অণুগল্প ।। পাষাণী ।। সুদামকৃষ্ণ মন্ডল

 

পাষাণী  

সুদামকৃষ্ণ মন্ডল


বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার সময় পৈ পৈ করে ঋতু বলে গেল  , তরু থাকল ম্যানেজ করে নিও  ।  আমি কয়েক দিনের জন্য বাবার বাড়িতে যাচ্ছি  ।
      সজনীকান্ত মুখের দিকে বিস্মিত চোখে চেয়ে চেয়ে ভাবল । কাপড়চোপড় গোছগাছ করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ার পর বলছে  । আগে থেকে কেন বলেনি  ? বাপের বাড়িতে স্ত্রী যাবে স্বামীকে মুখের কথাটুকু আগে থেকে বললে কেমন হয় ? সংযত হয়ে মনে মনে ভাবল সৌজন্যতার অভাব  । কারণ সে তো না বলবে না  । এর আগে বহুবার গেছে ।  প্রথম প্রথম বলত ।  একেবারে নাছোড় ছিল একবারই  । ঋতুর ভাইর বিয়েতে সজনীকে বরকর্তা করে নিয়ে যাবে বাবা-মা বলেছিল তাই ।  যাক সে কথা  । বিবাহের বয়স বাড়লে স্বামী নামক বস্তুটার গুরুত্ব হারায়  । স্বাধীনতা পেয়ে বসেছে  । দাম্পত্য জীবনের বয়স যত বাড়ে গুরুত্বও তত বাড়াতে হয় ।  মেয়ে মানুষ কিনা হয়তো তাই।
        তরুলতা এবাড়ির কাজের মেয়ে । যথারীতি সকাল সাতটায় আসে সারাদিন বাড়ির সব কাজ সম্পন্ন করে সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে যায়  । নিজের বাড়িতে ছেলে- মেয়ে আছে , বর আছে । একসময় বর তো রাজমিস্ত্রী ছিল  । অসুস্থ হয়ে ইদানিং কাজ করে না  । বাড়িতে বসে ঠোঙা বানায়  ,  ঝাঁটা- ঝাড়ু- খেলনা তৈরি করে প্লাটফর্মে বিক্রি করে  । ভোরের বেলা রান্না করে আলু সেদ্ধ ভাত  , কোনোদিন ডাল সবজি  । ছেলে-মেয়ে দু'টো তাই-ই নিজের হাতে তুলে খেয়ে বেরিয়ে যায় বাড়ির সংলগ্ন স্কুলে ।  স্কুল ফেরতা বাবার সঙ্গে দেখা করে হালকা কিছু খাবার কিনে দিলে আনন্দ ভরে ভাই বোনে ভাগবাঁটা করে খায় ।  তরু কি আর কাজের মেয়ে  ? স্বামীটা ছাদ ঢালাইয়ের সময় অসাবধানে পড়ে একটা পা খুইয়েছে ।  তারপর তরু বাধ্য হয়ে দু'বাড়িতে কাজ করত । সজনী অফিস যাওয়ার পথে আলাপ তারপর গত বছর থেকে একটাই বাড়িতে কাজ করে  । তরু মেয়েটি কর্মঠ  , আচরণ কথাবার্তায় ভালো  । সে খুবই বিশ্বস্তও বটে । যখন সে মাধ্যমিক পাশ করেছে বাপের বিয়ে দেবার জন্য তড়িঘড়ি পড়ে গেল  । মান সম্মানের ভয়ে কর্মঠ ছেলে ধরে গঁতিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত । সে বাপের বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়েছে।
       পরের দিন বেলা প্রায় ন'টা বাজল তখনও তরু আসেনি  । এত করে তরুকে বলে গেল সব জেনেও তবুও আসেনি কেন  ? রাস্তায় কোনও দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু  । এই ভাবতে ভাবতে সজনী স্নান সেরে তৈরি হচ্ছে অফিসে বেরিয়ে যাবার জন্য  ।
     তরুর চোখ লাল অশ্রু ভেজা চোখের পাতা  । চোখে মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট   ।
    ক্ষমা করবেন দাদাবাবু  । আসতে দেরি হয়ে গেল ।  আসার পথে হোটেল থেকে খাবার এনেছি খেয়ে অফিসে যান  ।
    তুমি আবার খাবার কিনে আনলে কেন  ? আমিও কি কিনে খেতে পারতাম না  ? কত নিয়েছে ?  আমার থেকে টাকা নিও  ।
    আমার দেরিতে আসার জন্যই তো কিনতে হল ?
     দেরি হল কেন  ? ঘর মুছবে কখন  ? রান্না হয়নি বাসন-কোসন মাজা হয়নি ;  ইলেকট্রিক বিল দিতে যেতে হবে ,  গ্যাস শেষের পথে বুকড করেছি আনতে হবে ।  সব জেনেও দেরি করলে  ? এত করে পৈ পৈ করে বলে গেল তোমার বৌদি  ?
     আমি কি আর ইচ্ছে করেই দেরি করেছি  ?
     তাহলে  ?
     কোলের মেয়েটার তিন দিন জ্বরে ভুগছে ।  গতরাতে মারা গেছে  ! বলে কান্না চেপে ধরে রাখতে পারল না ।
    সেকি  !!  মেয়ের জ্বর হয়েছে বলোনি তো  ?
   কেন  ! বৌদিকে বলেছি আউটডোরে ডাক্তার দেখাতে যাবো একদিন ছুটি চেয়েছিলাম  । উনি সাফ বলেই দিলেন  , এ মাসে ছুটি হবে না  ! ছেলে-মেয়ের দুঃখ-কষ্ট কি সবাইকে বোঝে ?  হয়তো বাঁচানো যেতো ।  কপাল যখন পোড়ে কেউ কি দেখে ?
      সজনীকান্ত বিস্ময়ে নিষ্পলক নেত্রে  নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে  !  কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ স্ত্রী বাবার বাড়িতে যাবার কথা বলে গেল শ্যালিকার সঙ্গে বেড়াতে । হঠাৎ কালকে ঠিক করেছে ঋতু ফরাক্কা যাবে বোনের সাথে  । সেখান থেকে তারাপীঠ - শান্তিনিকেতন -বোলপুর হয়ে দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দিরে পূজা দিয়ে আসবে বাড়িতে  । দশ বছর বিয়ে হয়েছে নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে গর্ভে সন্তান আসেনি তাই  । যার সন্তান নেই সে কি বোঝে সন্তান হারানোর মর্ম  ।
      সজনীর চোখে জল  বাধা মানছে না।
     থাক তোমাকে আর কোনো কাজ করতে হবে না ।  চলো - অফিস যাব না  । তোমার বাড়িতেই যাব  । তুমি কি মা না পাষাণী ?

----------------------------------- 

Sudamkrishna Mondal
C/O Sahitya Monjari
Vill - Purandar pur (Akshay Nagar)
Post - Akshay Nagar
P .S. Kakdwip
Dist. South 24 Parganas
Pin Code.743347
West Bengal. India




   

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad