বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার সময় পৈ পৈ করে ঋতু বলে গেল , তরু থাকল ম্যানেজ করে নিও । আমি কয়েক দিনের জন্য বাবার বাড়িতে যাচ্ছি ।
সজনীকান্ত মুখের দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে চেয়ে ভাবল । কাপড়চোপড় গোছগাছ করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ার পর বলছে । আগে থেকে কেন বলেনি ? বাপের বাড়িতে স্ত্রী যাবে স্বামীকে মুখের কথাটুকু আগে থেকে বললে কেমন হয় ? সংযত হয়ে মনে মনে ভাবল সৌজন্যতার অভাব । কারণ সে তো না বলবে না । এর আগে বহুবার গেছে । প্রথম প্রথম বলত । একেবারে নাছোড় ছিল একবারই । ঋতুর ভাইর বিয়েতে সজনীকে বরকর্তা করে নিয়ে যাবে বাবা-মা বলেছিল তাই । যাক সে কথা । বিবাহের বয়স বাড়লে স্বামী নামক বস্তুটার গুরুত্ব হারায় । স্বাধীনতা পেয়ে বসেছে । দাম্পত্য জীবনের বয়স যত বাড়ে গুরুত্বও তত বাড়াতে হয় । মেয়ে মানুষ কিনা হয়তো তাই।
তরুলতা এবাড়ির কাজের মেয়ে । যথারীতি সকাল সাতটায় আসে সারাদিন বাড়ির সব কাজ সম্পন্ন করে সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে যায় । নিজের বাড়িতে ছেলে- মেয়ে আছে , বর আছে । একসময় বর তো রাজমিস্ত্রী ছিল । অসুস্থ হয়ে ইদানিং কাজ করে না । বাড়িতে বসে ঠোঙা বানায় , ঝাঁটা- ঝাড়ু- খেলনা তৈরি করে প্লাটফর্মে বিক্রি করে । ভোরের বেলা রান্না করে আলু সেদ্ধ ভাত , কোনোদিন ডাল সবজি । ছেলে-মেয়ে দু'টো তাই-ই নিজের হাতে তুলে খেয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ির সংলগ্ন স্কুলে । স্কুল ফেরতা বাবার সঙ্গে দেখা করে হালকা কিছু খাবার কিনে দিলে আনন্দ ভরে ভাই বোনে ভাগবাঁটা করে খায় । তরু কি আর কাজের মেয়ে ? স্বামীটা ছাদ ঢালাইয়ের সময় অসাবধানে পড়ে একটা পা খুইয়েছে । তারপর তরু বাধ্য হয়ে দু'বাড়িতে কাজ করত । সজনী অফিস যাওয়ার পথে আলাপ তারপর গত বছর থেকে একটাই বাড়িতে কাজ করে । তরু মেয়েটি কর্মঠ , আচরণ কথাবার্তায় ভালো । সে খুবই বিশ্বস্তও বটে । যখন সে মাধ্যমিক পাশ করেছে বাপের বিয়ে দেবার জন্য তড়িঘড়ি পড়ে গেল । মান সম্মানের ভয়ে কর্মঠ ছেলে ধরে গঁতিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত । সে বাপের বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়েছে।
পরের দিন বেলা প্রায় ন'টা বাজল তখনও তরু আসেনি । এত করে তরুকে বলে গেল সব জেনেও তবুও আসেনি কেন ? রাস্তায় কোনও দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু । এই ভাবতে ভাবতে সজনী স্নান সেরে তৈরি হচ্ছে অফিসে বেরিয়ে যাবার জন্য ।
তরুর চোখ লাল অশ্রু ভেজা চোখের পাতা । চোখে মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট ।
ক্ষমা করবেন দাদাবাবু । আসতে দেরি হয়ে গেল । আসার পথে হোটেল থেকে খাবার এনেছি খেয়ে অফিসে যান ।
তুমি আবার খাবার কিনে আনলে কেন ? আমিও কি কিনে খেতে পারতাম না ? কত নিয়েছে ? আমার থেকে টাকা নিও ।
আমার দেরিতে আসার জন্যই তো কিনতে হল ?
দেরি হল কেন ? ঘর মুছবে কখন ? রান্না হয়নি বাসন-কোসন মাজা হয়নি ; ইলেকট্রিক বিল দিতে যেতে হবে , গ্যাস শেষের পথে বুকড করেছি আনতে হবে । সব জেনেও দেরি করলে ? এত করে পৈ পৈ করে বলে গেল তোমার বৌদি ?
আমি কি আর ইচ্ছে করেই দেরি করেছি ?
তাহলে ?
কোলের মেয়েটার তিন দিন জ্বরে ভুগছে । গতরাতে মারা গেছে ! বলে কান্না চেপে ধরে রাখতে পারল না ।
সেকি !! মেয়ের জ্বর হয়েছে বলোনি তো ?
কেন ! বৌদিকে বলেছি আউটডোরে ডাক্তার দেখাতে যাবো একদিন ছুটি চেয়েছিলাম । উনি সাফ বলেই দিলেন , এ মাসে ছুটি হবে না ! ছেলে-মেয়ের দুঃখ-কষ্ট কি সবাইকে বোঝে ? হয়তো বাঁচানো যেতো । কপাল যখন পোড়ে কেউ কি দেখে ?
সজনীকান্ত বিস্ময়ে নিষ্পলক নেত্রে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে ! কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ স্ত্রী বাবার বাড়িতে যাবার কথা বলে গেল শ্যালিকার সঙ্গে বেড়াতে । হঠাৎ কালকে ঠিক করেছে ঋতু ফরাক্কা যাবে বোনের সাথে । সেখান থেকে তারাপীঠ - শান্তিনিকেতন -বোলপুর হয়ে দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দিরে পূজা দিয়ে আসবে বাড়িতে । দশ বছর বিয়ে হয়েছে নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে গর্ভে সন্তান আসেনি তাই । যার সন্তান নেই সে কি বোঝে সন্তান হারানোর মর্ম ।
সজনীর চোখে জল বাধা মানছে না।
থাক তোমাকে আর কোনো কাজ করতে হবে না । চলো - অফিস যাব না । তোমার বাড়িতেই যাব । তুমি কি মা না পাষাণী ?
-----------------------------------
সজনীকান্ত মুখের দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে চেয়ে ভাবল । কাপড়চোপড় গোছগাছ করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ার পর বলছে । আগে থেকে কেন বলেনি ? বাপের বাড়িতে স্ত্রী যাবে স্বামীকে মুখের কথাটুকু আগে থেকে বললে কেমন হয় ? সংযত হয়ে মনে মনে ভাবল সৌজন্যতার অভাব । কারণ সে তো না বলবে না । এর আগে বহুবার গেছে । প্রথম প্রথম বলত । একেবারে নাছোড় ছিল একবারই । ঋতুর ভাইর বিয়েতে সজনীকে বরকর্তা করে নিয়ে যাবে বাবা-মা বলেছিল তাই । যাক সে কথা । বিবাহের বয়স বাড়লে স্বামী নামক বস্তুটার গুরুত্ব হারায় । স্বাধীনতা পেয়ে বসেছে । দাম্পত্য জীবনের বয়স যত বাড়ে গুরুত্বও তত বাড়াতে হয় । মেয়ে মানুষ কিনা হয়তো তাই।
তরুলতা এবাড়ির কাজের মেয়ে । যথারীতি সকাল সাতটায় আসে সারাদিন বাড়ির সব কাজ সম্পন্ন করে সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে যায় । নিজের বাড়িতে ছেলে- মেয়ে আছে , বর আছে । একসময় বর তো রাজমিস্ত্রী ছিল । অসুস্থ হয়ে ইদানিং কাজ করে না । বাড়িতে বসে ঠোঙা বানায় , ঝাঁটা- ঝাড়ু- খেলনা তৈরি করে প্লাটফর্মে বিক্রি করে । ভোরের বেলা রান্না করে আলু সেদ্ধ ভাত , কোনোদিন ডাল সবজি । ছেলে-মেয়ে দু'টো তাই-ই নিজের হাতে তুলে খেয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ির সংলগ্ন স্কুলে । স্কুল ফেরতা বাবার সঙ্গে দেখা করে হালকা কিছু খাবার কিনে দিলে আনন্দ ভরে ভাই বোনে ভাগবাঁটা করে খায় । তরু কি আর কাজের মেয়ে ? স্বামীটা ছাদ ঢালাইয়ের সময় অসাবধানে পড়ে একটা পা খুইয়েছে । তারপর তরু বাধ্য হয়ে দু'বাড়িতে কাজ করত । সজনী অফিস যাওয়ার পথে আলাপ তারপর গত বছর থেকে একটাই বাড়িতে কাজ করে । তরু মেয়েটি কর্মঠ , আচরণ কথাবার্তায় ভালো । সে খুবই বিশ্বস্তও বটে । যখন সে মাধ্যমিক পাশ করেছে বাপের বিয়ে দেবার জন্য তড়িঘড়ি পড়ে গেল । মান সম্মানের ভয়ে কর্মঠ ছেলে ধরে গঁতিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত । সে বাপের বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়েছে।
পরের দিন বেলা প্রায় ন'টা বাজল তখনও তরু আসেনি । এত করে তরুকে বলে গেল সব জেনেও তবুও আসেনি কেন ? রাস্তায় কোনও দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু । এই ভাবতে ভাবতে সজনী স্নান সেরে তৈরি হচ্ছে অফিসে বেরিয়ে যাবার জন্য ।
তরুর চোখ লাল অশ্রু ভেজা চোখের পাতা । চোখে মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট ।
ক্ষমা করবেন দাদাবাবু । আসতে দেরি হয়ে গেল । আসার পথে হোটেল থেকে খাবার এনেছি খেয়ে অফিসে যান ।
তুমি আবার খাবার কিনে আনলে কেন ? আমিও কি কিনে খেতে পারতাম না ? কত নিয়েছে ? আমার থেকে টাকা নিও ।
আমার দেরিতে আসার জন্যই তো কিনতে হল ?
দেরি হল কেন ? ঘর মুছবে কখন ? রান্না হয়নি বাসন-কোসন মাজা হয়নি ; ইলেকট্রিক বিল দিতে যেতে হবে , গ্যাস শেষের পথে বুকড করেছি আনতে হবে । সব জেনেও দেরি করলে ? এত করে পৈ পৈ করে বলে গেল তোমার বৌদি ?
আমি কি আর ইচ্ছে করেই দেরি করেছি ?
তাহলে ?
কোলের মেয়েটার তিন দিন জ্বরে ভুগছে । গতরাতে মারা গেছে ! বলে কান্না চেপে ধরে রাখতে পারল না ।
সেকি !! মেয়ের জ্বর হয়েছে বলোনি তো ?
কেন ! বৌদিকে বলেছি আউটডোরে ডাক্তার দেখাতে যাবো একদিন ছুটি চেয়েছিলাম । উনি সাফ বলেই দিলেন , এ মাসে ছুটি হবে না ! ছেলে-মেয়ের দুঃখ-কষ্ট কি সবাইকে বোঝে ? হয়তো বাঁচানো যেতো । কপাল যখন পোড়ে কেউ কি দেখে ?
সজনীকান্ত বিস্ময়ে নিষ্পলক নেত্রে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে ! কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ স্ত্রী বাবার বাড়িতে যাবার কথা বলে গেল শ্যালিকার সঙ্গে বেড়াতে । হঠাৎ কালকে ঠিক করেছে ঋতু ফরাক্কা যাবে বোনের সাথে । সেখান থেকে তারাপীঠ - শান্তিনিকেতন -বোলপুর হয়ে দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দিরে পূজা দিয়ে আসবে বাড়িতে । দশ বছর বিয়ে হয়েছে নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে গর্ভে সন্তান আসেনি তাই । যার সন্তান নেই সে কি বোঝে সন্তান হারানোর মর্ম ।
সজনীর চোখে জল বাধা মানছে না।
থাক তোমাকে আর কোনো কাজ করতে হবে না । চলো - অফিস যাব না । তোমার বাড়িতেই যাব । তুমি কি মা না পাষাণী ?
-----------------------------------


