অনসূয়া
স্বপন চক্রবর্তী
আজ ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারীর ২ তারিখ। অরিন্দমের জীবনের এক অনন্য মুহূর্ত। প্রায় সাতাশ বছর পর অরিন্দম দেশে ফিরতে চলেছেন।
গতকাল থেকে আজ সকাল দশটা অবধি অরিন্দমের খুবই কর্মব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। তারপর বাড়ি ফিরে যাত্রার শেষ প্রস্তুতি এবং অবশেষে হিথরো বিমানবন্দর থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা। প্রায় সাতাশ বছর পর অরিন্দম আবার তাঁর জন্মভূমি ভারতবর্ষের মাটিতে পা দেবেন। তিনি দেশে ফিরতে চলেছেন। কলকাতায়। একটা চিঠি তাঁর ভিতরকার মানুষটিকে বুঝি ওলটপালট করে দিয়েছে।
অরিন্দম মানে ডক্টর অরিন্দম চ্যাটার্জি,শল্য চিকিৎসক হিসাবে যাঁর নাম আজ বিশ্বজোড়া। আমেরিকা এবং ইংল্যাণ্ডের বিভিন্ন নামী দামী হাসপাতালে অনেকদিন কাজ করার পর গত দশ বছর তিনি লণ্ডনের বিখ্যাত ক্রোমওয়েল হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত আছেন। দেশে যাওয়া ত' দূরের কথা, একটা দিনও ছুটি নিতে তাঁকে কেউ দেখেনি। তাই যখন তিনি ভারতবর্ষে যাবেন বলে প্রায় একমাসের ছুটির দরখাস্ত করলেন, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রীতিমত অবাক হয়ে গেছিলেন। এবং বিনা বাক্যব্যয়েই তাঁর ছুটি মঞ্জুর হয়ে গিয়েছিল।
কোয়ানটাস এয়ারওয়েজের দুপুর ২-৩০ মিনিট অর্থাৎ ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ৮ টার বিমানে চড়ে পরদিন সকাল ৯-১৫ নাগাদ তাঁর কলকাতায় পৌঁছনোর কথা। অরিন্দম এতটুকু সময় নষ্ট করতে চান না। তাই এই দ্রুতগামী আরামদায়ক যাত্রাই তিনি বেছে নিয়েছেন যা তাঁকে ৪৯৬০ মাইল অর্থাৎ প্রায় ৭৯৮০ কিমি দূরত্বে পৌঁছে দেবে মাত্র ১৩ ঘন্টার কিছু বেশী সময়ে।
এত বছর বাদে তিনি দেশে ফিরছেন প্রায় এক মাসের লম্বা ছুটিতে। অনেক রুগীর দায়িত্ব তাঁর উপরে, তিনি যে ক্রোমওয়েল হাসপাতালের শল্য চিকিৎসা বিভাগের প্রধান। রুগীদের দায়ভার ত' তিনি অবহেলাভরে ছেড়ে আসতে পারেন না। হাসপাতালের সিনিয়র সার্জেন ড: সিম্পসন এবং ড:বেকহ্যামকে তিনি তাঁর দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে এসেছেন। সেই সাথে একটি তরুণ ভারতীয় যে সবেমাত্র তাঁদের হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন সেই আদিত্য আচারিয়াকে তিনি কিছু কাজের দায়িত্ব দিয়ে এসেছেন। আদিত্যের সংস্পর্শ তাঁকে তাঁর যৌবনের দিনগুলিকে যেন মনে করিয়ে দেয়। অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল কিন্তু ধীর,একনিষ্ঠ দায়িত্ব সচেতন এই ছেলেটিকে তিনি অল্প দিনেই তাঁর স্নেহের ভাণ্ডার উজাড় করে দিয়েছেন।
বিমানের আরামদায়ক 'বিজনেস ক্লাসের' আসনে বসে এই সব কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত অরিন্দম সামান্য ঘুমিয়েই পড়েছিলেন। আসলে এই ছুটির কারণে তিনি গত কয়েকদিনই উদয়াস্ত রুগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ভাল করে ঘুমই হয়নি। তাই হয়ত বিশ্রাম পাওয়ার সাথে সাথেই চোখ দুটো জড়িয়ে এসেছিল। আর সেই সাথে তাঁর অতীত জীবনটা একটু একটু করে যেন যবনিকার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসছিল। বিমান তখন মধ্যগগনে।
—-"সকাল ৭ টা। রবিবার। অন্যান্য দিনের মত এদিন আর সাত তাড়াতাড়ি মেডিক্যাল কলেজে ছুটতে হবে না। সেদিন তাঁর ছুটি। তিনি তখন মেডিকেল কলেজের একজন সামান্য জুনিয়র ডাক্তার।
"এই ওঠো না, সাতটা যে বেজে গেছে।" মিষ্টি মধুর ডাকটা তাঁকে নিদ্রার আবেশ থেকে যেন আরেক অন্য আবেশের দিকে ঠেলে দিল।
"কেন, এত তাড়া কিসের ! আজ ত' ছুটি। তুমি একবার কাছে বসতে পারছ না !" - অরিন্দম বললেন।
"কি যে বল না । আমি স্নান সেরে এখন ঠাকুরঘরে যাচ্ছি" - তাঁর সদ্য পরিণীতা স্ত্রী অনসূয়ার চটজলদি উত্তর। মা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি চললাম, তুমি তাড়াতাড়ি নীচে এস।" অনসূয়ারও আজ স্কুল নেই । বিছানায় শুয়ে অরিন্দম ভাবতে থাকেন অনসূয়ার সাথে তাঁর অদ্ভুত পরিচয় এবং পরিণয় পরিণতি।
অরিন্দমদের বাড়ী ছিল উত্তর কলকাতার মাণিকতলায়। এক বন্ধুর সাথে অরিন্দম গিয়েছিলেন চন্দননগরে তাঁর জন্য পাত্রী দেখতে। তার আগে অরিন্দমের মা বাবা সেই বিপাশা নাম্নী মেয়েটিকে দেখে পছন্দ করে এসেছিলেন। বর্ধিষ্ণু পরিবার, অরিন্দমেরও বিপাশাকে দেখে বেশ পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু বিপাশার সাথে তিনি যখন একান্তে কথা বলছিলেন তখন বিপাশা তাঁকে বলেছিল যে এক বিশেষ ব্যক্তিগত কারণে তার পক্ষে অরিন্দমকে বিবাহ করা সম্ভব নয়। তিনি যদি মনে করেন তাহলে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনসূয়ার সাথে আলাপ করতে পারেন। অনসূয়া খুবই ভাল মেয়ে।
শ্রীরামপুরে অনসূয়াদের বাড়ী। আপন বলতে কেবল আছে তার বিধবা মা। ছোট থেকেই কঠোর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তিনি অনসূয়াকে মানুষ করেছেন। অনসূয়া ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর করে বি এড করেছে এবং বর্তমানে কলকাতার শ্যামবাজারে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরাজীর শিক্ষিকা। অনসূয়া মুখার্জি। তার সুন্দরী বান্ধবীর সঙ্গে অরিন্দমের বিবাহ হলে খুব ভাল হবে-এ কথা বিপাশাই তাঁকে বলেছিল। বিপাশাই তাঁকে অনসূয়ার ঠিকানাটি দিয়েছিল।
বাড়ী ফিরে অরিন্দম সব কথাই মা বাবাকে জানান। মায়ের যদিও এ সম্বন্ধে কিছুটা আপত্তি ছিল মেয়েটির পারিবারিক অবস্থার কথা ভেবে, কিন্তু অরিন্দম মনে মনে অনসূয়ার সম্বন্ধে একটা ছবি মনের পটে এঁকে ফেলেছিলেন। তাই একদিন হাসপাতালের নাইট ডিউটির সুযোগে পরদিন সকালে তিনি সরাসরি শ্যামবাজার ডাফ হাইস্কুলে চলে গেলেন অনসূয়ার সাথে দেখা করার জন্য। নিজের পরিচয় দেবার পর তিনি তাকে তার বান্ধবী বিপাশার সব কথাই বললেন। মিষ্টি,লাবণ্যময়ী অনসূয়াকে তাঁর প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে গেছিল। ধীরে ধীরে পরস্পর পরস্পরের সাথে ভালভাবে পরিচিত হবার পর অরিন্দম অনসূয়াকে এক শনিবারের বিকালে তাঁদের বাড়ী নিয়ে এসে বাবা-মায়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। অনসূয়াকে দেখে অরিন্দমের মায়ের মনের সব বাধাই দূর হয়ে গেল। আর তিনিও একজন শিক্ষিকা ছিলেন। তাই আর একজন শিক্ষিকাকে নিজের আত্মজের স্ত্রী হিসাবে বরণ করে নিতে তাঁর আপত্তি থাকা যে অনুচিত, সেটি তিনি মনে মনে বুঝতে পেরেছিলেন।
অপরদিকে অরিন্দমের বাবা প্রাক্তন সরকারী বড়কর্তা ত' অনসূয়ার মধ্যে আপন মায়ের রূপটিই যেন উপলব্ধি করেছিলেন। অতএব শ্রীরামপুরে অনসূয়াদের বাড়ী গিয়ে তাঁরা বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন। আর অনসূয়ার মা। এমন সম্বন্ধ ত' অভাবিত। পাল্টী ঘর, ছেলে ডাক্তার, উত্তর কলকাতায় নিজস্ব দোতলা বাড়ী, কোন দাবী নেই-অতএব শুভস্য শীঘ্রম। অরিন্দম অনসূয়ার বিয়ে হয়ে গেল।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে অরিন্দম যখন এইসব ভাবছিলেন, ঠিক তখনই মায়ের ডাকে তাঁর চিন্তার তারটাই বুঝি ছিঁড়ে গেল। "কিরে খোকা, আর কতক্ষন শুয়ে থাকবি। নীচে আয়, সবাই একসঙ্গে চা খাব না ?" অরিন্দম দ্রুতপদে নীচে নেমে গেলেন। এমনভাবেই সুখের সাগরে দেড়টা বছর কেটে গেল।
হঠাৎ সেদিন মেডিকেল কলেজ থেকে লাফাতে লাফাতে অরিন্দম বাড়ী ফিরলেন। উচ্চশিক্ষার্থে লণ্ডন যাবার জন্য সব পরীক্ষাগুলিতেই তিনি সফল হয়েছেন এবং মোটা অর্থের বৃত্তির সহযোগে তাঁর লণ্ডন যাবার ব্যবস্থা পাকা। চিরকালই অরিন্দম অত্যন্ত মেধাবী, তাই এই সুযোগ লাভ করাটা তাঁর কাছে কোন দু:সাধ্য ব্যাপার ছিল না। তাঁর এই প্রচেষ্টার কথা অনসূয়া এবং তাঁর বাবা মা সকলেই জানতেন। বিকালে অনসূয়া বাড়ী এলে তাঁকে অরিন্দম সবই জানালেন। অনসূয়ার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। অরিন্দমের বাবা মায়েরও। তাঁদের ত' ঐ একটিই সন্তান। অরিন্দম তাঁদেরকে বোঝালেন যে মাত্র কয়েকটি বছর। তিনি ত' আর চিরকালের জন্য লণ্ডন চলে যাচ্ছেন না। 'এম আর সি পি, এফ আর সি এস' সহ চিকিৎসা সংক্রান্ত আরো কিছু বিশেষ বিদেশী ডিগ্রী অর্জন করেই তিনি ফিরে আসবেন। অরিন্দম যখন লণ্ডন রওয়ানা দিলেন তখন অনসূয়ার গর্ভে তাঁদের সন্তান ।
"স্যার, ইওর ডিনার ইজ রেডী" - এয়ার হোস্টেসের মৃদু কণ্ঠস্বরে অরিন্দমের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। ডিনার সেরে তিনি একটি মেডিকেল জার্নালের পাতা ওল্টাচ্ছিলেন। কিন্তু মনটাকে যেন কিছুতেই সংযত রাখতে পারছিলেন না। কতক্ষণে তিনি কলকাতায় পৌঁছবেন আর অনসূয়া এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ে সুচরিতাকে দেখবেন, সেই ভেবে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। সুচরিতার ছবি তাঁর কাছে না থাকলেও অনসূয়ার অনেকদিন আগের সেই ছবিটা দেখতে দেখতে অনসূয়ার সেই চিঠিটি তিনি আবার ব্রীফকেস থেকে বার করে পড়তে শুরু করলেন। খুবই সংক্ষিপ্ত,আবেগহীন সেই লেখা -
"প্রিয় অরিন্দম - হ্যাঁ, প্রিয়ই লিখছি, কারণ আজ সাতাশ বছর পরেও অন্য কোন সম্বোধন মনে এল না। তোমার মেয়ের মানে আমাদের একমাত্র মেয়ে সুচরিতার আগামী ৫ই ফেব্রুয়ারী বিবাহ দিতে চলেছি। না কোন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের সাথে নয় বা বিদেশে কর্মরত কোন পাত্রও নয়, ছেলেটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির অধ্যাপক।তোমার মেয়েও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছে। সেখানেই দুজনের পরিচয়। ছেলেটির নাম সত্যপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় । মেয়ের বাবা হিসাবে ছেলের পরিজনেরা তোমার সাথে পরিচিত হতে আগ্রহী। আরও বড় কথা,তোমার মেয়েও যেন কিছুদিন যাবত তোমাকে মন থেকে চাইছে। বিভিন্ন জার্নাল, সংবাদপত্রে মাঝে মাঝে তোমার কৃতিত্বের যেসব খবর প্রকাশ পায় তা সে সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। তোমার মেয়ে এবং তার হবু শ্বশুরালয়ের স্বজনদের ইচ্ছার মর্যাদা দিতে যদি সম্ভব হয় একবার কলকাতায় ঘুরে যেও।জানি তুমি খুবই ব্যস্ত। তবুও যদি কোনভাবে সামান্য সময় বের করতে পার তাহলে সুচরিতা খুশী হবে। এটা আমার নিছকই একটি অনুরোধ মাত্র। মনে কোরোনা যে তোমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য আমি ভিতর থেকে কোন বিশেষ তাগিদ অনুভব করছি। না, তা একেবারেই নয়। কিন্তু আমার মেয়ের সুখই আমার সুখ। আর আত্মজার মুখের দিকে তাকিয়ে, তার সুখের জন্য নিজেকেও অনেক শপথ থেকে সরে আসতে হয়। যদি সম্ভব হয় তবে একবার এসে সুচরিতা আর সত্যপ্রিয়কে আশীর্বাদ করে যেও। হ্যাঁ,তোমায় পাঠানো প্রতি মাসের সব টাকাটাই আমি সুচরিতার নামে ব্যাংকে জমা করে রাখি। ওই টাকায় আমার কোনদিনই প্রয়োজন হয়নি। এত বছর বাদে কিছুটা বাধ্য হয়েই তোমাকে চিঠিটা লিখতে হচ্ছে। যদি মনে কর এই চিঠিটি তোমার কাছে অর্থহীন, তাহলে আবর্জনা ভেবে ছিঁড়ে ফেলে দিও। তোমাকে অহেতুক বিরক্ত করার জন্য মার্জনা চেয়ে নিলাম।" - ইতি, অনসূয়া।
চিঠিটা পড়তে পড়তে অরিন্দমের চোখ দুটো বুঝি সজল হয়ে উঠেছিল। তিনি যেন কেমন অসুস্থ বোধ করছিলেন।একটা ছোট্ট ঘুমের বড়ি খেয়ে তিনি ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতিমধ্যে আমরা আরেকবার সেই অতীত স্মৃতি রোমন্থনে ফিরে যাই।
— অরিন্দম লণ্ডন পাড়ি দিলেন। অনসূয়াকে আবার কথা দিয়ে গেলেন যত শীঘ্র সম্ভব উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করে দেশে ফিরে আসবেন। অনসূয়া যেন নিজের, অনাগত সন্তানের এবং তাঁর বাবা মায়ের খেয়াল রাখেন। তিনি আরও বলে গেলেন যে তাঁদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সময়ে তিনি অবশ্যই অনসূয়ার পাশে থাকবেন। কিন্তু বিধাতা পুরুষ বুঝি অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। অরিন্দম চেষ্টা করেছিলেন অবশ্যই অন্তত একবারের জন্যও দেশে ফেরার। কিন্তু বৃত্তিলাভের শর্ত হিসাবে সেটি যে একেবারেই অসম্ভব ছিল। পাঁচ বছরের আগে কোন রকম শিথিলতা চলবে না - এটিই ছিল বৃত্তিলাভের অন্যতম শর্ত যেটি অরিন্দম হয়ত খেয়ালই করেন নি। তাই তাঁদের কন্যাসন্তান যখন কলকাতায় ভূমিষ্ঠ হল, তিনি তখন প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে। শুধু আক্ষেপ করা ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিল না তাঁর। অনসূয়ারও খুব অভিমান হয়েছিল। কিন্তু অরিন্দমের ত' কিছু করার ছিল না।
এরপর অরিন্দম নিজের 'এম আর সি পি' সংক্রান্ত পড়াশুনা এবং সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কাজে আরো বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর তখনই ঘটল এক অঘটন যা দুজনের জীবনকেই চিরকালের মত বিচ্ছিন্ন করে দিল। হাসপাতালে অরিন্দমের সাথে পরিচয় হল এক প্রাণোচ্ছলা ইংরেজ ললনা ড: বারবারা অ্যাণ্ডারসনের। বারবারা অরিন্দমকে বিবাহ করতে চাইল। অরিন্দম জানালেন যে তিনি বিবাহিত, কলকাতায় তাঁর স্ত্রী আছে, একটি সদ্যোজাতা কন্যাসন্তানও আছে। কিন্তু বারবারা সেসব কিছুই আমল দিল না। আর অরিন্দমও যেন কেমন নেশাগ্রস্তের মত বারবারার মোহের জালে ক্রমে ক্রমে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি বারবারার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে ফেললেন এবং সেই খবরটি তিনি বাড়ীতেও জানিয়ে দিলেন। এক ইংরেজ ললনাকে তিনি বিবাহ করবেন বলে মনস্থ করেছেন, তাই তাঁর পক্ষে কলকাতায় ফেরা আর সম্ভব নয়। এই অপ্রত্যাশিত,অভাবিত খবরে তাঁর মাণিকতলার বাড়ীতে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা তাঁর জানার কথা ছিল না, আর জানার ইচ্ছাও ছিল না। কারণ তিনি তখন অন্য এক সুখের সাগরে ভাসছিলেন।
ঐ অভাবিত খবরে অরিন্দমের বাবা মা একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বলতে গেলে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। আর অনসূয়া! তিনি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না অরিন্দম এমনটা করতে পারে! দুদিন বলতে গেলে কিছু খেতেই পারলেন না। তারপর সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে আসন্ন কঠোর জীবনসংগ্রামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুললেন। বিশেষ করে তাঁর সদ্যোজাতা কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে ত' মানসিক ভাবে দৃঢ় হতেই হল। আর সেই সাথে তাঁর শ্বশুর শাশুড়ীর স্নেহস্পর্শ তাঁকে মনে মনে অনেক সবলতা এনে দিলো। ততদিনে অরিন্দমের বাবা মাও বুঝি কিছুটা হলেও এই অপ্রত্যাশিত মানসিক ধাক্কার আঘাত সামলে উঠতে পেরেছিলেন।
কিছুদিন পরে অরিন্দম একটি চিঠি পেলেন কলকাতা থেকে। সেইসাথে কলকাতা উচ্চ আদালতের সিলমোহর দেওয়া বিশেষ কিছু কাগজপত্র। তাঁর মা বাবার জবানীতে সেই চিঠিতে লেখা ছিল যে তাঁরা তাঁদের একমাত্র পুত্রকে ত্যজ্যপুত্র ঘোষণা করেছেন। তাঁদের স্থাবর অস্থাবর কোন সম্পত্তিতেই অরিন্দমের কোন অধিকার রইল না। এবং সেই সম্পর্কিত আদালতের কাগজ তাঁরা পাঠিয়ে দিয়েছেন। চিঠিটি পড়ে অরিন্দম ক্ষুব্ধ হলেও তাঁর মেয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর ও অনসূয়ার নামে কলকাতার ব্যাংকে যে যৌথ অ্যাকাউন্ট ছিল সেখানে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ জমা দিতে শুরু করলেন। অবশ্য নির্দিষ্ট বললে ভুল বলা হবে, সময়ের সাথে সাথে টাকার অংকটি ক্রমবর্ধমানই বটে। এবং আজও নিয়মিত তাঁর সেই কর্মধারায় কোন ছেদ পড়েনি।
তারপর অনেকদিন কেটে গেছে । অরিন্দমের জীবনের উপর দিয়ে প্রচুর ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। বারবারার প্রতি যে মোহ অরিন্দমকে একসময় পাগল করে দিয়েছিল তা কাটতে বেশী সময় লাগে নি। বারবারার অসংবৃত জীবনযাপন অরিন্দমের ভাল লাগেনি। সেই থেকেই অশান্তির শুরু যার পরিণতি মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্পর্কের ভাঙন । তখন অরিন্দম কেবল 'এম আর সি পি'র চুড়ান্ত পরীক্ষায়ই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হননি, স্নাতকত্তোর পড়াশুনা শেষ করে 'এফ আর সি এস ডিগ্রী' লাভের দিকেও একধাপ অগ্রসর হয়ে গেছেন। কোনরূপ মানসিক অস্থিরতাই কখনো তাঁর পড়াশুনার ক্ষেত্রে কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। এক্ষেত্রেও যথারীতি তিনি তাঁর লক্ষ্যপূরণে সমর্থ হলেন এবং যথেষ্ট কৃতিত্বের সাথে।
এই সময়ই তাঁর আমেরিকার বিখ্যাত মেয়ো ক্লিনিক থেকে একটা সুযোগ এসে গেল। অরিন্দম সেই সুযোগ গ্রহণ করে আমেরিকায় পাড়ি দিলেন। কিছুদিন মেয়ো ক্লিনিক তারপর তিনি নিউ জার্সির বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করার পর তিনি আবার ইংল্যাণ্ডে ফিরে এসে সেন্ট টমাস হাসপাতালে যোগ দিলেন। ইতিমধ্যে শল্য চিকিৎসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় বুৎপত্তি অর্জনের সাথে সাথে তিনি আরও কয়েকটি বিশেষ 'ডিগ্রী'ও অর্জন করেছেন। গত দশ বছর লণ্ডনের বিখ্যাত ক্রোমওয়েল হাসপাতালের সঙ্গেই অরিন্দম যুক্ত আছেন।
এবং বারবারার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে এতগুলি বছর কেটে গেছে। তিনি কিন্তু একাকীই জীবন কাটাচ্ছেন। হয়ত তাঁর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি অনসূয়াকে চিঠিতে সবকিছু অবহিত করলেও অনসূয়ার তরফ থেকে কোন প্রত্যুত্তর আসেনি। অবশ্য অরিন্দম যখন বারবারার সাথে সম্পর্কের মোহজালে আবদ্ধ, সেই সময়েই অরিন্দমের বাবা, মা এবং অনসূয়ার মা মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই একে একে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তখন অনসূয়ার প্রতি নিষেধ থাকা সত্বেও তিনি প্রতিটি খবরই অরিন্দমকে জানিয়েছিলেন। হয়ত মনে মনে ভেবেছিলেন যে তাঁর অসহায় অবস্থার কথা ভেবে অরিন্দম অন্তত একবার কলকাতায় আসবেন। যদিও তিনি সে বিষয়ে অরিন্দমকে কোন অনুরোধ জানান নি। আর অরিন্দমও তখন বারবারার মোহিনীশক্তিতে এতটাই আকর্ষিত ছিলেন যে বাবা মায়ের মৃত্যুও তাঁকে এতটুকু টলাতে পারে নি। তার ওপর ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার একটা অভিমান, ক্ষোভ ত' ছিলই।
দেখতে দেখতে প্রায় ১৩ঘন্টা কেটে গেল। মাঝে কিছুক্ষণের জন্য অবশ্য বিমান দুবাই বিমানবন্দরে থেমেছিল। এবার দমদমের নেতাজী সুভাষ বিমানবন্দরে বিমান নামার সময় প্রায় আসন্ন। সিট বেল্ট বেঁধে সেই অনন্ত প্রহরের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছেন ড: অরিন্দম চ্যাটার্জি।
অবশেষে সেই অন্তিম মুহূর্ত। অরিন্দম যে কলকাতায় আসছেন এবং কখন আসছেন সেটি অনসূয়াকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। বিমানবন্দরের খুঁটিনাটি নিয়মকানুনের বেড়াজাল ভেদ করে তিনি যখন বাইরে এলেন, তখন লাউঞ্জে অনসূয়াকে দেখতে পেলেন।
এত বছর বাদে অনসূয়াকে দেখে তাঁর বুঝি চিনতে সামান্য অসুবিধা হচ্ছিল। মাথায় কাঁচাপাকা চুল, একটা গাম্ভীর্যের আবরণ যেন তাঁকে সেই ছবির অনসূয়া থেকে অনেকটাই আলাদা করে দিয়েছিল। হয়ত প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত থাকার জন্য তাঁকে অনেকটাই বয়স্ক লাগছিল। কিন্তু অনসূয়ার পাশে ঐ মেয়েটি কে ! একেবারে যেন অনসূয়ার মুখের আদলটি কেটে বসান আছে। তবে অনেকটাই দীর্ঘাঙ্গীনী, প্রায় অরিন্দমের মত। আর তার পাশে আর একটি সুপুরুষ তরুণ। অরিন্দম বুঝতে পারলেন ঐটি তাঁদের মেয়ে সুচরিতা আর পাশে খুব সম্ভবত তার হবু স্বামী।বিমানবন্দরের প্রধান এলাকা থেকে বেরিয়ে এলে অনসূয়া তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন, সাথে ওরা দুজন। এত বছর বাদে অনসূয়ার কিন্তু অরিন্দমকে চিনতে কোন সমস্যা হল না এটা ভেবে অরিন্দম একটু অবাক হলেন মনে মনে। তারপর মেয়েটি এবং তার দেখাদেখি ছেলেটিও তাঁকে প্রণাম করল। কিন্তু অনসূয়া সেদিকে গেলেন না। অরিন্দম বুঝলেন অনসূয়া আজো তাঁকে ক্ষমা করেননি। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে তিনি দুজনকে কাছে টেনে নিলেন।
অনসূয়া বললেন-"ও সুচরিতা, তোমার মেয়ে আর ওর পাশে ঐ ছেলেটি সুচরিতারই হবু স্বামী সত্যপ্রিয়।" অনসূয়ার কথা বলতে গিয়ে যেন গলাটা একটু কেঁপে গেল। অরিন্দমও যেন কেমন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় সাতাশ বছর পর দুজনের চাক্ষুষ দেখা। কিছুক্ষণ যেন সকলেই নিশ্চুপ। একটা অদ্ভুত নীরবতা যেন তাঁদেরকে গ্রাস করেছিল। তখন সুচরিতাই বললে-"কি হল, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে ! যেতে হবে ত'। সবাই অপেক্ষা করে আছে। তারপর বাবাও ত' বিমান যাত্রার ধকলে ক্লান্ত। সুচরিতার কণ্ঠে বাবা ডাক শুনে অরিন্দমের মনের ভিতরটা উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। আর অনসূয়া অবাক হয়ে ভাবছিলেন - "সুচরিতা কত সহজেই মানুষটাকে আপন করে নিল। কই, আমি ত' পারলাম না !"
অবশেষে সত্যপ্রিয়র ঝকঝকে ভক্সওয়াগনে যেতে যেতে টুকরো টুকরো দু'একটি কথাবার্তা হল। তবে অনসূয়া কিন্তু একেবারেই চুপ। রাস্তায় যেতে যেতে নতুন কলকাতা দেখে অরিন্দমের বেশ ভাল লাগছিল। এবার তাঁর মাণিকতলার বাড়ী। বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিয়ে সত্যপ্রিয় চলে গেল।তাকে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে হবে। অরিন্দম ত' দেখেশুনে হতবাক। তাঁদের সেই ছোট দুতলা বাড়ীটি যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। তার পরিবর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল বহুতল।সেই বহুতলের তিনতলায় একটি তিন কামরার ফ্ল্যাটে অনসূয়া মেয়েকে নিয়ে থাকেন। চার তলায় তাঁদের আরো একটি দুকামরার ফ্ল্যাট আছে। এছাড়া গত বছর একটি গাড়ীও অনসূয়া কিনেছেন। ফোর্ড। সুচরিতাই তাঁকে এসব খবর আসার সময় দিয়েছে। সবকিছু দেখেশুনে তিনি একটি বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতেও অনসূয়া কিন্তু জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে পেরেছেন।
আজ ৩রা ফেব্রুয়ারী, ৫ তারিখ সুচরিতার বিয়ে।স্বভাবতই বাড়ীতে অনেক আত্মীয়স্বজনের আগমন। এত বছর বাদে পরিচিত মানুষ, আপনজনদের সাথে দেখা হয়ে অরিন্দমের মনটা ভরে গেল। আর অনসূয়া এবং সুচরিতার উদ্যোগে অরিন্দমের আহার, বিশ্রামের কোন ত্রুটি রইল না। অনসূয়া সেভাবে অরিন্দমের সাথে কোন কথা না বললেও তাঁর সন্ধানী দৃষ্টি যে সবসময়ই অরিন্দমের উপর রয়েছে তা বুঝতে অরিন্দমের কোন অসুবিধাই হল না। তবে সুচরিতা একেবারে বিপরীত। সে প্রায়ই তাঁর কাছে আসছে আর তার মাঝে মাঝেই বাবা সম্বোধনে অরিন্দম বোধ করি নিজের মনকে প্রশ্ন করছেন-"কেন তিনি এতদিন এই মধুর ডাক শোনার থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন!"
অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে সুচরিতার বিয়ে হয়ে গেল।অশ্রুসজল সুচরিতা অবশেষে তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভবানীপুরে স্বামীর ঘরে চলে গেল। যাবার সময় অরিন্দমের ঘরে এসে কেবল বলে গেল-"বাবা কলকাতায় কি আর ফিরে আসা যায় না! তুমি লণ্ডনে কেমন আছ আমার কিছুই অজানা নেই। সত্যপ্রিয় সব খবর নিয়েছে।" অরিন্দম সুচরিতার কথায় কেমন যেন হতবাক হয়ে গেলেন। কি বলবেন বুঝি বুঝে উঠতে পারলেন না। অবশেষে একটা কথাই তিনি বলতে পারলেন- "আমার দিক থেকে চেষ্টার কোন ত্রুটি থাকবে না।" কিন্তু অনসূয়া! আজ চার দিন হল অরিন্দম কলকাতায় এসেছেন-অনসূয়া ত' তাঁর ব্যাপারে সামান্যতম আগ্রহই প্রকাশ করেননি!
সুচরিতার বৌভাতের অনুষ্ঠানও অত্যন্ত সুচারুরূপে সুসম্পন্ন হল। সুচরিতার স্বামী ছেলেটিকেও অরিন্দমের বেশ ভাল লেগেছে। যথেষ্ট মেধাবী, বুদ্ধিমান এবং সেইসাথে অত্যন্ত নম্র স্বভাবের ছেলেটি অচিরেই তাঁর মন জয় করে নিয়েছে।
অষ্টমঙ্গলার মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানেও কোন ত্রুটি রাখলেন না অনসূয়া। ধীরে ধীরে বাড়ি একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেল। সুচরিতাও দু দিন হৈচৈ করে বাড়ি মাতিয়ে রেখে সত্যপ্রিয়র সাথে শ্বশুরালয়ে ফিরে গেল। যাবার সময় সে অরিন্দমকে আরও একবার সেদিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল। অরিন্দম কিন্তু সে বিষয়ে তার মায়ের মতের কথা তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না।
এবার বাড়িতে কেবল অনসূয়া আর অরিন্দম। অরিন্দমের লণ্ডন ফেরার তারিখ সেই সাতাশে ফেব্রুয়ারী। হাতে আছে আরও বারোটা দিন। অরিন্দম ভাবছিলেন-এতদিন ত' অনসূয়ার সাথে সেভাবে কথাই হয় নি। এখনো কি অনসূয়া তাঁর থেকে দূরে দূরেই থাকবেন!
অনসূয়া এখন শ্যামবাজারের ডাফ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। ফলত তাঁর কাঁধে এখন অনেক দায়িত্ব। সুচরিতার বিয়ে উপলক্ষে পনের দিন ছুটিতে ছিলেন। এবার ত' তাঁকে স্কুলে ফিরতে হবে। আগামীকালই তিনি কাজে যোগ দেবেন। সেদিন সন্ধ্যায় অরিন্দম অনসূয়ার ঘরে গেলেন।
"আসতে পারি,"-কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত তাঁর কণ্ঠস্বর।"এসো"- অনসূয়ার নির্লিপ্ত উত্তর। "কিছু কি বলবে ! তোমার কি কিছু অসুবিধা হচ্ছে ? দেখ কাল থেকে আমাকে স্কুলে যেতে হবে। তোমার যদি একা লাগে তাহলে তুমি কদিন কোথাও ঘুরে আসতে পারো।"
"না না - একেবারেই নয়। আর কোথাও ঘুরতে গেলেও সেই একা একাই ঘুরতে হবে।" এখানে ত' বরং তুমি আছ, তারপর সুচরিতারা আসা যাওয়া করবে।'
"তাহলে ! অন্য কোন অসুবিধা?"
"অসুবিধার প্রশ্নই নেই। তবে তোমার সাথে কিছু কথা ছিল"- অরিন্দম বললেন।
"বল কি বলবে?"-অনসূয়া যেন কেমন উদাসীন।
"তুমি কি আমার লণ্ডনের জীবনযাত্রার কোন খবর রাখো ! আজ এত বছর আমি সেখানে কেমন আছি, তুমি ত' একবারও জানতে চাইলে না ! অনসূয়া, আমি ভাল নেই। জানি তোমাদেরকে আর সেই সাথে আমার বাবা, মা এবং তোমার মাকে যে কষ্ট, যে যন্ত্রণা আমি দিয়েছি তা ক্ষমাহীন অপরাধ। আমার জন্য প্রতি পদে তোমরা অপমানিত হয়েছ, ভীষণ অসহায়তা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তোমাকে দিন কাটাতে হয়েছে। কিন্তু আমার এই সীমাহীন অন্যায়ের জন্য আমিও ত' কম যন্ত্রণা সহ্য করছি না।"
"দেখ জীবনটা তোমার, তুমি সেটা কিভাবে কাটাবে সে ব্যাপারে আমার ত' কোন হাত নেই। তা ছাড়া লণ্ডনে তোমার স্ত্রী আছেন, নিশ্চয়ই তোমার সন্তান আছে। তাহলে তোমার দু:খ কিসের জন্য!"- অনসূয়া যেন আরও নির্লিপ্ত।
"কি বলছ অনসূয়া, ঐ বিবাহের পাঁচ বছরের মধ্যেই ত' বারবারার সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর আমাদের কোন সন্তানাদিও হয়নি। তখন থেকেই আমি একা। তোমাকে ত' চিঠিতে সব জানিয়েছিলাম। যদিও কোন উত্তর মেলেনি।"
"না অরিন্দম, আমি তোমার কোন চিঠিই পড়িনি বা নিরুপায় না হলে পড়ি না। কেবল তোমার পাঠানো অর্থটা সুচরিতার নামে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেশের আইন অনুসারে সেখানে প্রতি মাসে জমা দি। ঐ অর্থে আমার কোন দাবী নেই। সারা জীবন আমি যা উপার্জন করেছি এবং এখনও করছি, আর সেই সাথে তোমার বাবা মা আমার জন্য যা রেখে গেছেন তাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। তবে আমার স্থাবর অস্থাবর সব সম্পত্তিই আমি সুচরিতার নামে উইল করে দিয়েছি যাতে আমার অবর্তমানে তার কোনরূপ আইনগত অসুবিধা না হয়।"
অরিন্দম বুঝতে পারলেন অনসূয়া এখনও তাঁকে মনে মনে যথেষ্টই অবিশ্বাস এবং ঘৃণা করেন। অবশ্য এর জন্য অনসূয়াকে ত' কোনভাবেই দায়ী করা চলে না। তাঁর সীমাহীন অপরাধ তথা ক্ষমাহীন কৃতকর্মই ত' সর্বোতভাবে এর জন্য দায়ী-অরিন্দম প্রতি মুহূর্তে সেটি উপলব্ধি করেন। তবুও তিনি একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবেন। কেবল সুচরিতার কথা রাখার জন্যই নয়, এই কদিনে সবার সঙ্গে থেকে অরিন্দমের মনটাও ত আর এঁদেরকে ছেড়ে সুদূর লণ্ডনে একাকী থাকতে চাইছে না।
তাই তিনি বললেন- "অনসূয়া,তোমার কাছে একটা আর্জি নিয়ে এসেছিলাম।" অনসূয়া আবারও যেন কেমন অনাসক্ত। তাঁর যেন কেবল একটিই শব্দ জানা-"বল"।
"আবার কি নতুন করে কিছু ভাবা যায় না ! আবার কি আগের মত ঘর বাঁধা যায় না ! দেখ তুমিও এখন একা, সুচরিতা তার নতুন জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর বিদেশে আমি ত' চির নি:সঙ্গ। মানছি আমার অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না। তবুও কি একটা সুযোগ আমি পেতে পারি না ! আমি ভাবছি লণ্ডনের হাসপাতালের চাকরীটা ছেড়ে দেব। আমার অনেক পরিচিত আছেন এখানে। আর কলকাতায় ত' এখন অনেক বড় বড় হাসপাতাল। আমার কাজ পেতে কোনই অসুবিধা হবে না। তুমি যদি আমার পাশে থাক তাহলে আমাদের জীবনটা এখন থেকে একটা অন্য খাতে বইতে শুরু করবে। দেখ অনসূয়া, যত আমার যাবার দিন এগিয়ে আসছে ততই মনটা অধীর হয়ে উঠছে। বারবার মনে হচ্ছে যে যদি জীবনের এই অন্তিম অধ্যায়টা তোমার সঙ্গে কাটাতে পারতাম তাহলে হয়তো শেষ দিনগুলি কিছুটা বর্ণময় হত। আর সুচরিতারও মনে হয় সেরকমই ইচ্ছে। তুমি একটু ভাবো, অনসূয়া-আমার ত' যাবার এখনও বেশ কদিন বাকী আছে।"
"হাসালে, অরিন্দম-এমন কোন ভাবনাই আমার মনের মধ্যে নেই। তোমাকে এখানে আসতে অনুরোধ করেছিলাম কেবল সুচরিতার মুখ চেয়ে, যাতে আমাদের এই সম্পর্কের কোনরকম কালো দাগ তার জীবনে না পড়ে। যতই হোক না কেন, এই সমাজটা ত' পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এখানে এখনো মায়েদের চেয়ে বাবাদের মর্যাদা বেশী। আর তুমি এটা ভাবলে কি করে অরিন্দম! আমার জীবনের একটা বিরাট অধ্যায়, প্রায় সাতাশটা বছর যে কষ্ট, যে লড়াইয়ের মধ্যে কেটেছে , প্রতিটি পল, প্রতিটি মুহূর্ত যে ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, তোমার সঙ্গে নতুন করে ঘর বাঁধলে ত' আর সেটা ফেরত পাব না। সবার ওপরে তোমাকে আবার স্বীকার করা মানে আমার স্বর্গগত শ্বশুরমশাই তথা স্বর্গগতা শাশুড়ী মা এবং আমার মায়ের আত্মার প্রতি চরম অসম্মান করা। তাঁদের অকাল মৃত্যু ত' তোমার জন্য কষ্ট পেয়েই। ভাবতে পার, সেই সময় আমার কি অসহায় অবস্থা ! সুচরিতা তখন একেবারেই শিশু। আর এই বিরাট সংসারে আমি একেবারে একা, নি:সঙ্গ। তোমাকে খবর দেওয়া সত্বেও একবারের জন্যও তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াওনি সেদিন। না অরিন্দম, নতুন করে ভাবনার দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। সুচরিতা হয়ত তোমাকে এখানে ফিরে আসার জন্য বলেছে কারণ সে আমাকে বড্ড ভালবাসে। আমার একাকীত্ব তাকে প্রতি পদে যন্ত্রণা দেয়। তাই হয়ত সে চেয়েছে আমাদের মধ্যে আবার নতুন করে সম্পর্ক গড়ে উঠুক। কিন্তু সেটা অসম্ভব।
তার থেকে আমরা যেরকম আছি নিজের নিজের কর্মব্যস্ততার মধ্যে সেটাই শ্রেয়। আর তুমি যদি ভাব এখানে একা একা থাকতে তোমার খারাপ লাগবে, তাহলে ত' আমি তোমায় বলেইছি যে তুমি কোন হোটেলে উঠতে পার বা সেরকম কিছু ব্যবস্থা করতে পারলে আগেই লণ্ডনে ফিরে যেতে পার। আমার দিক থেকে কোন বাধা নেই। কারণ আমি তোমাকে বিশেষ সঙ্গ দিতে পারব না। আমি একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, অনেক দায়িত্ব। আর সুচরিতার বিয়ের হেতু বেশ কিছুদিন ছুটি নিতে হয়েছে। আমাকে কাল থেকে কাজে ফিরতেই হবে।"
অনসূয়ার উত্তরে অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মনে হল যেন অনসূয়া তাঁকে বাড়ী থেকে চলে যেতে বলছেন। আর কোন কথা না বাড়িয়ে অরিন্দম নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। দুদিনের মধ্যেই তিনি লণ্ডন ফিরে যাবার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন।সুচরিতা খবরটা শুনে অবাক হলেও কোন প্রশ্ন করেনি। কারণ সে তার মায়ের অটল জেদ সম্বন্ধে যথেষ্টই ওয়াকিবহাল ছিল।
আঠারোই ফেব্রুয়ারী রবিবার এয়ার ইণ্ডিয়ার সকাল ১০-২৫এর বিমানে অরিন্দম দিল্লী হয়ে লণ্ডনে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে ফেললেন।যে আনন্দঘন মন নিয়ে দুসপ্তাহ আগে এক শনিবার তিনি কলকাতায় এসেছিলেন ফিরে যাবার মুহূর্তে সেই আনন্দের সামান্যতমটুকুও তাঁর মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে হয়ত কিছুটা মাথা নত করেই তাঁকে ফিরে যেতে হচ্ছিল। বিমানবন্দরে সুচরিতার অশ্রুসজল মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলেন না। কিন্তু এসবের মধ্যেও অনসূয়া যেন কেমন ভাবলেশহীন। তাঁকে বুঝি এসব কিছুই স্পর্শ করছিল না। তবে একটি ব্যাপার অরিন্দমকে খুবই অবাক করে দিল। তিনি যখন বিমানবন্দরের অন্দরে যাবার পথে, সেই সময় অনসূয়া হঠাৎ এসে তাঁকে প্রণাম করলেন।
এতদিনের মধ্যে এই প্রথম। অরিন্দম যেন কেমন বিহ্বল হয়ে গেলেন। তাঁর সেই অতীতের কথা মনে পড়ে গেল, সেই দুর্গাপূজার বিজয়ার দিন রাত্রে অনসূয়ার তাঁকে প্রণাম করার কথা। কোনক্রমে 'ভাল থেকো' এই কথাটি বলেই অরিন্দম তাড়াতাড়ি বিমানবন্দরের অন্দরের দিকে পা বাড়াতে যাবেন এমন সময় অনসূয়ার একটি কথায় তিনি পিছন ফিরে তাকালেন। অনসূয়া বলছিলেন - "ফিরে যাওয়াটা কি সত্যই জরুরী ! "অরিন্দম কি ঠিক শুনেছেন! যেন নিজের কানকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি কি বলবেন ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না। অনসূয়ার এই অভাবিত মানসিক পটপরিবর্তন অরিন্দমকে হতবাক করে দিয়েছিল।এমন সময় দেখলেন সুচরিতা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলছে - "কি বাবা, শুনলে ত' মা কি বললো? তোমার যাওয়া হবে না।" সত্যপ্রিয়ের মুখটাও আনন্দে ঊজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এত ভালবাসা অরিন্দম বোধ করি জীবনে কোনদিন পান নি। একটু সামলে নিয়ে তিনি সুচরিতাকে বললেন - "কিন্তু মা, এখন ত' আমাকে যেতেই হবে। সেদিন তোমার মাকে বলেছিলাম আমি এখানে ফিরে আসতে চাই। তোমার মা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ হয়ত তাঁর মনে হচ্ছে যে আমার ফিরে যাওয়াটা অত জরুরী নয়। কিন্তু তাঁর এই চিন্তাধারার বদল কেবল একটা আবেগের বশেই ঘটেনি ত'! আমার মনে হয় তাঁর আরো গভীর ভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। আর আমিও সেদিন যে উৎসাহের সঙ্গে এখানে থেকে যাবার কথা ভেবেছিলাম আজ কিন্তু সেই মানসিক জোর আমার মধ্যে নেই। তাই আমাকেও আবার নতুন করে ভাবতে হবে। আর আমি কথা দিচ্ছি যদি আমাদের দুজনের মন একই কথা বলে তবে বিদেশের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আমি আমার দেশে তোমাদের মধ্যে ফিরে আসবো। আমার কথার খেলাপ হবে না। আমাকে বিশ্বাস কোরতে পার। আমি তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখব।"
সুচরিতা বললে - "হ্যাঁ বাবা , তুমি একেবারেই সঠিক। তোমাদের দুজনের আরও ভাবনার প্রয়োজন আছে। একটা সামান্য আবেগের বশে এত বড় সিদ্ধান্তে আসা অনুচিত। আর সত্যি কথা বলতে গেলে ত' কিছুদিন আগে অবধি তোমার সম্বন্ধে আমার মনেও বিরূপ ধারণা ছিল। তবে সত্যপ্রিয়র কাছ থেকে লণ্ডনে তোমার জীবনযাত্রার খবর পেয়ে তোমার সম্পর্কে আমার ধারণাটা বদলাতে শুরু করে।তখন আমি ভেবে দেখলাম যে হয়ত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তুমি আমার সামাজিক দায়িত্ব নিতে পার নি ঠিকই, কিন্তু আর্থিক দায়িত্ব ত' কখনো অস্বীকার করনি। তাই তোমার ওপর আর কোন অভিযোগ নেই আমার। আর বাবা আমি আবার বলছি, তুমি ঠিকই বলেছ, মা এবং তুমি, তোমাদের দুজনেরই আরও ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন আছে। আমরা না হয় আরো কিছুদিন অপেক্ষা করবো।" অনসূয়া একপাশে আবার কেমন ভাবলেশহীন ভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁডিয়েছিলেন। যেন এসব কোন কথাই তাঁর কানে ঢুকছিল না। মনে হল অনেক কষ্টে তিনি তাঁর আবেগকে চেপে রাখতে চেষ্টা করছিলেন। অন্যদিকে অরিন্দম, একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে আর কোন কথা না বলে ধীর পদক্ষেপে বিমানবন্দেরের অন্দরে প্রবেশ করলেন। তাঁর চোখ দুটি যেন অশ্রুসজল হয়ে উঠছিল ক্রমশ।
অবশেষে এয়ার ইণ্ডিয়ার বিমান AI-21 অরিন্দমকে নিয়ে আকাশে উড়ে গেল। যতক্ষণ বিমানটিকে আকাশে দেখা যাচ্ছিল। ততক্ষণ অপলক নয়নে অনসূয়া সেই দিকে তাকিয়েছিলেন। অবশেষে বিমানটি যখন একেবারেই দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল তখন অনসূয়া আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। নীরব অশ্রুর বন্যায় তিনি বুঝি ভেসেই গেলেন। সুচরিতার সেদিন আর স্বামীর সঙ্গে ফেরা হল না। সে অনসূয়ার কাছেই থেকে গেল।
রাত্রিবেলা শুয়ে শুয়ে অনসূয়া ভাবছিলেন তিনি কি সেদিন ঠিক করেছিলেন অরিন্দমকে ফিরিয়ে দিয়ে, না কি আজ বিমানবন্দরে তাঁর ব্যবহার তাঁর চারিত্রিক দুর্বলতার প্রমাণ ! অনেকদিন ত' কষ্ট করেছেন, এখন না হয় একটু সুখের মুখ দেখবেন, তাতে দোষের কি! অরিন্দম ত' এখনও তাঁকে ভালবাসেন। যে কটি দিন অরিন্দম ছিলেন, তিনি যে সবসময়েই তাঁর অনুর দিকেই নজর রাখতেন সেটি বুঝতে ত' কারো বাকী ছিল না। হয়ত যৌবনের উচ্ছলতায় অরিন্দম একটা ভুল করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এত বছর ধরে ত' তিনি সেই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করছেন। তবে কেন তাঁর মনে এই দ্বিধা , এই দ্বন্দ্ব! তাঁর প্রবল আত্মসম্মানবোধ তথা অহেতুক আত্মঅহংকারই কি এজন্য দায়ী! অনসূয়া যেন শান্তি পাচ্ছিলেন না। পাশেই সুচরিতা গভীর নিদ্রায় মগ্ন। তিনি আর মেয়েকে ডাকলেন না। শুয়ে শুয়ে এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন হয়ত নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সেই নিদ্রার ঘোরেই তিনি দেখতে পেলেন তাঁর মা এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
"মা, তুমি!"- অনসূয়ার জিজ্ঞাসার উত্তরে মা বললেন - "হ্যাঁ,খুকু, আমি এসেছি। অরিন্দমকে ফিরে আসতে বলে তুমি ঠিক কাজই করেছ। তোমার কষ্ট পাবার দিনের এবার অবসান ঘটুক সেটা আমরাও চাই।"
আর অরিন্দম ত' পাপের যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে। দেখ আর কারা এসেছেন আজ তোমার কাছে।" অনসূয়া দেখলেন তাঁর শ্বশুরমশাই ও শাশুড়ীমাও তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরাও যেন বলছেন - " হ্যাঁ মা, তোমার কোনোই ভুল নেই। তুমি একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ।" অনসূয়ার তন্দ্রা যেন টুটে গেল। তিনি দেখলেন কেউ কোথাও নেই। কেবল সুচরিতা তাঁর পাশে অকাতরে নিদ্রামগ্ন। অনসূয়া ভাবলেন — না না এসব তাঁর মনের ভুল। অরিন্দম ঠিকই বলেছে। সত্যিই ত' সেদিন বিমানবন্দরে তিনি আবেগের বশেই কথাগুলি বলেছিলেন। না তাঁকে আরো ভাবতে হবে । তাঁর মা বা শাশুড়ি মা যা বললেন সেটা নিছক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁর অবচেতন মনের চিন্তার বহি:প্রকাশ মাত্র।
দেখতে দেখতে কয়েক মাস কেটে গেছে । সুচরিতার সাথে অরিন্দমের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও সেদিন কলকাতা বিমানবন্দরের সেই ঘটনা নিয়ে আর কোন আলোচনাই হয় নি। হঠাৎ সেদিন একটি ছোট্ট বার্তা পেলেন অনসূয়ার কাছ থেকে-
"সুপ্রিয় অরিন্দম,
তুমি ফিরে এস। সেদিন হয়ত আমার মধ্যে অনেক আবেগ ছিল, কিন্তু আজ কোন আবেগ নয়, আমি অনেক ভেবেই এই সিদ্ধান্তে এসেছি। যে সুচরিতাকে আমি একদিন চিনতাম আজকের সুচরিতা তার থেকে অনেক আলাদা। আজ আমি কাছে থেকেও যেন তার থেকে অনেক দূরে আর তুমি দূরে থেকেও এখন তার অনেক কাছে। তাই আজ আমি এটা বুঝেছি যে আমি ছাড়া তুমি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি তুমি ছাড়া আমিও সম্পূর্ণ নই। তাই তোমার অনুর থেকে আর দূরে থেকো না।"
ইতি,
অনসূয়া।
অনু কথাটি অরিন্দমকে আরো একবার সেই অতীত স্মৃতির মণিকোঠায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন অনু এই ছোট্ট শব্দটি তাঁর মনে এখনো উন্মাদনার উন্মেষ জাগায়। তিনি অনসূয়াকে লিখতে গিয়েও কি লিখবেন ভেবে উঠতে পারলেন না। অবশেষে তিনি সুচরিতাকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি আর কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে ফিরছেন।
আরো প্রায় মাস দুয়েক কেটে গেল। অরিন্দম যেন হঠাৎই একেবারে নীরব। তাঁকে বার্তা পাঠালেও কোন উত্তর নেই। অনসূয়া, সুচরিতা এমনকি সত্যপ্রিয়র মনেও যেন কেমন একটা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছে।
এমন সময় ক্রোমওয়েল হাসপাতাল থেকে সুচরিতার কাছে একটা খবর এল -
" Dr. Arindam Chatterjee was severely injured in a car accident in London a few days back. He had been unconscious for quite a long time. However he has regained his senses and has been able to recognise every one now. Although we had no other option but to ampute his right leg which is now replaced with an artificial one. Now he is growing to be better. Don't be anxious. Now it will take at least three more months for his recovery. " — Dr. Simpson.
খবরটি বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় -"একটি গাড়ী দুর্ঘটনায় ড:অরিন্দম চ্যাটার্জি গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন অজ্ঞান ছিলেন। এখন তাঁর জ্ঞান ফিরেছে এবং তিনি সকলকে চিনতে পারছেন। কিন্তু তাঁর ডান পা টি বাদ দিতে হয়েছে এবং পরিবর্তে একটি নকল পা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এখন তিনি ক্রমশ সুস্থতার পথে। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তবে অন্তত আরও তিনমাস লাগবে হাসপাতাল থেকে তাঁর ছাড়া পেতে।"
-ডঃ সিম্পসন।
খবরটা পেয়ে সুচরিতা ত' কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আর অনসূয়া! তিনি যেন নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলেন না। কেন তিনি অরিন্দমকে অবিশ্বাস করলেন? এখনকার অরিন্দম আর অতীতের অরিন্দম - দুয়ের মধ্যে ত' অনেক ফারাক । তাঁর মনে হচ্ছিল যেন তিনি ছুটে চলে যান অরিন্দমের কাছে। কিন্তু তা যে একান্তই অসম্ভব।
অবশেষে অরিন্দম অনেকটা সুস্থ হয়ে আরও প্রায় তিন মাস বাদে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন। এবার তিনি অনসূয়াকে লিখলেন,
"সুপ্রিয়া অনু ,
তুমি ত' সবই জেনেছ। এই অবস্থায় প্রতিবন্ধী অরিন্দমকে কি তুমি গ্রহণ করতে পারবে? আবারও বলছি আবেগ থেকে কোন সিদ্ধান্তে এসো না। যা করবে সবদিক ভেবে করো।
ইতি,
অরিন্দম।
অরিন্দমের লেখাটা পড়ে অনসূয়ার খুব অভিমান হয়েছিল । তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তাঁর হয়ে মেয়ে সুচরিতা তার বাবাকে খুবই তিরস্কার করল। অরিন্দম দুজনের কাছেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন।
এবার অরিন্দম কলকাতায় আসার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন। কলকাতার একটি সুবিখ্যাত বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর খুবই হৃদ্যতা ছিল। তিনি তাঁদেরকে লিখলেন যে তিনি ঐ হাসপাতালের হয়ে কাজ করতে চান যদিও একটি দুর্ঘটনার জেরে তিনি শারীরিক ভাবে কিছুটা প্রতিবন্ধী। একটি নকল পায়ের সাহায্যে তিনি চলাফেরা করেন। তাঁর বার্তা পেয়ে ত' হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একেবারে আপ্লুত। প্রতিবন্ধকতার শিকার হলেও তাঁর উপস্থিতি এবং পরামর্শই অনেক মূল্যবান। তাঁরা তাঁকে হাসপাতালের শল্য তথা উপদেষ্টা বিভাগের সর্বোচ্চ পদ দিয়ে সম্মানিত করার প্রস্তাব দিল। অরিন্দম সানন্দে তাঁদের সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তবে তাঁর সুস্থ হতে আরো কয়েক মাস লাগবে সেটি তিনি সকলকেই জানিয়ে দিলেন।
পরের বছর ২০০৭ সালের পনেরই এপ্রিল বাংলা শুভ নববর্ষের দিন সকালে যখন অরিন্দম চিরকালের মত বিদেশের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে কলকাতা বিমানবন্দরে এসে নামলেন তখন সত্যই এক নতুন আনন্দের লহর সকলকে বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি কলকাতার যে অন্যতম সুবিখ্যাত হাসপাতালের শল্য তথা উপদেষ্টা বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দিতে চলেছেন, সেই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বিমানবন্দরেই একটি ছোটখাট সম্বর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। আর তাঁর মত প্রথিতযশা বিশ্ববরেণ্য শল্যচিকিৎসক কলকাতার হাসপাতালে যোগ দিচ্ছেন-অতএব সংবাদমাধ্যমের দৌরাত্ম্য ত' থাকবেই।
অরিন্দম এসব কাণ্ডকারখানায় ভারী অবাক হয়ে গেছিলেন। এবার তিনি দেখতে পেলেন বেশ কিছুটা দূরে অনসুয়া 'হুইল চেয়ার' নিয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। পাশে সুচরিতা ও সত্যপ্রিয় । তিনি সবার সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন 'হুইল চেয়ারের' প্রয়োজন নেই। জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনায় অনসূয়ার হাতেই তিনি তাঁর ভার তুলে দিতে চান। অবশেষে অনসূয়ার কাঁধে হাত রেখে বিমানবন্দর থেকে অরিন্দম যখন বেরিয়ে আসছিলেন তখন অনসূয়ার মধ্যে সেই চিরন্তন ভারতীয় নারীর শাশ্বত করুণাময়ী রূপটিই যেন আরো একবার মূর্ত হয়ে উঠল। যুগে যুগে ভারতবর্ষে এমন নারীরাই জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁরা পুরুষদের দেওয়া গরল পান করে নীলকন্ঠ হয়ে বারে বারে এই সমাজকে ধারণ করেছেন। অনসূয়াও ঠিক তেমনই একজন নারী । এককথায় অনুপমা। আর তাঁদের দেখে তখন তাঁদের মেয়ে সুচরিতার মনে কবিগুরুর সেই অমর সঙ্গীতের কয়েকটি ছত্র বিনা আর কিছুই মনে এল না।
"নব আনন্দে জাগো আজি নব রবিকিরণে,
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-ঊজ্জ্বল নির্মল জীবনে,
উৎসারিত নব জীবননির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি,
অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে।"
অনসূয়া আর অরিন্দম তাঁদের এই নবজীবনের পথে আপনাদের শুভেচ্ছার অপেক্ষায় রইলেন।
-সমাপ্ত-
স্বপন চক্রবর্তী।

