'সোনালি সবুজের স্বপ্ন'
লেখক - পরেশ সরকার
পাঠ প্রতিক্রিয়া - অরবিন্দ পুরকাইত
সোয়া সাতাশ বৎসরের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে
পরেশ সরকারের 'সোনালি সবুজের স্বপ্ন'
ছোটদের গল্প বলার মতো একটা মন আছে পরেশ সরকারের। লেখার ভঙ্গি সরস। চাল হালকা, যদিও বর্ণিত ঘটনা কখনও গভীরতা-ছোঁয়া। কিন্তু গল্পের নামে ছোটদের 'জ্ঞানবান করে তুলবোই'— এমন প্রতিজ্ঞা করে কোমর বেঁধে লাগেননি লেখক, যদিও গল্পের সঙ্গী হয়ে তারা অজান্তেই অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারবে।
'সোনালি সবুজের স্বপ্ন' গল্পগ্রন্থটি শুরু হয়েছে ভূতের গল্প দিয়ে। ভুতের চারটি গল্পের মধ্যে 'হয়তো মনের ভুল' গল্পটি বিভাগের শ্রেষ্ঠ গল্প। বেশ বোঝা যায় লেখক ব্যক্তিগতভাবেও অনেকখানিই জড়িত এ গল্পটির সঙ্গে। এই গল্পের গদ্য অনেকখানি সাবলীল এবং গল্পটিও অনেকখানি লিটোল রূপ পেয়েছে। গল্পটি যেন লেখককে বানাতে হয়নি— অনেকখানি স্বতোৎসারিত যেন। 'ডাকাত-ভূত' গল্পটি মোটামুটি। একটি মর্মস্পর্শী গল্প হয়ে ওঠার সব উপকরণই কিন্তু ছিল গল্পটিতে। ছিল কয়েকটি সূক্ষ্ম অথচ গভীর মুহূর্ত নির্মাণের সুযোগও। কিন্তু গল্পটি যোগ্য মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি ঠিকভাবে। 'অদ্ভুতুড়ে রাতে' গল্পটিতে, সুযোগ থাকলেও, ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেননি লেখক তেমনভাবে। 'ভূতেরা মনে হয় রামনাম সহ্যই করতে পারে না। তাই সে ধীরে ধীরে কোথায় মিলিয়ে গেল।'— লেখককে এ-কথা বলতে দেখে আমাদের তাজ্জব লাগে! এমনকি ব্যক্তিগতভাবে লেখক ভূতে বিশ্বাস করলেও, কিশোর-কিশোরীদের জন্যে যখন গল্প লিখছেন তখন তিনি এ-কথা বলতে পারেন না কিছুতেই।
একেবারে প্রথম গল্পটি অর্থাৎ 'শনিবারের ভর-দুপুরে' সামনে রেখে লেখার ক্ষেত্রে লেখকের কয়েকটি সাধারণ ত্রুটির কথা— যা আমার মনে হয়েছে— বলব, যেগুলি তাঁর অনেক গল্পেই কম-বেশি ঘটেছে। প্রথমে বলে নিই গল্পটি অত্যন্ত দুর্বল এবং মামুলি। যাইহোক, গল্পকে সুখপাঠ্য করতে অতীতের কোনও ঘটনার বর্ণনায় বারবার অতীত ক্রিয়াপদ ব্যবহার না করাই যুক্তিযুক্ত। অতীত কালে ঘটছে এই মর্মে শুরু করে নিয়ে তারপর বর্তমানের মত করে (অর্থাৎ সেই কালে চলে গিয়ে) বর্ণনা করাই শ্রেয়। গল্পের শুরুতে প্রায় পরপর যাচ্ছিল, করছিল (একাধিক বার), হচ্ছিল'র ব্যবহার কানে বাজে। ওই পুরো অতীত ঘটনাটুকুই 'রাস্তায় লোকজন অবশ্য নেই বললেই চলে', 'নদী কুলকুল করে বয়ে চলেছে'— এইভাবেই (অর্থাৎ মাঝেমধ্যে যেভাবে করা হয়েছে) বর্ণনা করলে গদ্যটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। যেমন, '... তবু কেমন গা ছমছম করছিল সত্যদাদুর' না বলে '... গা ছমছম করছে...' ব্যবহার বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।
গল্পটির শুরুর দিকে আছে, 'তাঁর বুকটা ভয়ে ঢিপ্্ঢিপ, (?) করছিল; অবশ্য তা ভূতের ভয়ে নয়। ফাঁকা রাস্তা। চোরডাকাতের ভয়টাই খুব!' ভূতের গল্প বলতে বসে আলটপকা এইভাবে ভুতের নাম মুখে এনে ফেলার মধ্যে কথকের মুন্সিয়ানার অভাবই দেখা যায়। বরং চোর-ডাকাতের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়েই পথ চলুক না কেন সত্যদাদু ঢিপঢিপানি নিয়ে আর তারপর আচমকাই সামনে পড়ে যাক না সেই অনভিপ্রেত দৃশ্যের! এমনকি ভূতকে প্রথমে চোর-ডাকাতই ভেবে বসুক না কেন।
লেখক কি ভূতে বিশ্বাস রাখেন? তাঁর গল্প কিন্তু স্পষ্ট সেকথা বলে। এখন অনেক লেখকই অবশ্য ভুতের গল্প লেখেন, কিন্তু তাঁদের ভূতে বিশ্বাস নেই আদৌ। তাঁরা মূলত তাঁদের গল্পে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরেন ভূতের অনস্তিত্ব তথা বিভ্রমে ভূত দেখা। সেইভাবেই তাঁরা তাঁদের গল্পে রহস্য উন্মোচন করেন বা পাঠকের জন্যে কয়েকটি সূত্র রেখে যান তাঁদের গল্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যার সাহায্যে জট খোলার দায়িত্বটা পালন করতে হয় পাঠককেই। আর তার ফলে কল্পনার ক্ষেত্রটা আরও বিস্তৃত করে রাখা যায় কিশোর-কিশোরীদের সামনে। বর্তমান গল্পটি তাদেরকে সে সুযোগ দেয় না। আর কল্পনাপ্রবণ করে তোলার অভিপ্রায়ে ভূতে বিশ্বাস গড়ে তোলার চেষ্টা গর্হিত।
লেখকের লেখার মধ্যে কিন্তু অনেক অসতর্কতার চিহ্ন রয়ে গেছে। সে কি বেশি লেখার কারণে? যতিচিহ্নের যদৃচ্ছ ব্যবহার পাঠে বিঘ্ন ঘটায়। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিই। অকারণ কমা'র (,) ব্যবহার রয়েছে। যেমন, 'না বর্ষা, না গরম মাঝামাঝি একটা, অবস্থা' কিংবা 'তাঁর বুকটা ভয়ে ঢিপ্্ঢিপ, করছিল'। প্রয়োজনের স্থলেও অনেকসময় বিস্ময়সূচক চিহ্নের অভাব। যেমন, 'আশ্চর্য ঘটনা।' ... 'লোকটা কি কর্পুরের (?) মতো উড়ে গেলেন।' ... 'কী ভয়ানক কাণ্ড রে বাবা।' দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের শুরুতে কেন যে উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহৃত হল বোঝা গেল না এবং উদ্ধৃতি চিহ্ন শুরুতে দেখা দিয়ে শেষ কোথায় আশ্রয় নিলেন জানা গেল না।
যে সত্যবাবুর সম্বন্ধে 'তিনি' ব্যবহার করা হচ্ছে, 'তাঁর' লেখা হচ্ছে, সেখানে 'দুপুরের দাও মারার লোভ তার বরাবরই' কিভাবে থেকে যায়! কিভাবে বিশু খুড়োর সম্বন্ধে থেকে যায় 'গোঁ ধরে ওদিকে যখন উনি যাচ্ছেন যাক!' যাক্ না হয়ে তো যা'ন হওয়ার কথা। যেমন হওয়ার কথা 'লোভ তাঁর...'।
গ্রুপ রিডিংও অত্যন্ত দায়সারাভাবেই করা হয়েছে বোঝা যায়। নইলে এত অজস্র বানানের গণ্ডগোল থেকে যায় কিভাবে? দু-একটি দৃষ্টান্ত দিই— 'একেবায়ে সুনশান', 'ত্রিশ-পঁত্রিশ', 'ঠাট্টা কয়ে', 'ফিন্্দিনে ফতুয়া' ইত্যাদি। আর 'হার্ট অ্যাটাক্ট হয়েছিল' না 'হার্ট অ্যাটাক্' (বা অ্যাটাক্ডও চলে)?
অনেক গল্পেই, তাঁর বলার ভঙ্গি অনায়াস নয়। গদ্যও নয় জড়তামুক্ত। শব্দপ্রয়োগের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। পুনরুক্তি দোষও ঘটেছে। ফলে গল্প নিটোল রূপ পায়নি। সংলাপ রচনায় জড়তা রয়েছে এবং তা অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়।
যাইহোক, এবার একে একে অন্য গল্পগুলোতে আসি। 'আলিদার হুলো মেনি' গল্পটি বলার ভঙ্গি কিন্তু অনায়াস। কার্যগতিকে বেড়াল পুষতে হলেও, একসময় তাদের প্রতি ভালবাসা জন্মে যায় চিরকুমার আলিদার। রিটায়ারমেন্টের ছ'মাস আগে মৃত আলিদার কবরের কাছে তাঁর পোষা বিড়ালগুলোর শোকবিহ্বল মূর্তি যেন আমরা দেখতে পাই। ছুঁয়ে যায় মনকে। এটাকে 'মজার গল্প' বিভাগে রাখা তেমন যুক্তিযুক্ত হয়নি। আর বড়দের থেকে ছোটদের জন্যে লেখার ক্ষেত্রে বেশি সতর্কতা সর্বদাই কাম্য— ওই অফিস পালানোর প্রসঙ্গটা না রাখলেও চলত।
সরস-করুণ 'সোঁদরবনের বাঘের ফাঁসি' গল্পটি বেশ জমাটি। আমরা সারা গল্পের সঙ্গে সঙ্গে একজনকে যেন চলতে দেখি— তিনি লেখক স্বয়ং। বাঘ বেরিয়েছে— এই সংবাদটুকু যে পরিমাণ আতঙ্ক আর গুজবের জন্ম দিতে পারে গুরুত্বে তা বোধহয় আমাদের শোনা সেই কলকাতায় জাপানী বোমা পড়ার ব্যাপারের থেকে কোনও অংশে কম নয়। এ অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝবার নয়। বর্তমান পর্যালোচকের এ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাচ্ছারা সত্যিই এসব গল্পে জমে যাবে। গল্পটাতে একটা অসঙ্গতি দেখলাম। আমরা দেখছি বাঁশঝাড়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বাঘের সামনাসামনি রয়েছে কালু আর লালু। অথচ বলা হচ্ছে, 'ওদিকে লালু ও খাঁদু লোকজনও ছুটে এসেছে (গঠনে দুর্বল বাক্যটি)। কালু রাগে কাঁপছে। ভীষণ ক্ষেপে গেছে লালু ও খাঁদুর ওপর। তোরা পালালি কেন? ...'— এখানে লালু হবে না ঝড়ু! পালিয়েছিল কিন্তু ঝড়ু ও খাঁদু।
'পাতাল ভৈরবী বনাম মা কালী' গল্পটিতে গ্রামবাংলায় হাডুডু খেলার আয়োজন ও আনন্দ-উত্তেজনার একটি সুন্দর চিত্র ধরা পড়েছে। কিন্তু প্রতিবার 'সাপোটার' কেন? 'ঘুম-কাতুরে চোর' বেচারা কাবুল ওরফে ক্যাব্্লার জন্যে কথকের মত আমাদেরও দুঃখ হয়। চুরি করতে এসে বেচারা ঘুমিয়েই পড়ল আর তার ফলে তার কী দুর্গতি! 'সিঁদেল চোরের নাতি' গল্পটি মহৎ উদ্দেশ্যসঞ্জাত। অত্যন্ত স্নেহের নাতির একের পর এক নাছোড় জেরায় জেরবার হয়ে ক্রমশ চুরিরূপ নিজের গর্হিত কর্মের ইতিহাস তার কাছে বলে ফেলতে হয় ভজহরি দাসকে। তারপর, নাতিকে যে সিঁদেল চোরের নাতি পরিচয়ে বাঁচতে হবে একথা ভেবে এবং চুরি না ছাড়লে নাতিও তার সঙ্গে চুরিতে বেরোবে বলায়, চুরি ছাড়া দারুণ কঠিন জেনেও নাতিকে ছুঁয়ে ভজহরি প্রতিজ্ঞা করে যে সে আর কখনও চুরি করবে না। গল্পটিতে একটা অসঙ্গতি আছে। যে নাতিকে বিভিন্ন লোকে এবং নাতির স্কুলের ছেলেরা বারবার বলে 'তুই সিঁদেল চোরের নাতি', দাদুর সঙ্গে তার প্রথম দিকের সংলাপে কিন্তু এটি স্পষ্ট যে দাদুর কাজ-কারবার সম্বন্ধে সে কিছুই জানে না— এটা কিভাবে সম্ভব! বরং দাদুকে কোনও একদিন তার প্রথম প্রশ্ন করার কথা, দাদু, আমাকে সকলে সিঁদেল চোরের নাতি বলে কেন বা সিঁদেল চোর কাকে বলে— জাতীয় কিছু একটা।
'বইমেলায় বই চুরির রহস্য' গল্পটিতে সঙ্কটটা বেশ ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ বই চোর ধরার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির অসহায়তা বেশ প্রকট করা গেছে। গোয়েন্দাদের সঙ্গে লুকোচুরিটা পাঠক বেশ উপভোগ করবে। তবে সমাধানটি সরলীকৃত হয়ে গেছে যেন। তবে বই চুরি কমুক আর না-ই কমুক সত্যিকারের ক্রেতাদের তো একটু সুবিধাই হয়ে গেল, তাই বা কম কি!
প্রিয় শিল্পীদের কন্ঠে গান শুনতে গিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে এইভাবে ডাকাতের খপ্পরে পড়তে হবে তা কে জানত! আবার, ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে নিজেকে আর একটু নিরাপদ করতে ঘরের কপাট বন্ধ করে দেওয়াতে পাশের ঘরে আটকা পড়া ডাকাত ধরতে যে এতখানি সুবিধা হয়ে যাবে তাই-ই বা জানত কে! 'ডাকাত ধরা' গল্পটি এমনই একটি আকর্ষণীয় গল্প।
গ্রামের মহিলারা যে চোর-ডাকাত ধরা বা তাড়ানোর ক্ষেত্রে কখনও কখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে অসম সাহসে, গ্রাম-বাংলায় ছড়িয়ে থাকা বহু গল্পই তার সাক্ষী। তেমনই একটি গল্প 'ডাকাত তাড়ালো প্রমিলা বৌদি'। ডাকাত হওয়ার মত কিছু অবস্থা নয় প্রমিলা বৌদিদের। তবুও ডাকাত পড়ল। হয়ত বা জমি-জায়গা সংক্রান্ত মামলার জেরে। ডাকাতের ছদ্মবেশে আসলে এরা খুনিও বা। তো এমন ভয়ঙ্কর ডাকাতদলের ভয়ঙ্কর মূর্তির সামনেও মার-খেয়ে-অচৈতন্য স্বামীকে নিয়ে ঘরে দরজা দিয়ে দারুণ সাহস বুকে বেঁধে বহুক্ষণ প্রতিরোধ করার ফলে শেষ পর্যন্ত ডাকাতদের পালাতে হল উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ রেখে। গল্পটিতে একটু অসঙ্গতি আছে বোধ হল। ডাকাতরা সাধারণত বাধা পাওয়ার আগে বোমা বা গুলি ব্যবহার করে না। তাতে আগেই লোক জানাজানি হওয়ার ভয় থাকে। গল্পটিতে বলা হয়েছে প্রথমে ঘরের কোণে বোম ফাটল তারপরে একজন এসে প্রমিলা বৌদির স্বামীর মাথায় লাঠি মারল।
হাসির গল্প হিসাবে 'সোনা বৌদির টুকিটাকি ডাক্তারি' গল্পটি বেশ দুর্বল। কিন্তু এই বিভাগের 'ছোটমাসির নাসিকা গর্জন' গল্পটি এক কথায় অনুবদ্য। পুস্তকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প এটি। তরতর করে পড়ে যাওয়ার সময় পাঠকের চোখে সবকিছু ভেসেও ওঠে যেন পরপর।
একটি ইংরাজী গল্পের ছায়া অবলম্বনে রচিত সাবলীল 'আফ্রিকার ভয়ঙ্কর জঙ্গলে' গল্পটিতে বাচ্ছারা রোমাঞ্চিত হবে। আকাশের শকুন থেকে জলের কুমীর, আর বুনো কুকুর ও চিতা— সকলেই খাদ্য হিসাবে পেতে চাওয়া বেচারা জিরাফ-ছানাটির দশা দেখলে কষ্ট হয়। আচ্ছা, আমাজন তো নদী হিসাবে বিখ্যাত দক্ষিণ আমেরিকার। তাহলে তাকে আফ্রিকার বলা হল কিভাবে!
যে গল্পটির নাম গ্রহণ করা হয়েছে গ্রন্থনামে সেই কল্পবিজ্ঞানের গল্পটি (সোনালি সবুজের স্বপ্ন) অনেকের ভাল লাগবে। মঙ্গল অভিযান সংক্রান্ত কিছু পরিসংখ্যানও এখানে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই 'পার্থ ফাইণ্ডার' লেখা হল কিভাবে! আর 'নাসা'কে 'যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোনেটিক্স অ্যান্ড...' না লিখে 'যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশ্্ন্্ল্ অ্যারোনেটিক্স...' লেখা দরকার ছিল।
কালে শহরবাসী এক জমিদারসন্তান তাঁর গ্রামের বাগানবাড়িতে সপরিবারে কাটাতে এসে নিজেদের একটু ভুলে কিভাবে ঘরে রাখা স্ত্রীর গহনাপত্র খোয়ালেন চোরের হাতে এবং যখন ধরে নেওয়া হয়েছে যে তা আর ফিরে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই তখন বাড়ির কুকুর ভুলো কিভাবে তা উদ্ধারে প্রধান ভূমিকা নিল তাই নিয়ে গল্প 'ভুলোর গোয়েন্দাগিরি'। এটিও ভাল লাগবে। আচ্ছা, রমেনবাবু অনেক জায়গায় বরেণবাবু হয়ে গেলেন কিভাবে আর যে দীনুরা 'কৃপা'কে কেপা বা 'বিশ্রাম'কে বিচ্ছেরাম বলে তাদের পক্ষে কিন্তু 'গ্রামটার' না বলে 'গেরামটার' বলাটাই স্বাভাবিক ছিল।
তিনি যে কোথায় মহান এক করুণাময়ী তা আর্ত আতুর টমাস বা লুসিদের তাঁর জন্যে আকুলতা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে 'মাদার টেরিজা' গল্পটিতে। এমন একটি বিষয় দিয়ে গল্পগ্রন্থটি শেষ করার জন্য লেখক অবশ্যই ধন্যবাদার্হ।
লেখকের পরবর্তী রচনা আরও সাবলীল ও সুঠাম হোক এই আশা পোষণ করে আলোচনা শেষ করছি।
শুভেন্দু সরকারের প্রচ্ছদ দৃষ্টিনন্দন।
তারিখ : ১০-১১-'৯৭
* * * *
প্রতি : পরেশ সরকার
শ্রদ্ধেয় পরেশবাবু,
লেখাজোখার লাইনে আপনার নিরন্তর লেগে থাকার নিষ্ঠা দেখে মাঝে মাঝে অবাক মানি। আপনার সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় বলতে এই সেদিন কার্তিকবাবুর সামনে তাঁর সেকশনে (যদিও তাঁর কাছে আপনার কথা শুনে আসছি অনেক দিনই)। তার অনেক আগে থেকেই আমি আপনার লেখার সঙ্গে পরিচিত (মূলত ধূর্জটিবাবুর সৌজন্যে), পাঠক হিসাবে যেমন আরও অনেকের সঙ্গে পরিচিত অথচ অনেকেরই সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় নেই। আপনাকে অবশ্য ব্যক্তিগতভাবেও আমি চিনি অনেকদিন হল। অবশ্য নিজের থেকে আলাপ করিনি যেচে আলাপ করার সংকোচবশত।
যাইহোক, পাঠক হিসাবে আমার যেটুকু বোধ গড়ে উঠেছে তার উপর ভরসা করে— কার্তিকবাবু যখন আপনার 'সোনালি সবুজের স্বপ্ন' আমায় দিলেন আমার পাঠজাত অনুভব তথা মতামত খোলাখুলিভাবে জানাতে— বইটি পড়ার জন্যে নিলাম। এমনিতে আপনার বই পেলে আমি সব সময় নিতে প্রস্তুত ছিলাম— আপনার লেখার সঙ্গে আরও একটু পরিচয় হতে পাবে এই মানসে। বাড়তি বলতে কার্তিকবাবু স্নেহবশত মতামতের ব্যাপারটাও জুড়ে দিলেন।
আপনাকে আমার এইটুকু বলার যে গল্পগুলি আমি খুঁটিয়ে পড়েছি এবং পাঠক হিসাবে আমার যেখানে যা মনে হয়েছে তা অতি সংক্ষেপে এখানে জানিয়েছি। আমার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেই। আমার অভিমত হল যে পুস্তকের পর্যালোচনা পর্যালোচকের পাঠজাত অনুভবানুগ হওয়া উচিত। মনে এক আর কলমে আর না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সমালোচনা সঙ্গতই হওয়া উচিত, পিঠ-চাপড়ানিমূলক নয়। সমালোচনা যদি লেখককে এই ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে যে, আমার কিছু কিছু বিষয় অন্যভাবে বা নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন আছে অথবা সংশোধনের প্রয়োজন আছে কিংবা এ-সবের সত্যিই কোনও দরকার নেই— সমালোচক ঠিক বলছেন না বা সমালোচকের ভাবনায় খামতি রয়েছে, তবে সে সমালোচনার প্রয়োজন আছে মনে করি। যেমন, আপনার 'মীরা ফিরে এসো'র অন্যান্য দু-একটি পত্রে (বঙ্গলোকও সম্ভবত) সমালোচনা পড়লেও 'কানাকড়ি'তে যশোধরা রায়চৌধুরীকৃত সমালোচনাটি অনেক বেশি কার্যকর বলে মনে হয়েছে আমার।
শুনেছি খোলামেলা সমালোচনা সহ্য করার মতো উদার্য আপনার রয়েছে। সেই ভরসায়, বইটি পড়ে, আমার যেমন যেমন মনে হয়েছে লিখলাম। এটি হয়তো কোথাও ছাপার যোগ্য না হতেও পারে। তবু একজন পাঠকের কাছে আপনার গল্পগুলি কেমন আবেদন রাখতে সক্ষম হল তা জানার জন্যে পুরো লেখাটি আপনার পড়া দরকার। আর বাস্তবে ছাপার মত করে লিখিনিও। তা হলে তা অনেক সংক্ষেপ হত। থাকত মোটের উপর কেমন হয়েছে তার পরিচয়। এইরকম প্রতিটি গল্প উল্লেখপূর্বক তাদের আলোচনা থাকত না। আমরা দেখেছি, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মত লেখিকার 'ময়না তদন্ত'র মত গল্প গ্রন্থের সমালোচনা সেরেছেন উত্তরা বসু মাত্র পাঁচ-সাতটি বাক্যে। আনন্দবাজারে। যার থেকে গ্রন্থটির কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। এইসব সমালোচকরাও অসহায় খানিকটা, সম্পাদক তাঁদের বেশি জায়গা দিতে চান না। একটুখানি জায়গার মধ্যে হয়ত তিনটি কি পাঁচটি বইয়ের সমালোচনা সারতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত সমালোচনা হওয়ার মুশকিল আছে। যাইহোক, যদি আপনার ইচ্ছা যায় তবে প্রয়োজনে সম্পাদনা করে লেখাটি ছাপাতে পারেন পর্যালোচকের জাতহানি না ঘটিয়ে। আর বইটির যদি পরবর্তী কোনও সংস্করণ প্রকাশ পায় তবে কার্তিকবাবুর দেওয়া আপনার বইটি (যেটি তিনি আবার আমাকে দিয়ে দিয়েছেন) অনেক কাজে লাগবে বলে আমার মনে হয়। কেন না, পড়ার সময় আমি অসংগতিপূর্ণ প্রায় সমস্ত শব্দ, বাক্য বা তাদের অংশের তলায় দাগ দিয়ে দিয়েছি।
আর বেশি কিছু লিখছি না। শুভেচ্ছা জানবেন।
— ইতি
অরবিন্দ পুরকাইত
তারিখ : ১২ নভেম্বর ১৯৯৭
ঠিকানা : গ্রাম + ডাক = গোকর্ণী,
জেলা = দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা,
পিন = ৭৪৩ ৬০১।
[অনুচিত বিবেচনায় সোয়া আটাশ বৎসরাধিক আগের মূল লেখার কোনো রকম পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা হয়নি, এমনকি রক্ষিত হয়েছে সেই সময়কার আমার বানানও]

