গল্প ।। গুরুদক্ষিণা ।। শংকর ব্রহ্ম

ছবিঋণ- ইন্টারনেট 


গুরুদক্ষিণা 

 

শংকর ব্রহ্ম



                 বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক কাজ করার পর, শেষে জীবনে শিক্ষকতাকেই বেছে নিই আমি। শিক্ষকতা করতে গিয়ে বিচিত্র ধরণের নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তারই একটি অভিজ্ঞতা এখানে আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি।


                চাকরি সূত্রে পাঁচ সাত বছর পরপর একটি স্কুল থেকে আর এক স্কুলে আমাকে বদলি হতে হয়েছে। এটা নিয়ম মাফিক স্থানান্তর। সকলকেই হতে হয় শিক্ষা বিভাগের প্রয়োজন মতো।

           

               সেবার তিলজলায়, হতদরিদ্র ছেলেমেয়েদের এক প্রাথমিক স্কুলে পড়াতে গেছি। পার্কসার্কাস রেল স্টেশনের কাছে স্কুলটা। আশেপাশে চমড়ার কারখানা। চামড়া শুকানো হয়। দুর্গন্ধে বাতাস এমন গা গুলিয়ে দেয় যে সেখানে সাৎারণ মানুষের টেকা দায। তার মধ্যেই  সেখানকার লোকের ঝুপড়ি তৈরি করে তার মধ্য বাস করে। সেই ঝুপড়ি-বস্তির গরিব ছেলে মেয়েরাই এখানে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করতে আসে। তার মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হলেও হিন্দু ঘরের কিছু ছেলে মেয়ে এখানে পড়াশুনা করতে আসে।  তবে এখানে পড়াশুনার চেয়ে স্কুলে এসে গুলতানি করাটাই ছেলেমেয়েদের মুখ্য কাজ। বাবা মা সকালে লোকের বাড়ি কাজে বেরিয়ে যায়। তা'রা ছেলেমেয়েদের এই ভেবে স্কুলে পাঠায় যে সারাদিন পথে পথে ঘুরে বেড়াবার চেয়ে স্কুলে গিয়ে খানিকটা নিরাপদে থাকবে ছেলে মেয়েগুলি, পড়াশুনা হোক বা না হোক।


              আমি একদিন টিফিনের পর ক্লাস নিতে গিয়ে শুনি, সকলেরই কিছু না কিছু চুরি গেছে ব্যাগ থেকে। কারও খাতা, কারও বই, কারও পেন্সিল, কারও রাবার, কারও বা টিফিনবাক্স থেকে খাবার। কে চুরি করতে পারে সকলেই জানে, কিন্তু কেউই তাকে হাতেনাতে ধরতে পারেনি কোনদিন। শুধু আজ নয়, প্রায় দিনই এই ধরণের চুরি হয়।

ক্লাস শেষ হলে, আমি গোপনে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নামটা জেনে নিই। তার নাম সাবির আলি।


               পরদিন আমি তাকে ডেকে ক্লাসের মণিটার করে দিই। আর বলি, কেউ যদি ক্লাসে দুষ্টুমি করে, তাহলে তার নাম বোর্ডে লিখে রাখবি। আর বলি, এখন থেকে ক্লাসে কারও কোন জিনিষ চুরি না হয়, সে'সব দেখার দায়িত্বও তোর। কারও কিছু চুরি হলে আমি তোকে ধরব। এই দায়িত্ব পেয়ে সে যেমন একদিকে মনে মনে গর্বিত হয়, অন্যদিকে আবার পড়ে যায় ফাঁপরে। গর্বিত হওয়ার কারণ, এতটা মূল্য আর কেউ তাকে কোনদিন দেয়নি, সবার উপরে সর্দারি করার। আর ফাঁপরে পড়ার কারণ, নাম সে বোর্ডে লিখবে কি করে, তার যে একেবারে অক্ষর জ্ঞান নেই। 'ক অক্ষর গো- মাংস' বলে প্রবাদে যাকে, সে একেবারে তাই।

             আমি তাকে সাহস দিয়ে বলি, এ আর, কঠিন কাজ কী? শিখে নিবি, তোর যা বুদ্ধি আছে মাথায় তা'তে শিখতে বেশি দিন লাগবে না দেখিস। শুনে সে খুশি হল।

             সত্যি সত্যিই কিছুদিনের মধ্যে সে ক্লাসের চল্লিশ জনের নাম লেখা শিখে ফেলল। ধীরে ধীরে পড়াশুনায়ও উন্নতি করতে দেখা গেল তাকে। সবচেয়েও বড় কথা, ক্লাস থেকে জিনিস চুরি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল একেবারে। তারপর সে সাফল্যের সাথে চতুর্থ শ্রেণী পাশ করে, অন্য স্কুলে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হল। তারপর আমার সঙ্গে তার আর কোন যোগাযোগ ছিল না। তার কোন খবরও পাইনি বহু বছর।


             এর প্রায় দশ-বারো বছর পরের কথা। একদিন ধর্মতলা থেকে ৩৯ নম্বর বাসে করে তিলজলার স্কুলে ফিরছি, বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি, পকেটের পঞ্চাশ টাকার নোটটি সেই। হাওয়া হয়ে গেছে পকেটমারের দৌলতে। বারবার পকেটে খুঁজি, আমার চারপাশে খুঁজি, পায়ের কাছে দেখি নীচু হয়ে। এদিক সেদিক খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। কেউ মেরে দিয়েছে। নিজেকে কেমন অসহায় লাগে।

            ঠিক সে সময়ই একটি লম্বা চওড়া ছেলে, আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে, কেমন আছেন স্যার? আমায় চিনতে পারছেন না?  আমি সাবির আলি, আমার কথা আপনার মনে নেই?  

মনে পড়ে যায় তার কথা। বলি, হ্যাঁ পারছি, মনে পড়ছে। কেমন আছ তুমি?

ভাল আছি স্যার, বলেই সে বাসের ভিতর অতো লোকের ভিড়ের মধ্যে, নীচু হয়ে ঢিপ করে আমাকে একটা প্রণাম করল। আমি দু'হাতে তুলে ধরে তাকে বলি, এ কী করছ বাসের ভিতর?

সে অমায়িক হেসে বলে, তাতে কি হয়েছে স্যার? আপনাকে এমন উৎভ্রান্ত দেখাচ্ছে কেন?

আমি তাকে বলি, পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটি গায়েব হয়ে যাওয়ার কথা।

সে বলে, সে কী ! 

স্যার আপনার পায়ের কাছে ওটা কি পড়ে আছে, দেখুন তো?

আমি নীচু হয়ে ঝুঁকে দেখি, হ্যাঁ পঞ্চাশ টাকার নোটটিই পড়ে আছে। প্রাণে জল আসে আমার ।

আমি টাকাটি তুলে নিয়ে কন্ডাকটারের কাছ থেকে পাঁচ টাকার একটা টিকিট কাটি।

আমি তারপর সাবিরকে খুশি হয়ে বলি, একদিন এসে স্কুলে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে।

সময় পেলে, একদিন যাব স্যার। আপনি ভাল থাকবেন। তার সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে, দেখে মনটা ভরে ওঠে আমার। 

আচ্ছা, বলে আমি বাস থেকে নেমে পড়ি তিলজলা স্টপেজ এসে পড়ায়।

   

             স্কুলে এসে দিদিমণিদের সবাইকে ঘটনাটা বলতেই, সকলেই বলে ওঠে, আপনি জানেন না স্যার?

- কি?

- সাবির আলি কবে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে, সে তো এখন পকেটমারেদের সর্দার হয়েছে?

- তাই নাকি? বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে, আকাশ থেকে মাটিতে পড়ি। মনটা খারাপ হয়ে যায় মুহূর্তে। টাকা হারানোর চেয়েও যেন আরও বেশি কিছু হারিয়ে যায় আমার কাছ থেকে।

মনে মনে ভাবি, তবে কি সাবির আলি আমাকে গুরুদক্ষিণা দিয়ে গেল? 


          আমি সাবিরকে মানুষ করতে পারিনি, এ ব্যর্থতার দায় আমি এড়াব কিভাবে? কিন্তু সাবির আলি যে পকেটমার হয়েছে, তার জন্য সমাজের কি দায় নেই কোনও? কার দায় বেশি? আমার নাকি সমাজের ভেবে আমি কোনও কূল কিনারা পাই না। 

----------------------------------------------------------------------------
নাম - ঠিকানা - ফোন নম্বর
----------------------------------------------------------------------------
SANKAR BRAHMA.
8/1, ASHUTOSH PALLY,
P.O. - GARIA,
Kolkata - 700 084.


শংকর ব্রহ্ম

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.