ভৌতিক গল্প ।। অভিশপ্ত আগুনখাকি ।। স্বপন চক্রবর্তী

 
ছবিঋণ- ইন্টারনেট 

 

 অভিশপ্ত আগুনখাকি 

 স্বপন চক্রবর্তী 

 

আমার ছোটবেলা থেকে বড়বেলা সবটাই কেটেছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বারুইপুরে। সেই পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে প্রখর বৈশাখে আমার জন্ম থেকে আজ জীবনের  বৈশাখ আমি অতিক্রম করে এখন পঁয়ষট্টিতম বৈশাখের পথে।  এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে অনেক অত্যদ্ভুত ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে। কিন্তু সেদিন রাত্রের সেই ভয়াবহ ঘটনা আজও যেন একাকী অন্ধকারে বসে থাকলে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সারা শরীরে যেন কেমন শিহরণ খেলে যায়, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আজ সেই ভয়ংকর ঘটনার কথাই তোমাদেরকে বলবো।


তখন বারুইপুর ত' ছিল একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম । বিদ্যুতের যোগাযোগ ছিল নামমাত্র কয়েকটি জায়গায়। চারিদিক বড় বড় গাছপালা, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই অন্ধকারে সব ঢেকে যেত। সেই বড় বড় গাছের ছায়া যেন গিলে খেতে আসত। লণ্ঠনের টিমটিমে আলো, ঝিঁঝি পোকা সহ বিভিন্ন পোকার ডাক, দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের হুক্কাহুয়া রব - সব মিলিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই বুকের ভেতরটা এক অজানা ভয়ে যেন কেঁপে উঠত। মায়ের কোলঘেঁষে আমরা ভাইবোনেরা বাবার কলকাতার অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতাম। বাবা এলে যেন মনে অনেকটা সাহস আসত।


আমার বাবার একটা ল্যামব্রেটা স্কুটার ছিল। বাবার খুব প্রিয় ছিল। তখন ত' এখনকার মত মোটরবাইকের চল ছিল না। ল্যামব্রেটা স্কুটার পঞ্চাশ ষাটের দশকে খুব জনপ্রিয় ছিল। অনেকেই এই যানটি ব্যবহার করতেন। ২০০২ সালে এই কোম্পানীটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই স্কুটারে চেপে বাবা ছুটির দিনে আমাকে, কখনো দাদাকে, কখনো দিদিদের  আশেপাশে ঘুরতে নিয়ে যেত। 


তখন আমার বয়স এই বছর বারো হবে । সেদিন ছিল রবিবার । এরকম বৈশাখ মাস। বাবা আমাকে বললো - বাবু , আজ আমার জয়নগরে একটা বন্ধুর মেয়ের আশীর্বাদে নিমন্ত্রণ আছে। যাবি আমার সাথে !  ও, তোমাদেরকে ত' বলতে ভুলেই গিয়েছি যে আমার ডাকনাম ছিল বাবু । বাবা, মা, দাদা , দিদি থেকে শুরু করে আমার আত্মীয় স্বজন এমনকি আমার স্কুল, কলেজ অফিসেও সকলেই আমাকে এই নামেই ডাকত।


যাই হোক, বাবার প্রস্তাব আমি ত' একপায়ে খাড়া। এদিকে মা ত' কিছুতেই যেতে দেবে না আমাকে।ভাই বোনেদের মধ্যে আমি সব থেকে ছোট ছিলাম।অতএব বাবা মায়ের খুব আদরের ছিলাম। অনেক অনুনয় বিনয় করে বাবা রাজী করালো মাকে। রওয়ানা হবার সময় মা আমাদের দুজনের হাতে বিপদতারিণীর ডোর বেঁধে দিল যাতে মা চন্ডী আমাদেরকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তখনও জানতাম যে মা বিপত্তারিণী চণ্ডীর এই ডোর কিভাবে আমাদেরকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে। সকাল দশটা নাগাদ আমরা বাবার ল্যামব্রেটায় চেপে বেরিয়ে পড়লাম। জয়নগরে বাবার বন্ধুর বাড়ীতে আপ্যায়ন আর আহার দুটোই দারুণ হলো। স্থানীয় থানার এক তরুণ পুলিশ অফিসারের সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। সারা দুপুরটা খুব আনন্দে কাটলো, কিন্তু বিপদ হলো বিকালবেলা। 


বাবা ঠিক করেছিল যে রোদের তাপ একটু কমলে বিকাল পাঁচটা নাগাদ বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। কিন্তু বাধ সাধলো প্রকৃতি। বিকাল চারটে কি সওয়া চারটে থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করলো। আর পাঁচটা বাজতে না বাজতেই শুরু হলো ভয়ংকর কালবৈশাখীর তাণ্ডব। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে চলল সেই ঝড়বৃষ্টি, বজ্রপাত। আমরা যখন বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটার ঘণ্টা পড়লো শুনতে পেলাম। বাবার বন্ধু অনীশ কাকু আমাদের সে রাত্রে তাঁর বাড়ীতে থেকে যাবার অনুরোধ করলেও বাবা রাজী হলো না। তার দুটো কারণ ছিল - প্রথমত: পরদিন ছিল সোমবার, সপ্তাহের প্রথম দিন অফিস কামাই করাটা বাবার কাছে খুবই অনুচিত মনে হয়েছিল আর দ্বিতীয়ত বাড়ীতে মা একা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সঙ্গে সারা রাত থাকবে কি ভাবে, সেটা ভেবে বাবা খুবই চিন্তিত ছিল। আর তখন তো কোনরকম ফোনের সুবিধা ছিল না, ফলে বাড়িতে কোন আগাম খবর দেওয়া সম্ভব ছিল না। 


আমরা যখন কাকুর বাড়ী থেকে বেরোলাম তখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল, অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছিল, তার সাথে মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকানো আর মেঘ গর্জন। পরে শুনেছিলাম যে সেদিন রাতে অমাবস্যা তিথির যোগ শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটার কিছু পর থেকেই। ফলত: আকাশ আরো অন্ধকার ছিল। বাবার বন্ধু অনীশ কাকু বললেন যে তাঁর বাড়ী থেকে ডানদিকে মিনিট পাঁচেক গেলে যে রাস্তাটা পড়বে সেই রাস্তা ধরে আরও মিনিট দশেক গেলে পড়ে আগুনখাকির মোড় বা ডাকিনীর মোড়। আর ডাকিনীর মোড় থেকে বাঁদিকে গেলেই বারুইপুর যাবার রাস্তা। বাবা বললেন - সে ত' আমি জানি, আমি ত' ঐ রাস্তা দিয়েই এসেছি। বাবার বন্ধু বললেন - হ্যাঁ, সে ত' ঠিকই, কিন্তু ঐ রাস্তায় প্রচুর বড় বড় গাছ আছে যার ডালপালা এই ঝড়ে ভেঙে রাস্তার ওপর পড়ে থাকলে গাড়ী চালানোর পক্ষে খুব অসুবিধা হবে। তবে আর একটা রাস্তা আছে বটে, আমার বাড়ীর পিছন দিক দিয়ে। একেবারে সোজা রাস্তা। কিন্তু রাস্তাটা ভাল নয়, খুবই অন্ধকার, ভাঙাচোরা। ঝোপঝাড় খুব বেশী, তবে বড় গাছ তেমন নেই। তবে ঐ রাস্তাটা দিয়ে গেলে খুব তাড়াতাড়ি আগুনখাকির মোড়ে পৌঁছনো যায়। কিন্তু রাস্তাটায় একটু ভয় আছে। সন্ধ্যার পরে ঐ রাস্তায় কেউ চলাচল করে না। "বাবা বললে - " ভয়, সেটা কিরকম ! " কাকু বললেন - ঐ রাস্তার পাশে একটা জলা আছে । ডাকিনীর জলা। জলাটা পেরিয়ে গেলেই আগুনখাকির মোড়, যার আরো একটা নাম হল ডাকিনীর মোড়। আগুনখাকির শ্মশানে এক ডাকিনী ভৈরবী থাকতো , একদিন নাকি তার দেহটা ঐ জলায় কেউ পুঁতে রেখে দিয়ে যায়। আমার দাদুর কাছ থেকে শোনা। তারপর থেকে সন্ধ্যার পরে কেউ ঐ রাস্তায় যেতে সাহস করে না।" বাবা বললেন - " তুমি চিন্তা কোরো না, আমি ঐ ঘুরপথ দিয়েই ঠিক চলে যাব।"


আগুনখাকির মোড় বা ডাকিনীর মোড় । এই নামটা আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে। এই আগুনখাকির মোড়ের ঠিক বাঁদিকেই দুটো শ্মশান।  করালী কাপালিকের শ্মশান আর ডাকিনীর ঘাট। প্রথমোক্ত শ্মশানটিতে করালী ভৈরব নামে একজন কাপালিক এসে বাসা বেঁধেছিল। তার সঙ্গে ছিল একজন ভৈরবী, যে আবার নাকি ডাকিনী মন্ত্রে সিদ্ধ ছিল, যার কথা বাবার বন্ধু বলেছেন। তাদের নামেই নাকি শ্মশানগুলির এমন নামকরণ। তবে এই শ্মশানদুটির আগে অন্য নাম ছিল । আগুনখাকির শ্মশান আর বুড়োর ঘাট। এই বুড়োর ঘাটে নাকি কেবল বয়স্ক পুরুষদেরই শবদাহ হত এক সময়। অন্য কোন শব এখানে দাহই করা যেত না। চিতাই নাকি জ্বলত না। তবে এখন কি হয় বলতে পারবো না। আর আগুনখাকির শ্মশানে নাকি দিনের বেলা কোনদিন আগুন নিভত না। কোন শব না এলেও হঠাৎ করেই আপনা আপনিই চিতা জ্বলে উঠত। তাই থেকেই নাকি আগুনখাকি নামটা হয়েছিল। আবার সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই এখানে নাকি বিভিন্ন রকম অশরীরী কার্যকলাপ শুরু হত। হঠাৎ করেই যেন কেমন সব ফিসফিস আওয়াজ, পায়ের শব্দ শোনা যেত, দাহ করতে নিয়ে আসা কোন শবদেহ নাকি মাঝে মাঝে শ্মশানের পাশ দিয়ে যে খাল বয়ে যাচ্ছে সেখানে কেউ পুঁতে রেখে দিয়ে যেত। তাই বিকাল থেকে এখানে কেউ শবদাহ করতে আসত না। আজ বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যুগে এসব হয়তো তোমরা কেউ বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এত বছর পরেও সন্ধ্যার পরে ঐ আগুনখাকির মোড় বা ডাকিনীর মোড় জায়গাটি শুনেছি একই রকম রয়ে গেছে। সেই অন্ধকার, প্রায় জনমানবহীন,একটা গা ছমছমে পরিবেশ।দুপুরের পর থেকে এখনও এখানে কেউ শবদাহ করতে আসে না।


যাই হোক , আবার সেদিনের কথায় ফিরে আসি। বাবা  বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তাই ধরল। কিন্তু সেদিন দুর্ভাগ্য যেন আমাদের পিছু ছাড়ছিল না। সামান্য কিছুটা যাবার পরেই সামনে দেখি একটা বড় ডাল রাস্তার এদিক থেকে ওদিক অবধি পড়ে রয়েছে । গাড়ী যাবার মত কোন জায়গা নেই। বাবা বললো - " কি আর করা যাবে, যা আছে কপালে। মা বিপত্তারিণী চণ্ডীকে স্মরণ করে চল আমরা ঐ পিছনের রাস্তাটাই ধরি। " এই বলে বাবা গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। বেশ কিছুটা গেছি, চারিদিক অন্ধকার আর রাস্তার দুপাশে প্রচুর জঙ্গল যার মধ্যে বিষাক্ত সাপ থাকাও বিচিত্র নয় । এমন সময় জলাটা দেখতে পেলাম সামনে গাড়ীর আলোয়। বুকটা যেন কেমন কেঁপে উঠল। হঠাৎ দেখি সামনে কেউ যেন একজন আলো নিয়ে যাচ্ছে। বেশ জোরেই যাচ্ছিল, কারণ আমাদের গাড়ী কিছুতেই তাকে অতিক্রম করতে পারছিল না। এমনভাবেই আমরা আগুনখাকির মোড়ে পৌঁছে গেলাম। দেখলাম সেই আলো হাতে মানুষ বা মানুষী যাই হোক না কেন সে বাঁদিকে গিয়ে যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা তাই দেখে খুবই আশ্চর্য্য হয়ে গেলাম। এদিকে আবার জোরে বৃষ্টি শুরু হল। চারিদিক অন্ধকার। কোন লোকজন কোথাও নেই। বাবাকে খুব চিন্তিত মনে হল -" খুব বিপদে পড়লাম রে বাবু। কখন বাড়ী পৌঁছবো কে জানে !"  আমারও খুব ভয় লাগছিল। বাবা আমাকে সাহস দিয়ে বললো - " চল, সামনে বাঁদিকে একটা ভাঙাচোরা ঝুপড়ী মত দেখা যাচ্ছে। আপাতত ওর নীচে আশ্রয় নিয়ে এই বৃষ্টি থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হবে।"  স্কুটারের আলোয় দেখতে পেলাম যে ঝুপড়ীর পাশের একটা দেওয়াল আছে, তবে একদম ভাঙা। আর ঝুপড়ীর অবস্থাও তথৈবচ। মনে হল ঝুপড়ীর পিছন দিকে একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ আর  তার মধ্যে কিছু গাছপালাএ আছে । যাই হোক তাড়াতাড়ি আমরা সেই ঝুপড়ীর নীচে আশ্রয় নিলাম। ইতিমধ্যেই বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে বেশ শীত শীত করছিল। তারপর ঠাণ্ডা হাওয়া, জনমানবহীন আঁধারে ঘেরা এক অপার্থিব পরিবেশ, বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদ্ভুত আওয়াজ, দূর থেকে ভেসে আসা শিয়াল আর পেঁচার ডাক-সব মিলিয়ে বারবার আগুনখাকির করালী কাপালিকের শ্মশানের সেই সব জনশ্রুতিগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এতই অন্ধকার ছিল যে পাশে বাবাকেও দেখা যাচ্ছিল না। অনেকটা দূরে মনে হয় কোন বাড়ি থেকে লণ্ঠনের আলোর একটা মৃদু রেখা ভেসে আসছিল। কিন্তু সে আলো এতটাই অল্প ছিল যে সমস্ত পরিবেশটাকে যেন আরো রহস্যময় করে তুলেছিল।


হয়ত আধঘণ্টা একই ভাবে সেই দমবন্ধকর অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পিছনে একটা সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজে চমকে উঠলাম। এই অন্ধকার বৃষ্টির মধ্যে ফাঁকা মাঠ থেকে কে আবার সাইকেল চালিয়ে আসছে ! আমি বাবাকে ভয়ে ভয়ে ডাকলাম -" ও বাবা, শুনতে পাচ্ছ কে যেন সাইকেল চালিয়ে আসছে !"  বাবার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় ধরা ছিল। কিন্তু কখন যে সেটা ছেড়ে গেছিল টেরই পাই নি। বাবার কোন আওয়াজ না পেয়ে, আমি চেঁচিয়ে উঠলাম - " ও বাবা, সাড়া দিচ্ছ না কেন !" কিন্তু বাবার কোন উত্তর পেলাম না। আর ঘন অন্ধকারে ত' কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। এমন সময় মনে হল কেউ যেন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু কারোকে দেখতে পেলাম না। সেই সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজ। তারপর কেমন ফ্যাঁসফেঁসে কণ্ঠস্বরে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো - " কি হয়েছে খোকা ?"  আমি বললাম - " আমার বাবা এখানে স্কুটার নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন আর না দেখতে পাচ্ছি বাবাকে , না কোনো গাড়ীর আওয়াজ পাচ্ছি। বাবা যে কোথায় গেল !" লোকটা তেমনই ফ্যাঁসফেঁসে কণ্ঠস্বরে বললে - " কেন ঐ ত' তোমার বাবা। গাড়ীর আলোটা দেখতে পাচ্ছ না !" আমি অবাক হয়ে দেখলাম-সত্যিই ত' , সামনে একটা আলো দেখা যাচ্ছে । কেমন সামনে এগিয়ে চলেছে। এতক্ষণ ত' দেখতে পাই নি। আমি আর সময় নষ্ট না করে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সেই আলোটার পিছনে 'বাবা বাবা' বলে ছুটতে শুরু করলাম। মনে হল যেন আমার পিছনে সেই সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজ করতে করতে লোকটাও আসছিল। কিন্তু লোকটা কি সাইকেল চড়ে আসছিল ! অন্ধকারে যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।


যাই হোক, এইভাবে 'বাবা বাবা' বলে চিৎকার করে সেই আলোর পিছনে ছুটতে ছুটতে আমি যে কোথায় পৌঁছে গেছিলাম প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারি নি। তারপর চারিদিক অন্ধকার। কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব আমার ওপর চেপে বসছিল। হঠাৎই যেন আমার মনে হল আমি একা একা  আগুনখাকি শ্মশানের ভিতর ঘুরে বেড়াচ্ছি আর ছোট ছোট অনেক আলোক বিন্দু আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। আমি 'বাবা বাবা' বলে চিৎকার করতে গেলাম কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরোল না। এমন সময় কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল - "বাবু , তুই কোথায় !"  মনে হল বাবা যেন পিছন দিক থেকে আমাকে ডাকছে। আমি পিছন দিকে তাকালাম, কিন্তু কারোকে দেখতে পেলাম না। আর ঠিক সেই সময় কে বুঝি আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল - " কি খোকা, বাবাকে দেখতে পেলে ! " তারপরে এক ভয়ংকর অট্টহাসি। সেই ভীষন চিৎকার আমি জীবনে কোনদিন ভুলতে পারবো না। আর সেই সঙ্গে সব আলোকবিন্দুগুলো যেন আমার ঘাড়ের ওপর এসে পড়লো। আমি 'মাগো' বলে চিৎকার করে উঠে মনে হয়, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ তার পর কি হয়েছিল আর আমি কিছু জানি না। 


হঠাৎ আমার চোখমুখে জল পড়তে আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখলাম চারিদিকে দিনের আলো । আমি একটা ধুধু মাঠের মধ্যে শুয়ে আছি আর বেশ কিছু কৌতূহলী মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি প্রথমটা যেন কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। 'আমি কোথায়' এই প্রশ্নের উত্তরে তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে জায়গাটা হল ভয়ানক আগুনখাকি করালী কাপালিকের শ্মশান আর ওঁরা আমাকে এখানে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন। ওঁরা সকলে শ্মশানযাত্রী। সকালবেলা এসেছেন শবদাহ করতে। হঠাৎ আমার নজরে পড়লো আমার হাতে মায়ের বেঁধে দেওয়া বিপদতারিণী মা চণ্ডীর ডোরটা কেউ যেন খোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারে নি। আমার তখন সব মনে পড়ে গেল। তার মানে সারারাত আমি এই শ্মশানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। ভাবতেই সারা শরীরটা যেন শিউরে উঠলো। আমি ওঁদেরকে কাল রাতের সব ঘটনা বলতে ভয়ে যেন ওঁদের চোখমুখ সব সাদা হয়ে গেল। বললেন যে মা চণ্ডীই আমাকে রক্ষা করেছেন। এরকম ঘটনা এর আগেও এখানে দুএকবার ঘটেছে, কিন্তু কারোকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আমার বাবা কোথায় ! বাবাকে না পেলে আমি কি করবো ! আমি বুঝি কেঁদেই ফেললাম। আর ঠিক তখনই একজন এসে বললেন যে ডাকিনীর ঘাটের কাছে এক ভদ্রলোককে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এসেছে, আর তিনি তাঁর ছেলের নাম ধরে খুব কাঁদছেন।


আমি বুঝতে পারলাম যে উনি আমার বাবা ছাড়া আর কেউ নন। আমি সকলকে বললাম যে আমাকে ঐ ভদ্রলোকের কাছে নিয়ে যেতে। আমাকে দেখে আমায় জড়িয়ে বাবার সে কি কান্না ! বাবার কাছ থেকে যা জানতে পারলাম তা বাবার জবানিতেই বর্ণনা করছি।


"ঝুপড়ীতে তোর পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল কেউ যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমি বেহুঁশের মত তার পিছন পিছন চললাম। তুই যে আমার পাশে আছিস, আমার গাড়ীটা যে ওখানে রয়েছে- সেসব কিছুই তখন মাথায় ছিল না। আমি সেই গভীর অন্ধকারের ভিতরে সেই অজানা অচেনা ছায়ামূর্তির পিছনে চলতে শুরু করলাম। চলতে চলতে হঠাৎ মনে হল সামনে যেন অনেক জল। তখন আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখলাম সামনে একটা খাল। তবে কি আমি খালে নামতে যাচ্ছিলাম । না না, এ কোথায় চলেছি আমি। তোর নাম ধরে ডাকবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। ঠোঁট, গলা সব যেন শুকিয়ে কাঠ। আর কি জল তেষ্টা। মনে হল ওই খালে নেমে জল খাই। এমন সময় মনে হল ঠিক যেন তোর গলায় কেউ আমায় ডাকছে। আমি যেই পিছন ফিরেছি , অমনি আমার কানে কে ফিসফিস করে বলে উঠল - "কোথায় যাচ্ছ, তোমার ছেলে ত' সামনে"। তারপর সে কি অট্টহাসি ! আর মনে হল অসংখ্য ছোট ছোট আলোকবিন্দু আমাকে ঘিরে ধরেছে। আমি তোর মায়ের দেওয়া বিপত্তারিণী মা চণ্ডীর ডোরটা চেপে ধরে বলে উঠলাম - 'মা, আমাদের রক্ষা করো।' 

ব্যাস, তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান হল তখন দেখলাম আমি এই খালের ধারে পড়ে আছি আর এঁরা আমাকে ঘিরে রয়েছেন। " 

সকলেই বাবার কথায় খুব আশ্চর্য্য হয়ে বললেন যে বিপত্তারিণী মা চণ্ডীই আমাদের দুজনকে রক্ষা করেছেন এ যাত্রা। রাত্রিবেলা এই শ্মশানের ধারেকাছে কেউ আসে না। এখানে এলে কেউ আর প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারে না। ইতিমধ্যে কেউ একজন আমাদের জন্যে চা, বিস্কুট এনে দিলেন। চা পান করে মনে হল শরীরটা যেন একটু চাঙ্গা হল। এমন সময় বাবা বলে উঠলেন - " আরে, আমার গাড়ীটা। গাড়ির কথা ত' ভুলেই গেছিলাম।" একজন জিজ্ঞাসা করলেন - " কি গাড়ী !" বাবা বললেন - " স্কুটার। ঐ যে ভাঙা ঝুপড়ীটাতে আমরা কাল রাত্রে দাঁড়িয়েছিলাম, ঐখানেই ত' গাড়ীটা ছিল। " একজন বললেন - " আপনারা কাল কোন ঝুপড়ীর নীচে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলুন ত ! ঝুপড়ী ত' দুটো শ্মশানেই দুটো আছে বটে শবযাত্রীদের জন্যে , কিন্তু সেগুলো ত' ভাঙাচোরা নয়।"  আমি বললাম - " না না, সেটা ত' একদম ভাঙা, মনে হয় শ্মশানে ঢোকার মুখেই । " শুনে সবাই যেন কেমন চমকে উঠল। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন - " কি হল, আপনারা সকলে যেন কেমন চমকে উঠলেন ! কেন !"  একজন ভদ্রলোক বললেন - " মশাই, সত্যিই আপনাদের ওপর মা চণ্ডীর অশেষ কৃপা। নয়ত' আপনাদের মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। ঐ ঝুপড়ীর পাশের ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে আগে শবযাত্রীরা যাতায়াত করতো। এমনকি ঐ ঝুপড়ীতে বসে বিশ্রামও নিত, গল্পগুজব করতো। কিন্তু এখন আর করে না। বাবার প্রশ্নের জবাবে সেই ভদ্রলোক বললেন - "এই শ্মশানে আগে একজন ডোম ছিল । প্রহ্লাদ ডোম। সে কাছেই থাকত। কোন শব এলে শবযাত্রীরা তাকে ডেকে আনত। কিন্তু দুপুর তিনটে বেজে গেলে সে কিছুতেই শ্মশানে আসতে রাজী হত না। সকলে সেটা জানত। তাই দুপুরের পরে কোন শবযাত্রী এখানে আসত না। এহেন প্রহ্লাদ সেদিন হঠাৎ সন্ধ্যার সময় সাইকেল চড়ে শ্মশানে ঢুকেছিল। স্থানীয় একজন তাকে দেখে জিজ্ঞাসাও করেছিল যে সন্ধ্যা বেলায় কি কারণে সে শ্মশানে যাচ্ছে । প্রহ্লাদ উত্তর দেয় যে তার নতুন ঘড়িটা শ্মশানে ফেলে এসেছে। সেটা আনতে যাচ্ছে। লোকটা আর কিছু বলে নি বা অন্য কারোকেও সেদিন কিছু জানায়ও নি। পরের দিন সকালে প্রহ্লাদের ভিজে সপসপে মৃতদেহটা ওই ঝুপড়ীর মধ্যে পড়েছিল। হাতে সেই নতুন ঘড়িটা।আর তার সাইকেলটা খালের জলে ভাসছিল। সে কেন খালের ধারে গেছিল , সে ভিজলই বা কি করে আর তার সাইকেলটাই বা কিভাবে খালে গিয়ে পড়লো - পুলিশ এসব নিয়ে অনেক তদন্ত করেছিল। কিন্তু কোন সদুত্তর পায়নি। তারপর থেকে ঐ ঝুপড়ীর ধারে কাছে কেউ যায় না। কেমন যেন গা ছমছম করে। এমনকি একা একা কেউ যাতায়াত করলে সে অনেক সময় সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজও শুনতে পায় পিছনে। কিন্তু কারোকে দেখতে পায় না। আর আপনারা যখন ঐ ঝুপড়ীতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন , তাঁর মানে আপনারা প্রথমে প্রহ্লাদের খপ্পরেই পড়েছিলেন। সত্যিই আপনাদের ওপর মা চণ্ডীর অশেষ কৃপা।"  বাবা বললেন - "কিন্তু আমার স্কুটারটার কি হবে ! ঐ ঝুপড়ীতে গিয়ে ত' আমাদের দেখতে হবে।" প্রথমে একটু ইতস্তত: করলেও পরে সকলে বললেন - " চলুন,আমরা আপনাদের সাথে যাচ্ছি।" ঝুপড়ীর কাছে গিয়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দেখলাম বাবার অত সাধের স্কুটারটা অনেক দূরে ছিটকে পড়ে আছে আর একেবারে ভাঙাচোরা অবস্থায়। কে বা কারা বুঝি প্রচণ্ড আক্রোশে সব ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। তার চাকা থেকে শুরু করে আয়না অবধি কোন কিছুই আর অবশিষ্ট  ছিল না। বাবা প্রথমটায় একটু ভেঙে পড়লেও পরে বুঝলেন যে গাড়ীটা গেছে যাক, কিন্তু আমরা যে মায়ের কৃপায় প্রাণে বেঁচে গেছি, সেটা সত্যিই অনেক সৌভাগ্য। তিনি গাড়ীর মায়া ত্যাগ করে এবার বাড়ী ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 

কিন্তু আমরা বাড়ি ফিরবো কি ভাবে ! বাবা তখন ঐ শবযাত্রীদের একজনকে অনুরোধ করলেন  যে জয়নগরে গিয়ে বাবার বন্ধুকে একবার খবর দিতে। খবর পাওয়া মাত্র অনীশ কাকু, তাঁর ছেলে এবং হবু জামাতা সহ আরো একজন ভদ্রলোক এসে হাজির। প্রথমে ত' গত রাতে  আমাদের ওনার বাড়িতে ফিরে যাওয়া উচিত ছিল বলে বাবার প্রতি কাকু খুব অনুযোগ করলেন। তারপর তাঁর হবু জামাতার উদ্যোগে জয়নগর থানার একটি পুলিশ জিপে করে সকলে মিলে আমাদের বারুইপুরের বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। তখন ঘড়িতে বাজে দুপুর বারটা, মনে হল আমাদেরও বুঝি বারটা বাজতে চলেছিল। 

বাডীতে পৌঁছে দেখলাম সকলে মুখ শুকনো করে বসে আছে।  অনেক প্রতিবেশী আমার মাকে ঘিরে বসে আছেন। আমাদের দেখে ত' মায়ের কান্না যেন বাধ মানছিল না। আমাদের চোখমুখের অবস্থা আর জামাকাপড়ের দশা দেখে সবার বাকরোধ হবার মত অবস্থা। ইতিমধ্যেই বাবার বন্ধুর হবু জামাতার প্রচেষ্টায় বারুইপুর থানা থেকে একজন পুলিশ অফিসার , আমরা যে নিরাপদে বাড়ী ফিরে আসছি , সে খবরটা মাকে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তার আরো একটা কারণও ছিল। আমাদের একজন প্রতিবেশী সকাল বেলাতেই থানায় আমাদের গত রাত্রে বাড়ী না ফেরার খবরটা জানিয়েছিলেম। তাই সেই বিষয়ে ইতিমধ্যেই বারুইপুর ও জয়নগর থানার মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। 

পরে আমাদের কাছে অভিশপ্ত আগুনখাকির শ্মশানের সব ঘটনা শুনে ত' সকলের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। সেদিন যে মা বিপত্তারিণী চণ্ডীই আমাদের রক্ষা করেছিলেন, সে বিষয়ে সবাই একমত ছিলেন। তবে তার সঙ্গে ছিল আমার গর্ভধারিণী মায়ের প্রার্থনা আর আকুলতা।  যদিও বাবার মাঝেমাঝে তাঁর সাধের স্কুটারটার জন্য কষ্ট হত। তখন মা বাবাকে বোঝাতেন এই বলে যে একটা গাড়ীর চেয়ে দুটো প্রাণ অনেক দামী তাঁর কাছে । 

আজও যখন এমন কোন দুর্যোগের রাতে কোনভাবে রাস্তায় একাকী পথ চলি, আর কেউ যদি পিছনে সাইকেলের ঘণ্টি বাজায়, তাহলে মাঝে মাঝে চমকে ঊঠি। মনে হয়ে কেউ যেন কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে - " কি খোকা, বাবাকে খুঁজে পেলে নাকি !" ওফ্  কি ভয়ংকর সেই রাত। আমি জীবনে কোনদিন ভুলতে পারব না। 

—————————————————————————-

                                   💀সমাপ্ত💀

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.