ছবিঋণ- ইন্টারনেট
হাতিদেবতা আর কাঞ্চনজঙ্ঘা
অঞ্জনা মজুমদার
গরমের ছুটিতে বিনু আর মিনু মা বাবার সঙ্গে বেড়াতে এসেছে পাহাড়ে। কালিম্পং এর কাছে ছোট্ট একটা গ্রাম চিবোতে এক সুন্দর হোমস্টে পাখিবাড়ি। একটা ছোট্ট টিলার ওপরে ছবির মতো বাড়ি, ফুল আর পাতাবাহার গাছ দিয়ে ঘেরা। চারিদিকে পাখির কিচিরমিচির আর দূরে পাহাড়ের সারি। হালকা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। হোমস্টের বারান্দায় চেয়ারে বসে মা বললেন, আমি এখানেই বসে পাহাড় দেখবো। বিনু মিনু একদম দুষ্টুমি করবে না। বাগানের বাইরে বেরোবে না।
কেয়ারটেকার সুজান, জন্মসূত্রে নেপালি বললেন, এখানে ভয়ের কিছু নেই মা। তবে বাচ্চারা জঙ্গলের বেশি ভেতরে না যাওয়াই ভালো। দুই ভাই বোন একটা করে আপেল কামড়াতে কামড়াতে নাচতে নাচতে দৌড়ল।
বাগানটা বেশ বড়ো। কমলা, আপেল,পেয়ারা, কলার গাছ আছে। আর আছে নানা রকমের ফুলের গাছ। হাত বাড়িয়ে কমলালেবু পাড়া যায়। মিনু একটা কমলালেবু নিতে গিয়েছিল, পেছন থেকে বিনু বলল, না বলে নেওয়া ঠিক হবে না মিনু।
হাত সরিয়ে মিনু দৌড় দিল বাগানের অন্য দিকে। পিছনে পিছনে বিনুও দৌড়াল। এদিকে বাগানের পাঁচিলের পাশে একটা মন্দির। ভাই বোনে পায়ে পায়ে মন্দিরের সামনে।
মিনু বলল, দাদাভাই মন্দিরে ঢুকবো না?
দুজনে জুতো খুলে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরের দরজার সামনে। দরজা ভেজানো ছিল। হাত দিয়ে ঠেলতেই খুলে গেল। অবাক হয়ে ওরা দেখলো মন্দিরের দেবতা একটা কালো হাতি। বড় বড় সাদা দুটো বাঁকানো দাঁত। গলায় একটা সাদা ফুলের মালা। সামনে ধূপ জ্বালানো। মনে হয় একটু আগেই পুজো হয়েছে। সামনে একটা থালায় একছড়া কলা। ওটাই বোধহয় প্রসাদ। ভাইবোনে কপালে হাত ঠেকিয়ে হাতিদেবতাকে প্রণাম করলো। মিনুর মনে হলো হাতিদেবতার চোখদুটো হেসে উঠলো।
পেছন দিকে একটা দরজা, হালকা হাওয়ায় পাল্লা দুটো দুলছে। ওদিক থেকে কেউ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দুজনে ওই দরজা দিয়ে পাঁচিলের পেছনে চলে এলো। খেয়ালই নেই যে পায়ে জুতো নেই, শুধু মোজা।
এদিকে একটা পায়ে চলার সরু পথ। ওরা এগিয়ে চললো, দুপাশে জঙ্গল ক্রমশঃ ঘন হয়ে আসছে ওদের খেয়াল নেই। একটা কালো বিড়াল মিয়াঁও করে রাস্তা পার হয়ে গেল। মিনুর পায়ে একটা কাঁটা ফুটেছে। মা বলে কেঁদে উঠলো সে, আর বিনুরও হুঁশ ফিরল।
মিনুর পা থেকে কাঁটা বের করে দুহাতে তাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল, চল্ বোন এবার ফিরে যাই।
বলে পেছন ফিরে তাকিয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেল। একি? হোমস্টের পাঁচিল আর মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে না তো?
মিনুও খেয়াল করেছে, দাদাভাই কোনদিকে ফিরবো? আমরা কি তবে হারিয়ে গেছি?
বিনু কোনও উত্তর দিতে পারলো না। বোনের হাত শক্ত করে ধরে যে পথটা সামনে পড়ল সেদিকে এগিয়ে চললো। সামনে হঠাৎ চারজন পাহাড়ি লোক যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হলো।
কি হলো খোকাবাবু, পাখিবাড়ির রাস্তা খুঁজে পাচ্ছো না? আমাদের সাথ চলো রাস্তা বাতলিয়ে দেবো।
ভাই বোন একটু দোনামনা করছে দেখে এবার তারা জোর করে হাত চেপে ধরে ওদের টেনে নিয়ে চলল। মুখটাও বেঁধে দিল। গায়ের জোরে ওদের সঙ্গে পারল না, অসহায়ের মতো বন্দি হয়ে গেল দুই ভাই বোন। পাঁজাকোলা করে একটা ভাঙা ঘরে ওদের একটা চৌকির ওপর ফেলে লোকগুলো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আমাদের কাজ শেষ। দুটো বাচ্চা ধরেছি। এদের ব্যবস্থা এবার সর্দার করবে। সর্দারের আসতে রাত হবে। আয় একটু গলা ভিজিয়ে নিই। বলে ঘরের কোণে রাখা দুটো বোতল নিয়ে গলায় ঢালতে যাবে, তক্ষুনি একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ।
গুন্ডাগুলোর আতঙ্কে হাত থেকে বোতল পড়ে গেল। শুকনো পাতার ওপর পড়েছে তাই ভাঙলো না। ভাঙা দরজাটা একটা ধাক্কা লেগে আরও একটু বেশি ভেঙে গেল। সেই ভাঙা অংশে একটা হাতির মাথা দেখা গেল।
মিনু বিনু দেখল অবিকল সেই মন্দিরের দেবতা, কেবলমাত্র জীবন্ত। গুন্ডাগুলো একপাশে জড়োসড়ো হয়ে হাত জোড় করে পড়ে রইল কেন বুঝতে পারল না বিনু।
হাতিটির শুঁড়ের ইশারায় একজন গুন্ডা বিনুদের হাত মুখ খুলে দিল। বিনু মিনুর হাত ধরে দরজার বাইরে বেরিয়ে আসতেই অন্ধকারে অনেক মানুষের গলার আওয়াজ শোনা গেল। মায়ের গলা শোনা গেল, বিনু মিনু কোথায় তোরা?
মিনু চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলো, মা আ আ।
জোরালো অনেকগুলো টর্চের আলো এসে পড়লো ওদের ওপর। মা,বাবা, সুজান আর একদল পুলিশ এগিয়ে এলেন। মিনু দৌড়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। বিনুও ছুটে গেল। অফিসার আর পুলিশের দল লোক চারজনকে ধরে ফেলল। ওরা বাঁধা দেবার চেষ্টাও করলো না।
অফিসার বললেন, আবার তোরা বাচ্চা চুরির চেষ্টা করেছিস?
একজন গুন্ডা হতাশ হয়ে বলল, পারলাম না। এবারেও হাতি দেওতা বাচ্চাদের বাঁচিয়ে দিল।
অফিসার চুপ করে গেলেন। মা বললেন, হাতি দেবতা?
মিনু বলল, সত্যি মা, একটা বড় হাতি এসেছিল। তাকে দেখেই এরা ভয় পেয়ে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে।
সুজান কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে বলল, বাবা হাতি দেবতা আবার বাচ্চাদের বাঁচিয়ে দিলেন। কাল বড় করে পুজো দেব দেবতার মন্দিরে।
বাবার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে অফিসার বললেন, যতবার এই চিবোতে কোনও বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই একটা হাতি এসে বাঁচিয়েছে। অথচ এ জঙ্গলে কোনও হাতিই নেই, বন দফতর অনেক খোঁজ করে দেখেছে।
মা বললেন, কোথায় হাতি দেবতার মন্দির?
সুজান বললেন, আমাদের পাখিবাড়িতেই তো হাতিদেবতার মন্দির। মা বললেন, আমি কালই পুজো দেবো।
সুজান সম্মতিতে মাথা নাড়লেন।
পরদিন সকালে উত্তেজিত বাবার গলা, ওরে বিনু মিনু, দেখবি আয়। আকাশে পাহাড়ের গায়ে কী অপরূপ দৃশ্য।
সবাই তড়িঘড়ি বাইরে এলো। পাহাড়ের মাথায় তুষারাবৃত সেই রানির মুকুট। যা দেখার জন্য কত মানুষ বার বার পাহাড়ে আসেন।
সুজান বললেন, আজ একমাস পর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল। হাতিদেবতা দেখা দিলে পরদিনই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
মা দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে না কি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বোঝা গেল না। বিনু মিনু অবাক হয়ে চেয়ে রইল। সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই রইল।
------------------------------
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লী বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনী
কলকাতা

