গল্প ।। অতুলনীয় ।। প্রতীক মিত্র

 

অতুলনীয় 

প্রতীক মিত্র 

 
এই বাড়িতে কত বছর হল খেয়াল আছে? নিজের মনেই ভাবছিলো অতুল। নব্বই টপকে এখনো একা একা বেঁচে আছে কি করে অন্যের তাকে নিয়ে এই ভাবনাতেই বেশ পুলকিত  হয়ে পড়ে সে। তাও ছেলেমেয়েদের ছেড়ে এই বাড়িতে বউএর সাথে এসেছিল বছর কুড়ি হল। বউ গত হওয়ার পর, তাও দশ বছর হবে, একাকীত্ব বিষয়টার মধ্যেও বেশ বীরত্ব খুঁজে পেয়েছে। সামনের পুকুর ঘেরা বাগান ওকে প্রলুব্ধ করে। ওর মনে হতে থাকে পা'গুলো যদি ঠিক থাকতো, একদিন ভেতরে যেত। পুকুরে মাছ, গাছে নানা ধরনের পাখি, আলোছায়া ... সব মিলিয়ে একটা যেন যাদুকরী পরিবেশ। পাড়ার একটা ব্যাপার আছে। কেউ কারো কথা ভাবে না। না ভালোয়, না মন্দে। যেই ছেলেটি দু'সপ্তাহ অন্তর ওষুধ দেয়, যেই মহিলা দু'বেলা খাবার দিয়ে যায় কিম্বা যে মাতাল চিৎকার করে অতুল এরই ঘরের সামনে মাঝে মাঝেই, এদের কাছ থেকেই খবরটা ছড়ায়। অধিকাংশই বলাবলি করতে থাকে যে লাশটা খুঁজে পেলে ভালো। তবে গেছে যখন বুড়োর জন্যে ভালোই হয়েছে, খুব কষ্ট পাচ্ছিল।অতুলের অনুপস্থিতি যখন ক্রমে ওই ক'জন আর শূন্যতা সয়ে নিচ্ছিলো, অতুল ফিরে আসে। জিজ্ঞাসা করলে ও বলতে পারে না ওই আর্থ্রাইটিস নিয়ে সে দোতলা থেকে নেমে বেশ খানিকটা হেঁটে ওই বাগানে গেল কিভাবে? ফিরলোই বা কি করে? রহস্যকে রহস্যই রেখে দেয় অতুল। ও জানে বাগানে মাছ-পাখি-গাছ-রোদ আর আঁধার ছাড়াও একটা বাচ্চা ছেলে ছিল যে ওকে দিক নির্দেশ করে সবটা ঘুরিয়েছিল। বাচ্চাটার সাথে তার শৈশবের অবয়বের মিল ছিল। বাচ্চাটাও জিজ্ঞাসা করতো, এই জীবনের কত বছর হল? ওখান থেকে মানে ওই বাগান থেকে ফেরার পর অতুলের যেন বৈষয়িক বুদ্ধি জেগে উঠেছে। ছেলেমেয়েদের  খবর পাঠিয়েছে।সম্পত্তির বিষয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে। সময় অঢেল নেই বলেই কেমন যেন বাস্তবিকবোধটা হৈহৈ করে বেড়ে গেছে তার মধ্যে। আর কোনো আফসোস নেই জীবনের এই দীর্ঘতার জন্য। বরং তার বেশ ভালোই লাগছে বেঁচে। তবে হ্যাঁ, বাগান থেকে দোতলার ব্যালকনিতে ওই বুড়ো মানে নিজেকে দেখার যে মজা সেইটাও ও গোপনই রাখতে চায়।
-----------------------------
প্রতীক মিত্র
কোন্নগর, হুগলী

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad