ভ্রমণকাহিনি।। দক্ষিন ভারতের শেষ সমুদ্র তটে ।। দীপক পাল

ছবিঋণ - ইন্টারনেট 
 

দক্ষিন ভারতের শেষ সমুদ্রতটে 
 ( দ্বিতীয় পর্ব )

 দীপক পাল

 

 পরেরদিন সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে ড্রাইভার মজিদ গাড়ি নিয়ে কটেজে এসে হাজির হলো আমরা সবাই গাড়িতে করে চিত্রাতে এসে ঢুকলামব্রেকফাস্টের সাথে চা গ্রহণ করার জন্য ব্রেকফাস্ট সেরে 

গাড়ীতে উঠে বিবেকানন্দ রকের দিকে  রওনা দিলাম আমার সেই আগেকার দেখা ফাঁকা ফাঁকা লঞ্চ

ঘাটেরচারদিক খোলা মেলা অবস্থানের বিন্দু মাত্র  চোখে পড়লো না বরং চিন্তে না পারার মত সম্পূর্ণ বৈপরীত্য 

 এবং বৈচিত্র চোখে পড়লো 

 লঞ্চ ঘাটে পৌঁছাতে কত রকমেরদোকানপাট  খাবারের দোকান হোটেল ইত্যাদি চোখে পড়ল তা 

 বেশ দেখার মতোও বটে লঞ্চঘাটে এখন আর সোজাসুজি যাওয়া যায় না অনেক ঘুরে ঘুরেএঁকেবেঁকে লাইন দিয়ে সুষ্ঠু ভাবে যেতে হয় লঞ্চঘাটায় তার জন্য গেট দিয়ে ঢোকার আগে বাইরে লাইন দিয়ে টিকিট কাটতে হয় টিকিটের মূল্য একশো টাকা  যারা তিনশো টাকার স্পেশাল টিকিটে যেতে চান তারা সোজাসুজি গেটের ভিতরে ঢুকে  

আলাদা কাউন্টার  থেকে টিকিট কেটে অন্য পথে অন্য লাইনে গিয়ে দাঁড়াতেহয় এই লাইনে আধ ঘন্টার মধ্যে আমরা লঞ্চঘাটায় পৌঁছে গেলাম ঠিক সেই সময় একটা লঞ্চ এসে ভিরলো যাত্রীরা নেমে গেলে আমরা একে একে উঠেপড়লাম সমুদ্রে কাছেপিঠে লঞ্চ ভ্রমণ ভারি আনন্দদায়ক আগেরবার খালি বিবেকানন্দ রক দেখে খুবই আনন্দ পেয়েছি এবারে দেখছি বিবেকানন্দ রকের থেকেওউঁচুতে স্থাপিত এক মূর্তি যা বিবেকানন্দ রকের সাথে একটা সেতু দিয়ে যুক্ত দুর থেকে দেখতে ভারী সুন্দর লাগছে কিন্তু যাই হোক স্বামী বিবেকানন্দের থেকেও কিতিনি উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠিত, যিনি সারা বিশ্বে  

ভারত  ভারতবাসীকে এক অতি উচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন তিনি তো শুধু বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেননি, সমগ্র ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তাই তার থেকেও অনেক উচ্চতায় এই মূর্তি কি করে স্থান পেল আমি কেমন এর মধ্যে প্রাদেশিকতার গন্ধ পেলামগুগুল সার্চ করে কিছুটা আলোকিত হলাম থিরুভুল্লাভুর ছিল এনার নাম তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত তামিল কবি  দার্শনিক তার কার্যকাল ছিল সম্ভবতপাঁচশো খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে সংস্কৃতেও তার ছিল গভীর পান্ডিত্য তার স্ট্যাচুর উচ্চতা 133'  স্থাপিত 1976. মনে হয় বিবেকানন্দের স্ট্যচুর থেকেও এর উচ্চতাবাড়ানো এক কৌশল যা  

তামিলেদের অহঙ্কারের এক নিদর্শন যদিও দেশ বিদেশের পর্য্যটকরা বিবেকানন্দ রক দেখতেই আসে তাদের মধ্যে কজনেই বা থিরুভুল্লাভুরের খবর রাখে


 বড়দিনের ছুটি পড়ে যাওয়ায় এখন দক্ষিণ  ভারতে ভয়ানক  রাশ এখন এখানকার আবহাওয়া ভারি মনোরম লঞ্চ বিবেকানন্দ রকে এসে ভীড়লোসামনে সমুদ্রের পাগল করা হাওয়ায় সবার বেশবাস এলোমেলো হয়ে গেল আমার নাতি বাবুসোনার টুপি হাওয়ায় উড়ে গেল সে দৌড়ে গিয়ে টুপি কুড়িয়ে এনেমাথায় পরে দুহাত দিয়ে চেপে ধরলো হাওয়া ঠেলে এগিয়ে চললাম দুই সাগর  এক সমুদ্রের এই মিলন তার সাথে সূর্যের  সোনালি কিরণ মাখামাখি হয়ে একনৈসর্গিক দৃশ্যের সৃষ্ঠি করেছে ভারত মহাসাগরের ঢেউয়ের ওপর নানা রঙের আলপনা আঁকা হচ্ছে মোহিত হয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ তারপর সবাই জুতো-টুতো জমা করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম ওপর থেকে ভারত মহাসাগরের অপূর্ব রূপ আরো সুন্দর দেখা যায় সারা রক জুড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্নভাষাভাষির লোক কাতারে কাতারে মহা বিষ্ময়ে এবং 

 মহা আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ মূর্তির পাদদেশে এক টুকরো ভারত যেন উপস্থিত হয়েছে তাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাতে


            বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির তৈরী হয় ঊনিসশো সত্তর সালে রানাডে নামে এক আর্কিটেক্ট এই মন্দির নির্মাণ করেন গর্ভগৃহে একটি উপাসনা স্থল আছে যেটাদেখতে যেমন সুন্দর তেমনি উপাসনার ব্যবস্থাও   

অত্যন্ত ভাল গর্ভগৃহের সামনের দেওয়ালে বেশ বড় করে ওঁ শব্দটি আঁকা কারো ইচ্ছে হলে একটুখানির জন্য বসেযেতে পারেন এরপর আমরা গেলাম থিরুভুল্লাভুরের মন্দির দেখতে এই মন্দিরে যাবার সেতুটি ভারি চমৎকার তারপর আমরা ফিরলাম কটেজে


            বিকেলে আমরা গাড়ীতে করে বেরোলাম কন্যা কুমারী মন্দির দেখতে মন্দিরে ঢুকতে একটা গোপুরম পেরিয়ে যেতে হয় সচরাচর দক্ষিণভারতের মন্দির গুলোতে ঢুকতে যে গোপুরম দেখা যায় তার  খুব সুন্দর হয় এগুলোর উচ্চতা  কারুকার্য  দেখার মত  বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বটে কিন্তু তুলনায় এইমন্দিরের গোপুরম অতি সাধারণ তার না আছে উচ্চতা না আছে ভালো কারুকার্য্য কিন্তু সমুদ্রের ধারে বলে আছে সামুদ্রিক হাওয়া, যদিও সেটা বোঝার উপায় নেই কারণ উঁচু উঁচু বাড়ীর জন্য সমুদ্র এখান থেকে দেখা যায় না এখানে সমুদ্রের ধারে ঘাট আছে অনেক তার মধ্যে মাতৃমন্দির ঘাট অন্যতম পর্যটকরা এইঘাটে স্নান করে কুমারিকা মন্দিরে পূজা দিতে যান পুরুষদের সম্পূর্ণ খালি গায়ে, খালি পায়ে একটি  মাত্র উত্তরীয় গায়ে চড়িয়ে মন্দিরে ঢুকতে পারে মহিলারাকাপড় পড়ে ঢুকতে পারেন তাই আমাদের তিরুবন্তপুরম্ থেকে কেনা উত্তরীয় আমি শুভ বাবুসোনা গায়ে জড়িয়ে নিলাম দুরন্ত হাওয়ায় সেটাও গায়ে রাখার উপায় নেই মন্দির দর্শন করে আমরা বেরিয়ে এলাম কিন্তু স্বর্ণালঙ্কারে  ফুলসাজে ভূষিত দেবী কুমারিকার অপূর্ব সুন্দর মূর্তি দেখে দুই চোখ ভরে গেছে


         মাতৃমন্দির ঘাটের পিছনে একটা গল্প আছে বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম ছিলেন ঋষি জমদগ্নির কনিষ্ঠ পুত্র একদিন ৠষি তার স্ত্রীর চাঞ্চল্যতা দেখেরাগে  অগ্নিশর্মা  হয়ে  তার জ্যেষ্ঠ পুত্র কে ডেকে তার মার শিরচ্ছেদ করার আদেশ দেন কুড়ুল দিয়ে বড় পুত্র মায়ের কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ঋষিরেগে গিয়ে পরের পুত্রকে ডেকে একই আদেশ দেন সেও মায়ের সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকলো এরপর তিনি সব পুত্র দের ডেকে যখন কনিষ্ঠ পুত্রপরশুরামকে ডাকলেন তখন পরশুরাম কুড়ুল তুলে এক কোপে মায়ের শিরোচ্ছেদ করেন কিন্তু মাতৃ হত্যার দায়ে কুঠার তার হাতে লেগে থাকলো ঋষি জমদাগ্নিপরশুরামের ওপর সন্তুষ্ট হলেন, কিন্তু বাকি সব পুত্রদের প্রতি রাগে অভিশাপ দিয়ে তাদের পশু করে রাখলেন তারপর ঋষি পরশুরামের হাতে কুড়ুল আটকে থাকতেদেখে তাকে বর দিতে চাইলেন পরশুরাম তার মাতা  তার ভ্রাতাদের প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন ঋষি অবাক হলেন এবং তার চাওয়াকে ফিরিয়ে নিতে বললেল কিন্তুপরশুরাম কিছুতেই তা ফেরত না নেওয়ায় অগত্যা ঋষি বলতে বাধ্য হয়ে বলেন,' তথাস্তু ' এদিকে পরশুরাম মাতৃহত্যার দায় থেকে মুক্তি পেতে দেশের সর্বত্রতীর্থস্থানগুলো দর্শন করতে বেরিয়ে পরলেন অনেক তীর্থস্থান ঘোরার পরে এই কন্যা কুমারীর  সমুদ্রে স্নান করার সময় তার কুঠার হাত  

থেকে খসে পড়লো মাতৃহত্যার পাপ থেকে তিনি মুক্তি পেলেন এখন সেইজন্য এই ঘাট মাতৃমন্দির ঘাট হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে নাকি দেবী কুমারিকার এক বিগ্রহ এখানে 

 কুড়িয়ে পাওয়ায় এরওপর মন্দির নির্মাণ করে দেবী কুমারিকাকে মাতৃরূপে পূজা করার দরুন এখানে ঘাট 

 তৈরী করে সেই ঘাটের নাম দেওয়া হয় মাতৃমন্দির ঘাট কে জানে


          ডিনার সেরে ফিরে এলাম হোটেলে কাল সকালে যাবো রামেশ্বরম



                                                                                                (  চলবে )
From : - Dipak Kr. Paul, (9007139853),
 

DTC Southern Heights,  

D.H. Road, Joka

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.