স্মৃতিকথা ।। স্মৃতিকথায় মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ।। সমীর কুমার দত্ত

 

ছবিঋণ - ইন্টারনেট 

 

স্মৃতিকথায় মণিশংকর মুখোপাধ্যায়

 সমীর কুমার দত্ত  

            

আধুনিক কলকাতার নগরজীবনের রূপকার, সংগ্রামী জীবন থেকে উঠে আসা বাঙালির উচ্চাশা, আপস‌ ও উত্তরণের কথাশিল্পী 'শংকর ' তথা মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। শৈশবে পিতৃহীন হয়ে তাঁর সংগ্রামী জীবন তাঁকে যে সম্মানের জায়গায় এনে দিয়েছে, তা সকল শ্রেণীর পাঠক ও লেখককে উদ্বুদ্ধ করবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমি তাঁর সৃষ্টি কর্মের দিকে যেতে চাই না। তবে একটা কথা বলবো যে তিনি এমন একজন সাহিত্যিক, যাঁর অধিক সংখ্যক রচনা চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে এবং এইজন্য তিনি অনেক সাহিত্যিকের ঈর্ষার কারণ । তাঁর পাঠক সংখ্যা অগণিত, সুতরাং তাঁর সৃষ্টি কর্ম ও গতানুগতিক জীবন সম্পর্কে পাঠকরা যা জানেন , তার বাইরে বিশেষ কিছু বলতে পারবো না অথবা এক‌ই কথা বলে বিষয়কে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। এই গতানুগতিকতার বাইরে কিছু কথা থাকে, তাকে ছুঁয়ে যাবার জনেই এ লেখার অবতারণা। তাঁর পরবর্তী দুই ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে ও যে পাড়ায় তিনি বসবাস করতেন, সেই পাড়ার সঙ্গে আমি গভীর ভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলাম । সেই সূত্রে তাঁদের সম্পর্কে যা জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে সেটুকুর স্মৃতি রোমন্থন করতে চাই।

শৈশবে পিতৃহীন হয়ে পড়ায়, জেষ্ঠ্য সন্তান হ‌ওয়ার জন্য বিধবা মা অভয়া দেবী এবং তিন ভাই অর্ধেন্দু 
( ইন্দে), দিব্যেন্দু ( লালা) ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা পিনাকী — এই নিয়ে তাঁদের সংসার এবং তার দায়- দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। তাদের পরিবার বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে এসে মধ্য হাওড়ার চৌধুরী বাগানের বিহারীলাল চক্রবর্তী লেনের একটি গলিতে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করতে থাকেন। এই পাড়ার দুই বিপরীত পার্শ্বের প্রায় দুই আড়াই কিমি দূরে দুই বিখ্যাত স্কুল  হাওড়া জেলা স্কুল ও বিবেকানন্দ  ইনস্টিটিউশন এই দুই স্কুলে পড়াশোনা করেন। জিলা স্কুলে পড়ার সময় বেতন দিতে না পারার জন্য তাঁকে স্কুল পরিবর্তন করে হাওড়া বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে এসে ভর্তি হতে হয় ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত  প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় শুধাংশু শেখর ভট্টাচার্য  মহাশয়ের সহযোগিতায়। পরবর্তী কালে ওনার‌ই সহযোগিতায় অস্থায়ী শিক্ষকতার কাজ পান। আই. এ পড়ার জন্য রিপন কলেজ বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু অভাবে যাদের জীবন কাটে , তাদের এক‌ই অবস্থা বার বার ঘটে। সেই বেতন দিতে না পারার জন্য আই. এ পরীক্ষায় বসার পথে বাধা হয়। 

সেইসময় একটি সাহিত্য সভায় রম্যরচনা লিখে প্রিন্সিপাল সাহেবের মনোরঞ্জন করে পরীক্ষায় বসার সুযোগ পান। 

এই বোধ হয় তাঁর প্রথম লেখা শুরু। পিতৃ বিয়োগের পর তাঁর মা অভয়া দেবী শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন। ছোট থেকেই ছেলেরা মায়ের কঠিন শাসনে মানুষ হন। আমি তাঁর ভাই দিব্যেন্দু মুখোপাধ্যায় ওরফে লালাদা'র মুখে শুনেছি রাত ন'টার মধ্যে সকলকে বাড়ি ঢুকে পড়তে হবে। তাঁর মায়ের জীবদ্দশায় ছেলেদের বিয়ে হয়ে যাবার পরেও এই নিয়ম চালু ছিলো। ছেলেরা এত‌ই মা"কে মান্য করতেন।
মণিশংকরদা'কে পাড়ায় বড়ো একটা দেখা যেতো না। অর্থ উপার্জনের জন্য ভীষণ কর্মব্যস্ত থাকতেন।ভীষণ অমায়িক, বাক্ সংযমী ও মিতভাষী ছিলেন। নামী দামী হয়ে ওঠার পরেও  উচ্চ নীচ সকলের সঙ্গে সমানভাবে কথা বলতেন।

আমি ঠিক ওই পাড়ায় থাকতাম না। পাশের পাড়ায় থাকতাম। চৌধুরী বাগানে থাকতেন নেতাজির একনিষ্ঠ অনুগামী বিপ্লবী হরেন্দ্রনাথ ঘোষ , নেতাজি যাঁকে 'হরেন দা' বলে সম্বোধন করতেন, তাঁর অকৃতদার  ভাইপো ,নেতাজি অনুগামী  স্বর্গীয় প্রশান্ত ঘোষ ওরফে মান্টুদা'র পরামর্শে আমরা 'অগ্রণী ছাত্র সংঘ' নামে ক্লাব গড়ে তুলি। যেখানে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা, নেতাজির ওপর নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি হতো। মণিশংকর' দার  দুই ভাই অর্ধেন্দু ও দিব্যেন্দু গান বাজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একবার 'শ্যামা' নৃত্যনাট্য হয়েছিল, তাতে ওই দুই ভাই যুক্ত ছিলেন। সেই সুবাদেই ওনাদের সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর আমি অন্যত্র চলে যাওয়ায় আর দেখা হয়নি। বর্তমানে ওনারা কে কেমন আছেন জানি না।  ওনারা ওই পাড়াতে বহুদিন কাটিয়েছেন। পরবর্তী কালে ভাইয়েরা লেখাপড়া শিখে  জি. কে. ডাবলুতে চাকরি পান । 
ছোট ভাই পিনাকী মুখোপাধ্যায়, খুব সম্ভবতঃ ওর পায়ের একটু ডিফেক্ট ছিলো, ভালো চাকরি পায়।
তখন ওনারা চৌধুরী বাগানের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে শিবপুর ট্রাম ডিপোর কাছে মায়াপুরী সিনেমার পাশাপাশি জায়গা কিনে বাড়ি তৈরি করে চলে যান। 

তাঁর মৃত‌্যুর খবর শোনার পর থেকে সামান্যতম স্মৃতিও চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
চৌধুরী বাগানের নেতাজি সুভাষচন্দ্র রোডের মুখে একটা সেলুন ছিলো। নাম বঙ্কুদার সেলুন। ওনারা ওই সেলুনে চুল দাড়ি কাটতেন। বঙ্কুদা মারা যাবার পর , ছেলে প্রসাদ দাস দোকান চালাতো। ওর কাছেও মণিশংকরদা চুল দাড়ি কাটতেন। প্রসঙ্গান্তরে একটা কথা বলে রাখি, চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত ক্যামেরাম্যান স্বর্গীয় বিজয় ঘোষ ওই পাড়াতেই থাকতেন।ফিল্ম প্রোডিউসার ও দু দুটি সিনেমা হলের মালিক স্বর্গীয় গোপী চক্রবর্তীর অনেকগুলি বাড়ির মধ্যে একটিতে মণিশংকরদারা ভাড়া থাকতেন । একবার মণিশংকরদা তখন শিবপুরে থাকতেন। কারোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চৌধুরী বাগানে এসে প্রসাদের খোঁজ নিচ্ছেন, কি প্রসাদ, ভালো আছো তো?" ওনারা যে গলিতে থাকতেন, সেখানে একটা বস্তিতে অতি অখ্যাত, বর্ণকালো এক মহিলা থাকতেন , যাকে সবাই রাঙাদি বলে ডাকতো। একটু মাথার গন্ডগোল ছিলো। মণিশংকরদার গল্পে সেও বাদ যায়নি তাঁর  লেখায় 'কতো অজানারে' তে। উক্ত রাঙাদিকে আমিও চিনতাম। 'একা একা একাশি' ও 'পাগল সাহেবের পাগলামি' প্রভৃতি ব‌ইতে তাঁর জানা অনেকে স্থান পেয়েছে।

আমার একটা দুঃখ রয়ে গেলো যে আমি যৌবনকালে একটি বৃহৎ ও উন্নত মানের হস্ত লিখিত ম্যাগাজিন 'চিত্রলেখা' র অলংকরণ ও সম্পাদনা করি, যাতে বঙ্গের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদিগের শুভেচ্ছা ও মতামত সংগ্রহ করা আছে, নেই শুধু মণিশংকরদারটাই। তার যথার্থ কারণ‌ও আছ। তিনি তখন জীবন যুদ্ধে ভীষন ব্যস্ত। আর আমিও  অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য‌ও হয়ে ওঠেনি। কথায় আছে না, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায়না। এও ঠিক তাই। এতো কাছে পেয়েও তাঁর শুভেচ্ছা ও মতামতের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। 
    যাক্,অযথা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মণিশংকরদার কথা বলে শেষ করা যাবে না। মানুষ হিসেবে তো কথাই নেই। না ফেরার দেশে তাঁর চিরপ্রস্থান খুব‌ই মর্মান্তিক। তাঁর আত্মার চির শান্তি কামনা করে  তাঁর সম্পর্কে আর একটি কথা বলে এ লেখার ইতি টানতে চাই। বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো আর কতোজন সাহিত্যিক এই অমানুষিক লড়াই করে যশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন আমার তা জানা নেই।কারণ, বিশ্বকবির ভাষায় বলি,"বিপুলা এই পৃথিবীর কতোটুকু জানি।"
===================
 

Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.