কল্পবিজ্ঞান গল্প ।। সাম্যের আকাশ ।। তপন মাইতি

 

ছবিঋণ - ইন্টারনেট 

 

সাম্যের আকাশ

     তপন মাইতি


কলকাতা থেকে বেশ দূরে, সুন্দরবন, ধানখেতের ফাঁকে এক ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই সাম্যের জন্ম। মাটির ঘর, টিনের চাল, বর্ষায় টপটপ করে জল পড়ে—কিন্তু সেই ফাঁক দিয়েই সাম্য প্রথম তারা দেখেছিল।
সাম্য যা চায়, তা সে পায় না। না খেলনা, না নতুন জামা, না উৎসবের দিনেও বড়ো মাছের টুকরো।
মা সবসময় বলেন—"পড়াশোনা কর। চাকরি কর। মানুষের মতো মানুষ হ। দেখবি, সবাই কদর করবে।"
কিন্তু সাম্যের মনে প্রশ্ন জাগে—মানুষের কদর কি কেবল টাকার জন্য? জ্ঞান কি কিছু নয়?
তার সহপাঠী দিশা—ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে। নতুন ব্যাগ, নতুন জুতো, জন্মদিনে কেক কাটে। সাম্য দূর থেকে দেখে। সে রোগা পটকা, খেলাধুলোয় কেউ দলে নেয় না। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু ক্লাসে? বিজ্ঞানের বই খুললেই যেন তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। পুরো একটা আকাশ আলো করে আসে।  যা একদম নীল। 
সাম্য একদিন পুরনো রেডিও ভেঙে ফেলল। বাবা খুব বকেছিলেন। কিন্তু সে ভেতরে দেখে ফেলল—তারের জট, ছোট ছোট সার্কিট, কুণ্ডলী। সেদিন রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল—সে এমন কিছু বানাবে, যা মানুষের জীবন সহজ করবে। গ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জল। গ্রীষ্মে কুয়ো শুকিয়ে যায়। মাঠ ফেটে যায়।
সাম্য ভাবল—"যদি বাতাস থেকে জল তৈরি করা যেত?" বই পড়ে সে জানল, বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকে।
সে পুরনো ফ্যান, বরফের বাক্স, আর টিনের পাত দিয়ে বানাল এক অদ্ভুত যন্ত্র।
নাম দিল— "নীল কুয়াশা সংগ্রাহক"। প্রথমে সবাই হাসল। কিন্তু ভোরবেলা যন্ত্রের নিচে ছোট্ট বালতিতে জল জমে উঠল। মা অবাক। বাবা চুপচাপ। সাম্যের চোখে তখন অন্য আলো।
সেই রাতেই সাম্য ছাদে বসে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ তার বানানো যন্ত্রের লাল বাতি জ্বলে উঠল।
এক অদ্ভুত সংকেত! মনে হচ্ছিল—দূর মহাকাশ থেকে কেউ ডেটা পাঠাচ্ছে।
সে সংকেত রূপান্তর করে দেখল—একটি মানচিত্র। পৃথিবীর নয়। সে বুঝল—এটা কোনো উপগ্রহের ভাঙা সিগন্যাল নয়। এ যেন কেউ তাকে খুঁজছে।
পরদিন দিশা জিজ্ঞেস করল—"তুই এত পড়িস কেন? চাকরি করে টাকা কামাবি, তাই তো?"
সাম্য শান্ত গলায় বলল—"আমি শুধু টাকা চাই না। আমি চাই, যেন গ্রামের মানুষ আর কষ্ট না পায়।"
দিশা প্রথমবার চুপ করে গেল।
সাম্য ঠিক করল—সে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তি-উৎপাদক বানাবে, যা সূর্যের আলো আর বাতাস থেকে শক্তি নিয়ে সারাবছর বিদ্যুৎ দেবে। তার নোটবুকে লেখা ছিল—
"Project Blue Star"
সে ভাবল—যদি প্রতিটি গ্রামে ছোট ছোট শক্তি-তারা বসানো যায়, তাহলে লোডশেডিং থাকবে না।
তার যন্ত্র তৈরি হলো—একটি ছোট গোলাকার ডিভাইস। নিজে নিজে ঘোরে। আলো শোষণ করে। বাতাস টানে। গ্রামের মোড়ে বসানো হলো পরীক্ষামূলকভাবে।
সেই রাতে—গ্রামের সব বাড়িতে প্রথমবার টানা ছয় ঘণ্টা আলো জ্বলল।
মা কাঁদলেন। বাবা মাথায় হাত রাখলেন। কিন্তু রহস্য তখনও বাকি।
সেই অদ্ভুত সংকেত আবার এল।
এবার স্পষ্ট বার্তা—"তুমি প্রস্তুত। মানবতার জন্য কাজ চালিয়ে যাও।" সাম্য বুঝল—
সে একা নয়। পৃথিবীর বাইরেও কেউ আছে, যারা নজর রাখছে—মানুষের মধ্যে কে সত্যিই মানবতার জন্য কাজ করছে। তার তৈরি যন্ত্র হঠাৎ নীল আলো ছড়াতে লাগল। আকাশে এক অদ্ভুত রিং তৈরি হলো। দিশা দূর থেকে দেখছিল। গ্রামের মানুষ ভয় পেয়ে গেল। সাম্য শান্ত স্বরে বলল—
"এটা ভয়ের নয়। এটা ভবিষ্যতের দরজা।" নীল আলো ধীরে ধীরে তার চারপাশে ঘিরে ধরল।
রাত গভীর। গ্রামের আকাশে তারা কম, কিন্তু সাম্যের চোখে আজ নক্ষত্রের ভিড়।
তার সামনে টেবিলে ছড়িয়ে আছে তার "নীল নক্ষত্র" প্রকল্পের নকশা—যে স্বপ্ন একদিন মাটির ঘরে জন্মেছিল।
সে জানে, আজকের রাতটা অন্যরকম। যে ছেলেটা একসময় খেলনা পায়নি, নতুন জামা পায়নি, মাঠে দলে নেয়নি কেউ—সে আজ মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন শুধু হৃদস্পন্দন নয়—
এ যেন ভবিষ্যতের দরজায় কড়া নাড়া। মা ঘরের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছেন। মায়ের চোখে উদ্বেগও আছে, আবার গোপন গর্বও আছে।
বাবা চুপচাপ বারান্দায় বসে বিড়ি হাতে—কিন্তু আজ তার চোখে সন্দেহ নেই, আছে অপেক্ষা।
সাম্য যন্ত্রটার সুইচ ছুঁয়ে দেয়। কিছু মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে নীল আলো ছড়াতে শুরু করে গোলাকার ডিভাইসটা। বাতাস যেন থমকে দাঁড়ায়। ফ্যান না চললেও টিনের চালের ওপর দিয়ে হাওয়ার শব্দ আসে। গ্রামের কয়েকটা বাড়িতে একে একে আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলো শুধু বিদ্যুতের নয়—
এ আলো আত্মসম্মানের। এ আলো প্রমাণের—মধ্যবিত্তের সন্তানও স্বপ্ন দেখলে আকাশ ছুঁতে পারে। সাম্যের চোখ ভিজে যায়। সে মনে মনে বলে—"আমি শুধু নিজের জন্য করিনি।
আমি করেছি তাদের জন্য, যারা প্রতিদিন কষ্ট করে বাঁচে। যাদের ঘরে আলো নেই, কিন্তু স্বপ্ন আছে।" দিশা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে। আজ সে প্রথমবার সাম্যকে নতুন চোখে দেখে—দারিদ্র্যের নয়, সম্ভাবনার চোখে।
সাম্যের হাত কাঁপছে—ভয়ে নয়, আবেগে। সে জানে, এ শুরু মাত্র। কল্পবিজ্ঞানের যে ভাবনা সে বুকের মধ্যে লালন করেছে, তা আর কাগজে বন্দী নেই। তা বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে গেছে। তার মনে হয়—
মানুষের বড় হওয়া মানে শুধু চাকরি পাওয়া নয়। মানুষের বড় হওয়া মানে অন্য মানুষের জীবন একটু সহজ করা। নীল আলো ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যায়। গ্রামের অন্ধকার পিছু হটে। সাম্য আকাশের দিকে তাকায়।
আজ তার মনে হয়, তারারাও যেন একটু ঝুঁকে তাকিয়ে আছে—এক মধ্যবিত্ত ছেলের জেদ, ব্যথা আর ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া ভবিষ্যতের দিকে। তার বুকের ভেতর একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হয়—"স্বপ্ন শুধু দেখার জন্য নয়, স্বপ্ন বাস্তব করার জন্য।"
=======================
 
নাম:তপন মাইতি
ঠিকানাঃ গ্রামঃ পশ্চিম দেবীপুর; পোঃ দেবীপুর; থানাঃ মৈপীঠ কোস্টাল; জেলাঃ দঃ২৪পরগণা; পিন-৭৪৩৩৮৩; পশ্চিমবঙ্গ। ভারত।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.