ছবিঋণ- ইন্টারনেট
অন্তিম লগ্ন
দীনেশ চ্যাটার্জী
২০৯৯ সালের ১০ই মার্চ, ক্যালেন্ডারের পাতায় আজকের তারিখটা লাল কালিতে গোল করা নেই, কিন্তু পৃথিবীর আটশ কোটি মানুষের হৃদয়ে এই তারিখটা খোদাই হয়ে গেছে গত তিন বছর ধরে। আজ সেই দিন—'দ্য ফাইনাল ইভেন্ট'। বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'গ্রেট কুলিং', কারণ কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় টানে পৃথিবী আজ তার কক্ষপথ থেকে ছিটকে যাবে অসীম অন্ধকারের দিকে।
অনির্বাণ বাবু আজ একটু ভোরেই উঠেছেন। আন্দুলের এই পুরনো বাড়িটার ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি দেখছেন দিগন্তের আকাশ। সূর্যটা আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড়, যেন এক দানবীয় রক্তজবা ফুটে আছে নীল আকাশে। বাতাসে কোনো পাখির ডাক নেই। রাস্তার মোড়ে সেই চেনা চায়ের দোকানের আড্ডা নেই, নেই কোনো স্কুলবাসের হর্ন। এক অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতা চাদরের মতো জড়িয়ে আছে শহরটাকে।
তিনি তার Vivo ফোনের ক্যামেরাটা অন করলেন। Pro মোডে গিয়ে ISO আর শাটর স্পিড অ্যাডজাস্ট করে একটা শেষ ছবি তুললেন এই পৃথিবীর। একজন ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তিনি সারাজীবন শব্দ নিয়ে খেলেছেন, কিন্তু আজ সব শব্দ যেন অর্থহীন মনে হচ্ছে।
সিঁড়িতে ছোট ছোট পায়ের শব্দ ভেসে এলো। আট বছরের অনাথ মেয়ে দিয়া ওপরে উঠে এল। তার চোখে ভয় নেই, আছে একরাশ কৌতূহল।
"দাদু, আজ স্কুল ছুটি কেনো?"
অনির্বাণ বাবু এক ম্লান হাসি হাসলেন। তিনি দিয়াকে কাছে টেনে নিলেন। "হ্যাঁ রে দিয়া, আজ পৃথিবীটা খুব ক্লান্ত, তাই ও একটু বিশ্রাম নেবে। আয়, আজ তোকে শেষ একটা গল্প শোনাই।"
তিনি তার ডায়েরিটা বের করলেন। এই ডায়েরিতে লেখা আছে হিমালয়ের বরফশৃঙ্গ থেকে শুরু করে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের কথা। তিনি দিয়াকে বলতে শুরু করলেন কীভাবে মানুষ একদিন আগুন আবিষ্কার করেছিল, কীভাবে চাকা ঘুরিয়ে সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল।
দুপুর গড়াতেই অভিকর্ষ বলের পরিবর্তন বোঝা যেতে লাগল। ডাইনিং টেবিলের গ্লাসটা হঠাৎ করেই কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে বহুদূরে। বড় বড় শহরগুলো ইতিমধ্যে জনশূন্য হয়ে গেছে । যারা পেরেছে, তারা 'আর্ক-১' রকেটে করে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু অনির্বাণের মতো সাধারণ মানুষরা জানেন, এই মাটিই তাদের শেষ আশ্রয়।
তিনি দিয়াকে নিয়ে বাড়ির সামনের ছোট বাগানটাতে বসলেন। সেখানে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। "জানিস দিয়া, এই পৃথিবীটা একটা মস্ত বড় পাঠশালা ছিল। আমরা ছাত্ররা ঠিকমতো পড়াশোনা করিনি বলেই আজ স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।"
দিয়া বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, "আবার কি কাল স্কুল খুলবে না?"
অনির্বাণ বাবু আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশটা নীল থেকে ধীরে ধীরে বেগুনী হয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্রগুলো দিনের বেলাতেই ফুটে উঠছে হীরার টুকরোর মতো।
বিকেল ৫টা। পৃথিবী তার কক্ষপথের শেষ বিন্দুতে পৌঁছেছে। এখন থেকে শুরু হবে অসীম যাত্রা—সূর্যের আলো থেকে দূরে, চিরস্থায়ী শীতের দেশে।
অনির্বাণ বাবু অনুভব করলেন চারপাশটা ঠান্ডা হয়ে আসছে। তিনি দিয়াকে নিজের শাল দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। তারা তখন দেখছেন শেষ সূর্যাস্ত। সূর্যটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে, যেন কোনো জাদুকর তাকে গিলে ফেলছে।
তিনি দিয়াকে শোনালেন রামায়ণের সেই গল্প, যেখানে হনুমান সূর্যকে ফল ভেবে গিলতে গিয়েছিলেন। দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে যেন মুহূর্তের জন্য মৃত্যুর বিভীষিকা মুছে গেল।
আকাশ এখন পুরোপুরি কালো হয়ে গেছে । কিন্তু সে কালোতে কোনো ভয় নেই। লক্ষ লক্ষ তারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে পৃথিবীকে। অনির্বাণ বাবু অনুভব করলেন তার শরীরটা হালকা হয়ে আসছে। তিনি দিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
"ভয় পাস না দিয়া, আমরা শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছি। যেখানে সব গল্প সত্যি হয়।"
পৃথিবী তার শেষ আবর্তন পূর্ণ করল। মহাকাশের নিস্তব্ধতায় মিশে গেল মানুষের শেষ দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু কোথাও যেন এক রেশ রয়ে গেল—সেই সব গল্পের, কবিতার আর ভালোবাসার, যা মানুষ এই নীল গ্রহে রেখে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কিন্তু এই সন্ধ্যা অন্যদিনের মতো নয়। আকাশটা এখন কালচে বেগুনি, আর তার মাঝে মাঝে বিদ্যুতের মতো অদ্ভুত আলোর রেখা খেলে যাচ্ছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পাতলা হয়ে আসছে, তাই মহাকাশের নক্ষত্রগুলো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
অনির্বাণ বাবু দিয়াকে নিয়ে বাড়ির লাইব্রেরি ঘরে ঢুকলেন। ঘরের চারপাশ বইয়ে ঠাসা। শেক্সপিয়র থেকে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে মহাকাব্য—সব যেন আজ তাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত। তিনি একটা পুরনো ট্রাঙ্ক খুললেন। ভেতরে রয়েছে।কতগুলো হলদেটে হয়ে যাওয়া খাতা।
"দাদু, এগুলো কী?" দিয়া কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
"এগুলো হলো পৃথিবীর জমানো সম্পদ, দিয়া। মানুষ যখন চলে যায়, তখন তার ঘরবাড়ি বা টাকা পড়ে থাকে না, পড়ে থাকে তার সৃষ্টি। এই দেখ, এটা আমার বাবার লেখা ডায়েরি, আর এটা আমার ছাত্রজীবনে লেখা কবিতা।"
তিনি একটা খাতা খুলে পড়তে শুরু করলেন। বাইরের জগতের হাহাকার যেন এই ঘরের দেয়ালে এসে থমকে গেল। তিনি দিয়াকে শোনালেন বর্ষার দিনে কদম ফুলের ঘ্রাণের কথা, শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর শীতের সকালে রোদে বসে পিঠে খাওয়ার গল্প। দিয়া মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। সে হয়তো কোনোদিন এই ঋতুগুলো আর দেখবে না, কিন্তু অনির্বাণের শব্দের তুলিতে তার মনে এক নতুন পৃথিবীর ছবি আঁকা হয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির পুরনো রেডিওটা সশব্দে বেজে উঠল। ব্যাটারির শেষ শক্তিতে কোনো এক দূর দেশের সিগন্যাল ধরা পড়েছে। এক ফরাসি নারী কণ্ঠে গান ভেসে আসছে। ভাষা না বুঝলেও সুরটা করুণ আর শান্ত। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ হয়তো এই সুরেই কাঁদছে।
অনির্বাণ বাবু ভাবলেন, সারাজীবন মানুষ ধর্ম, জাত আর সীমানা নিয়ে লড়াই করল। কিন্তু আজ যখন শেষ দিন এল, তখন সবাই শুধু 'মানুষ'। মঙ্গলে যাওয়ার রকেটগুলো অনেক আগেই দিগন্ত ছাড়িয়ে চলে গেছে। যারা রয়ে গেছে—দরিদ্র, অসুস্থ, বৃদ্ধ আর একা মানুষ—তারা আজ একে অপরের হাত ধরে বসে আছে।
তিনি দিয়াকে বললেন, "দেখ দিয়া, মানুষ যখন একা থাকে তখন সে ভয় পায়। কিন্তু যখন সে অন্যের কথা ভাবে, তখন মৃত্যুও তাকে ভয় দেখাতে পারে না।"
রাত ৮টা,মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এখন এতটাই কমে গেছে যে পা ফেললে মনে হচ্ছে যেন মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছেন। অনির্বাণ বাবু দেখলেন বাগানের পুকুর থেকে জল ছোট ছোট গোলক হয়ে শূন্যে ভাসছে। দিয়া অবাক হয়ে সেই জলের বলগুলো ধরার চেষ্টা করছে।সে যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী পরিবেশ।
হঠাৎ করেই আকাশ চিরে এক বিশাল উল্কাপাত শুরু হলো। হাজার হাজার তারা যেন খসে পড়ছে পৃথিবীর কোলে।
"দাদু! দেখ কত তারা!" দিয়া হাততালি দিয়ে উঠল।
অনির্বাণ বাবু বুঝলেন, এগুলো তারা নয়। এগুলো হলো পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকা হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ (Satellites)। পৃথিবীর কক্ষপথ পরিবর্তনের কারণে সেগুলো কক্ষচ্যুত হয়ে বায়ুমণ্ডলে পুড়তে পুড়তে নেমে আসছে। মানুষের তৈরি প্রযুক্তির শেষ দাহ এটি।
অনির্বাণ বাবু দিয়াকে একপাশে বসিয়ে একটি শেষ চিঠি লিখতে বসলেন। কার জন্য? হয়তো অনাগত কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর জন্য, যারা কোনোদিন এই মৃত গ্রহটাকে খুঁজে পাবে।
তিনি লিখলেন:
"আমরা নিখুঁত ছিলাম না। আমরা যুদ্ধ করেছি, প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছি। কিন্তু আমরা ভালোবাসতেও জানতাম। আমরা কবিতা লিখতাম, গান গাইতাম আর সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হতাম। যদি তোমরা এই চিঠি পাও, তবে জেনে রেখো—এই গ্রহে একসময় এমন এক জাতি বাস করত যারা স্বপ্ন দেখতে জানত।"
তিনি চিঠিটা একটি কাঁচের জারে ভরে শক্ত করে মুখ বন্ধ করে দিলেন। তারপর বাড়ির সবচেয়ে উঁচু আলমারির মাথায় রেখে দিলেন।
রাত তখন কত কে জানে। ঘড়িগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে। ইলেকট্রনিক্স সব অকেজো। সারা পৃথিবী এখন এক আদিম অন্ধকারে ডুবে গেছে। আকাশ থেকে সূর্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে, কারণ পৃথিবী এখন সূর্যের আকর্ষণ ছিন্ন করে একাকী মহাকাশে যাত্রা শুরু করেছে।
তীব্র ঠান্ডা নামছে। অনির্বাণ বাবু দিয়াকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। দিয়া ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার নিষ্পাপ মুখটা দেখে অনির্বাণের মনে হলো, এই শিশুটির জন্য কি কোনো ভবিষ্যৎ অবশিষ্ট নেই? নাকি মৃত্যু মানেই এক নতুন জন্ম?
রাত যত বাড়ছে, কনকনে ঠান্ডা হাড়ের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করেছে। আন্দুলের বাড়ির জানলার কাঁচে বরফের সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটে উঠছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা নোনা বাতাস এখন আর আর্দ্র নয়, বরং তা তুষারশীতল।
অনির্বাণ বাবু ঘরের মাঝখানে রাখা পুরনো কাঠের আলমারি আর কয়েকটা ভাঙা চেয়ার ভেঙে ছোট একটা আগুন জ্বালালেন। আগুনের শিখাটা কাঁপছে, আর তার আলোয় ঘরের দেয়ালে ছায়াগুলো ভূতের মতো নাচছে। দিয়া ঘুমের ঘোরে একটু কেঁপে উঠলে তিনি নিজের কাশ্মীরি শালটা তার গায়ে আরও ভালো করে জড়িয়ে দিলেন।
তিনি ভাবলেন, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ গুহায় এভাবেই আগুন জ্বালিয়ে বন্য পশুর হাত থেকে বাঁচত। আজ ইতিহাস যেন এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন করছে—আবার সেই আগুন, আবার সেই বেঁচে থাকার আদিম লড়াই। কিন্তু আজ কোনো পশু নেই, আজ শত্রু স্বয়ং মহাকাশ।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো ট্রানজিস্টর রেডিওটা কর্কশ শব্দ করে উঠল। স্ট্যাটিক শব্দের মাঝে খুব ক্ষীণ একটা সংকেত ভেসে আসছে। অনির্বাণ বাবু অবাক হয়ে কান পাতলেন। কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, বরং এক অদ্ভুত সুর—যেন মহাকাশের নক্ষত্ররা একে অপরের সাথে কথা বলছে।
তিনি ভাবলেন, হয়তো মঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাওয়া সেই 'আর্ক-১' মহাকাশযান থেকে কেউ শেষ বার্তা পাঠাচ্ছে। অথবা হতে পারে, কোনো দূর নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে অন্য কোনো সভ্যতা পৃথিবীর এই অন্তিম লগ্ন প্রত্যক্ষ করছে।
রেডিওর সেই শব্দে দিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ কচলে বলল, "দাদু, ওটা কিসের শব্দ? গান বাজছে?"
অনির্বাণ বাবু তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, "হ্যাঁ দিয়া, ওটা পৃথিবীর বিদায়ি গান। শোন, কী সুন্দর ছন্দ!"
রাত ৩টে। বাড়ির বাইরে থেকে এক বিকট শব্দ এল। অনির্বাণ বাবু জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, পাশের বড় বটগাছটা শিকড় সমেত মাটি থেকে উপড়ে শূন্যে ভাসছে। পৃথিবীর মহাকর্ষ শক্তি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। মাটি থেকে ধুলোবালি আর ছোট ছোট পাথর মেঘের মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
তিনি দিয়াকে শক্ত করে ধরলেন, পাছে সেও জানলার বাইরে হারিয়ে না যায়। ঘরের ভেতরের বইগুলো তাক থেকে বেরিয়ে এসে ঘরের ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের 'সঞ্চয়িতা' আর শেক্সপিয়রের 'হ্যামলেট' পাশাপাশি ভাসছে—জ্ঞানের কোনো ভেদাভেদ নেই আজ।
দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল, "দাদু দেখ, আমি উড়ছি!"
অনির্বাণ বাবুর চোখে জল এল। এই মহাপ্রলয়কে শিশুটি এক জাদুকরী খেলা মনে করছে। তিনি ভাবলেন, মৃত্যুকে যদি এভাবে হাসিমুখে বরণ করা যেত, তবে জীবন কতই না সুন্দর হতো।
অনির্বাণ বাবু তার ডায়েরির শেষ পাতাটা বের করলেন। হাত কাঁপছে ঠান্ডায়, কিন্তু তিনি লিখতে চাইলেন।
"আজ ১০ই মার্চ, ২০৯৯। সময় স্থির হয়ে গেছে। পৃথিবী এখন সূর্যের পরিবার ত্যাগ করে এক যাযাবর গ্রহ (Rogue Planet)। আমাদের আকাশ এখন আর নীল নয়, বরং এক অনন্ত নক্ষত্রখচিত অন্ধকার। আমরা মরে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের পরমাণুগুলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। হয়তো কয়েক কোটি বছর পর, কোনো এক নতুন নক্ষত্রের চারপাশে আমরা আবার ধুলিকণা হয়ে জন্ম নেব।"
তিনি ডায়েরিটা বন্ধ করে দিয়ার কপালে একটা চুমু খেলেন।
হঠাৎ করে বাইরে এক তীব্র নীল আলো জ্বলে উঠল। কোনো উল্কাপাত নয়, বরং বায়ুমণ্ডলের শেষ স্তরের সাথে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষে তৈরি হওয়া এক বিশাল 'অরোরা' বা মেরুজ্যোতি। পুরো আন্দুল শহরটা সেই নীল আর সবুজ আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
অনির্বাণ বাবু দিয়াকে কোলে নিয়ে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে কোনো বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না, শুধু কুয়াশা আর সেই স্বর্গীয় আলো। পৃথিবী এখন তার শেষ বায়ুমণ্ডলটুকুও মহাকাশে বিসর্জন দিচ্ছে।
"দাদু, দেখ কত আলো! আমরা কি স্বর্গে যাচ্ছি?" দিয়া ফিসফিস করে বলল।
অনির্বাণ বাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, পৃথিবী এখন আর একা নয়। দূরে অন্য গ্রহগুলোকেও ছোট ছোট বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, পৃথিবী এখন এক অনন্ত যাত্রার পথিক।
রাত ৪টে, ঘড়ির কাঁটাগুলো এখন আর চলছে না, কারণ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ঘরের ভেতরের উষ্ণতা এখন হিমাঙ্কের অনেক নিচে। আগুনের শিখাটা নিভে গেছে, শুধু অবশিষ্ট লাল কয়লাটুকু ধিকিধিকি জ্বলছে। অনির্বাণবাবু অনুভব করলেন তার হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু তিনি দিয়াকে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরলেন।
তিনি ভাবলেন, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই মাটির ওপর দিয়ে হেঁটেছে, ঘর বেঁধেছে, যুদ্ধ করেছে। কত সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেছে, কত সভ্যতার জন্ম হয়েছে। আজ সেই সবকিছুর সমাপ্তি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম মুহূর্তে তার মনে কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। শুধু আছে এক গভীর প্রশান্তি।
"দাদু, ঘুম আসছে খুব..." দিয়ার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত ক্ষীণ।
অনির্বাণ বাবু ম্লান হাসলেন। "ঘুমো দিদিভাই, ঘুমো। কাল যখন চোখ খুলবি, দেখবি চারপাশটা একদম নতুন। কোনো দুঃখ নেই, কোনো অভাব নেই।"
তিনি জানতেন এই ঘুম আর ভাঙবে না, কিন্তু সত্যকে সুন্দর করে বলাই তো সাহিত্যের কাজ। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি দিয়াকে তার শেষ পাঠটি দিয়ে যেতে চান—ভয় নয়, বিশ্বাসের পাঠ।
পৃথিবী এখন আর কোনো সৌরজগতের অংশ নয়। সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ছিন্ন করে পৃথিবী এখন একটি 'রুগ প্ল্যানেট' (Rogue Planet) হিসেবে অসীম মহাকাশে ভাসছে। চারপাশটা এতটাই অন্ধকার যে মনে হচ্ছে মহাবিশ্ব নিজেই একটি বিশাল ব্ল্যাক হোল।
হঠাৎ অনির্বাণ বাবুর মনে হলো, তিনি ঘরের দেয়াল ভেদ করে বাইরের মহাকাশ দেখতে পাচ্ছেন। এটা কি তার মস্তিষ্কের হ্যালুসিনেশন নাকি মৃত্যুর আগের কোনো বিশেষ চেতনা? তিনি দেখলেন, পৃথিবী তার সাথে সাথে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়, সমুদ্র আর মানুষের স্মৃতিগুলোকে। যদিও সেগুলো এখন বরফে ঢাকা মৃত পাথরের স্তূপ, তবুও তাদের মধ্যে একসময় প্রাণ ছিল। সেই প্রাণের স্পন্দন কি মহাকাশে চিরতরে মুছে যাবে?
অনির্বাণ জানেন, শক্তি অবিনশ্বর। তাদের শরীরের প্রতিটি অণু একসময় কোনো নক্ষত্রের হৃদয়ে তৈরি হয়েছিল। আজ তারা আবার সেই নক্ষত্রপুঞ্জেই ফিরে যাচ্ছে। E=mc^2—আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত সমীকরণটি তার চোখের সামনে ভাসছে। ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, আর জীবন রূপান্তরিত হচ্ছে এক নতুন স্তরে।
মৃত্যুর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে অনির্বাণবাবু এক অদ্ভুত দিব্যদৃষ্টি পেলেন। তিনি দেখতে পেলেন, কয়েক বিলিয়ন বছর পর এই মৃত পৃথিবীটা কোনো এক দূরবর্তী নক্ষত্রের কক্ষপথে প্রবেশ করেছে। সেই বরফ গলা শুরু হয়েছে। আবার সাগরের জলে প্রাণের প্রথম কোষ তৈরি হচ্ছে।
হয়তো সেই পৃথিবীতে আবার মানুষ জন্মাবে। তারা আবার মাটির তলা থেকে খুঁড়ে বের করবে মানুষের তৈরি এই ধ্বংসাবশেষ। হয়তো কোনো এক গবেষক সেই কাঁচের জারটা খুঁজে পাবেন, যার ভেতরে অনির্বাণ বাবুর শেষ চিঠিটা রাখা আছে। তারা অবাক হয়ে পড়বে এক প্রাচীন সভ্যতার কথা, যারা পৃথিবীকে ভালোবাসতে জানত।
এই চিন্তাটা তাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দিল। মানুষের সৃষ্টি অমর, যদি তা হৃদয়ে ধারণ করা যায়।
৫টা বেজে ৩০ মিনিট। পৃথিবী এখন তার শেষ বায়ুমণ্ডলটুকু হারিয়েছে। অনির্বাণ বাবুর নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দিয়া তার কোলেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। হঠাৎ ঘরের জানলা দিয়ে এক অভূতপূর্ব আলোর ঝলকানি এল। কোনো মেরুজ্যোতি নয়, বরং মহাকাশের দূরবর্তী কোনো সুপারনোভার আলো যেন পৃথিবীকে অভিবাদন জানাচ্ছে।
অনির্বাণ বাবু শেষবারের মতো তার চোখ দুটি খুললেন। তিনি দেখলেন, অন্ধকার মহাকাশে পৃথিবী এক ছোট্ট নীল হীরের মতো জ্বলছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "বিদায়, প্রিয় পৃথিবী। ক্ষমা করো আমাদের।"
তার হাত থেকে কলমটা খসে পড়ল। ডায়েরির পাতায় শেষ বাক্যটা অপূর্ণ রয়ে গেল— "ভালবাসা কখনো ম..."
এখন আর কেউ নেই। কোনো মানুষ নেই, কোনো হাহাকার নেই। হিমালয় থেকে আন্দিসের চূড়া—সবই এখন বরফের কবরে শায়িত। প্রশান্ত মহাসাগর এখন এক বিশাল আয়না, যা নক্ষত্রের আলো প্রতিফলন করছে।
পৃথিবী এখন এক নিঃশব্দ জাহাজ। সে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক মহান সভ্যতার কঙ্কাল। কিন্তু মহাবিশ্বের কাছে কোনো কিছুই হারায় না। কোটি বছর পর কোনো এক দূর গ্রহের আকাশ থেকে যখন কোনো শিশু টেলিস্কোপ দিয়ে তাকাবে, সে হয়তো একটি ছোট্ট ম্লান নক্ষত্র দেখবে। সে জানবে না যে ওটা একসময় প্রাণচঞ্চল পৃথিবী ছিল, যেখানে অনির্বাণ আর দিয়া নামের দুজন মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একে অপরের হাত ধরে বসে ছিল।
-----------------------------------
দীনেশ চ্যাটার্জী

