ধারাবাহিক উপন্যাস ।। মাধব ও মালতি (পরিচ্ছেদ-১৫) ।। সমীরণ সরকার


prem

 

মাধব ও মালতি 

সমীরণ সরকার 


(পূর্বকথা:--চেতকের পিঠে চেপে মানবেন্দ্র নারায়ণ যখন কমলাপুর গ্রামে পূর্ণিমাদের বাড়িতে পৌঁছালো , তখন গভীর রাত।
গর্ভবতী পূর্ণিমা সে রাতে  নিজের বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে বাইরে উঠোনে বেরিয়ে এসেছিল। দুশ্চিন্তায় ছটফট করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল কামিনী ফুল গাছের নিচে।
মানবেন্দ্র নারায়ন কে অত রাতে ওখানে দেখে পূর্ণিমা বিশ্বাস করতে পারছিল না। 
সাদা ঘোড়া  চেতককে দেখে এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ যেভাবে চেতনাকে বাজিতে জিতেছিল,
এই ঘটনা জেনে পূর্ণিমা শুধু বিস্মিত হল না, তার ভালোবাসার মানুষ মানবেন্দ্র নারায়ন সম্পর্কে গর্বিত হল। 
সে রাতে  মানবেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে গৃহত্যাগ করলো পূর্ণিমা।)

---------------------
               
বাঁকুড়া থেকে জয়পুর যাওয়ার রাস্তা জঙ্গলাকীর্ণ। নিস্তব্ধ গভীর রাতে সেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে চলেছে মানবেন্দ্র নারায়ণ ও পূর্ণিমা। পুরো ব্যাপারটা পূর্ণিমার কাছে এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও তার গর্ভের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করছিল। আর প্রতিমুহূর্তে মনে পড়ছিল তার ভালোবাসার মানুষ , তার প্রাণাধিক প্রিয় রাজকুমারের কথা। সে মনে মনে ভাবছিল যে, কমলাপুর গ্রামে বসে সে কিভাবে তার কুমারের কাছে খবর পাঠাবে যে, পূর্ণিমার গর্ভে এখন তাঁর সন্তান বড় হচ্ছে। কিভাবে সে তার সন্তানকে রক্ষা করবে?  আর এখন? এখন সে কত নিশ্চিন্ত। এই আপাত নিশ্চিন্ততার মধ্যেও সে চিন্তান্বিত এই ভেবে যে, আজ এত বছর বাদে রামু মামা তাকে আর তার রাজকুমারকে থাকতে জায়গা দেবে তো,?
যদিও বা দেয়, সংসার চলবে কী করে,? তার রাজকুমার তো ধনী পিতার সন্তান। সাধারণ কোন কাজকর্ম করা তার পক্ষে তো সম্ভব নয়। 
তাছাড়া রামু মামার অর্থনৈতিক অবস্থা তো তেমন সচ্ছল নয়। পুজো আচ্চা করে সংসার চালায় কোনমতে। সেই আয়ের উপরে দু দুটো আরো বাড়তি পেটের বোঝা তিনি সামলাবেন কী করে?
কিন্তু ওখানে না উঠলে এই মুহূর্তে তার রাজকুমারকে নিয়ে সে কোথায় যাবে? আর তো কেউ পরিচিত নেই তার। 
ঘোড়ার পিঠে পূর্ণিমাকে বসিয়ে তাকে প্রায় দুহাতে বেষ্টন করে ঘোড়ার লাগামটা ধরে রেখেছে মানবেন্দ্র নারায়ণ। প্রতিমুহূর্তে পূর্ণিমার শরীরের স্পর্শ তাকে মাতাল করে তুলছিল।
পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ে যাচ্ছিল যে, না, এখন তার 'পুনি'কে বেশি বিরক্ত করা ঠিক হবে না। 
ও মা হতে চলেছে। তার সন্তানের মা। 
কিন্তু 'পুনি' যে বলছে তাকে 'সোমড়া' না কোথায় নিয়ে যাবে, সেখানে  নাকি তার এক মামা আছে, সেখানে গিয়ে সে কত দিন তার পুনিকে নিয়ে থাকবে? তাকে তো এবার উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? সে তো তেমন কোন কাজ জানে না। ঠিক আছে, ওখানে গিয়ে পৌঁছানো যাক, তারপর চিন্তা করা যাবে। 
এভাবে ঘোড়ার পিঠে চেপে যাওয়াটা পূর্ণিমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগছিল। গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জঙ্গলের ভিতরে মুঠো মুঠো জোনাকির জ্বলা আর নেভায় তৈরি হয়েছে আলো আর আঁধারের রহস্যময়তা।
মাঝে মাঝে জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসছে বুনো জন্তুর আওয়াজ। ভেসে আসছে 
রাতচরা পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ ।আর‌ মাঝে মাঝে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করা তীক্ষ্ণ চিৎকারে ভীত করে তুলছে পরিবেশ।
জঙ্গলের  ভিতরে দৌড়ে যাওয়া শিয়াল বা অন্য বুনো পশুর পায়ের চাপে শুকনো পাতা ভাঙছে মচমচ শব্দে।
বুনো পশুর ভেসে আসা ডাক মন দিয়ে শুনল, পূর্ণিমা। এ ডাক পূর্ণিমা চেনে। এটা। তো গন্ধগোকুলের ডাক। একটা নয়, দুটো ডাকছে একসাথে।।
এবার রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের একটু ভিতরে ঘোড়া নিয়ে গেল মানবেন্দ্র নারায়ন। জঙ্গলের ভিতরে কিছুটা জায়গা যেন একটু পরিষ্কার। গাছপালার সংখ্যাও সেখানে অপেক্ষাকৃত কম। পুনি দেখতে পেল,সেখানেই একটা মস্ত বড় ঝাঁকড়া গাছ ডালপালা মেলে  একটু জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী গাছ ওটা? বট নয়। তাহলে এত বড় গাছটার অনেক স্তম্ভ মূল থাকতো।
 পুনি দেখতে পেল, ওই গাছটার প্রায় গা‌ ঘেঁষেই আছে একটা মাটির দোতলা ঘর।
ভিতর থেকে হালকা আলোর আভা বেরিয়ে আসছে।মানবেন্দ্র নারায়ন সেদিকেই এগিয়ে নিয়ে চলল ঘোড়াকে।

                   
  পনেরো

আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক শ্রী সুধীর কুমার মিত্র রচিত'হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গ সমাজ' গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে,' বলাগড় থানার অন্তর্গত 'সোমড়া' এককালে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল। এখানকার 'রাধাগোবিন্দের' মন্দিরে প্রতিদিন দ্বাদশ জন ব্রাহ্মণ এবং পঞ্চায়েত জন ভিক্ষুককে নিয়মিত খেতে দেওয়া হতো। 
সোমড়ার আনন্দ ভৈরবাণী মন্দির বাংলাদেশে প্রাচীন শিল্পকলার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই মন্দিরের গঠন পদ্ধতি নাগারার ভাস্কর্যের অনুকরণ নির্মিত। মন্দিরের স্তম্ভ গুলি হিন্দু মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন স্বরূপ। কালী, বিনু গোপাল দুর্গা অন্নপূর্ণা প্রভৃতির মূর্তি টেরাকো টায় অঙ্কিত আছে। এই মূর্তি গুলির ভঙ্গিমা অজন্তা ও বাঘের মূর্তি গুলির সমগোত্রীয় বলিয়া কথিত। 
এই গ্রামের দেওয়ান রামশঙ্কর রায় ও রায় রায়ান রাজা রামচন্দ্র সেন খ্যাতনামা ব্যক্তি ছিলেন।
রাজা রামচন্দ্রের প্রাসাদ বর্তমানে ভগ্ন হইয়াছে এখনও তাহার বংশধরগণ গ্রামে মহাসমারোহের শহীদ দুর্গাপূজা করেন। এই বংশের দুর্গা প্রতিমার বৈশিষ্ট্য যে দেবীর দশভুজা মূর্তির তিনটি হাত কেবল সামনে থাকে, বাকি সাতটি হাত পিছনে অদৃশ্য থাকে। এই রূপ ত্রিভুজা সিংহবাহিনী মূর্তি হুগলি জেলার আর কোথাও দেখা যায় না। এই গ্রামের রাম শঙ্কর রায়ের ভবন ও একসময় দ্রষ্টব্য ভবন বলিয়া পরিগণিত হইত । তাঁহার গড় খাদ বেষ্টিত বিরাট অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ বর্তমান আছে। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত একাধিক মন্দির এর চিহ্ন এখনো বিদ্যমান আছে তন্মধ্যে পঞ্চরত্ন ও নবরত্ন মন্দির দুইটি উল্লেখযোগ্য। নবরত্ন মন্দিরে জগদ্ধাত্রী মূর্তি আছে। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠিত বলিয়া লেখা আছে। 
পঞ্চরত্ন মন্দিরটি ১১৭২ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহা বঙ্গের আদি শ্রী শ্রী মহাবিদ্যা নামে খ্যাত। মন্দিরের ছাদ পিরামিডের ন্যায় দেখা যায়। এই রূপ মন্দির বাঙ্গালার স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে। সোমড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় গণ ও প্রাচীন বংশ। ইহাদের  গৃহদেবতা জগদ্ধাত্রীর নিত্য পূজা হয়।'

এই বন্দোপাধ্যায় বংশের এক শরিকের অনুরোধে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষ 
হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সোমরা গ্রামে এসেছিলেন। 

(চলবে)

-_---------------------------------

Regards
Dr. Samiran Sarkar
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727


















Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.