রহস্য গল্প ।। একটি অপ্রকাশিত খুনের গল্প ।। উৎপল সরকার



একটি অপ্রকাশিত খুনের গল্প

উৎপল সরকার 

 

ঘাড়ের ঠিক পেছনে যেন কেউ হঠাৎ বরফ-ঠান্ডা হাত রাখল। চমকে উঠল রাজীব।কয়েক মুহূর্ত সে বুঝতেই পারল না, সত্যিই কেউ তাকে ছুঁয়েছে, নাকি তার নিজের ভেতরের কোনও অদৃশ্য ভয় শরীরকে এমন শীতল করে দিয়েছে।

ট্রেন তখন দীঘা ছেড়ে শিলিগুড়ির দিকে ছুটছে। রাতের অন্ধকার কেটে জানালার বাইরে একের পর এক আলো পিছিয়ে যাচ্ছে। দূরের কোনও অচেনা স্টেশন, কোনও নিঃসঙ্গ বাড়ি, কোনও ঘুমন্ত জনপদ—সবকিছু কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা যাচ্ছে, তারপরই অন্ধকারের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। জানালার কাচে প্রতিফলিত আলোয় এক মুহূর্তের জন্য ঐন্দ্রিলার মুখটা দেখতে পেল রাজীব।সে হাসছে।কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই।আছে কেমন এক তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত নিশ্চয়তা।

—তুমি যাই বলো, রাজীব, আমি নিশ্চিত।

ঐন্দ্রিলার গলা শান্ত। অস্বাভাবিক রকম শান্ত।

রাজীব জানে, ঐন্দ্রিলা যখন এভাবে শান্ত হয়ে যায়, তখন তার ভিতরে ঝড় শুরু হয়েছে।

—কী নিয়ে নিশ্চিত?

রাজীবের গলায় বিরক্তির চেয়ে ক্লান্তিই বেশি।

—তুমি তারার সঙ্গে অনেক কিছুই করেছ।

—বিশ্বাস করো, ঐন্দ্রিলা। তারা আমার শুধু বন্ধু।

—শুধু বন্ধু?

ঐন্দ্রিলা মৃদু হেসে উঠল।সেই হাসিতে কোনও উষ্ণতা নেই।

—আর কিছু নয়।

রাজীব জানালার দিকে তাকাল।

—আর কিছু নয়।

কথাটা বলার পর নিজের কাছেই যেন তার কণ্ঠস্বর অপরিচিত মনে হল।

ঐন্দ্রিলা এবার একটু ঝুঁকে এল।

—তোমার মা নিজে আমাকে বলেছে।

রাজীব চুপ।

—ঘণ্টার পর ঘণ্টা দরজা বন্ধ থাকত। তোমার মা সহ্য করতে পারত না। বাইরে বেরিয়ে যেত। রাস্তায় হাঁটত। তুমি তখন বুঝতেই না, একজন মা তার ছেলের সংসারের ভিতরের অশান্তি কতটা টের পায়।রাজীবের বুকের মধ্যে পুরনো কোনও দরজা যেন শব্দ করে খুলে গেল।

সে কিছু বলতে চাইল। পারল না।

নিঃশব্দতারও একটা শব্দ আছে। সেই শব্দ কখনও কখনও সবচেয়ে নির্মম। ঘরের ভিতর সেই শব্দটাই যেন কথাগুলোকে গিলে নিচ্ছিল।কিছুক্ষণ পরে রাজীব ধীরে বলল,

—আমি স্বীকার করছি, তোমার সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর  কিছুদিন ভাড়া বাড়িতে থাকার সময় তারার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বেড়েছিল। আমরা ঘুরেছি। অনেক কথা বলেছি। কিন্তু কখনও সীমা পেরোয়নি।

ঐন্দ্রিলার চোখ দুটো হঠাৎ বদলে গেল।

—একটা ছেলে আর মেয়ের আবার বন্ধুত্ব !

—কেন হবে না?

—হয় না।

—তোমার ধারণা।

—আমার ধারণা নয়। আমার বোধ।

ঐন্দ্রিলার গলায় এবার চাপা উত্তেজনা।

—আমি জানি, রাজীব ।তুমি কী করেছ, কোথায় করেছ—সব জানি।

রাজীব তাকিয়ে থাকে ঐন্দ্রিলার  দিকে।

—তুমি সত্যিই সব জানো?

ঐন্দ্রিলা উত্তর দেয় না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।

ঝগড়াটা রাতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। পুরনো অভিযোগ, পুরনো অভিমান, পুরনো হিসাব—সবকিছু যেন হঠাৎ একসঙ্গে ফিরে আসে। পঁচিশ বছরের দাম্পত্যে এমন ঝগড়া নতুন নয়। তাদের সংসারে অনেকদিন ধরেই ভালোবাসার চেয়ে অভ্যাসের আয়ু বেশি।শেষ পর্যন্ত দুজনেই নিজেদের অভ্যস্ত আলাদা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।সেই আলাদা বিছানাগুলোই যেন তাদের বিবাহিত জীবনের শেষ আশ্রয়।

 

রাত আরও গভীর হলে পাশের ঘর থেকে নিঃশব্দে উঠে আসে ঐন্দ্রিলা।

রাজীব তখনও জেগে।

ঐন্দ্রিলা তার পাশে বসে।

কিছুক্ষণ কোনও কথা বলে না।

তারপর রাজীবের হাত ছুঁয়ে খুব আস্তে বলে,

—তুমি এখনও রেগে আছ?

রাজীব মুখ ফেরায়।

হালকা হাসে।

—আমার রাগ কি কখনও এতক্ষণ থাকে?

ঐন্দ্রিলা আরও কাছে আসে।

—শোনো…

—হুম?

—আমরা দীঘা যাচ্ছি।

রাজীব অবাক হয়ে তাকায়।

—কী?

—দুদিনের জন্য।

—এখন?

—হ্যাঁ, এখনই ঠিক করেছি।

রাজীব কিছু বলার আগেই ঐন্দ্রিলা তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। অনেকদিন পরে সেই স্পর্শে রাজীবের মনে হয়—এই মানুষটাকে সে যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছিল। এই ঐন্দ্রিলা তার চেনা। তার প্রথম জীবনের ঐন্দ্রিলা। যে একসময় রাগের মধ্যেও হাসতে পারত, অভিমানের পরেও হাত বাড়িয়ে দিতে পারত।হয়তো মানুষ বদলায় না।শুধু একে অপরের চোখে তার চেহারাটা বদলে যায়।

 

দীঘার সমুদ্র সেদিন অদ্ভুত শান্ত।

জোয়ারের পর সমুদ্র সাধারণত যেমন থাকে, তার থেকেও যেন বেশি নিশ্চুপ। ছোট ছোট নিস্তেজ ঢেউ এসে বালির গায়ে মাথা রেখে ফিরে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ নেই। দূরে সমুদ্রের মাঝে কয়েকটা আলো স্থির হয়ে জ্বলছে।

নোনা বালিতে পাশাপাশি বসে আছে রাজীব আর ঐন্দ্রিলা।কতদিন পরে তারা এমন করে পাশাপাশি বসেছে, কেউ হিসাব রাখেনি।

ঐন্দ্রিলা শিশুর মতো গলায় বলল,

—খুব মজা হল, তাই না?

রাজীব একটু হাসল।

—হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—শুরুর পরের দিনগুলোতে যদি তোমাকে এমন পেতাম…

বাকিটা আর শেষ করল না।

ঐন্দ্রিলা তার দিকে তাকাল।

দুজনেই হাসল।অদ্ভুত শান্ত সমুদ্রও যেন চুপ করে তাদের কথা শুনছিল।

সেই মুহূর্তে রাজীবের মনে হয়েছিল, মানুষের জীবন বোধহয় এমনই। একটা সম্পর্ক ভাঙতে ভাঙতে কখনও কখনও হঠাৎ এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয়—সবকিছু আবার শুরু করা যায়।কিন্তু মানুষ যে সবসময় নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখতে পারে না।

ফেরার দিন।

হোটেলের ঘরে জিনিসপত্র গোছানো হচ্ছে।রাজীব বাইরে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখল, ঐন্দ্রিলা ফোনে কথা বলছে।

তার গলায় অদ্ভুত কাঁপুনি।

—টুবলু…

  রাজীব   বুঝলো ওপাশে ছেলের গলা।

ঐন্দ্রিলা বলল,

—আমি তোকে বলেছিলাম, তোর বাবা বদলাবে না।

রাজীব দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গেল।

—কী হয়েছে, মা?

—এখানে এসেও লুকিয়ে লুকিয়ে তারাকে মেসেজ করছে।

—কী বলছ মা?

—যতবার তোর বাবা অনলাইন, ততবার তারাও অনলাইন।একটা দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর ঐন্দ্রিলা বলল,

—এরপর আর আমাদের একসঙ্গে থাকার কথা বলবি না। তোকে ঠিক করতে হবে—বাবা না মা।

ওপাশে টুবলু চুপ।

তারপর ঐন্দ্রিলা আরও নিচু গলায় বলল,

—এখন আবার মদ খাচ্ছে।

ফোন কেটে গেল।

রাজীব তখন অনেকটা দূরে চলে এসে হোটেলের বারান্দার থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে।তার মনে হল, সে যেন নিজের জীবনের কোনও অচেনা দৃশ্য দেখছে।

ঐন্দ্রিলা কাঁদছিল।

আবার একটু পরেই হাসছিল।

কান্না আর হাসি—দুটোই যেন মেপে মেপে।রাজীবের বুকের ভিতর হঠাৎ একটা শূন্যতা তৈরি হল।এত বছর একসঙ্গে থেকেও সে বুঝতে পারেনি, একজন মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষকে ধীরে ধীরে মুছে দিতে পারে।

শুধু শরীর থেকে নয়।

স্মৃতি থেকে।

বিশ্বাস থেকে।

তারপর একদিন এমনভাবে, যেন সে কোনওদিন ছিলই না।

 

রাত বারোটা।

দীঘা থেকে শিলিগুড়ির দিকে ছুটছে ট্রেন।বগির অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে।কেউ কম্বলের ভিতর মুখ ঢুকিয়ে শুয়ে আছে। কেউ মোবাইলের আলোয় শেষবারের মতো কোনও বার্তা পড়ছে। ট্রেনের চাকার একটানা শব্দ যেন একটা যান্ত্রিক লোরি হয়ে চারপাশের ঘুমকে আরও গভীর করে তুলেছে।

রাজীবের চোখে ঘুম নেই।

ঐন্দ্রিলা পাশের সিটে ঘুমিয়ে আছে।

তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রাজীব।

এই মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল।

এখনও কি ভালোবাসে?

উত্তরটা নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।

সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

—আমি টয়লেটে যাচ্ছি।

ঐন্দ্রিলার হাতটা ছুঁয়ে বলল।

কোনও উত্তর এল না।

রাজীব দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে বাইরে তাকাল।রাতটা অদ্ভুত সুন্দর।

আকাশ পরিষ্কার। দূরে অসংখ্য তারা। ট্রেনের গতি যেন পৃথিবীকে পিছনে ফেলে ছুটে যাচ্ছে। সঙ্গে আকাশের বুকে তারা গুলোও যেনো দূরে সরে সরে যাচ্ছে।রাজীবের হঠাৎ মনে হল, এই আকাশেরও কোনও শেষ নেই।মানুষের দুঃখের মতো।কোনও সীমা নেই।হঠাৎ মনে হল—আকাশটা যেন তাকে ডাকছে।

 

ঠিক তখনই—

পেছন থেকে ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা হাতের একটা ধাক্কা।

মাত্র এক মুহূর্ত।

তারপর—

চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে গেল  রাজীবের শরীর।অন্ধকারের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড যেন সবকিছু ভাসতে থাকল।তারপর কংক্রিটের সঙ্গে প্রচণ্ড আঘাত।সব শব্দ থেমে গেল।

 

দু’মাস পরে।

সেই ফ্ল্যাট। যেখানে কদিন আগেও  রাজীব ছিল বা হয়তো থেকেও ছিল না।

ড্রয়িংরুমে কয়েকজন মানুষ বসে আছে।টেবিলের ওপর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।ঐন্দ্রিলা চা দিচ্ছে।তার মুখে কোনও আতঙ্ক নেই।টুবলু রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ টুবলুর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।সে মুখ ফিরিয়ে কেঁদে ফেলল।বাবাকে সে খুব ভালোবাসত।
Uploaded Image

বাবার সঙ্গে তার মতের অমিল ছিল, অভিমান ছিল, কিন্তু বাবাকে হারানোর কথা কখনও ভাবেনি।মানুষ কখনও কখনও যাকে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি পায়, তার কাছ থেকেই সত্যিটা সবচেয়ে দেরিতে জানতে পারে।টুবলু কাঁপা হাতে রিপোর্টটা আবার তুলে নিল।

রিপোর্টে লেখা—

“Death due to fall from moving train under influence of alcohol.”

ঘরটা নিঃশব্দ।

কেউ কোনও কথা বলল না।

জানালার বাইরে তখন বিকেলের আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।ঐন্দ্রিলা কাপটা টেবিলে রেখে জানালার দিকে তাকাল।তার মুখ শান্ত।খুব শান্ত। সাধারণত ঝড়ের পরে যেমন হয়।

শুধু কেউ জানে না—

ঝড়টা বাইরে হয়েছিল,

নাকি তার ভিতরে।

 ----------------------------

 

লেখায়--- উৎপল সরকার

নিউটাউন, জেলা আলিপুরদুয়ার

যোগাযোগ:-৭০০১২৯৭৪৫৯

ই ডাক:-utpalwbmo@gmail.com

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad