ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি ।। দক্ষিণ ভারতের শেষ সমুদ্রতটে ( তৃতীয় পর্ব ) ।। দীপক পাল


 

 দক্ষিণ ভারতের শেষ সমুদ্রতটে 


 ( তৃতীয় পর্ব )

   দীপক পাল 




                পরদিন সকালে চিত্রা থেকে চা ব্রেকফাস্ট সাঙ্গ করে গাড়িতে উঠে আমরা রামেশ্বরম যাত্রা করলাম জানালার ধারে বসেছিলাম রাস্তার দুই পাশে নারকেলবীথির সারি চোখে পরে দক্ষিণ ভারতে বিশেষত কেরালা তামিলনাড়ুতে বড় বড় ফ্যাক্টরিতে কার্পেট, পাপোশ ইত্যাদি অনেক রকম জিনিস তৈরী হয়  

এবং তা সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে তাই এই ব্যবসা এই সব রাজ্যে ইকনমির একটা দিক বটে তার জন্য নারকেল গাছের চাষ এখানকার একটা জীবিকা নারকেলের ছোবা দিয়ে এইসব সরঞ্জাম তৈরি হয় তাই এখানে বড় একটা ডাব বিক্রি হতে দেখা যায় না এবারে যদিও অল্প কিছু দেখা গেছে কিন্তু আমার আগেকার ভ্রমণে তাও দেখতে পাইনি আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম এখানে যত্রতত্র, তা হচ্ছে সোলার সিস্টেমের ব্যবহার এমনকি ছোট ছোট ফ্যাক্টরিগুলোতেও এই সূর্য রশ্মির ব্যবহার লক্ষ্য করেছি গাড়ির ভিতর থেকে  এইসব দেখতে দেখতে  কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল করিনি হঠাৎ একটা বিকট  শব্দে ঘুম ভাঙলো বুঝলাম আমাদের গাড়িটা এক্সিডেন্ট করেছে আমি সিট থেকে ছিটকে পড়েছি সামনে ড্রাইভারের সিটের ওপর আমার ঠিক চোখের উপরের অংশতে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে আমি মাথা তুলতে তুলতে ভাবছি আমরা সবাই কি তলিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারে সেই চিন্তাটা এসেছিল ঘুমন্ত অবস্থায়  বিকট শব্দে মাথাটা তুলে সামনে তাকিয়ে দেখি মজিদ  তার পাশে বসা শুভ সিট বেল্ট বাধা অবস্থায় বসে আছে আমার চোখের ঠিক ওপর থেকে রক্ত পড়ছে  খুব জ্বালা করছে আমার স্ত্রী শীলা মধ্যিখানে বসায় সামনে কোন সাপোর্ট না পেয়ে সামনের দুই সিটের মাঝে গিয়ে পড়ে চোট পায় এছাড়া আর কারো কোন চোট লাগেনি আসলে আমাদের গাড়ী যখন হাই রোড ধরে ছুটছিল তখন ঠিক সামনের গাড়িটা হঠাৎ করে ব্রেক কষায় আমাদের গাড়ীটা হুরমুর করে  গাড়ীটার ওপর গিয়ে  

পড়ে আমাদের গাড়ীটার এতে বেশ ক্ষতি হয় সামনের দিকের দুপাশের দরজা দুটো আটকে যায় মজিদ যদিও ওর দিকের দরজাটা অনেক ঠেলেঠুলে খুলতে পারলো কিন্তু শুভর দিকের দরজাটা আর খোলা গেলনা মজিদ রে রে করে সামনের গাড়ীটার ড্রাইভারের ওপর গিয়ে পড়লো সে আবার তার গাড়ির কি ক্ষতি হলো সেটা লক্ষ্য করছিল যদিও তার ক্ষতি হয়েছে সামান্য এদিকে তার কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই হঠাৎ গাড়ি থামানোর কোন কারণ বলেনি মজিদ আবার ফিরে এসে গাড়ী স্টার্ট করার চেষ্টা করলো, হলো না গাড়ির বনেট খুলে দেখলো, কিন্তু কিছু বুঝলো না তারপর থানায় ফোন করে সম্পূর্ণ ঘটনার কথা বলায় তারা এখনই আসছে বললো মজিদ একটা গ্যারেজ থেকে একজন মেকানিক ধরে আনলো সে যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে প্রথমে ঠুকঠাক করে শুভর দিকের দরজাটাকে মুক্ত করলোতারপর বনেট খুলে ভেতরটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখে বললো রেডিয়েটার খারাপ হয়ে গেছে তার জন্য গাড়ি স্টার্ট  নিচ্ছে না এছাড়া আরো  কি খারাপ হয়েছে ভাল করে দেখতে হবে এর মধ্যে আগের গাড়ির ড্রাইভার  তার গাড়ি নিয়ে চলে গেল খবর পেলাম পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে গেলে ইন্সুরেন্স কোম্পানির লোক আসবে ইনভেস্টিগেট করতে আমাদের রাস্তার ধারে একটা নির্মীয়মাণ দোকানে টানা পাঁচ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল মজিদ আমাদের জন্য  একটা খালি দোকানঘর সঙ্গে কয়েকটা চেয়ার আর একটা বাথরুমের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল একটা অটো ভাড়া করে সেই দোকানে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাও করেছিল সব পক্ষের ইনভেস্টিগেসন শেষ হয়ে যাবার পর আমাদের রেসকিউ করে রামেশ্বরম নিয়ে যাবার জন্য ট্যুর কোম্পানি একটা 

নতুন গাড়ি পাঠালো দুই ড্রাইভার সব কাগজপত্র টেকওভার - হ্যান্ড ওভার করে আমাদের সব মালপত্র নতুন গাড়ীতে উঠিয়ে নেবার পর আমাদের নিয়ে রামেশ্বরম রওনা দিল ওদিকে  মজিদের গাড়ীটা নিয়ে যাবার জন্য থানা থেকে গাড়ি আসায় মজিদ সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঐদিকে দৌড়ে গেল খুব চিন্তিত দেখাল ওকে নতুন ড্রাইভারের নাম মুনির  মজিদের তুলনায় কম কথা বলে তবে দুজনেই খুব ভদ্র  হেল্পফুল রামেশ্বরম পৌঁছানোর আগে পড়ে মন্ডপম আমি এর আগেরবারে রাতের ট্রেনে মাদুরাই থেকে রামেশ্বরম গিয়েছিলাম তখনও ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি ট্রেন মন্ডপম স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছিল তারপরই প্লম্বন সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় দেখেছিলাম নিচে দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ চলেছে একের পর এক সেবার ফিরতি ট্রেনে মন্ডপম নেমে দুপুর দুটোর পরে বাসে করে রাত দশটায় কন্যাকুমারীতে পৌঁছেছিলাম তখন মন্ডপমকে দেখেছিলাম খুব সাদামাটা। 

 

এবারে গাড়ি করে রামেশ্বরম যাবার সময় মন্ডপমকে দেখলাম খুবই উন্নত শহর এবারে রাতের অন্ধকারে প্লম্বন সেতু পেরোলাম যা ঠিক ভালো করে বুঝলাম না আমাদের হোটেলের ম্যানেজারের সাথে শুভ তার আগে যোগাযোগ করায় সে বলেছিল রাত দশটার মধ্যে হোটেলে ইন্ করলে রাতের খাবার পাওয়াযাবে মন্দির পেরোবার পর একটু এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকের একটা রাস্তা ধরে একটু এঁকে বেঁকে গিয়ে আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম তখন দশটা বাজতে দশ মিনিট খুব সুন্দর হোটেলটা বারান্দা থেকে সমুদ্রের ভিউটা দেখার মতো জামা কাপড় চেঞ্জ করতে করতে রাতের ডিনার এসে গেল ডিনার সেরে পরের দিন সকালে স্নানকরে মন্দির দর্শন এর প্ল্যান করা হলো


            পরদিন সকালে স্নান সেরে হোটেল থেকে বেরিয়ে মুনিরের গাড়িতে সবাই উঠে বসলাম মন্দিরের মেন গেটের কাছে নামলাম বাইরেই এক জায়গায় জুতো মোবাইল সব জমা দিলাম পুজোর সামগ্রী নিলাম এতে আছে একটা নারকেল, এক ছড়া কলা, আর বেলপাতা ফটক পেরিয়ে স্পেশাল টিকিট কেটে লাইন দিলাম পায়ে পায়ে এগোতে থাকলাম মন্দিরের ভেতরের করিডোর নাকি চার হাজার ফুট লম্বা আর সতেরো থেকে চব্বিশ ফুট প্রশস্ত দু'ধারে বেশ বড় বড় থামের উপর ছাদ এবং থামের নিচের অংশ থেকে ওপরের অংশ বেশি মোটা মনে হয় ছাদের ভার বইবার জন্য এই ব্যবস্থা তবে বলতে গেলে সেরকম কিছু কারুকার্য নেই তাতে রেলিং দেওয়া দীর্ঘ লাইন এগোতে থাকলো ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে যেতে যেতে অবশেষে দূর থেকে গর্ভগৃহের ভিতরে ঠাকুরের অধিষ্ঠান লক্ষ্য করলাম অতি বৃহৎ শিবলিঙ্গ প্রদীপ  মোমের আলোয় দৃশ্যমান গর্ভগৃহের বাইরে এত ইলেকট্রিক আলোর ছড়াছড়ি কিন্তু সে আলোর রোশনাই খালি বাইরে কিন্তু সে আলো ধ্যানমগ্ন দেবতার যাতে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয় তাই শুধু ভিতরে স্নিগ্ধ আলো আর পুরোহিতের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চা এখানে তীর্থযাত্রীদের পূজা দেবার অধিকার নেই সেই পূজা নেবে বেরোবার পথে অন্নপূর্ণা  বিশ্বেশ্বরের নামে পুরোহিত নারকেল  ভেঙে অর্ধেক রেখে, কলার ছড়াও ভেঙে কিছুটা রেখে বাকিটা তীর্থযাত্রিকে প্রসাদ করে ফিরিয়ে দেয় এই কাজটা পুরোহিত করে অতি দ্রুত হাতে প্রসাদ হাতে নিয়ে সবাই বেরোলাম মন্দিরের গোপুরম থেকে প্রায় আড়াই পৌনে তিন ঘন্টা রে জমা দেওয়া সব জিনিসপত্র ফেরৎ নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। 


             বিকালে আবার বেরোলাম সবাই প্রথমে গেলাম ধনুস্কোটির কাছে এক টাওয়ারে শ্রীরামচন্দ্র এখানে বসে যুদ্ধের প্রস্তুতি  তার পরিচালনা করতেন এইখানে সম্ভবত সমুদ্রের প্রস্থটা অনেক ছোট ছিল সেই সময়কাল এখনকার সাথে তুলনা করলে চলবে না পার ভেঙে ভেঙে সমুদ্র আরও অনেক চওড়া হয়েগেছে সেজন্য এইখানেই সেতুবন্ধন করার অনেক সুবিধাজনক ছিল তাই অনেক সহজেই সম্পুর্ণ বানর সেনা নিয়ে রাম-লক্ষণ লঙ্কা আক্রমণ করতে পেরেছিল রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়েছিল সাতাশি দিন রাবণ বধের পর রাম ঠিক এই জায়গায় বিভীষণের রাজ্যাভিষেক করান বিভীষণ হয় লঙ্কাধিপতি পরে এখানে একটা মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় এখান থেকে তিনদিকের সমুদ্র দেখতে লাগে অতি মনোহর


                                                                                        
  ( চলবে )

Address:-
---------------
Dipak Kumar Paul, 9007139853,
DTC, Southern Heights,
Block-8,  Flat-1B, 
D.R. Road, Kol-700104.
------------------------------------.

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.