান। টাকা হাতে পেয়ে প্রথমে মহাজনকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বাড়ি ও জমি তার নামে কিনে নেন। বাকি টাকা দুই মেয়ের বিয়ের জন্য রেখে দেন। বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি এই খবরও লোকমুখে পৌঁছে যায়। এবার শাশুড়ি বলেন--- " আমার বৌমার বাবার কপালটা বেশ ভাল। এতটাকা একসাথে লটারিতে পাওয়ার কপাল আমাদের নেই ভাই। তা যাক মাথাগোঁজার জায়গা ও বাড়িটাতো ছাড়াতে পেরেছেন তিনি। আমরা তাতেই খুশি। খুব টেনশনে ছিলাম আমরা।" এতোদিন তিনি ছেলে-বৌকে শ্বশুরবাড়ি যেতে দেননি। আজ নিজের থেকেই ঘুরে আসতে বলেন তিনি। বাবার ব্রেইন স্ট্রোকের সময় ঋতু শ্বশুরবাড়িতে বসে শুধু চোখের জল ফেলেছে কিন্তু একটিবারও বাবাকে দেখতে যেতে পারে নি। আজও মেয়েদের পদে পদে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। 
একদিন সকালে হঠাৎ একজন ভদ্রলোক হৈমন্তীদের বাড়িতে আসেন। তিনি হৈমন্তীকে জিজ্ঞাসা করেন, "তোমার বাবা বাড়ি আছেন? আমার একটু দরকার ছিল।" সেই সময় দাঁত মাজতে মাজতে মাস্টার মশাই ঘর থেকে বাইরে আসেন। মাস্টার মশাই তাকে দেখে চিনতে পারেন। তিনি বলেন --- "আরে লাভপুরের মহাজন বিকাশ রঞ্জন আজ সকাল সকাল আমাদের বাড়িতে। কি ব্যাপার বন্ধু, কোনো দরকার?" মহাজন বিকাশ রঞ্জন দাস মাস্টার গোবিন্দ মন্ডলের বাল্য সঙ্গী। এক গ্ৰামে বড় হওয়া পড়াশোনা সবই একসঙ্গে ছিল। ভাগ্যের চাকায় আজ বিকাশ রঞ্জন মহাজন আর গোবিন্দ মন্ডল গরিব স্কুল মাস্টার। মহাজন বিকাশ রঞ্জন দাস মাস্টার মশাইকে বলেন---- " আমার দুই ছেলের তোর দুই মেয়েকে খুব পছন্দ। ওরা একদিন তোদের এই গ্ৰামে অফিসের কাজে এসেছিল। তখন তোর মেয়েদের দুজনকে দেখে ওদের খুব পছন্দ হয়। ওরা খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে জানায়। তা ওরা যে তোর মেয়ে তা তো আমি জানতাম না। আমি চাই আমার দুই ছেলের সঙ্গে তোর দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বন্ধুত্ব বেয়াইয়ের সম্পর্কে পরিনত হোক। আমি শুনেছি ওদের মা নেই। তবে তুই চিন্তা করিস না ওদের শাশুড়ি খুবই ভালো। মায়ের ভালোবাসা আশা করি ওর কাছ থেকে ওরা শতভাগ পাবে। আমার মেয়ে না থাকায় বৌমা নয় দুজন মেয়ে পাব আমরা। তাছাড়া তোর মেয়ে মানেই তো আমার মেয়ে।" মাস্টার মশাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। ভাবেন-- "এক মহাজন এতোদিন ধরে আমার শোচনীয় অবস্থা করে দিয়েছে, সেই মহাজনের ঘরেই মেয়েদের বিয়ে দেব! ওরা যদি সংসার করতে না পারে তবে তো আমার গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। এখন কি করি আমি !" মুহূর্তের মধ্যে আবার এটাও মনে আসে--- " সব মহাজন তো একরকম নন। সুদ খেলেও কেউ কেউ মানবিকও হন। মহাজন প্রজাদের উপকার করে মহৎ জনও হয়ে ওঠেন। তাছাড়া আমি যতটুকু শুনেছি মহাজন বিকাশ রঞ্জন দাস আর পাঁচটা মহাজনের মতো নন। ও গরীবের মন বোঝে। তাছাড়া ছেলেরা চাকরি করে। ও আমার বাল্যবন্ধু। আশাকরি যেটা হবে সেটা ভালোই হবে।" তিনি বাল্যবন্ধুকে বলেন--- " তোর যদি আমাকে বেয়াই বানাতে আপত্তি না থাকে তাহলে আমরও কোনো আপত্তি নেই। তোর ঘরে আমার মেয়েরা বউ হয়ে যাবে সেটা তো আমার সৌভাগ্য। তাছাড়া ওদের বিয়ের বয়সও হয়েছে। আজ না হয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে।" বিকাশ রঞ্জন দাস বন্ধুর কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তিনি বলেন --- " আমি খুব টেনশন নিয়ে এখানে এসেছিলাম। তোর বৌদি তো আমায় সোনার দুটো নেকলেস দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন 'মেয়ের বাবাকে রাজি করিয়ে সোনার নেকলেস দিয়ে দুজনকে আশীর্বাদ করে একেবারে পাকা কথা ও দিনক্ষণ ঠিক করে তাই ফিরবেন। আমার ছেলেদের বিয়েতে আর দেরি করব না। নাতি-নাতনী মানুষ করতে হবে তো।' তা তোর যদি আপত্তি না থাকে তবে আমার দুই হবু বৌমাকে আমি আজই আশীর্বাদ করে ফিরব।" বিকাশ বাবুর কথা শেষ হতে না হতেই মাস্টার মশাই বলেন--- " হ্যাঁ সে তুই করতেই পারিস, আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে এখানে বড় মেয়ে ঋতু ও বড় জামাই থাকলে খুবই ভালো হতো। বোনের বিয়ের আশীর্বাদ তো না জানলে খুবই কষ্ট পাবে।" এরপর বন্ধু বিকাশ বলেন --- "ঠিক আছে তোর বড় মেয়ের ঠিকানাটা দে আমার গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে তোর বড় মেয়ে ও বড় জামাইকে নিয়ে আসছে। তোর কোনো চিন্তা নেই। আশীর্বাদ আজই হবে।" একঘন্টার মধ্যে বড় মেয়ে ও বড় জামাই মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি এসে উপস্থিত হয়। সকলের উপস্থিতিতে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয় ও মেজ মেয়ে হৈমন্তীকে বড় ছেলের ও ছোট মেয়ে রাধীকে ছোট ছেলের বউ হিসাবে সোনার নেকলেস দিয়ে আশীর্বাদ করেন মহাজন বিকাশ রঞ্জন দাস। লজ্জায় লাল হয়ে যায় হৈমন্তী ও রাধী। বড় দি ঋতু দুজনকে খুব সুন্দর করে কাপড় পড়িয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল। দুজনকে সুন্দর সাজে গলায় সোনার নেকলেস দিয়ে অসাধারন লাগছিল। এরপর একঘন্টা অতিবাহিত করেন মহাজন বিকাশ রঞ্জন দাস। চা-বিস্কুট ও মিস্টির ব্যবস্থা করেন মাস্টার মশাইয়ের বড় জামাই। 
একমাস পর এক রবিবারে তাদের দুজনের খুব আড়ম্বরপূর্ণভাবে বিবাহ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয়েছিল। মাস্টার মশাইকে বন্ধু বিকাশ রঞ্জন দাস বলেছিলেন ---- " বিয়ে থেকে বৌভাত পুরো খরচ আমি করব। আমার ঘরে এক সঙ্গে দুদুটো লক্ষ্মী যাচ্ছে। মা লক্ষ্মীর কৃপায় আমার কোনো দিকেই কমতি নেই। তুই একেবারে চিন্তা করবি না। তোর মেয়েদের শ্বশুর হিসাবে নয় বন্ধু হয়ে বন্ধুর জন্য এটুকু তো করতেই পারি। তুই মেয়ে জামাইকে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করবি।" বন্ধুর মুখের উপর সেদিন কিছুই বলতে পারেন নি মাস্টার মশাই। শুধু মনে মনে ভেবেছিলেন--- " মহাজন শুধু সুদখোর হন না, মহাজন মানুষের কথা চিন্তা করে মহৎ জনও হন। আমার কত বন্ধু তো ছিল কিন্তু তারা তো কেউ এমন মানবিক নন। সব মহাজন মহাজন নন।" এরপর দুচোখে জল দেখা যায় মাস্টার মশাইয়ের। বন্ধু বিকাশ রঞ্জন দাসকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন---" তোর ঘরে আমার মেয়ে দুজনকে দিয়ে আমি খুব খুশি। মেয়েদের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই নিজের বাড়ি। আমার বিশ্বাস ওরা এবাড়ির থেকে তোর বাড়িতে বেশি সুখে থাকবে। আমি তো সারা জীবন ওদের কষ্ট ছাড়া তেমন কিছুই দিতে পারি নি। গরিব স্কুল মাস্টারের ঘরে সব চাহিদা পূরণ হয় না তা তো তুই জানিস। ভুল ত্রুটি হলে নিজের মেয়ে মনে করে ওদের তুই মানিয়ে নিস ভাই।" এরপর বন্ধুর হাতদুটো তিনি চেপে ধরেন। দুই মেয়েকে চোখের জলে বিদায় জানান তিনি।

----------------------------------- 






Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad