প্রেম বিষয়ক গল্প ।। শব্দহীন চিঠি ।। জয় মণ্ডল


 ছবিঋণ-ইন্টারনেট 

শব্দহীন চিঠি

জয় মণ্ডল




কলকাতার ব্যস্ত ট্রাম লাইনের পাশেই আকাশ আর তিতলির প্রথম দেখা। আকাশ পেশায় একজন স্থপতি, যে শহরের পুরনো অট্টালিকাগুলোর ধ্বংসাবশেষে নতুন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পায়। আর তিতলি? তিতলি হলো সেই বৃষ্টির মতো, যে না বলে আসে আর সব কিছু ওলটপালট করে দিয়ে যায়। তিতলি একটি মূক ও বধির স্কুলের শিক্ষিকা। সে কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু তার চোখের ভাষাতে এমন এক জাদু আছে যা হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী।

তাদের প্রেমের শুরুটা কোনো ক্যাফেতে বা দামী উপহারে হয়নি। হয়েছিল এক চিলতে রোদে ভেজা ট্রাম কামরায়। আকাশ লক্ষ্য করেছিল, জানলার পাশে বসা মেয়েটি অদ্ভুত ছন্দে আঙুল নাড়িয়ে বাতাসের সাথে কথা বলছে। আকাশ সেদিন সাহস করে তার স্কেচবই থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে লিখেছিল, "বাতাস কি আপনার কথা শুনতে পাচ্ছে?" 

তিতলি লেখাটা পড়ে শব্দহীন এক হাসি হেসেছিল। তারপর আঙুলের ইশারায় বুঝিয়েছিল— "বাতাস শুনতে পায়, যদি মন দিয়ে শোনা যায়।" সেই শুরু।

আকাশ আর তিতলির প্রেমটা ছিল নীরবতার। আকাশ তিতলির জন্য 'সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ' শিখতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, আমরা যারা কথা বলতে পারি, তারা অনেক সময় কথা দিয়ে মিথ্যা বলি। কিন্তু তিতলির আঙুলের ডগায় কোনো মিথ্যা নেই। তাদের দেখা হতো গঙ্গার ঘাটে, কখনও বা নোনাধরা পুরনো গোলবাড়িগুলোর ছাদে। আকাশ তিতলিকে বলত সেই পুরনো বাড়ির ইট-পাথরের ইতিহাসের কথা, আর তিতলি আকাশের হাতের তালুতে আঙুল বুলিয়ে লিখে দিত তার না বলা স্বপ্নের কথা।

কিন্তু সমাজের নিজস্ব কিছু নিয়ম থাকে। আকাশের পরিবার যখন তিতলির কথা জানতে পারল, তখন প্রথম বাধাটা এল ঘর থেকেই। আকাশের মা স্পষ্ট বলে দিলেন, "যে মেয়ে কোনোদিন 'মা' বলে ডাকতে পারবে না, সে আমাদের ঘরের বউ হবে কী করে?" 

আকাশ সেদিন প্রতিবাদ করেনি। সে জানত, প্রেম মানে চিৎকার করা নয়। সে তিতলিকে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। কোনো কথা না বলে তিতলি শুধু আকাশের মায়ের হাত দুটো নিজের হাতে নিল। তারপর ইশারায় বোঝাল, সে কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু সে আকাশের মায়ের চোখের প্রতিটি ক্লান্তি আর ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। সেই স্পর্শে কোনো ভাষা ছিল না, কিন্তু ছিল এক অদ্ভুত মায়া। আকাশের মা সেদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝলেন, হৃদয়ের ডাক শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয় না।

বিয়েটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। কিন্তু বিয়ের ঠিক এক বছর পর এক অদ্ভুত পরীক্ষা এল তাদের জীবনে। আকাশের একটি বড় প্রোজেক্টের জন্য তাকে পাহাড়ে যেতে হলো। সেখানে এক ভয়াবহ ধসের কবলে পড়ে আকাশ তার চোখের দৃষ্টি সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলল। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে আকাশ যখন অন্ধকারে ডুবে আছে, তখন তার কানে কেবল নিস্তব্ধতা। সে কথা বলতে পারছিল না যন্ত্রণায়, আর তিতলি তো কথা বলতেই পারে না।

সেই অন্ধকারে আকাশের মনে হচ্ছিল সে একা। কিন্তু ঠিক তখনই সে অনুভব করল এক পরিচিত হাতের স্পর্শ। তিতলি আকাশের হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে লিখতে শুরু করল। সে লিখছিল না, সে যেন আকাশের ত্বকের ওপর ছবি আঁকছিল। আকাশ চোখ বন্ধ করেই বুঝতে পারল তিতলি তাকে বলছে— "আমি তোমার চোখ হবো আকাশ। তুমি যতদিন দেখতে পাবে না, আমি তোমার পৃথিবীকে আমার ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দেব।"

আকাশ সেদিন বুঝতে পারল, তাদের প্রেমটা কেন অনন্য। সে অন্ধ আর তিতলি মূক। কিন্তু তাদের ভালোবাসাটা ছিল সম্পূর্ণ। তিতলি সারাদিন আকাশের পাশে বসে থাকত। আকাশ যখন বাইরের আবহাওয়া জানতে চাইত, তিতলি আকাশের হাতে বৃষ্টির জল ছিটিয়ে দিত। আকাশ যখন ফুল দেখতে চাইত, তিতলি তার নাকে বুনো ফুলের ঘ্রাণ ধরত।

আকাশের দৃষ্টি ফিরে এল কয়েক মাস পর। কিন্তু সেই অন্ধকারের দিনগুলো তাদের শিখিয়ে দিল যে, ভালোবাসা কোনো ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি আত্মার একটি সংযোগ। 

আজ অনেক বছর কেটে গেছে। আকাশ এখন শহরের একজন সফল স্থপতি। তাদের একটি ছোট মেয়ে হয়েছে। মেয়েটি কথা বলতে পারে, কিন্তু সে তার মায়ের সাথে কথা বলে ইশারায়। আকাশ যখন কাজ থেকে ফেরে, সে দেখে তার স্ত্রী আর মেয়ে বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছে। কোনো কথা হচ্ছে না, কেবল হাতের মুদ্রায় আর চোখের ইশারায় এক গভীর ভাব বিনিময় চলছে।

আকাশ মাঝেমধ্যে তিতলিকে একটি চিঠির খাম দেয়। তিতলি অবাক হয়ে খোলে, ভেতরে থাকে সাদা কাগজ। কোনো লেখা নেই। তিতলি হাসে। সে জানে, এই সাদা কাগজটাই আকাশের সবচেয়ে বড় প্রেমপত্র। কারণ আকাশের ভালোবাসা এখন আর শব্দের ওপর নির্ভর করে না। 

এই গল্পটি আমাদের শেখায় যে, প্রেম মানে কেবল একে অপরের পরিপূরক হওয়া নয়, বরং একে অপরের সীমাবদ্ধতাকে অলঙ্কার হিসেবে গ্রহণ করা। শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আসলে সত্যিকারের অনুভবের শুরু হয়।

ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই। মৌনতাও কখনও কখনও হাজারো শব্দের চেয়ে বেশি মুখর হতে পারে। যখন দুটি আত্মা একে অপরের নীরবতা বুঝতে পারে, তখনই সেই প্রেম অমরত্ব পায়।

----------------------------------------


Contact Details : 
Name : Joy Mondal, 
Kalimandir purbapara, kalikapur, near PHC, Post - kalikapur, P. S - Sonarpur, south 24 parganas, W. B. - 743330


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.