গল্প ।। সমাপতন ।। শ্যামাপ্রসাদ সরকার


ছবিঋণ - ইন্টারনেট 



সমাপতন

শ্যামাপ্রসাদ সরকার


-আপনাকে এর আগে এখানে কখনও  আসতে দেখেছি কি?

আচমকা প্রশ্নবাণে  বৃদ্ধটি  ঘোলাটে চোখে মুখ তুলে  তাকালেন। এর উত্তরে অস্ফূটে কি যে বললেন তা বোঝা গেল না।

আমি আর একটু সময় নিয়ে আবার প্রশ্ন করলাম, 

- ' আপনি সেই  বিখ্যাত  বার্ড ওয়াচার  নবীন কর্মকার তো? আমাকে এখনও চিনলেন না বুঝি?

বৃদ্ধ আর একটু অপ্রস্তুত হলেন যেন। কাঁধের ঝোলাটা  সামলে নিয়ে আমার দিকেখানিক ভাবলেশহীন গলায়  বললেন, 

'আচ্ছা এখান থেকে গোলদিঘীর ট্রামটা আজকাল আর পাই না কেন! জানেন কিছু? '

আমি কথা বলার একটা সুযোগ পেয়ে গলা খাঁকড়ে নিয়ে বললাম, ' কলকাতা আড়ে বহরে অনেকটা বদলে গেছে এই ক'বছরে! ট্রাম তো এখন আস্তে আস্তে উঠে যেতে বসেছে!আপনি বাসে চড়তে পারবেন কি? অবশ্য ওতে এখন কিন্তু ভীড় হবে। '
...
বৃদ্ধ একটা ক্লিন্ন হাসি ছড়িয়ে দিলেন শেষ বিকেলের মরা আলোয়। কাঁধের ঝোলাটা আবার ঠিক করে নিয়ে বললেন, 'আমার সাথে আজকাল কেউ কথাটথা বলে না। আপনি ঠিক কে বলুন তো ভাই? আমার সাথে কথা বলছেন, তাও এত দরদী গলায়! '
...
আমি এবারে একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠে বললাম,

 ' কাল আমার বাবা (সুধন্য সেন এর ৬ষ্ঠ মৃত্যুদিন)। তবে  শেষের দিকে  এদিকটায় রোজ বিকেলে একবার করে হাঁটতে আসতেন।
 তাই এই দিনটার আগের দিন  আমি একবার এখানে এসে কিছুক্ষণ বসি। আজ এখানে এসেই আপনাকে দেখে চেনা চেনা ঠেকল। বাবার একজন বন্ধু ছিলেন নবীন কর্মকার, ঠিক আপনার মত দেখতে।কপলের   সামনে সিঁথি, রোগাটে চেহারা, অবসরে পাখি টাখি দেখতে এদিক ওদিক যেতেন এমনকি ওসব নিয়ে অনেক বইপত্তর সংগ্রহ করে  পড়তেও ভালবাসতেন। এমনকি ছেলেবেলায় আমাদের ভবানীপুরের বাড়িতেও উনি আসতেন! আমাদের কাছে ওঁর দেখা নানা জায়গায় বার্ড ওয়াচিং আর নানা ধরণের অদ্ভূত গল্প শোনাতেন! জানেন! ঠিক তাঁর মত আপনাকেও  দেখতে। বিশেষ করে  আপনার নাকের ওই আঁচিলটার জন্য আরও বেশী মনে হচ্ছিল!তাই আর কি..অনেকদিন মানে  প্রায়  বছর তিরিশ পঁয়তিরিশ তো হবেই এসব প্রসঙ্গের..! '

এবারে দেখতে পেলাম বৃদ্ধর গালে ক্ষয়াটে শেষ  বিকেলের  আলো এসে পড়েছে। মলিন অথচ নির্মোক ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে এতক্ষণে একটু হাসলেন।

- ' কি বললেন নামটা ? সুধন্যদা আর নবীন কর্মকার! আমার নাম কি বললেন নোওওবীইইইন করমোওওওকাআআর'আবার বলুন তো ভাই ! নামটা এভাবে টেনে টেনে বারদুয়েক আওড়ালেন। তারপর বললেন,

 ' হ্যাঁ ! একদিন সবাই এই নামেই ডাকতো '!

 আবার একটু থেমে নিজের মনে মনে বলে উঠলেন,

 " তখন চটকলের টাইমকিপারের চাকরিটাও  ছিল। শেয়ালদায় আমাদের একটা আড্ডা  বসত। সেই কবেকার কথা! বড় ছেলেটা ট্রেনে হকারি করে এখন। ছোট ছেলেটা আঠেরো উনিশ বছরের হবে, লুকিয়ে রাজনীতি করত। তারপর পুলিশ একদিন এসে তুলে নিয়ে গেল। তারপর থেকে ওর আর কোনও খবর নেই। এদিকে আমাদের অফিসে নানা ঝঞ্ঝাট শুরু হল আস্তে আস্তে। লেবার ইউনিয়নও সেদিন আমাকে আশ্রয়  দিল না। চাকরীটা গেল। মাঝবয়সে এসে এসব সামলাতে না পেরে আমার বুড়িটাও  বিষ খেল একদিন। এখন কয়েকবছর হল আমিও বড়ছেলের হাতে সবকিছু  কিছু ছেড়ে ছুড়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম। পুরনো সম্বল বলতে  খালি এই কটা জিনিস ছাড়তে পারিনি এখনও!" 

ততক্ষণে দেখলাম মলাট ছেঁড়া দুখানা বই,  সেলিম আলি আর অমল হোম বেরিয়ে এসেছে ঝোলাটা থেকে। এরপর   তার সাথে বেরোল একটা ভাঙা দূরবীণ। 
....
পৌষের গোড়া বলে এতক্ষণে দিনের আলো নিভে এসেছে। বৃদ্ধটি আমার পিতৃবন্ধু সে বিষয়ে এখন আর সন্দেহ নেই। ইতঃস্তত করে জিজ্ঞাসা করলাম,

 ' কোথায় যাবেন এখন! মানে রাতে তো কোথাও তো একটা থাকেন ! জায়গার নামটা বললে আজ পৌঁছে দিতে পারতাম।' 

যাওয়ার কথা উঠতেই দেখলাম একরাশ বিরক্তি জেগে উঠল বৃদ্ধের চোখে। তারপর নিজের মনে 'আমি কোথায় থাকি? কোথায় থাকি যেন! ' 

মনে হচ্ছে ভদ্রলোকের মস্তিষ্কের কিছু একটা রোগ বেঁধেছে। নিজের মনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ  হনহন করে দেখলাম উল্টোদিকে হাঁটা লাগালেন । তবে ওই বৃদ্ধটির  চলে যাওয়ার মধ্যে আমাদের  পরিচিত জগতটাকে অস্বীকার করে এক  বিপুল ও অচেনা  জনারণ্যে মিশে যাওয়ার একটা চেষ্টা আছে যেটা বুঝতে পারলাম। 


হঠাৎ খানিক ভেবে ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। হনহনিয়ে রাস্তা পেরিয়ে একরকম যেন চম্পট দিলেন।বৃদ্ধের যে মাথাটা পুরোটিই খারাপের পথে কোনও সন্দেহ নেই।


বাস ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হল যেন অতীত সময়ের দুটো চেনা মানুষ হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে।  একজনকে চিনি আর অন্যজন আধচেনা। তাদের‌ সেই ঠিকানা আজকের জমানায় অনাবিষ্কৃত থেকে গেলেও কোথাও কারো কিছু যাবে আসবে না। 


এমনকি  দুজনের  মধ্যে একজন  মানুষ যেমন পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে আর অন্যজন হয়ত তাঁর বন্ধুস্থানীয় সেই মানুষটি  যাঁর কাছে আমার  ছেলেবেলায় বহুবার শোনা প্যারাডাইস  ফ্লাইক্যাচার আর বসন্তবৌরীদের সেই  অসমাপ্ত কাহিনিটাও অন্য কোন আসরে আবার শ্রুত হবে খুব শিগগিরই।

এইসব পাওয়া না পাওয়ার গল্প আজীবনে যেন  কোনওদিন আর শেষ হবার নয়।
.....






Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.