ওরে ও খোকন ওতো জোরে দৌড়াস না বাবা পড়ে যাবি যে।খোকন পিছন ফিরে উত্তর দেয়, না কাকা আমি ঠিক আছি পড়বো না। বনগাঁ লোকাল যে এসে গেছে। বলেই দৌড় লাগায় সাথে নং প্লাটফর্মে।
চায়ের দোকানের নিবারণ কাকা করুন দৃষ্টি তে চেয়ে থাকে খোকনের দিকে। আহা রে কত স্বপ্ন ছিল এই খোকনকে নিয়ে ওর মায়ের!! কোথা থেকে কি হয়ে গেলো। আজ ওই ছোট্ট বারো বছরের বাচ্চাটাকে ঝোলা কাঁধে হকারি করতে হচ্ছে। নিবারণ কাকার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। খোকনের বাবাও ট্রেনে হকারি করতো। মানুষটা খুব ভালো ছিল সবাই পছন্দ করতো রোজগার ভালোই হতো। তাই খোকনকে ভালো করে মানুষ করার ইচ্ছেটাও স্বামী স্ত্রী দুজনের মধ্যেই ছিল কিন্তু হঠাৎ একদিন তারাহুড়ো করে নামতে গিয়ে প্লাটফর্মে না পড়ে পড়লো সোজা ট্রেনের নিচে, ব্যাস সব শেষ। সেই থেকে খোকনের মা -ই একা খোকনকে ভালো ভাবে মানুষ করার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। বাজারে সবজি বিক্রি কখনো স্টেশনের বাইরে বসে ফল বিক্রি এই ভাবেই চলছিল। খোকন ও বাবা কে হারিয়ে মায়ের আঁচল ধরা হয়ে গেছিলো মা ছাড়া আর কিছুই জানতো না। রোজ মা কোলে বসিয়ে গল্প শুনিয়ে না খাওয়ালে খোকন খাবে না। মা তাকে কত রকমের গল্প বলতো সেই সঙ্গে খালি বোঝাতো খোকন তোকে লেখা পড়া শিখে অনেক বড় মানুষ হতে হবে। বাবুদের ছেলেদের মতো শিক্ষিত হয়ে ভালো চাকরি করতে হবে। মায়ের মুখে এই সব কথা শুনতে শুনতে ছোট্ট খোকন ও স্বপ্ন দেখতো সে বড় হবে। পল্টু দাদার মতো ফুটবল খেলবে অনেক গুলো গোল দেবে। সবাই মাঠে চিৎকার করে বলবে খোকন গোল দে খোকন গো ওওওও ল। আবার ভাবে অনেক অনেক পড়াশোনা করে বড় চাকরি করবো মাকে নিয়ে ঘুরবো। ওই যে মা রুপকথার গল্পে যে রাজপুত্রের কথা বলে ওদের মতো ঘোড়ায় করে মাকে নিয়ে অনেক দেশ ঘুরতে যাবো। মা তো কোথাও যায় না। খালি কাজ করে মা কে কোনো কাজ করতে দেবো না। মা আর আমি খালি বড় বাড়িতে থাকবো আর ঘুরবো। শিশুমনের কত হাজারো সাজানো স্বপ্ন নিয়ে ধীরে ধীরে মায়ের আদরে খোকন বেড়ে উঠছিলো। কিন্তু বিধি বাম। তাঁদের ছোট্ট সুখ ও যে তার সহ্য হোলো না। কদিন দিন থেকেই মায়ের জ্বর কাঁশি বুকে ব্যথা তাই ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার সব দেখে টেস্ট করে বলে খোকন তোর মায়ের তো কঠিন ব্যামো হয়েছে রে। এই রোগ সারাতে গেলে অনেক টাকার দরকার কিন্তু তুই কোথায় পাবি বাবা"! খোকন জিজ্ঞেস করে তবে কি আমার মা বাঁচবে না ডাক্তার কাকা? কথাটা শুনে ডাক্তারের খুব কষ্ট হয়। কিন্তু তিনি নিরুপায় হয়ে বলেন দেখ আমি যতোটা পারি সাহায্য করবো কিন্তু তারপর ও বেশ অনেক টাকার দরকার। ছোট্ট খোকন পরিস্থিতির চাপে এক ধাক্কায় বড় হয়ে যায়। বুঝতে পারে এবার মা কে তার বাঁচাতেই হবে। তার তো বাবাও নেই। এক মা -ই আছে তাই সব স্বপ্ন পিছনে ফেলে দেয়, এখন তার একমাত্র স্বপ্ন মাকে বাঁচিয়ে তোলা। আর সেই কথা ভেবেই খোকন তার বাবার দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে থাকা ঝোলা টাই কাঁধে তুলে নিলো। চললো ট্রেনে হকারি করতে। এই প্লাটফর্ম থেকে ওই প্লাটফর্ম। এখন খোকনকে অনেকেই চেনে। তার কচি কণ্ঠে বেজে ওঠে -
পুতুল নেবে গো পুতুল,
হাতে পেলে সবাই নাচবে,
খোকা হাসবে খুকু হাসবে,
বারো টাকায় সব পাবে।
এই সেদিন একজন দয়াপরবশ হয়ে দুটো পুতুল নিয়ে যা দাম তার থেকে পঞ্চাশ টাকা বেশি দিচ্ছিলো খোকন তাকে টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো কাকু আমার মা বলেছে কারুর দান নিতে নেই নিজে সত পথে থেকে রোজগার করতে হয়। আর কখনো কাউকে ঠকাতে নেই তাহলে নিজেও ঠকতে হয়। মা আরো বলে চুরি করা মহা পাপ। আমি আমার মায়ের কথা শুনে চলি আমার তো মা ছাড়া আর কেউ নেই। আমার কাছে আমার মা - ই জীবন আমার মা -ই সব, তাই জন্য বলছি কাকু তুমি আমাকে আমার পুতুলের দামটা খালি দাও। আর বলো ঠাকুর যেন আমার মাকে ভালো করে দেয়। এই বলে খোকন ছুটলো সাত নং প্লাটফর্মে কারণ সেখানে তখন তার লাকি বনগাঁ লোকাল এসে গেছে। আর ওই বাবুটি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে খোকনের পানে,আর মনে মনে বলে তুই এইরকমই থাকিস খোকন তোর মায়ের সুন্দর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে। আর ঈশ্বর বলে যদি কিছু থাকে তবে তার কাছে অন্তর থেকে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোর মাকে সুস্থ করে তোর কাছে ফিরিয়ে দেন, ভালো থাকিস বাবা।। অনেক বড় মনের মানুষ হয়ে ওঠ।
-------------------------
রাজারহাট, কলকাতা।

