গল্প ।। অসমাপ্ত বিকেলের কাব্য ।। জয় মণ্ডল

ছবিঋণ- ইন্টারনেট 
 

অসমাপ্ত বিকেলের কাব্য

 জয় মণ্ডল



প্রথম অধ্যায়: কফির ধোঁয়া ও হারিয়ে যাওয়া সুর

কলকাতার এক ছমছমে বর্ষার দুপুর। আকাশটা সকাল থেকেই গোমড়া হয়ে আছে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো এখনই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে। অনিমেষ তার চিরচেনা পুরনো লাইব্রেরির কোণায় বসে একটা জীর্ণ বইয়ের পাতায় আঙুল বোলাচ্ছিল। এই লাইব্রেরিটা তার কাছে কেবল বইয়ের ঘর নয়, এটি তার একলা থাকার স্বর্গ। হঠাৎ দরজার বেলটা বেজে উঠল। বৃষ্টির ঝাপটা বাঁচিয়ে ভেতরে ঢুকল এক তরুণী। ভেজা চুল, হাতে একটা ক্যানভাস আর চোখে এক অদ্ভুত মায়া। অনিমেষের কেন জানি মনে হলো, এই মুখটা তার বড্ড চেনা। 

মেয়েটির নাম নীলাঞ্জনা। সে একজন চিত্রশিল্পী, যে মানুষের মুখ নয়, মানুষের চোখের ভেতরের গল্প আঁকতে ভালোবাসে। সে অনিমেষের উল্টো দিকের টেবিলে এসে বসল। লাইব্রেরিতে তখন পিনপতন নীরবতা, শুধু বাইরে টিনের চালে বৃষ্টির পাগল করা শব্দ। অনিমেষ তার বই থেকে চোখ সরিয়ে নীলাঞ্জনার দিকে তাকাল। নীলাঞ্জনা তখন নিবিষ্ট মনে তার স্কেচবুক পেন্সিল চালাচ্ছে। 

হঠাৎ নীলাঞ্জনা মুখ না তুলেই বলল, "আপনি কি জানেন, বৃষ্টির দিনে পুরনো বইয়ের গন্ধ আর কফির ধোঁয়া মিলে একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া তৈরি করে?" 

অনিমেষ অবাক হলো। সে একটু হেসে বলল, "আমি ভেবেছিলাম এই উপলব্ধিটা শুধু আমারই। আমি অনিমেষ।"

"আমি নীলাঞ্জনা। তবে সবাই আমাকে নীল বলে ডাকে," সে তার স্কেচবুকটা অনিমেষের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। অনিমেষ দেখল, সাদা পাতায় ফুটে উঠেছে তার নিজেরই এক বিষণ্ণ অবয়ব। 

সেই বিকেলের পর থেকে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। প্রতিদিন সেই একই লাইব্রেরিতে তারা বসত। তাদের আলাপ ছিল একটু অন্যরকম। তারা রাজনীতির কথা বলত না, সিনেমা নিয়ে তর্ক করত না; তারা কথা বলত ঝরে যাওয়া শিউলি ফুল নিয়ে, নির্জন স্টেশনের একাকীত্ব নিয়ে আর জীবন নামের এক জটিল ধাঁধা নিয়ে। 

অনিমেষ ছিল সরকারি অফিসের এক সাধারণ কেরানি, যার জীবনটা ছিল রুটিনে বাঁধা। কিন্তু নীলাঞ্জনার স্পর্শে তার সেই একঘেয়ে ধূসর জীবনে রঙের ছোঁয়া লাগল। সে কবিতা লিখতে শুরু করল। প্রতিটি কবিতার ছত্রে ছত্রে থাকত নীলাঞ্জনার সেই বাঁকা হাসি আর একজোড়া কাজলভরা চোখ। অন্যদিকে নীলাঞ্জনার ক্যানভাসগুলো এখন নীল আর ধূসর রঙ ছেড়ে লাল আর হলুদে ভরে উঠতে লাগল। সে অনিমেষকে একদিন বলেছিল, "জানেন অনিমেষ, আমি এতদিন শুধু দুঃখ আঁকতাম। আপনি এসে আমাকে শেখালেন যে সুখের কোনো অবয়ব হয় না, শুধু একটা অনুভূতি হয়।"

এক সন্ধ্যায় তারা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসল। গঙ্গার হাওয়ায় নীলাঞ্জনার চুলগুলো উড়ছিল। অনিমেষ তার পকেট থেকে একটা ছোট রূপোর আংটি বের করল। কিন্তু কিছু বলার আগেই নীলাঞ্জনা তার হাতটা চেপে ধরল। তার হাতটা ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। 

"অনিমেষ, আমার কিছু কথা আপনাকে বলা হয়নি," নীলাঞ্জনার গলার স্বর কাঁপছিল। 

অনিমেষের বুকটা ধক করে উঠল। "কী হয়েছে নীল? তুমি কি কোথাও যাচ্ছ?"

নীলাঞ্জনা দূরে বয়ে যাওয়া নৌকাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমরা পরের সপ্তাহে পাকাপাকিভাবে কানাডায় চলে যাব। আমার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য এটাই শেষ সুযোগ। হয়তো আর কোনোদিন এই শহরে ফেরা হবে না।"

অনিমেষের চারপাশের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে সবেমাত্র চিনতে শুরু করেছে, যার হাসিতে সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে, সে আজ চলে যাওয়ার কথা বলছে। সে আংটিটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। সে জানত, এই মুহূর্তে নিজের ভালোবাসার কথা বলে সে নীলাঞ্জনাকে দুর্বল করতে চায় না। 

"তুমি যাবে নীল। মা সবার আগে। আমি... আমি ঠিক থাকব," অনিমেষের গলাটা ধরে এল। 

নীলাঞ্জনা তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট নীল ডায়েরি বের করে অনিমেষের হাতে দিল। "এই ডায়েরির শেষ পাতাটা আপনি আমাদের বিচ্ছেদের দিন খুলবেন। তার আগে নয়। কথা দিন।"

অনিমেষ মাথা নাড়ল। সেদিন আর কোনো কথা হলো না। গঙ্গার ওপারে সূর্যটা ডুবে গেল, রেখে গেল এক গভীর রক্তিম আভা, যা দেখতে ঠিক এক ফালি ক্ষতের মতো। 

পরের সাতটা দিন তারা প্রতিটা মুহূর্ত একসাথে কাটাল। তারা ট্রামে করে সারা শহর ঘুরল, ভিক্টোরিয়ার মাঠে বাদাম ভাজা খেল, আর শেষবারের মতো সেই লাইব্রেরিতে গিয়ে বসল। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না, কেউ কাঁদল না। কিন্তু দুজনের বুকের ভেতরেই এক বিশাল সমুদ্র গর্জন করছিল। 

অবশেষে সেই দিনটা এল। এয়ারপোর্টের গেটে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনা শেষবারের মতো অনিমেষের চোখের দিকে তাকাল। সে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু দুফোঁটা চোখের জল তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। 

"ভালো থাকবেন কবি। আপনার কবিতার পাতায় আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন তো?" 

অনিমেষ কিছু বলতে পারল না, শুধু তার হাতটা একবার শক্ত করে ধরল। নীলাঞ্জনা চলে গেল। অনিমেষ দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না প্লেনটা একটা ছোট বিন্দুর মতো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল। 

বাড়ি ফিরে অনিমেষ তার অন্ধকার ঘরে বসে সেই নীল ডায়েরিটা বের করল। কাঁপা হাতে শেষ পাতাটা উল্টালো সে। সেখানে কোনো লেখা ছিল না, শুধু একটা শুকনো নীলপদ্ম আঠা দিয়ে লাগানো ছিল। আর তার নিচে লেখা ছিল মাত্র একটা লাইন: "অনিমেষ, আমি আপনার কবিতার কথা দিতে পারছি না, কিন্তু আমার প্রতিটি ক্যানভাসে আমাদের এই অসম্পূর্ণ বিকেলটা বেঁচে থাকবে। আমাদের প্রেমটা পূর্ণতা পেল না ঠিকই, কিন্তু এটি চিরকাল 'অসমাপ্ত' থেকে অমর হয়ে রইল। দেখা হবে কোনো এক ভিন্ন জন্মে, ভিন্ন কোনো শহরে।"

অনিমেষ ডায়েরিটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তবে আজকের বৃষ্টিতে কোনো গান নেই, আছে শুধু এক নিঃসঙ্গ মানুষের নীরব কান্নার শব্দ। অনিমেষ তার ডায়েরিটা খুলে কলম ধরল। সে জানে, নীলাঞ্জনা নেই, কিন্তু তার এই অভাবটাই হবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা।

তারপর...... 

দশটি বছর পার হয়ে গেছে। কলকাতা শহরটা অনেক বদলেছে। গঙ্গার ধারের সেই ধুলোমাখা রেলিংগুলোতে এখন নতুন রং লেগেছে, পুরনো ট্রামগুলোর বদলে এসেছে আধুনিক বাস, আর মানুষের হাতের স্মার্টফোনগুলো কেড়ে নিয়েছে চিঠির শেষ মাধুর্যটুকু। কিন্তু শহরটা বদলালেও অনিমেষের মনের ভেতরকার সেই স্থির সময়টা পাল্টায়নি।



দ্বিতীয় অধ্যায়: স্মৃতিদের অলকানন্দা

অনিমেষ এখন মধ্যচল্লিশের এক প্রৌঢ়। তার চুলে এখন রূপোলি ছোঁয়া, আর চোখের কোণে জমেছে সূক্ষ্ম বলিরেখা। সরকারি কেরানির চাকরি থেকে সে এখন অনেক উপরে, কিন্তু তার আসল পরিচয় এখন অন্য—সে একজন বিখ্যাত কবি। তার প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের নাম নীলপদ্মকে কেন্দ্র করে। পাঠকেরা ভাবে এগুলো নিছক কল্পনা, কিন্তু কেবল অনিমেষ জানে, প্রতিটি শব্দের আড়ালে লুকানো আছে এয়ারপোর্টের সেই শেষ বিদায়ের কান্না।

অন্যদিকে, কানাডার অটোয়া শহরে নীলাঞ্জনা তখন এক ব্যস্ত গ্যালারির মালকিন। তার ক্যানভাসগুলো এখন আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদৃত। তবে তার আঁকা ছবির রঙে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। তার ছবিগুলোতে এখন মানুষ নেই, শুধু আছে ছায়া আর অদ্ভুত এক শূন্যতা। তার মা মারা গেছেন অনেক বছর হলো, বাবাও এখন শয্যাশায়ী। নীলাঞ্জনা বিয়ে করেনি। অনেক প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু তার মনের সেই ছোট ঘরটিতে আজও একজনই কবির আসন পাতা রয়েছে।

হঠাৎ একদিন নীলাঞ্জনার টেবিলে একটি পার্সেল এল। কলকাতা থেকে পাঠানো। ভেতরে একটি কাব্যগ্রন্থ, নাম— "অসমাপ্ত বিকেলের কাব্য"। লেখক: অনিমেষ চ্যাটার্জি। নীলাঞ্জনা বইটির পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখল উৎসর্গ পাতায় লেখা: "সেই নীলপদ্মটিকে, যে না থেকেও আমার প্রতিটি নিশ্বাসে উপস্থিত।"

নীলাঞ্জনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঠিক করল, তাকে ফিরতে হবে। যে শহর তাকে শূন্য হাতে ফিরিয়েছিল, সেই শহরই হয়তো আজ তার পূর্ণতার চাবিকাঠি লুকিয়ে রেখেছে। সে তার বাবার দেখাশোনার ব্যবস্থা করে এক দশকের দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে কলকাতার ফ্লাইটে উঠল।

কলকাতায় তখন শরতের মেঘমালা। নীলাঞ্জনা সোজা চলে গেল সেই পুরনো লাইব্রেরিতে। কিন্তু গিয়ে দেখল সেই জীর্ণ ভবনটি এখন নেই, সেখানে এক বিশাল মাল্টিপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। সে ভাবল, যে ঠিকানার খোঁজে সে এসেছে, সেই ঠিকানাই যদি হারিয়ে যায়, তবে মানুষটাকে কোথায় খুঁজবে?

সে হতাশ হয়ে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসল। প্রিন্সেপ ঘাটের সেই স্মৃতিগুলো তাকে ঘিরে ধরল। হঠাতই তার মনে পড়ল অনিমেষের সেই ডায়েরির কথা। সে তার ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে অনিমেষের নাম সার্চ করল। দেখল, আজ সন্ধ্যায় শহরের এক প্রেক্ষাগৃহে অনিমেষের নতুন বইয়ের পাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠান।

নীলাঞ্জনা কোনোমতে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সেখানে পৌঁছাল। হলঘর কানায় কানায় পূর্ণ। স্টেজে আলো আঁধারির মাঝে বসে আছেন একজন পুরুষ। নীল রঙের পাঞ্জাবি, গম্ভীর কণ্ঠস্বর। দশ বছর পর অনিমেষকে দেখে নীলাঞ্জনার মনে হলো তার শরীরের ভেতর দিয়ে এক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। 

অনিমেষ তখন আবৃত্তি করছিলেন:
"তুমি আসোনি বলে আমি শব্দ বুনেছি,
তুমি ছিলে না বলে আমি একাকীত্ব চিনেছি।
যে বৃত্ত এঁকেছিলে তুমি আমার করতলে,
সেই বৃত্তেই আমি আজও ঘুরছি চোখের জলে।"

হলের সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। আবৃত্তি শেষ হতেই হল ফেটে পড়ল করতালিতে। কিন্তু অনিমেষের চোখ ছিল শূন্য। তিনি জানেন না, যাকে তিনি খুঁজছেন, সে এই ভিড়ের মধ্যেই এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন অটোগ্রাফ নিতে ভিড় জমিয়েছে, নীলাঞ্জনা ভিড় ঠেলে একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে সেই পুরনো নীল ডায়েরিটা, যার ভেতর সেই শুকনো নীলপদ্ম আজও সযত্নে রাখা। 

অনিমেষ মাথা নিচু করে বইয়ে সই করছিলেন। নীলাঞ্জনা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "এই ডায়েরির শেষ পাতাটা কি আপনার মনে আছে, কবি?"

অনিমেষের কলমটা থমকে গেল। তিনি ধীর গতিতে মাথা তুললেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো সময় স্থির হয়ে গেছে। প্রেক্ষাগৃহের কোলাহল, আলোর রোশনাই সব যেন মুছে গেল। শুধু রয়ে গেল দুই জোড়া চোখ, যারা দশ বছরের দীর্ঘ মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আজ শ্রাবণের দেখা পেয়েছে।

"নীল?" অনিমেষের কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই গেল না। 

নীলাঞ্জনা হাসল, তবে তার চোখ বেয়ে জল পড়ছে। "আমি বলেছিলাম না অনিমেষ, দেখা হবে কোনো এক ভিন্ন জন্মে। আজ মনে হচ্ছে, আমরা আবার জন্ম নিলাম।"

তারা দুজনে হল থেকে বেরিয়ে এল। গঙ্গার ধারের সেই নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তারা যেন আবার সেই কুড়ি বছরের তরুণ-তরুণী হয়ে গেল। কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু আছে একসাথে থাকার এক গভীর তৃপ্তি। 

অনিমেষ তার পকেট থেকে সেই পুরনো আংটিটা বের করল, যা সে দশ বছর ধরে আগলে রেখেছে। "নীল, আমি বৃত্তের বাইরে যেতে পারিনি। বৃত্তটা তোমাকে নিয়েই শেষ করতে চাই।"

নীলাঞ্জনা তার হাতটা এগিয়ে দিল। আংটিটা তার অনামিকায় জায়গা করে নিল। কিন্তু ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেলা তখনও বাকি ছিল।

অনিমেষ হঠাতই কাঁপতে শুরু করলেন। তার হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিল, যা তিনি নীলাঞ্জনাকে বলতে চাননি। উত্তেজনায় তার শ্বাসকষ্ট হতে শুরু করল। নীলাঞ্জনা আতঙ্কিত হয়ে উঠল, কিন্তু সেখানে তখন কোনো জনমানব নেই। অনিমেষ নীলাঞ্জনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। 

"নীল... আমার ডায়েরিটা পূর্ণ হয়েছে," অনিমেষ অতিকষ্টে হাসলেন। "দেখা হওয়ার কথা ছিল, হলো। এবার যাওয়ার পালা।"

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। "না অনিমেষ, তুমি আমাকে আবার একা করে যেতে পারো না! আমি এইমাত্র ফিরে এসেছি!"

অনিমেষের চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। তার শেষ কথা ছিল— "আমাদের ভালোবাসা অসম্পূর্ণ নয় নীল... এটি এখন অবিনশ্বর।"

শরতের আকাশে তখন বিজয়া দশমীর চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। গঙ্গার জলে প্রতিমা বিসর্জনের সুর বাজছে। নীলাঞ্জনা সেই নিথর দেহটা আঁকড়ে ধরে বসে রইল। দশ বছর আগের বিচ্ছেদ ছিল দূরত্বের, আর আজকের বিচ্ছেদ হলো জীবনের। কিন্তু নীলাঞ্জনা আজ আর কাঁদছে না। কারণ সে জানে, অনিমেষ তাকে তার কবিতার মাঝে সারাজীবনের জন্য বন্দি করে দিয়ে গেছে।

পরদিন খবরের কাগজের এক কোণে লেখা হলো: "প্রখ্যাত কবি অনিমেষ চ্যাটার্জি পরলোকগমন করেছেন। তার পাশে পাওয়া গেছে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীকে, যিনি কেবল একটি নীলপদ্ম হাতে বসে ছিলেন।"

প্রেমটি আবারও অসম্পূর্ণ থেকে গেল লৌকিক বিচারে, কিন্তু পরলৌকিক জ্যামিতিতে তারা আজ চিরতরে এক।
======================== 



জয় মণ্ডল, 
কালীমন্দির পূর্বপাড়া, কালিকাপুর, পোস্ট - কালিকাপুর, সোনারপুর, পশ্চিমবঙ্গ। 



Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.