শরতের শেষ দিকের রাত। বহরমপুর শহরের আকাশটা যেন ধোয়া জল দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে—একফোঁটা মেঘও নেই। পূর্ণিমার চাঁদ উঁচুতে ঝুলে আছে, তার রুপালি আলো ঝরে পড়ছে শহরের ঘাট, রাস্তা আর ছাদের ওপরে। গঙ্গার জলে সেই আলো যেন ভাঙা আয়নার মতো টুকরো টুকরো হয়ে ঝিকিমিকি করছে। বাতাসে শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে, দূরে মন্দির থেকে ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে, আর মাঝেমধ্যে ভাঙা ঢোলের মতো বাজছে ঘাটের পাশের কাকদের ডাক।
অর্পণ গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে হালকা নীল শার্ট, চোখে বিস্ময় আর অপেক্ষার ছায়া। চারপাশে ভিড় নেই, কেবল কয়েকজন মাঝি নৌকা বেঁধে রেখে গল্প করছে। নদীর ঢেউয়ের শব্দের ফাঁকে যেন শোনা যাচ্ছিল অর্পণের বুকের ভেতরের ধুকপুক। তার মনে হচ্ছিল—আজকের রাতটা অন্যরকম।
আর ঠিক তখনই এল মেঘলা। সাদা সালোয়ার কামিজে স্নিগ্ধ মুখে হেঁটে আসছিল সে, যেন চাঁদের আলো তার চুলে মিশে গেছে। পায়ের নূপুরের মৃদু শব্দ রাতের নিস্তব্ধতায় আলাদা ছন্দ তুলে আনছিল। অর্পণ তাকিয়েই বুঝল—এই মুহূর্তটা তার সারা জীবনের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে।
তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে, বহরমপুরের বইমেলায়। শহরের মেলামাঠ তখন রঙিন আলো আর কাগজের গন্ধে ভরে গিয়েছিল। চারদিকে স্টলের ভিড়, কেউ বই বেছে নিচ্ছে, কেউ দর কষাকষি করছে, আর মাঝেমধ্যে মাইকে ভেসে আসছে ঘোষণার আওয়াজ। সেই ভিড়ের মধ্যেই ধাক্কা লেগে মেঘলার হাত থেকে বইটা মাটিতে পড়ে যায়। অর্পণ বইটা তুলে নিয়ে বলেছিল—
— "এই বইটাই কি খুঁজছিলেন?"
সেদিনের লাজুক হাসি থেকে শুরু হয়েছিল তাদের গল্প। তারপর থেকে শহরের প্রতিটি কোণায় তাদের স্মৃতি জমতে শুরু করল। শীতের সকালে কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে গরম চায়ের কাপ ভাগ করে নেওয়া, লালবাগের ইমামবাড়ার সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস নিয়ে হাসাহাসি করা, অথবা কোর্ট স্ট্রিটের ভিড় পেরিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গোপনে হাত ধরা—সবকিছুই যেন শহরের মাটিতে গেঁথে গেল। বহরমপুর ধীরে ধীরে তাদের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে উঠল।
কিন্তু সময় সবসময় সহজ পথ দেখায় না। পড়াশোনার জন্য মেঘলাকে চলে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। দূরত্ব যেন হঠাৎ করে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয় তাদের মাঝে। ফোন আর বার্তায় কথা হলেও সেই শহরের ছায়া, সেই চাঁদের আলো ভাগাভাগি করার মুহূর্তগুলো অনুপস্থিত থেকে যেত। অর্পণ প্রায়ই গঙ্গার ঘাটে এসে বসত, নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবত—"তুমি দূরে আছো মেঘলা, তবুও এই চাঁদের আলো তোমাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে।" আর মেঘলা কলকাতার ছাদে বসে একই চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলত—"আমরা আলাদা শহরে আছি, তবুও একই আকাশ আমাদের এক করে রেখেছে।"
দুই বছর পর মেঘলা ফিরে এলো বহরমপুরে। সেদিন ছিল শরৎ পূর্ণিমা। শহরের বাতাসে উৎসবের গন্ধ—দূরে কোথাও কাশফুলের সাদা ঢেউ, শিউলির মালা দিয়ে সাজানো বাড়ির উঠোন। গঙ্গার ঘাটে নামতেই মেঘলার মনে হল—কতদিন পর শহরটা যেন তাকে আবার আপন করে নিল। অর্পণ দাঁড়িয়েছিল সিঁড়ির ধারে। তার চোখে তখন মিশে ছিল উত্তেজনা আর অচেনা আশঙ্কা।
দু'জনের চোখাচোখি হতেই সময় থেমে গেল। চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল, কেবল নদীর ঢেউ আর বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন রয়ে গেল। মেঘলার ঠোঁটে ঝলমলে হাসি, আর চোখে জল ভেজা আলো। অর্পণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল—
— "মেঘলা, আমি ভাবতাম তুমি হয়তো আর ফিরবে না। তবুও আমি প্রতিদিন এই ঘাটে আসতাম, কারণ মনে হতো চাঁদের আলোয় তুমি আমার পাশেই আছো।"
মেঘলা ফিসফিস করে উত্তর দিল—
— "আমি কোথায় যেতাম অর্পণ? এই শহরেই তো আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল। আমি জানতাম, একদিন আমি আবার ফিরব, আর আমরা একসাথে এই চাঁদের আলোয় দাঁড়াব।"
নদীর হাওয়া তখন আরও জোরে বইছিল। গঙ্গার জলে ভাঙা প্রতিফলন যেন একসাথে মিশে যাচ্ছিল। মেঘলা অর্পণের হাত ধরল, মাথা হেলিয়ে দিল তার কাঁধে। চুপচাপ নিঃশ্বাসের ভেতর এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি জন্ম নিল। অর্পণ বলল—
— "এই শহর, এই চাঁদ, আর আমাদের ভালোবাসা—এগুলোই আমাদের গল্পের চিরন্তন সাক্ষী।"
মেঘলা চোখ মুছে বলল—
— "যতদিন আকাশে চাঁদ থাকবে, ততদিন আমাদের গল্পও বেঁচে থাকবে।"
রাতের আকাশে তখন চাঁদ আরও উজ্জ্বল। নদীর ঢেউ ভেঙে পড়ছিল ঘাটের সিঁড়িতে, মাঝিদের নৌকা দুলছিল হাওয়ায়, আর চারপাশের শহর যেন নীরবে শুনছিল তাদের ভালোবাসার অমর সঙ্গীত। বহরমপুর শহরের প্রতিটি ইট, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি আলো সাক্ষী হয়ে রইল সেই রাতের।
সেদিন রাতে গঙ্গার ধারে, চাঁদের আলোয়, লেখা হয়ে গেল তাদের গল্প—ভালোবাসার গল্প, অটুট প্রতিশ্রুতির গল্প, চিরন্তন এক রূপকথা।
=====================
Name - Shyam Sundar Mondal
Vill- Punia ,P.o - Keshiadanga
P.s - Khargram, Dist - Murshidabad
Pin - 742159 ,

