কি যেন একটা শব্দ হলো। বাইরে বেরিয়ে দেখি প্রচন্ড বৃষ্টি আর মেঘ ডাকার আওয়াজ।বাড়ির সামনের কাঠচাঁপা গাছটা গোড়া থেকে উপরে উঠেছে। বাবা এক নিমিশেই ঘর থেকে ছুট্টে আসতে চাইলে রানু দিদি বাধা দিলো। বাবা একঝটকায় রানু দিদির হাতটাকে সড়িয়ে দাওয়া থেকে সটান উঠোনে ঝাঁপ মেরে দেহের সব শক্তি দিয়ে গাছটাকে তোলার চেষ্টা করছে। মুশুল ধারে বৃষ্টি আর মেঘের গর্জন। মা ও বাবাকে ডাকছে চলে এসো বলছি। আমি নিচে নামতে যাবো এমন সময় এক ভীষণ জোরে ধমক। মনে হয় মেঘের থেকেও বেশি শক্তিশালী ছিলো সেই আওয়াজ।
মা অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমরাও হতবাক। রোগা জিরজিরে চেহারার সেই বাবা আজ যেন বাহুবলি হয়ে একাই প্রকৃতির সাথে লড়ছে। আর সারা শরীর জুড়ে উঠে আসতে এক মায়াবী শক্তি। পাশের বাড়ি থেকে নিতাই কাকা 'কি'রে এই বৃষ্টিতে কি করছিস ? ঘরে ঢোক। যখন তখন বিপদ হয়ে যেতে পারে। বাবা অবাক দৃষ্টিতে কাঠ চাঁপা গাছটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আর কি একটা বিড়বিড় করে বলছেন। যত বলছেন তত হাতের শিরাগুলো উঁচু হয়ে উঠছে আর প্রকাস্ট শক্তিশালী মানুষ হয়ে উঠছেন।
অবশেষে গাছটাকে দাঁড় করালেন। কিন্তু কোথায় যেনো মাটির সাথে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। ওই কাঠ চাঁপাগাছ এখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। বাবা জানতেন তবুও তাকে আপ্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা। তড়িঘড়ি করে পাশের ঘর থেকে শাবল আর কোদাল নিয়ে এলেন গাছটাকে পিলারে ঠেসন দিয়ে রেখে। যত খুঁড়ছেন দেখছেন সব মাটি আলগা হয়ে গেছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে হাউমাও করে কেঁদে উঠছেন। প্রকৃতির বিপক্ষে যেনো ওই একলা মানুষটিই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
বৃষ্টি থেমেছে। গাছটি আবার মাটিতে ঢলে পড়েছে। বাবার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। বাবা অবশ্য আমায় প্রায় বলতেন আমার জীবনের সব চেষ্টাই ব্যর্থতার রঙে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমি কিছুতেই ঘর থেকে বেরোতে পারছিনা। বাবা যদি আবার ধমক দেন। তবুও আমি ভয়ে ভয়ে বোরোলাম। উঠোনে নামলাম। দেখলাম শুধু কাঠচাঁপা নয় আমার বসানো পুঁই গাছ টাও ছিঁড়ে গেছে। হয়তো বাবা কাঠচাঁপা গাছটা তুলতে গিয়ে কোনোভাবে ছিঁড়ে ফেলেছেন। আমি গাছটাকে কেটে রান্নাঘরে রেখে দিলাম।
বাবা গত তিনদিন হচ্ছে কোনো খাবারই মুখে তুলছেন না। অদ্ভুত ভাবে গাছটাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদছেন। না ঠিক কান্না বলা চলেনা। কারণ এক ফোঁটা ও চোখের জল পড়ছেনা। আমাদের সকল চেষ্টাই বৃথা। আজ একসপ্তাহ পূর্ন হলো। বাবা একইভাবে গাছের গোড়ায় বসে আছেন। এবার ওই গাছটাকে কেন্দ্র করেই তার ডালপালা নিয়ে একটা চেয়ারের আকৃতি তৈরী করলেন। তবে কোনোভাবেই গাছকে আঘাত না করেই তিনি ওই চেয়ার তৈরী করলেন। ঠিক চেয়ার নয়, তবুও... বাড়ি থেকে ঠিক দু মাইল দূরে আমাদের একটা জলা জমিতে সেটিকে রেখে তারওপর তিনি বসে রইলেন। আমি রোজ তিনবেলা খাবার দিয়ে আসি বাবাকে। বাবা একটাও কথা বলেন না আর। আমি গিয়ে খাবার টা রেখে চলে আসি। বাবা কখন সেটিকে গ্রহণ করেন সেটা আমি জানিনা। কিন্তু বোধ হয় খাবারটা খান। প্রতিসময় যখন ফিরে আসি দেখি ফাঁকা পাত্র। মা রোজ কাঁদেন। কাছে গিয়ে ফিরে আসার আকুতি করেন। কিন্ত সব চেষ্টাই ব্যর্থ। জমিকে কেন্দ্র করে এখন একটা ঘর করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মধ্যিখানে সেই কাঠের বানানো একটা চেয়ার এখনও একই জায়গায়। বাবা তারওপর বসে আছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর একই ভাবে জট পরা চুল দাড়ি আর একটা আস্ত ভেঙে পড়া মানুষের উপন্যাস।
দিন চলে যায় রানু দিদির ও বিয়ে পাকা হয়। বিয়ের দিন রানু দিদি অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। তবুও বাবা ফিরলেন না একইভাবে সেই চেয়ারটায় বসে আছেন। আমি অবাক দৃষ্টিতে রানুর দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি কি সরলতায় আঁকা কত বছর পেড়িয়ে আসার গল্প। আর কাঠ চাঁপাগাছের নিচে আমাদের খেলার দিনগুলোয় বাবা আসলেই দৌড়ানোর স্মৃতি। তাহলে কি সবটাই শুধু গল্প হয়ে থেকে যাবে?
---------------------
তীর্থঙ্কর সুমিত
মানকুণ্ডু, হুগলী
পিন - ৭১২১৩৯
মো - ৯৭৪৮০৫২২২০

