কল্পবিজ্ঞানের গল্প ।। মেজমামার চন্দ্র অভিযান ।। অঞ্জনা মজুমদার


ছবিঋণ- ইন্টারনেট 

 

মেজমামার চন্দ্র অভিযান 

অঞ্জনা মজুমদার 
 
সবুজের মেজমামা কখন যে কি কান্ড ঘটাবেন সে কথা কেউ আন্দাজ করতে পারে না। নানা রকম আবিষ্কার করার চেষ্টা করে অনেক সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। বাড়ির সবাই মেজমামাকে বেশ ভয় পায়। মেজমামার ল্যাবরেটরিতে সবার ঢোকার অনুমতি নেই। বাড়ির কুকুর বেড়ালও মামাকে সমঝে চলে। একবার অদৃশ্য হবার ওষুধ তৈরি করে ভুলু কুকুরকে অদৃশ্য করে দিয়েছিলেন। অদৃশ্য হয়ে ভুলু নিশ্চয়ই খুব সমস্যায় ছিল। তারপর থেকে ভুলু মেজমামার ধারে কাছে থাকে না। 
মিনি বেড়ালের লেজে কালিপটকা বেঁধে জ্বালিয়ে দেওয়ার আইডিয়া মেজমামার ছিল। তারপর মিনি মিউমিউ আওয়াজ করতে ভুলে ছিল অনেক দিন। 
এবার মেজমামা কি এক্সপেরিমেন্ট করছেন দশ দিন ধরে সবুজের বাড়ির কেউ আন্দাজ করতে পারছে না। দিম্মা তো চুপিচুপি সবুজকে জিজ্ঞেস করলেন, দাদুভাই তুই কি জানিস মেজ কি পরীক্ষা করছে ওর ম্যাজিক ঘরে? 
ল্যাবরেটরিকে দিম্মা ম্যাজিক ঘর বলেন কিন্তু সবাই মনে মনে দিম্মার এই নামকরণ সমর্থন করে। দাদু, বড়মামা সামনে কিছু না বললেও সর্বক্ষণ আতঙ্কিত হয়ে থাকেন মেজমামার মাথায় কি আবার উদ্ভট পরিকল্পনার উদয় হয়!
আজ সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে মেজমামা উজ্জ্বল মুখে ঘোষণা করলেন, আমি কাল চন্দ্র বিজয় করতে যাচ্ছি। 
দাদুভাই বিষম খেলেন, চন্দ্র অভিযান ? তুমি কি নাসা থেকে ডাক পেয়েছো? তোমার কি শারিরীক সুস্থতার পরীক্ষা হয়ে গেছে ? কিন্তু তোমার যা চেহারা তাতে তোমাকে কি করে সিলেক্ট করলো? 
মেজমামা রেগে গেলেন, কেন আমার চেহারা কি খারাপ?
বড়মামা মুচকি হাসলেন, তোর ওজন মেপেছিস রিসেন্টলি? ওজন তো একশো কুড়ি কেজির বেশি হয়ে গেছে। 
দিম্মা বললেন, একদম নজর দিবি না মেজ কতদিন পরে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। শান্তিতে খেতে দে বেচারাকে।
বড়মামা বললেন, মা তোমার মেজ ছেলে চাঁদে যাচ্ছে। সেখানে কি এই লুচি আলুর দম বোঁদে পাবে?  সেখানে সব কন্টিনেন্টাল। 
দিম্মা থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন। চাঁদের দেশে কেন খাবার পাওয়া যাবে না সেটা তাঁর বোধগম্য হল না।
মেজমামা রেগে উঠে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দরজা দিলেন। দিম্মা চোখ মুছে বললেন, ছেলেটাকে শান্তিতে খেতেও দিবি না তোরা।
কিন্তু সবুজ আর তার বোন জিনি জানে মেজমামার মুখ থেকে কিছু কথা বের হওয়া মানে কিছু না কিছু ঘটনা ঘটবেই। দুজনে তাই রাতে ল্যাবরেটরির দরজায় টুকটুক করে টোকা দিল। 
মেজমামা যেন এরই অপেক্ষায় ছিলেন। দরজা খুলে দুজনকে চট করে ভেতরে টেনে নিলেন। 
জানতাম তোরা আসবি। আমার রকেটে তোদের দুজনের জন্যও সিট রাখা আছে। কাল সকালের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। নানান বাঁধা আসবে তাই আজই রওনা দিতে হবে। 
সবুজ বলল, কিন্তু তোমার রকেট কই? 
মেজমামা হাসলেন, দূর বোকা! এখন কি আর রকেটে করে যেতে হয়? বলে ঘরের কোণে একটা গোল বলের জিনিস দুই পা ওয়ালা দেখালেন। বলের মধ্যে লাল নীল আলো জ্বলছে। এর নাম চিকি।
মেজমামা রিমোট টিপলেন। একটা দরজা খুলে গেল। দুজনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। 
ল্যাবরেটরির ছাদের দিকের দরজা খুলে বলটি দুই পায়ে হেঁটে ছাদে চলে এল। তারপর হুস্ করে আকাশে উড়ে গেল। 
বলের ট্রান্সপারেন্ট দেওয়াল দিয়ে আকাশে ওড়া দেখে জিনি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। সবুজ চারিদিকে তাকিয়ে দেখল ওদের বাড়ি ছাড়িয়ে, স্কুল ছাড়িয়ে, হসপিটালের মাথার ওপর দিয়ে নদী পার হয়ে জঙ্গলের দিকে উড়ে চলল। 
সবুজ বলল, কোথায় যাচ্ছি আমরা?  
মেজমামা বললেন, কেন, সোজা চাঁদের দেশে। সব প্রোগামিং করা আছে। সময় লাগবে, আয় একটু ঘুমিয়ে নিই। কোনও চিন্তা নেই। 
মেজমামা চোখ বুজতেই নাক ডাকা শুরু হল। জিনি মেজমামাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। সবুজ আর কি করে?  রাতের আকাশের তারা দেখতে দেখতে সেও ঘুমিয়ে পড়ল।
প্রথমে ঘুম ভাঙল সবুজের চোখে রোদ পড়তে। পুব আকাশে লাল সূর্য টুক করে ওপরে উঠে পড়েছে। চিকির ভেতরে রোদের তেজটা বেশিই লাগছে, বাড়ির মতো জানালায় পর্দা দেওয়া নেই যে!
কিন্তু চিকি এটা কোথায় এল? নীচে চেনা চেনা ঘরবাড়ি। ওই তো স্কুল, খেলার মাঠ। চাঁদের পথ কই? তাড়াতাড়ি মেজমামাকে ঠেলে ডাকল, ও মামু তাড়াতাড়ি ওঠো। আমরা কোথায় আছি তাকিয়ে দেখো। 
মেজমামা চোখ বুজেই বললেন, এসে গেছে চাঁদ?  এবার নামতে হবে। ঠেলা দিচ্ছিস কেন? 
মিনিও ঘুম ভেঙে উঠে পড়ল। উঠেই কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল, ও মামু স্কুলটাও চাঁদে চলে এসেছে ?  
মেজমামা ধড়ফড়িয়ে চোখ মুছে চারিদিকে তাকিয়ে বললেন, সে কি রে? আমরা তো আমাদের গ্রামেই রয়েছি। বলে চিকির যন্ত্রপাতি মানে সুইচ টেপাটেপি করতে লাগলেন।
জিনি কেঁদে ফেলল, বাড়ি যাবো মামু। 
জিনির কান্না মেজমামা কেন বাড়ির কেউ সহ্য করতে পারে না। মেজমামা বললেন, চেষ্টা করছি জিনি, কিন্তু চিকি আমার কথা শুনছে না। 
সবুজ বলল, তাহলে কি হবে মামু? আমরা কি আকাশেই ঘুরতে থাকবো? 
এদিকে নীচে প্রচুর মানুষের জটলা। অমন অদ্ভুত বল আকাশে দেখে গ্রামের অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। তার মধ্যে দাদু আর বড়মামাও এসে দাঁড়িয়েছেন। ওরা সবুজ আর জিনিকে খুঁজছেন।
বড়মামা হাত নাড়ছেন, নেমে আয় মেজ। মা বাড়িতে কান্নাকাটি জুড়েছেন। 
জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিল জিনি, নামতে পারছে না চিকি। 
নীচে দাঁড়িয়ে আছেন স্কুলের ফিজিক্সের মাস্টারমশাই। মাথা চুলকে বললেন, আচ্ছা সবুজ, কতটা চার্জ আছে দেখা যায় কি? 
মেজমামার মাথা কাজ করছে না, সবুজ দেখল একটা নীল আলো জ্বলছে সে জায়গায় লেখা আছে লো চার্জ। কাম ডাউন। প্রেস দ্য রেড বাটন কুইকলি। 
সবুজ তাড়াতাড়ি লাল বোতামটা টিপল। চিকি মানে মেজমামার চন্দ্রযান ধীরে ধীরে স্কুলের মাঠে নেমে এল। দরজা খুলে গেল। জিনি দরজায় দাঁড়িয়ে। বড়মামা হাত বাড়িয়ে জিনিকে কোলে তুলে নিলেন। কই সবুজ, মেজ বেরিয়ে আয়। 
সবুজ মেজমামার হাত ধরে নীচে নেমে এল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। 
দাদু বললেন, বাড়ি চলো। আবার একটা ঝামেলা করলে তো?
জিনি বলল, আর একটু হলে চাঁদেই চলে যেতাম। 
ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বলের গায়ে হাত বোলাচ্ছে। ওরা জানে মেজমামার নতুন নতুন আবিষ্কার সবসময়ই ওদের নতুন নতুন খেলার জিনিস দেয়। ওরা বলটাকে ঘিরে নাচতে লাগল। আমরাও চাঁদে যাব, আমরাও চাঁদে যাব। 
চন্দ্র অভিযান ব্যর্থ তাই মেজমামা মাথা নিচু করে বাড়ি চললেন।বড্ড খিদে পেয়েছে, মায়ের কথা মনে পড়ছে।
-----------------------

অঞ্জনা মজুমদার 
এলোমেলো বাড়ি 
চাঁদপুর পল্লী বাগান 
পোঃ  রাজবাড়ি কলোনী 
কলকাতা   ৭০০০৮১ 



Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.