আফ্রিকান লোককথা ।। অন্ধের পাখি ধরা ।। বাংলা রূপান্তর : চন্দন মিত্র


ছবিঋণ- ইন্টারনেট 
 
 অন্ধের পাখি ধরা

  বাংলা রূপান্তর : চন্দন মিত্র  

 

বিয়ের পর দান্‌সো দ্যাখে, তার একমাত্র শ্যালক অন্ধ। স্বভাবত সে জন্মান্ধ শ্যালকের প্রতি  সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। কয়েকদিন পরে সে শ্যালককে জিজ্ঞাসা করে, 'দাদাভাই, তুমি কি আমার সঙ্গে শিকারে বেরোবে?'  

শ্যালক জানায়, 'আমি তো অন্ধ। তবে তুমি যদি আমাকে সাহায্য করো, তাহলে অবশ্যই যেতে পারি।'

  দান্‌সো শ্যালকের হাত ধরে শিকারে বেরোলো। জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে সে শ্যালকের দিকে  তাকিয়ে দেখল, সে নাককান দিয়ে গন্ধ ও শব্দ অনুভব করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে দান্‌সোকে অবাক করে শ্যালক ওই জঙ্গলে কোন্‌ কোন্‌ ধরণের গাছপালা ও পশুপাখি রয়েছে তার খুঁটিনাটি বিবরণ তুলে ধরল। হঠাৎ সে বলে উঠল, 'কাছাকাছি একপাল শুয়োর খাবারের খোঁজে  ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি পাখি ওড়ার জন্য ডানা মেলছে।' শ্যালকের এই আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে দান্‌সো অবাক হয়ে যায়।

  বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর তারা একটি জলাশয়ের কাছে পৌঁছে যায়। শ্যালক তার ফাঁদটি জলাশয়ের কাছে পেতে দেয়। সে ভেবেছিল পশু বা পাখি তার ফাঁদটি দেখতে পাবে না, ফলে অজান্তে ফাঁদে আটকে পড়বে। যদিও অন্ধ হওয়ার কারণে সে ফাঁদটি যথাযথভাবে ঘাসপাতা দিয়ে  আড়াল করতে পারে না। অন্যদিকে দান্‌সো তাড়াহুড়ো করে ফাঁদটি একটি ঝোপের পাশে কোনোরকমে পেতে দেয়। আসলে সে যত দ্রুত সম্ভব স্ত্রীর কাছে ফিরতে চাইছিল। পরের দিন দুজনে পৌঁছে গেল ফাঁদের কাছে। শ্যালক দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'আমার ফাঁদে একটি সুন্দর  পাখি ধরা পড়েছে। আমি সেই পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছি।'  দান্‌সো বলল, 'ভুলভাল না বকে  একটু চুপচাপ থাকো।'

  দান্‌সো প্রথমে নিজের পাতা ফাঁদের দিকে এগিয়ে গেল। আনন্দের সঙ্গে সে দেখল একটি পুচকে পাখি ফাঁদে পড়েছে। সে পাখিটিকে কোমরে বাঁধা ঝোলায় ঢুকিয়ে নিল। তারপর সে  শ্যালকের হাত ধরে তার পাতা ফাঁদের দিকে এগিয়ে গেল। সত্যি সত্যি দেখা গেল তার ফাঁদেও  একটি পাখি ধরা পড়েছে। দান্‌সো ফাঁদ থেকে পাখিটা বের করে অবাক হয়ে যায়। পাখি তো নয়,  যেন এক টুকরো রামধনু। তুলতুলে রঙিন পালকে পাখিটার সারা দেহ মোড়া। দান্‌সো ভাবল, এই পাখিটা যদি বউকে দিতে পারি তাহলে সে খুব খুশি হবে। যদিও পাখিটা ধরা পড়েছে শ্যালকের  ফাঁদে, সেও বিবাহিত। পাখিটা দেখে তার বউও খুশি হবে। এইসব ভাবনার ফাঁকে দান্‌সো পাখিটিকে নিজের ঝোলায় ঢুকিয়ে নেয় এবং তার ফাঁদে পড়া পাখিটি বের করে শ্যালকের হাতে দিয়ে বলে, 'এই নাও এই পাখিটা তোমার ফাঁদে পড়েছে।' শ্যালক পাখিটি হাতে নিয়ে কানের  কাছে ধরে তার ডাক শোনে। তারপর পাখিটার গায়ে হাত বুলিয়ে নিজের ঝোলায় রেখে দেয়।

  ফেরার পথে দুজনে একটি গাছের তলায় বিশ্রাম নেয়। তাদের মধ্যে নানান আলোচনা শুরু হয়। দান্‌সো শ্যালককে জিজ্ঞাসা করে, 'আচ্ছা দাদাভাই, মানুষ নিজেদের মধ্যে কেন লড়াই করে?' অন্ধ   শ্যালক মুখ খোলে না। তবে তার মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় সে গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছে। কিছুক্ষণ পরে সে দান্‌সোর মুখের দিকে তাকিয়ে দুই চোখের অন্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলে, 'মানুষ নিজেদের মধ্যে লড়াই করে কারণ, তারা একে অন্যের সঙ্গে সেই আচরণ করে, যেমন  আচরণ তুমি আমার সঙ্গে করেছ।'

    শ্যালকের কথা শুনে দান্‌সো লজ্জায় পড়ে যায়। সে নিজের ঝোলা থেকে পাখিটি বের করে   শ্যালকের হাতে তুলে দেয়। শ্যালক পাখিটির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, 'আমার কাছে কি   আরও কিছু জানতে চাও?'

দান্‌সো বলে, 'মানুষ নিজেদের মধ্যে লড়াই করার পরেও কীভাবে পুনরায় বন্ধু হয়ে ওঠে?'

শ্যালক হাসি মুখে বলে, 'তারা তাই করে, যা তুমি এখন আমার সঙ্গে করলে।' এইভাবে তারা   পুনরায় বন্ধু হয়ে ওঠে।  

===================  

     

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.